ঈমানের শাখা

হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী

(পর্ব-১০)

(৫৩) পিতামাতার খেদমত করা :

মহান আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার খেদমতের কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا  ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরীক করো না। তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো’ (নিসা, ৪/৩৬)। মহান আল্লাহ বলেন, وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ ‘আর আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখো, তোমার) প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই’ (লোক্বমান, ৩২/১৪)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ– ‘আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোয় সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌঁছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতাÑপিতার উপর যে নে‘মত দান করেছ, তোমার সে নে‘মতের যেন আমি শুকরিয়া আদায় করতে পারি এবং আমি যেন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পসন্দ করো। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মাঝে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’ (আহকাফ, ৪৬/১৫)।  মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا – وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا– ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাদের প্রতি ‘উহ’ শব্দটিও করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তাদের সাথে নরমভাবে কথা বলো। আর তাদের প্রতি মমতাবশে নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো যেমন তারা আমাকে ছোটকালে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন’ (বানী ইসরাঈল, ১৪/২৩-২৪)।

নিজের জন্য পিতা-মাতা এবং সন্তান-সন্তুতিসহ সকল মুমিন মুমিনাত এবং মুসলিম-মুসলিমাতের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। যেমন, মহান আল্লাহ ইবরাহীম ন সম্পর্কে বলেন, رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ ‘হে আমাদের প্রভু! আমাকে ও আমার পিতামাতাকে এবং ঈমানদার সকলকে ক্ষমা করো, যেদিন হিসাব দণ্ডায়মান হবে’ (ইবরাহীম, ১৪/৪১)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى عَمْرٍو الشَّيْبَانِىَّ يَقُولُ حَدَّثَنَا صَاحِبُ هَذِهِ الدَّارِ وَأَشَارَ إِلَى دَارِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ سَأَلْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم أَىُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ قَالَ الصَّلاَةُ عَلَى وَقْتِهَا. قَالَ ثُمَّ أَىُّ قَالَ ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ. قَالَ ثُمَّ أَىُّ قَالَ الْجِهَادُ فِى سَبِيلِ اللَّهِ. قَالَ حَدَّثَنِى بِهِنَّ وَلَوِ اسْتَزَدْتُهُ لَزَادَنِى–

আবু আমর আশ-শায়বানী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর বাড়ীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ বাড়ীর মালিক আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমলটি  আল্লাহর  নিকট অধিক প্রিয়। তিনি বললেন, যথাসময়ে ছালাত আদায় করা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, অতঃপর পিতা-মাতার খেদমত করা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোনটি? আল্লাহর  রাসূল (ছাঃ) বললেন, অতঃপর আল্লাহর  পথে জিহাদ করা। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বললেন, এগুলো তো আল্লাহর  রাসূল (ছাঃ) আমাকেই বলেছেন। যদি আমি আরও অধিক জানতে চাইতাম, তাহলে তিনি আরও বলতেন’।[1]  অপর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِى قَالَ أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ  أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ أَبُوكَ–

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর  রাসূল! আমার নিকট উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হক্বদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বললেন, অতঃপর কে? নবী (ছাঃ) বললেন, তোমার মা। তিনি বললেন, অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তিনি বললেন, অতঃপর কে? তিনি বললেন, অতঃপর তোমার পিতা’।[2]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أُجَاهِدُ. قَالَ لَكَ أَبَوَانِ. قَالَ نَعَمْ. قَالَ فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ-

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি জিহাদে যাব? তিনি বললেন, তোমার কি পিতা-মাতা আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তাদের (সেবা করার মাধ্যমে) জিহাদ করো’।[3]  অপর হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رضى الله عنهما قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ. قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَلْعَنُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ قَالَ يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أَمَّهُ

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী (ছাঃ) বলেছেন, কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লা‘নত করা। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর  রাসূল (ছাঃ) আপন পিতা-মাতাকে কোনো লোক কীভাবে লা‘নত করতে পারে? তিনি বললেন, সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়’।[4]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى بَكْرَةَ عَنْ أَبِيهِ رضى الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ. قُلْنَا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ  الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ. وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ، أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ . فَمَا زَالَ يَقُولُهَا حَتَّى قُلْتُ لاَ يَسْكُتُ

আবু বাকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমি কি তোমাদের সব থেকে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? আমরা বললাম, অবশ্যই সতর্ক করবেন হে আল্লাহর  রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহর  সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশীদার গণ্য করা, পিতামাতার নাফরমানী করা (অবাধ্য হওয়া)। একথা বলার সময় তিনি হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন, এরপর সোজা হয়ে) বসলেন এবং বললেন, মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, দু‘বার করে বললেন। ক্রমাগত বলেই চললেন, এমনকি আমি বললাম,  তিনি মনে হয় থামবেন না’।[5]

(৫৪) আত্মীয়তা রক্ষা করা :

মহান আল্লাহ বলেন, فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ- أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ-  ‘তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তাহলে তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই যাদের আল্লাহ লা‘নত করেন, ফলে তাদের বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন’ (মুহাম্মাদ, ৪৭/২২-২৩)। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ  ‘পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর  সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং যে সম্পর্ক অটুট রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে ও পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য রয়েছে অভিসম্পাৎ এবং তাদের জন্য রয়েছে মন্দ আবাস’(রা‘দ, ১৩/২৫)। অথবা নিজের কল্যাণের জন্যই আত্মীয়তা রক্ষা করতে হবে, যাতে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন নাজাত মিলে। মহান আল্লাহ বলেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا ‘আর তোমরা আল্লাহর  ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরীক করো না। তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং আত্মীয় পরিজন, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, পথের সাথী ও তোমাদের দক্ষিণ হাত যাদের অধিকারী তাদের সাথেও সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিতকে ভালোবাসেন না’ (নিসা, ৪/৩৬)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنه قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ رِزْقُهُ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِى أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি পসন্দ করে যে, তার জীবিকা বৃদ্ধি হোক অথবা তাঁর মৃত্যুর পরে সুনাম থাকুক, তবে সে যেন আত্মীয়ের সঙ্গে সদাচরণ করে’।[6]   অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ  صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ الرَّحِمَ سُجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ ، فَقَالَ اللَّهُ مَنْ وَصَلَكِ وَصَلْتُهُ ، وَمَنْ قَطَعَكِ قَطَعْتُهُ  আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী (ছাঃ) বলেন, ‘রক্ত সম্পর্কে মূল হলো রহমান। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, যে ব্যক্তি তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখবে আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার হতে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও সে লোক হতে সম্পর্ক ছিন্ন করব’।[7]  নবী (ছাঃ) বলেন, لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِى إِذَا قَطَعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا– ‘প্রতিদানকারী আত্মীয়তার হক্ব সংরক্ষণকারী নয়, বরং আত্মীয়তার হক্ব সংকরক্ষণকারী সে ব্যক্তি যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরেও বজায় রাখে’।[8]

জান্নাত পেতে হলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى أَيُّوبَ رضى الله عنه أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَخْبِرْنِى بِعَمَلٍ يُدْخِلُنِى الْجَنَّةَ. قَالَ مَا لَهُ مَا لَهُ وَقَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم أَرَبٌ مَالَهُ، تَعْبُدُ اللَّهَ، وَلاَ تُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمُ الصَّلاَةَ، وَتُؤْتِى الزَّكَاةَ، وَتَصِلُ الرَّحِمَ-

আবু আইয়ূব আনছারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, ‘এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি বিষয় শিক্ষা দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। উপস্থিত লোকজন বললেন, তার কী হয়েছে? তার কী হয়েছে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তার একটি বিশেষ প্রয়োজন আছে। এরপর নবী (ছাঃ) বললেন, তুমি আল্লাহর  ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে অংশী স্থাপন করবে না, ছালাত ক্বায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে’।[9]   অপর হাদীছে এসেছে,

عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ إِنَّ جُبَيْرَ بْنَ مُطْعِمٍ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ

জুবায়ের ইবনু মুতঈম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি নবী (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। [10]

(৫৫) উত্তম চরিত্র :

বিনয়-নম্রতা অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করে। হক্ব পেলেই হক্ব গ্রহণ করা, রাগের সময় মানুষকে ক্ষমা করা, আমানত বজায় রাখা, সত্য কথা বলা, ইসলামের সকল কাজ রাসূল (ছাঃ)-এর দেখানো পদ্ধতিতে আদায় করা, প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, শিরকী কাজ ও বিদ‘আতী আমল থেকে মানুষকে রক্ষা করা, সকল অন্যায় অপকর্ম থেকে নিজেকে হেফাযত রাখার চেষ্টা করা এবং অপরকেও রক্ষা করার চেষ্টা করা। রাসূল (ছাঃ)-এর চরিত্রকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসকে কামনা করে ও অধিক হারে আল্লাহকে স্মরণ করে’ (আহযাব, ৩৩/২১)। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ ‘আর অবশ্যই তুমি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত’ (ক্বলম, ৬৮/৪)। উত্তম চরিত্রের আরও একটি গুণ মানুষকে ক্ষমা করা। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ‘যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় (আল্লাহর  রাস্তায়) ব্যয় করে, যারা ক্রোধ দমন করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৩৪)।

সুতরাং সাধারণভাবে মানবজাতিকে এবং বিশেষভাবে সকল দাঈ ও ওলামায়ে কেরামকে নম্রতা-ভদ্র হতে হবে, মানুষকে অন্যায়ভাবে ধমক দেওয়া, কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, আচার-ব্যবহার উগ্র হওয়া চলবে না। এরূপ করলে মানুষ নিকটে থাকবে না। বদনাম ছাড়া কিছুই করবে না। এ মর্মে রাসূল (ছাঃ)-কে আল্লাহ বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ– ‘আর আল্লাহর  রহমতের কারণেই তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী কঠোর হৃদয়ের হতে, তাহলে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত’ (আলে ইমরান, ৩/১৫৯)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رضى الله عنهما قَالَ لَمْ يَكُنِ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا وَكَانَ يَقُولُ إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاَقًا-

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী (ছাঃ) অশ্লীলভাষী ও অসাদচরণে অধিকারী ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নৈতিকতায় সর্বোত্তম’।[11]   অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ مَسْرُوقٍ قَالَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمْ يَكُنْ فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا وَقَالَ إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَىَّ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاَقًا

মাসরূক্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহর  রাসূল (ছাঃ) জন্মগতভাবে বা ইচ্ছাপূর্বক অশ্লীল ভাষী ছিলেন না। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি আমার সবচেয়ে প্রিয়, যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী’।[12]  অপর এক হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها أَنَّهَا قَالَتْ مَا خُيِّرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَمْرَيْنِ إِلاَّ أَخَذَ أَيْسَرَهُمَا، مَا لَمْ يَكُنْ إِثْمًا، فَإِنْ كَانَ إِثْمًا كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ، وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِنَفْسِهِ، إِلاَّ أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ بِهَا-

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী (ছাঃ)-কে কখনো দু’টি জিনিসের একটি গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হলে তখন তিনি সহজটিই গ্রহণ করতেন, যদি তা গুনাহ না হত। গুনাহ হতে তিনি অনেক দূরে অবস্থান করতেন। নবী করীম (ছাঃ) নিজের ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর  সীমারেখা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রতিশোধ নিতেন’।[13]  সুতরাং কুরআন-সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং সালাফে ছালেহীনের আদর্শে আদর্শবান হওয়াই উত্তম আদর্শ।

(৫৬) ক্রীতদাসদের প্রতি ইহসান করা, উত্তম ব্যবহার করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورً ‘আর তোমরা আল্লাহর  ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরীক করো না। তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং আত্মীয় পরিজন, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, পথের সাথী ও তোমাদের দক্ষিণ হাত যাদের অধিকারী তাদের সাথেও সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিতকে ভালোবাসেন না’ (নিসা ৪/৩৬)। হাদীছে এসেছে,

عَنِ الْمَعْرُورِقَالَ رَأَيْتُ أَبَا ذَرٍّ الْغِفَارِىَّ رضى الله عنه وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ وَعَلَى غُلاَمِهِ حُلَّةٌ فَسَأَلْنَاهُ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ إِنِّى سَابَبْتُ رَجُلاً فَشَكَانِى إِلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لِىَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم أَعَيَّرْتَهُ بِأُمِّهِ. ثُمَّ قَالَ إِنَّ إِخْوَانَكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ فَأَعِينُوهُمْ

মা‘রূর (রহিঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি আবু যার গিফারী (রাঃ)-এর দেখা পেলাম। তার গায়ে তখন এক জোড়া কাপড় আর ক্রীতদাসের গায়ের (অনুরূপ) এক জোড়া কাপড় ছিল। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তিকে আমি গালি দিয়েছিলাম। সে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তখন নবী করীম (ছাঃ) আমাকে বললেন, তুমি তার মায়ের প্রতি কটাক্ষ করে লজ্জা দিলে? তারপর তিনি বললেন, তোমাদের গোলামেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। কাজেই কারও ভাই যদি তার অধীনে থাকে তবে সে যা খায় তা হতে যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরিধান করে, তা হতে যেন পরিধান করায় এবং তাদের সাধ্যাতীত কোনো কাজে বাধ্য না করে। তোমরা যদি তাদের শক্তির ঊর্ধ্বে কোনো কাজ তাদের দাও তবে সহযোগিতা করো’। [14]

(চলবে)

[1]. বুখারী, হা/৫২৭; মুসলিম, হা/৮৫; আহমাদ, হা/৩৮৯০ ।

[2]. বুখারী, হা/৫৯৭১; মুসলিম, হা/২৫৪৮; আহমাদ, হা/৯০৮১।

[3]. বুখারী, হা/৫৯৭২; মুসলিম, হা/২৫৪৯; আহমাদ, হা/৬৭৬৫।

[4]. বুখারী, হা/৫৯৭৩; মুসলিম, হা/৯০; আহমাদ, হা/৭০২৯।

[5]. বুখারী, হা/৫৯৭৬; মুসলিম, হা/৮৭; আহমাদ, হা/২০৩৮৫।

[6]. বুখারী, হা/২০৬৭; মুসলিম, হা/২৫৫৭; আহমাদ, হা/১৩৫৮৫।

[7]. বুখারী, হা/৫৯৮৮।

[8]. বুখারী, হা/৫৯৯১; আহমাদ, হা/৬৫২৪।

[9]. বুখারী, হা/৫৯৮৩; মুসলিম, হা/২৫৫৬; আহমাদ, হা/১৬৭৩২।

[10]. বুখারী, হা/৫৯৮৪; মুসলিম, হা/২৫৫৬; আহমাদ, হা/১৬৭৩২।

[11]. বুখারী, হা/৩৫৫৯; মুসলিম, হা/২৩২১; আহামদ, হা/৬৫০৪।

[12]. বুখারী, হা/৩৭৫৯; আহমাদ, হা/৬৭৬৭।

[13]. বুখারী, হা/৩৫৬০; মুসলিম, হা/২৩২৭; আহমাদ, হা/২৪৮৪৬; বায়হাক্বী, হা/১০/৩৫০।

[14]. বুখারী, হা/২৫৪৫; মুসলিম, হা/১৬৬১; আহমাদ, হা/২১৪৩২।