ঈমান-আক্বীদার পরিচর্যা

কাযী ফেরদৌস করীম (মুন্নি)

এই পৃথিবীতে অন্যায়, পাপাচার, ফিতনা আপন গতিতে আপনা থেকেই চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর জন্য বিশেষ কোনো প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না; পরগাছার মতো দ্রুত তা ছড়িয়ে যায়। আর তখন আস্তে আস্তে জ্ঞানশূন্য মুসলিমরাও তাতে জড়িয়ে পড়ে। এটা এই জন্য যে, এসব নামধারী মুসলিমরা নিজ দ্বীন-ঈমানের যত্ন ও হিফাযতের ব্যাপারে উদাসীন ও নিষ্ক্রিয়। একজন কৃষক তার জমিতে ভালো ফসল ফলাতে চাইলে সে যেমন তার  জমিতে নিড়ানি দেয়, সেচ দেয়, সার দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে, পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে তার কষ্টের ফসলকে বাঁচাতে কিটনাশক দেয়, প্রতিনিয়ত পাহারা দেয়, তারপরই ভালো ফলন আশা করে। তেমনি প্রতিটি মুসলিমের ফরয হচ্ছে নিজ কুরআন-হাদীছ ভিত্তিক সঠিক জ্ঞান অর্জন করে ঐ কৃষকের মতো নিজ দ্বীন, ঈমান, ইলম, আখলাক, লেনদেন, সারা জীবনের করণীয়-কর্তব্যকে দুনিয়ার অন্যায়, যুলুম, পাপাচার, শিরক, কুফর, বিদ‘আত, নাফরমানী, মুনাফেক্বী, ফিতনা-ফাসাদ থেকে হিফাযতের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেই জান্নাতের আশা করা।

হক্ব ও বাতিলের দ্বন্দ্বমুখর এই পৃথিবীতে ঈমান-আমলকে হিফাযতের আবশ্যকিতায় শিরক, কুফর, বিদ‘আত, অন্যায়, পাপাচারের বিরুদ্ধে চালাতে হয় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। শরী‘আতসম্মত পদ্ধতিতে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত দ্বারা কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হয়, স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) ও তার ছাহাবায়ে কেরাম আমাদেরকে তার উৎকৃষ্ট সংস্কার ও সংশোধনের বাস্তব  শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আর যখনই কেউ শিরক, কুফর, বিদ‘আতী আক্বীদাহ থেকে মুক্ত করতে এই সংস্কারমুখী দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে এসেছে, সেই সমাজে নিগৃহীত, নিপীড়িত, উপেক্ষিত, সমালোচিত ও বিতাড়িত হয়েছে।

স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) যখন তার জাতিকে এই সত্যের দাওয়াত দেন, তখন তার জাতি তাকে মিথ্যা অপবাদ, নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার করেছেন। এটাই সত্য যে, এই পৃথিবীতে যেই হক্ব বলবে তার প্রতি সারা পৃথিবী মারমুখী হয়ে উঠবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় চাকচিক্যহীন পবিত্র জীবনাদর্শকে উজ্জীবিত করার জন্য ইসলামের ইতিহাসে যারা নিজেদেরকে উৎসর্গ করছেনে, তারা যদিও সংখ্যায় কম ছিলেন, কিন্তু ঈমানরে দীপ্ত চেতনায় ছিলেন পাথরের চেয়ে শক্ত। পাহাড়রে চেয়ে অটল। আল্লাহর শক্তি ও সাহায্যে তারা ছিলেন পরিশ্রমী বিজয়ী বীর-মুজাহিদ।

আর তাইতো মুসলমি জাতির মাইলফলক হয়ে উজ্জ্বল তারকার মতো আজও তারা অনুসরণীয়-অনুকরণীয় হয়ে আছেন ও থাকবেন।

ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবস্থা, যার বিজয়ের মানদ- সংখ্যাধিক্য নয়; বরং ঈমান, ইনছাফ, তাওয়াক্কুল, আল্লাহভীতি, রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য, সততা, আল্লাহর শক্তি ও পরিপূর্ণ সাহায্যে অর্জিত হয়।

অসত্যের ধারক ও পাপাচারীর দল সর্বদা সংখ্যাধিক্যে সত্যাশ্রয়ীদের চেয়ে দলে ভারীই ছিল, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সংখ্যালঘু সত্যাশ্রয়ীদেরই বিজয়ী করেছেন। কারণ তারা ছিলেন (দ্বীনের পথে) অবিচল ।

মহান আল্লাহ বলেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ ‘তোমাকে যেমন হুকুম করা হয়েছে, তেমনই দ্বীনের পথে অবিচল থাকো’ (হূদ, ১১/১১২)।

একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ মোতাবেক নিষ্ঠা ও সংকল্প দ্বারা যা অর্জন করা সম্ভব। মানুষ মাত্রই আল্লাহ্র বান্দা বা দাস। আল্লাহর প্রতি যে ঈমান রাখে, তার সমস্ত কর্ম ও প্রাণচাঞ্চল্যের কেন্দ্র হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তাকে সন্তুষ্ট করাই আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে দল-মত, নেতা সকলকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্পর্কিত হতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ ‘তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করতে এবং ছালাত ক্বায়েম করতে ও যাকাত প্রদান করতে, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত সঠিক দ্বীন’ (আল-বায়্যিনাহ, ৯৮/৫)।

আল্লাহ আমাদেরকে তার দ্বীনের সঠিক পথে চলার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!