ঈমান ও ইসলাম ভঙ্গের কারণ
-ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর*

(পর্ব-২)

আল্লাহর সাথে শিরক করার অর্থ হলো- বান্দা কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে তার নিকট প্রার্থনা করে, কোনো কিছু আশা করে, তাকে ভয় করে, তার উপর ভরসা করে, তার নিকট সুপারিশ চায়, তার নিকট বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য ফরিয়াদ করে, কিংবা তার নিকট এমন বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে, যার সমাধান আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারে না। অথবা তার নিকট মীমাংসা চায়, কিংবা আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার আনুগত্য করে, অথবা তার কাছ থেকে শরী‘আতের বিধান গ্রহণ করে কিংবা তার জন্য (বা তার নামে) যবেহ করে, অথবা তার নামে মানত করে, অথবা তাকে এতটুকু ভালোবাসে, যতটুকু আল্লাহকে ভালোবাসা উচিত। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যে সকল কথা, কাজ ও বিশ্বাসকে ওয়াজিব বা মুস্তাহাবরূপে নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোর সব কিংবা কোনো একটি গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদেশ্যে করাই হলো শিরক।

আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে শিরকের মিশ্রণ ঘটলে আল্লাহর মর্যাদার হানি করা হয়। যা তিনি কোনোভাবেই বরদাশত করেন না। ফলে সে তার দয়া ও ক্ষমা লাভ করতে পারবে না। তিনি শর্তারোপ করেছেন,

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْ لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

‘সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’ (কাহ্ফ, ১৮/১১০)।

যারা ঈমানের সাথে শিরকের সংমিশ্রণ ঘটায় না, তারাই সফলকাম। তাদেরই ইবাদত মহান আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُوْنَ.

‘প্রকৃতপক্ষে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের সাথে শিরক মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা রয়েছে। আর তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (আন‘আম, ৮২)। উক্ত আয়াতে বর্ণিত যুলুম অর্থ শিরক, যা রাসূল (ছা.) উল্লেখ করেছেন।[1]

পক্ষান্তরে যারা ঈমানের সাথে শিরকের মিশ্রণ ঘটাবে, তাদের আমলসমূহ নষ্ট হয়ে যাবে। তাদের ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত ও তাসবীহ-তাহলীল কোনোই কাজে আসবে না। সবকিছুই বিফলে যাবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ يَّكْفُرْ بِالْإِيْمَان فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِى الْآخرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ

‘যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে কুফরী করবে, তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে। সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (মায়েদাহ, ৫/৫)।

অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরও স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন,

وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ

‘তারা যদি শিরক করে, তাহলে তারা যা আমল করেছে সবই বাতিল হয়ে যাবে’ (আন‘আম, ৬/৮৮)। অন্য আয়াতে স্বয়ং মুহাম্মাদ (ছা.)-কে হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেছেন,

وَلَقَدْ أُوْحِىَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ.

‘নিশ্চয় আপনার উপর এবং আপনার পূর্ববর্তীদের উপর অহি করা হয়েছে যে, যদি আপনি শিরক করেন, তবে অবশ্যই অবশ্যই আপনার আমল বাতিল হয়ে যাবে। আর আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন’ (যুমার, ৩৯/৬৫)। এই আয়াতে উল্লেখিত وَلَتَكُوْنَنَّ مِنْ الْخَاسِرِيْنَ এর ব্যাখায় মুফাসিরগণ বলেন, ‘দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ শিরকের মাধ্যমে তার আমল দুনিয়াতে যেমন নষ্ট হবে, অনুরূপ পরকালে তাকে কঠিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে’।[2]

وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ

‘যে আল্লাহর সাথে শিরক করে, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে, আর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে দূরবর্তী কোনো স্থানে নিক্ষেপ করে’ (হজ্জ, ২২/৩১)।

উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘দী (রাহি.) বলেন, ‘মুশরিক যখন (শিরক করে) ঈমানের দৃঢ়তা নষ্ট করে ফেলে, তখন শয়তান তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ঈমান ছিনিয়ে নিয়ে যায়। অতঃপর তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলে এবং তার নিকট থেকে দ্বীন ও দুনিয়া সবই নিয়ে চলে যায়। অর্থাৎ ধ্বংস করে দিয়ে যায়’।[3]  অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তার রাসূল মুশরিকদের থেকে দায়মুক্ত’ (তওবা, ৯/৩)।

রাসূলুল্লাহ (ছা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে স্বীয় উম্মতকে হুঁশিয়ার করেছেন। তন্মধ্যে এক নম্বরে শিরকের বিষয়ে সাবধান হতে বলেছেন। যেমন,

اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কর্ম হতে বেঁচে থাকো। সকলে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছা.)! তা কী কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা…’। [4]

উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে শিরকের মিশ্রণ ঘটাবে, তার ঈমান ও আমল কিছুই থাকবে না। সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাবে। তার ঈমান ও আমল হবে তলাবিহীন ঝুড়িতে রাখার ন্যায়। যেহেতু তার কোনো আমলই গৃহীত হয়নি, ফলে তার শেষ ঠিকানা হবে জাহান্নামে।

আল্লাহ তা‘আলার নামাবলি ও গুণাবলির যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যে বৈশিষ্ট্যগুণে তিনি আমাদের একক রব ও উপাস্য, আমাদের রাসূল (ছা.) বা কোনো ওলী-দরবেশ, জিন-পরী বা গ্রহ-তারা, গাছ-পালা ও পাথর ইত্যাদিকে সেসব বৈশিষ্ট্যের কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যের সমান বা আংশিক অধিকারী বলে মনে করা এবং নবী, ওলী, গাছপালা ও পাথর ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তর দ্বারা উপাসনামূলক কোনো কর্ম করাকে শিরকে আকবার বলা হয়। এরূপ শিরককারীর পরিণতি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। এরশাদ হচ্ছে,

إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ

‘যে আল্লাহর সাথে অন্য কাইকে শরীক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম’ (মায়েদাহ, ৫/৭২)।

উপরের আয়াতে কারীমার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেননি যে, তাকে জান্নাতে দিব না বা জাহান্নামে দিব। বরং বলেছেন, তার জন্য জান্নাত হারাম। আর এরূপ নিকৃষ্ট ব্যক্তির অবধারিত ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। সে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ফলে সেদিন তার কোনো সাহায্যকারীও থাকবে না। শিরক জান্নাত ও জাহান্নামের মূল পার্থক্যকারী বিষয়। শিরক না করলে জান্নাত, আর করলে জাহান্নাম।

عَنْ جَابِرٍ  رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ  مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ.

জাবের (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শরীক করে মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[5]  অপর হাদীছে এসেছে-

عَنْ جَابِر بْن عَبْدِ اللَّهِ  رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُولُ مَنْ لَقِىَ اللهَ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ دَخَلَ النَّارِ.

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে তার সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সাথে কাউকে শরীক করা অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[6]   

কোনো ব্যক্তি শিরক করলে তার জাহান্নামে প্রবেশের জন্য আর কোনো বাধা থাকে না। এরূপ নোংরা আক্বীদার মানুষের জন্য জান্নাত শোভনীয় নয়। শিরকের মতো ভয়ঙ্কর পাপ দুনিয়াতে নেই। তাওহীদ এবং শিরক কোনোভাবেই একত্রিত হতে পারে না। শিরকের মূল শিকড় সমেত উপড়িয়ে ফেলার জন্যই তাওহীদের আবির্ভাব। যে কোনো মূল্যে শিরক থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব। মু‘আয (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (ছা.) ১০টি বিষয়ের উপদেশ দিয়েছিলেন। তন্মধ্যে সর্বাগ্রে যে নছীহত করেন, তা হলো- لَا تُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا وَإِنْ قُتِلْتَ وَحُرِّقْتَ ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়’।[7]

উপরিউক্ত হাদীছে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শিরকের সাথে আপোস করা যাবে না। শিরক না করার কারণে যদি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়, তাহলে হাসিমুখে মরণকে বরণ করে নেওয়া ভালো। কিন্তু শিরকের সাথে আপোস করে বেঁচে থাকা ভালো নয়। শিরক না করার কারণে মৃত্যুবরণ করলে আশা করা যায় জান্নাত লাভে ধন্য হবে। পক্ষান্তরে শিরক করলে দীর্ঘ জীবন লাভ করে পরকালে জাহান্নামের খড়ি হিসাবে পরিগণিত হবে।

(চলবে)

 

*  শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৪২; তিরমিযী, হা/৩০৬৭; মিশকাত, হা/৫১৩১।

[2]. তাফসীরে সা‘দী, ১/৭২৯; আত-তাফসীরুল মুয়্যাস্সার, ৮/২৮৩। 

[3]. তাফসীরে সা‘দী, ১/৫৩৮।   

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭২; আবুদাঊদ, হা/২৮৭৪; নাসাঈ, হা/৩৬৭১; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৫৫৬১; বায়হাক্বী শু‘আবুর ঈমান, হা/২৮৪; ছহীহ আত-তারগীব, হা/১৩৩৮; ইরওয়াউল গালীল, হা/২৩৬৫; মিশকাত, হা/৫২।  

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৯, ১/৬৬; তিরমিযী, হা/২৬৪৪; আহমাদ, হ/৩৬২৫; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৫৫১; মুসনাদে আবু আওয়ানাহ, হা/৩০; মিশকাত, হা/৩৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৩৪, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪।  

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮০, ৯৩; আহমাদ, হ/১৪৫২৮; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৫৩১; ত্বাবারানী আওসাত্ব, হা/৭৮৭৯; বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৬৫; মুসনাদে আবু আওয়ানাহ, হা/৩৩; মিশকাত, হা/৩৮।  

[7]. আহমাদ, হা/২২১২৮; ইরওয়াউল গালীল, হা/২০২৬; ছহীহ আত-তারগীব, হা/৫৭০; মিশকাত, হা/৬১, সনদ ছহীহ।