ঈমানের শাখা

হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী

(পর্ব-১২)

(৫৯) দ্বীনদার ব্যক্তিদের নিকটবর্তী হওয়া, তাদেরকে ভালোবাসা, তাদের মাঝে সালাম প্রচার করা এবং মুছাফাহ করা :

মুসলিম-মুমিন ব্যক্তির মাঝে সালাম প্রচার একে অপরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টির একটি অন্যতম মাধ্যম। নিজ গৃহে হোক বা অন্যের গৃহে হোক সালাম দিয়েই প্রবেশ করবে। আর অন্যের গৃহে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করবে না, অনুমতি দিলে সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যদের গৃহে প্রবেশ করো না। যতক্ষণ না তোমরা তাদের অনুমতি নাও এবং গৃহবাসীদের প্রতি সালাম কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। সম্ভবত তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে (তা মেনে চলার মাধ্যমে)’ (নূর, ২৪/২৭)। এরপর মহান আল্লাহ  বলেন,

فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

‘যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তাহলে সেখানে প্রবেশ করো না, তোমাদেরকে অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও! তাহলে তোমরা ফিরে এসো। এটাই তোমাদের জন্য পবিত্রতর। আর আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত’ (নূর, ২৪/২৮)। এই শরী‘আত সম্মত সুন্দর আদবটি মহান আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রদান করেছেন, যাতে করে তারা অন্যের গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়, এরপর সালাম প্রদান করে। আর প্রবেশ করার পূর্বে তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরে অনুমতি না দিলে ফিরে আসবে। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ كُنْتُ فِى مَجْلِسٍ مِنْ مَجَالِسِ الأَنْصَارِ إِذْ جَاءَ أَبُو مُوسَى كَأَنَّهُ مَذْعُورٌ فَقَالَ اسْتَأْذَنْتُ عَلَى عُمَرَ ثَلاَثًا، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِى فَرَجَعْتُ فَقَالَ مَا مَنَعَكَ قُلْتُ اسْتَأْذَنْتُ ثَلاَثًا، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِى فَرَجَعْتُ، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا اسْتَأْذَنَ أَحَدُكُمْ ثَلاَثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، فَلْيَرْجِعْ فَقَالَ وَاللَّهِ لَتُقِيمَنَّ عَلَيْهِ بِبَيِّنَةٍ أَمِنْكُمْ أَحَدٌ سَمِعَهُ مِنَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ أُبَىُّ بْنُ كَعْبٍ وَاللَّهِ لاَ يَقُومُ مَعَكَ إِلاَّ أَصْغَرُ الْقَوْمِ، فَكُنْتُ أَصْغَرَ الْقَوْمِ، فَقُمْتُ مَعَهُ فَأَخْبَرْتُ عُمَرَ أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ذَلِكَ-

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি আনছারদের এক মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আবু মূসা (রাঃ) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এসে বললেন, আমি তিনবার ওমর (রাঃ)-এর নিকট অনুমতি চাইলাম কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হলো না। তাই আমি ফিরে এলাম। ওমর (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে ভিতরে প্রবেশ করতে কিসে বাধা দিল? আমি বললাম, আমি প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হলো না। তাই আমি ফিরে আসলাম। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যদি তোমাদের কেউ তিনবার প্রবেশের অনুমতি চায়, কিন্তু তাতে অনুমতি দেয়া না হয় তবে সে যেন ফিরে যায়। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! তোমাকে একথার উপর অবশ্যই প্রমাণ পেশ করতে হবে। ফলে তিনি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মাঝে কেউ কি নবী করীম (ছাঃ) থেকে এই হাদীছ শুনেছ? তখন উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার কাছে প্রমাণ দিতে দলের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তিই উঠে দাঁড়াবে। আর আমি দলের সর্বকনিষ্ঠ ছিলাম। সুতরাং আমি তার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, রাসূল (ছাঃ) অবশ্যই একথা বলেছেন’।[1]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو  رضى الله عنهما أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم أَىُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ قَالَ تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূলর্ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামের কোন কাজটি তুলনামূলক বেশী উত্তম? তিনি বললেন, তুমি অন্যকে খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা-অচেনা সকলকে সালাম প্রদান করবে।[2]  অন্যত্র এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الْكَبِيرِ، وَالْمَارُّ عَلَى الْقَاعِدِ، وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, বয়োকনিষ্ঠ বয়োজ্যৈষ্ঠকে, পথচারী উপবিষ্টকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম দিবে’।[3]

রাসূল ধ শিশুদেরকেও সালাম দিতেন। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنه أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَقَالَ كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم يَفْعَلُهُ

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একবার আনাস (রাঃ) একদল শিশুর পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করা কালে তিনি তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন যে, নবী করীম (ছাঃ) তা করতেন’।[4]

মহিলাদের সালাম দেওয়া সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ,

عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها حَدَّثَتْهُ أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَهَا إِنَّ جِبْرِيلَ يُقْرِئُكِ السَّلاَمَ قَالَتْ وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللهِ

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা নবী করীম (ছাঃ) তাকে বললেন, জিবরীল (আঃ) তোমাকে সালাম দিয়েছেন। তখন তিনি বললেন, ওয়া আলাইহিস সালাম ও রহমাতুল্লাহ’।[5]   অন্য এক হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيهِ عَنْ سَهْلٍ قَالَ كُنَّا نَفْرَحُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ قُلْتُ وَلِمَ قَالَ كَانَتْ لَنَا عَجُوزٌ تُرْسِلُ إِلَى بُضَاعَةَ قَالَ ابْنُ مَسْلَمَةَ نَخْلٍ بِالْمَدِينَةِ فَتَأْخُذُ مِنْ أُصُولِ السِّلْقِ فَتَطْرَحُهُ فِى قِدْرٍ، وَتُكَرْكِرُ حَبَّاتٍ مِنْ شَعِيرٍ، فَإِذَا صَلَّيْنَا الْجُمُعَةَ انْصَرَفْنَا وَنُسَلِّمُ عَلَيْهَا فَتُقَدِّمُهُ إِلَيْنَا، فَنَفْرَحُ مِنْ أَجْلِهِ، وَمَا كُنَّا نَقِيلُ وَلاَ نَتَغَدَّى إِلاَّ بَعْدَ الْجُمُعَةِ-

সাহ্ল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জুম‘আর দিনে খুশি হতাম। রাবী বলেন, আমি তাকে বললাম, কেন? তিনি বললেন, আমাদের একজন বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে কোনো লোককে ‘বুদা‘আ’ নামক খেজুর বাগানে পাঠিয়ে বীচ চিনির শিকড় আনতো। তা একটি হাঁড়িতে দিয়ে সে তাতে কিছুটা যবের দানা দিয়ে ঘুঁটে এক রকম খাবার তৈরি করত। এরপর আমরা যখন জুম‘আর ছালাত আদায় করে ফিরতাম তখন আমরা এ মহিলাকে সালাম দিতাম। তখন সে আমাদের ঐ খাবার পরিবেশন করত। আমরা এজন্য খুশী হতাম। আমাদের নিয়ম ছিল যে, আমরা জুম‘আর পরেই মধ্যাহ্নভোজন  করে বিশ্রাম  করতাম’।[6]

অতএব, ফেতনার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে মেয়েদের সালাম দেওয়া যেতে পারে।

একে অপরের মাঝে সালাম প্রচার-প্রসার এর মাধ্যমে মহব্বত বাড়বে। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না বিশ্বাস স্থাপন করবে। বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবে না যতক্ষণ না পরস্পরে ভালোবাসা স্থাপন করবে, তাহলে আমি কি তোমাদের সে বিষয়টি বলে দিব না যেটি করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা তৈরি হবে। তাহলে তোমরা তোমাদের পরস্পরের মাঝে সালামের প্রচার-প্রসার করো’।[7]

যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, তাদের ব্যাপারে হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ اللهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلاَلِى الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِى ظِلِّى يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلاَّ ظِلِّى-

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমার মর্যাদা-সম্মানার্থে পরস্পরকে ভালোবেসেছিল তারা কোথায়? আজকে আমি তাদের আমার ছায়াতলে ছায়া দিব। এ দিনে আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই’।[8]

মুছাফাহা সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,

عَنْ قَتَادَةَ قَالَ قُلْتُ لأَنَسٍ أَكَانَتِ الْمُصَافَحَةُ فِى أَصْحَابِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ نَعَمْ

ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আমি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী করীম (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণের মধ্যে কি মুছাফাহা চালু ছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ’।[9]

(৬০) সালামের উত্তর  দেওয়া :

মহান আল্লাহ  বলেন,  وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا ‘আর যখন তোমরা সম্ভাষণপ্রাপ্ত হও, তখন তার চেয়ে উত্তম সম্ভাষণ প্রদান করো অথবা ওটাই প্রত্যুত্তর করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী’ (নিসা, ৪/৮৬)। যখন তোমাদের কোনো মুসলিম ভাই সালাম দেয়, তখন তাকে তার থেকে উত্তমভাবে জবাব দাও, অথবা তার অনুরূপ উত্তর দাও।

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ عَلَى الطُّرُقَاتِ فَقَالُوا مَا لَنَا بُدٌّ، إِنَّمَا هِىَ مَجَالِسُنَا نَتَحَدَّثُ فِيهَا قَالَ فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلاَّ الْمَجَالِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهَا قَالُوا وَمَا حَقُّ الطَّرِيقِ قَالَ غَضُّ الْبَصَرِ، وَكَفُّ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلاَمِ، وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ، وَنَهْىٌ عَنِ الْمُنْكَرِ

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে একবার নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রাস্তায় বসা ব্যতীত কোনো উপায় নেই, আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি। তখন তিনি বললেন, যদি তোমাদের রাস্তায় মজলিস করা ব্যতীত উপায় না থাকে, তবে তোমরা রাস্তার হক্ব আদায় করবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক্ব কী? তিনি বললেন, তা হলো চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া। সালামের জবাব দেওয়া এবং সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা’।[10]

(৬১) অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা :

হাদীছে এসেছে,

عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رضى الله عنهما قَالَ أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِسَبْعٍ بِعِيَادَةِ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ، وَتَشْمِيتِ الْعَاطِسِ، وَنَصْرِ الضَّعِيفِ، وَعَوْنِ الْمَظْلُومِ، وَإِفْشَاءِ السَّلاَمِ، وَإِبْرَارِ الْمُقْسِمِ، وَنَهَى عَنِ الشُّرْبِ فِى الْفِضَّةِ، وَنَهَانَا عَنْ تَخَتُّمِ الذَّهَبِ، وَعَنْ رُكُوبِ الْمَيَاثِرِ، وَعَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ، وَالدِّيبَاجِ، وَالْقَسِّىِّ، وَالإِسْتَبْرَقِ-

বারাআ ইবনু আযিব (ছাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন- ‘রোগীর খোঁজ-খবর নেওয়া, জানাযার সঙ্গে যাওয়া, হাঁচিদাতার জন্য দু‘আ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, মাযলূমের সাহায্য করা, সালামের প্রচার-প্রসার করা এবং কসমকারীর কসম পূর্ণ করা। আর নিষেধ করেছেন, (সাতটি কাজ থেকে) রূপার পাত্রে পানাহার, স্বর্ণের আংটি পরিধান, রেশমী যিনের উপর সওয়ার হওয়া, মিহি রেশমী বস্তু পরিধান করা, পাতলা রেশমী বস্ত্র ব্যবহার, রেশম মিশ্রিত কাতান বস্ত্র পরিধান এবং গাঢ় রেশমী পরিধান করা’।[11]   রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, عَائِدُ الْمَرِيضِ فِى مَخْرَفَةِ الْجَنَّةِ حَتَّى يَرْجِعَ ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ ব্যক্তির সেবায় নিয়োজিত রয়েছে সে জান্নাতের পথে রয়েছে যতক্ষণ না সে ফিরে আসে’।[12]

(৬২) যে ব্যক্তিই মারা যাক, তার জানাযার ছালাত পড়া :

হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ رَدُّ السَّلاَمِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ

আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের হক্ব পাঁচটি- (১) সালামের জওয়াব দেওয়া (২) অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেওয়া। (৩) জানাযার পশ্চাদনুসরণ করা। (৪) দাওয়াত কবুল করা। (৫) হাঁচিরদাতার উত্তর দেওয়া (আল-হামদুলিল্লাহ জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা)’। [13]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের ছয়টি হক্ব রয়েছে। জিজ্ঞেস করা হলো, সেগুলো কী কী হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, (১) যখন তুমি সাক্ষাৎ করবে, তখন তাকে সালাম দিবে (২) তোমাকে দাওয়াত করলে তা কবুল করবে। (৩) তোমাকে নছীহত করলে তা গ্রহণ করবে। (৪) হাঁচিদাতার আল-হামদুলিল্লাহর জবাব দিবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে। (৫) অসুস্থ হলে তার সেবা করবে এবং (৬) কেউ মারা গেলে তার জানাযায় শরীক হবে।[14]   অন্যত্র এসেছে,

عَنْ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فَلَهُ قِيرَاطٌ فَإِنْ شَهِدَ دَفْنَهَا فَلَهُ قِيرَاطَانِ الْقِيرَاطُ مِثْلُ أُحُدٍ

ছাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জানাযার ছালাত আদায় করল তার জন্য এক ক্বীরাত্ব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি জানাযার ছালাত ও দাফন করাতে উপস্থিত হলো তার জন্য দু’ক্বীরাত্ব রয়েছে। এক ক্বীরাত্ব হলো উহুদ পাহাড়ের সমান’।[15]

(৬৩) হাঁচিদাতার জন্য দুআ করা :

আবু মূসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمِّتُوهُ فَإِنْ لَمْ يَحْمَدِ اللَّهَ فَلاَ تُشَمِّتُوهُ ‘তোমাদের কেউ যখন হাঁচির পর আল-হামদুলিল্লাহ পড়ে, তখন তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে (দু‘আ করো) আর যদি আল-হামদুলিল্লাহ না পড়ে, তাহলে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে জবাব দিয়ো না’।[16]

 

(৬৪) কাফের এবং ফিতনা-ফাসাদকারীদের থেকে দূরে থাকা আর তাদের প্রতি কঠোর হওয়া :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ

‘মুমিনগণ যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে তোমরা যদি তাদের থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো। আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর (প্রতিশোধ গ্রহণ) সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন। আর আল্লাহর কাছেই সবাইকে ফিরে যেতে হবে’ (আলে ইমরান, ৩/২৮)। মহান আল্লাহ  আরও বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহূদী-নাছারাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা তাদের মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না (মায়েদাহ, ৪/৫১)। তিনি আরও বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

‘হে মুমিনগণ! তোমাদের পূর্বে যারা কিতাবপ্রাপ্ত হয়েছে, তাদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের দ্বীনকে খেল-তামাশার বস্তু মনে করে তাদের ও কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক’ (মায়েদাহ, ৪/৫৭)। মহান আল্লাহ  বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিকটবর্তী কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো। তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করে। আর জেনে রাখো যে, আল্লাহ সর্বদা মুত্তাক্বীদের সঙ্গে থাকেন’ (তওবাহ, ৬/১২৩)।

মহান আল্লাহ বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করিও না, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা তারা অস্বীকার করেছে এবং রাসূলকে ও তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে এজন্য যে তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। তোমরা যদি আমার পথে সংগ্রামে ও আমার সন্তুষ্টির সন্ধানে বের হও (তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না) তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ কর অথচ তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো তা আমি জানি। তোমাদের মধ্যে যে এমন করবে সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হবে’ (মুমতাহিনা, ৬০/১)।

মহান আল্লাহ  বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের পিতা ও ভাইদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের মুক্বাবিলায় কুফরকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই সীমালঙ্ঘকারী’ (তওবাহ, ৬/২৩)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لاَ تَبْدَؤُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى بِالسَّلاَمِ، فَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقٍ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِه-

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ইয়াহূদী এবং নাছারাদের প্রথমে সালাম দিয়ো না। তোমাদের সাথে তাদের কারও রাস্তায় সাক্ষাৎ হলে তাকে অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ রাস্তায় চলতে বাধ্য করো’।[17]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ تُصَاحِبْ إِلاَّ مُؤْمِنًا وَلاَ يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلاَّ تَقِىٌّ.

‘তোমার বন্ধু যেন মুমিন ব্যক্তি হয় আর তোমার খানা যেন মুমিন ব্যক্তি, মুত্তাক্বী ব্যক্তি খায়’।[18]

 

(৬৫) প্রতিবেশীর সম্মান করা : 

মহান আল্লাহ  বলেন,

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا-

‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং আত্মীয়-পরিজন, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, পথের সাথী ও তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক (দাস-দাসী, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিতকে ভালোবাসেন না’ (নিসা, ৪/৩৬)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا زَالَ يُوصِينِى جِبْرِيلُ بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ-

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি নবী করীম (ছাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আমাকে জিবরীল (আঃ) সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অছিয়ত করতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয়, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ করে দিবেন’।[19]

(৬৩) হাঁচিদাতার জন্য দোআ করা :

হাদীছে এসেছে,

سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمِّتُوهُ فَإِنْ لَمْ يَحْمَدِ اللَّهَ فَلاَ تُشَمِّتُوهُ

(আবু মূসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন হাঁচির পর আল-হামদুলিল্লাহ পড়ে তখন তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে (দু‘আ করো) আর যদি আল-হামদুলিল্লাহ না পড়ে তাহলে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে জবাব দিয়ো না’।[20]

(৬৪) কাফের এবং ফিৎনা-ফাসাদকারীদের থেকে দূরে থাকা আর তাদের প্রতি কঠোর হওয়া :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ ‘মুমিনগণ যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে তোমরা যদি তাদের থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা কর। আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর (প্রতিশোধ গ্রহণ) সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন। আর আল্লাহর কাছেই সবাইকে ফিরে যেতে হবে’ (আলে ইমরান, ৩/২৮)।

মহান আল্লাহ  আরো বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহূদী-নাছারাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা তাদের মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (মায়েদাহ, ৪/৫১)। তিনি আরও বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের পূর্বে যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে, তাদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের দ্বীনকে খেল-তামাশার বস্তু মনে করে তাদের ও কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক’ (মায়েদাহ, ৪/৫৭)।

মহান আল্লাহ  বলেন,  يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিকটবর্তী কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো। তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করে। আর জেনে রাখো যে, আল্লাহ সর্বদা মুত্তাক্বীদের সঙ্গে থাকেন’ (তওবাহ, ৬/১২৩)। মহান আল্লাহ বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করো না, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা তারা অস্বীকার করেছে এবং রাসূলকে ও তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে এজন্য যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। তোমরা যদি আমার পথে সংগ্রামে ও আমার সন্তুষ্টির সন্ধানে বের হও (তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।) তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ করো অথচ তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর তা আমি জানি। তোমাদের মধ্যে যে এমন করবে সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হবে’ (মুমতাহিনা, ৬০/১)।

মহান আল্লাহ  বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের পিতা ও ভাইদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের মুকাবিলায় কুফরকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী’ (তওবাহ, ৬/২৩)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لاَ تَبْدَؤُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى بِالسَّلاَمِ، فَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقٍ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِه

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ইয়াহূদী এবং নাছারাদের প্রথমে সালাম দিয়ো না। তোমাদের সাথে তাদের কারও রাস্তায় সাক্ষাৎ হলে রাস্তা সংকীর্ণ করতে বাধ্য করো’।[21] অন্যত্র নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لاَ تُصَاحِبْ إِلاَّ مُؤْمِنًا وَلاَ يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلاَّ تَقِىٌّ ‘তোমার বন্ধু যেন মুমিন ব্যক্তি হয়। আর তোমার খানা যেন মুত্তাক্বী ব্যক্তি খায়’।[22]

(৬৫) প্রতিবেশীর সম্মান করা : 

মহান আল্লাহ  বলেন,

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا

‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরীক করো না। তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং আত্মীয়-পরিজন, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, পথের সাথী ও তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক (দাস-দাসী, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিতকে ভালোবাসেন না’ (নিসা, ৪/৩৬)।

হাদীছে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَا زَالَ يُوصِينِى جِبْرِيلُ بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ ‘আমাকে জিবরীল (আঃ) সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অছীয়ত করতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয়, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীর ওয়ারিছ করে দিবেন’।

(চলবে)

[1]. বুখারী, হা/৬২৪৫; মুসলিম, হা/৫৭৫১; আহমাদ, হা/১১০৪৩।

[2]. বুখারী, হা/১২; মুসলিম, হা/৩৯; আহমাদ হা/৬৫৮১।

[3]. বুখারী, হা/৬২৩৪;  তিরমিযী, হা/২৯২২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১১৪৯।

[4].  বুখারী, হা/৬২৪৭; আদাবুল মুফরাদ, হা/১০৪৩; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১২৭৮।

[5]. বুখারী, হা/৬২৫৩; আহমাদ, হা/২৫৭৮৭; মিশকাত, হা/৬১৭৮।

[6]. বুখারী, হা/৬২৪৮।

[7]. মুসলিম, হা/৫৪; আহমাদ, হা/৯০৭৩।

[8]. মুসলিম, হা/২৫৬৬; মিশকাত, হা/৫০০৬।

[9]. বুখারী, হ/৬২৬৩; মিশকাত, হা/৪৬৭৭।

[10]. বুখারী, হা/৬২২৯; মুসলিম, হা/২১২১; আহমদ হা/১১৩০৯।

[11]. বুখারী, হা/৬২৩৫; মুসলিম, হা/২০৬৬; আহমাদ, হা/১৮৫৩২।

[12]. মুসলিম, হা/২৫৬৮; আহমাদ, হা/২২৪০৪।

[13]. বুখারী, হা/১২৪০; মুসলিম, হা/২১৬২; আহমাদ, হা/১০৯৬৬।

[14]. মুসলিম, হা/২১৬২; আহমাদ, হা/৮৮৪৫।

[15]. মুসিলম, হা/২২৩৯; আহমাদ, হা/২২৩৮৪।

[16]. মুসলিম, হা/২৯৯২; আহমাদ, হা/১৯৬৯৬; বায়হাক্বী, ১১/৪৮৪।

মুসলিম, হা/২১৬৭।

[18]. আবুদাঊদ, হা/৪৮৩২; তিরমিযী, হা/২৩৯৫, সনদ ছহীহ।

[19]. বুখারী, হা/৬০১৪; মুসলিম, হা/২৬২৪; আহমাদ, হা/৫৫৫৭।

[20]. মুসলিম, হা/২৯৯২; আহমাদ, হা/১৯৭১১।

[21]. মুসলিম, হা/২১৬৭।

[22]. আবুদাঊদ, হা/৪৮৩২; তিরমিযী, হা/২৩৯৫, সনদ ছহীহ।