ঈমান ও ইসলাম ভঙ্গের কারণ  

-ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

ঈমানের গুরুত্ব ও ফযীলত :   

জান্নাতে যাওয়ার জন্য ঈমানদার হওয়া শর্ত। ঈমান আনায়ন করা ব্যতীত কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। যে সকল বিষয়ের উপর শরী‘আতে ঈমান আনতে বলা হয়েছে, সেগুলোর উপর পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনতে হবে। প্রকৃত মুমিন হিসাবে জীবনযাপন করতে হবে। নতুবা জান্নাতে যাওয়া যাবে না। মুমিন-মুসলিম ব্যক্তিরাই জান্নাত লাভের সুযোগ পেয়ে ধন্য হবে।

‘আল-ঈমান’ (الإِيمَانُ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- আন্তরিক বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও প্রশান্তি। আর শরী‘আতের পরিভাষায় ঈমান হলো-تصديق بالجنانِ، وقول باللسانِ، وعملٌ بالجوارح والأَركانِ، يزيدُ بالطاعةِ، وينقصُ بالمعصيةِ ‘অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও আমলে বাস্তবায়নের নাম ঈমান, যা পুণ্য দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং পাপ দ্বারা হ্রাস পায়’।[1]   

কী কী বিষয়ের উপর ঈমান আনতে হবে, কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে তা তুলে ধরা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি আয়াত পেশ করা হলো। এরশাদ হচ্ছে- 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا

 ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর  প্রতি, তার রাসূলের প্রতি, সেই কিতাবসমূহের প্রতি, যা তিনি তার রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং সেই কিতাবের প্রতি, যা তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছিলেন। আর যে আল্লাহ, তার ফেরেশতামণ্ডলী, তার কিতাবসমূহ, তার রাসূলগণ এবং শেষ দিবসকে অস্বীকার করবে, সে ঘোর বিভ্রান্তিতে পতিত হবে’ (নিসা, ৪/১৩৬)।

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জিবরীল (আ.) দ্বীন শিখানোর জন্য আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট আসলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সামনে হাটুগেঁড়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন,

يَا مُحَمَّدُ أَخْبِرْنِى عَنِ الإِيمَانِ قَالَ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ  قَالَ صَدَقْتَ.

‘হে মুহাম্মাদ (ছা.)! আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন তথা ঈমান কী? তিনি (রাসূল (ছা.) ) উত্তর দিলেন, ঈমান হচ্ছে- আল্লাহ তা‘আলা, তার ফেরেশতামণ্ডলী, তার কিতাবসমূহ, তার রাসূলগণ এবং পরকালকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এ ছাড়া তাক্বদীরের ভালো-মন্দের উপর (অর্থাৎ জীবন ও জগতে কল্যাণ-অকল্যাণ যা কিছু ঘটছে, সবই আল্লাহর  ইচ্ছায় হচ্ছে- এ কথার উপর বিশ্বাস করা) বিশ্বাস স্থাপন করা। উত্তর শুনে আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন’।[2]   

সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আছ-ছাক্বাফী (রা.) বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর  রাসূল (ছা.)! আপনি আমাকে ইসলামের এমন একটি চূড়ান্ত কথা বলে দিন, যা আপনি ছাড়া আমাকে আর কারও কাছে জিজ্ঞেস করতে না হয়। তিনি বললেন, قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ ‘আমি আল্লাহর  উপর ঈমান এনেছি’- তুমি এ কথা বলো এবং এ ঘোষণায় সুদৃঢ় থাকো’।[3]

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ مُؤْمِنٌ.

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুমিন ব্যতীত কোনো ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’।[4]

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত। নবী (ছা.) বলেছেন, ‘যার হৃদয়ে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে’।[5]  অপর বর্ণনায় রয়েছে- সেদিন বলা হবে, أَخْرِجُوا مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ و فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الإِيمَانِ ‘সেই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করো, যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে এবং তার হৃদয়ে বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে’।[6]   

عَنْ أَبِى أُمَامَةَ أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا الإِيمَانُ قَالَ إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا الإِثْمُ قَالَ إِذَا حَاكَ فِى نَفْسِكَ شَىْءٌ فَدَعْهُ.

আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক লোক রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর  রাসূল (ছা.)! ঈমান কী? তিনি বললেন, যখন তোমাকে নেক (সৎ) কাজ আনন্দ দিবে ও খারাপ (অসৎ) কাজ পীড়া দিবে, তখন তুমি মুমিন। আবার সে লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর  রাসূল (ছা.)! খারাপ (অসৎ) কাজ কী? উত্তরে তিনি বললেন, যখন কোনো কাজ করতে তোমার মনে দ্বিধা ও সন্দেহের উদ্রেক করে (তখন মনে করবে এটা গুনাহের কাজ), তখন তা ছেড়ে দিবে’।[7]

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ.

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘ঈমানের ৭০ বা ৬০ টির অধিক শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম হলো- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্নটি হলো- রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা’।[8]  আবার অপর এক বর্ণনায় ঈমানের ৭২টি শাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।[9]  ঈমানের শাখাগুলোর কোনোটিকে ছোট বলে তুচ্ছ জ্ঞান করা উচিত নয়।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إنّ الإِيمانَ لَيَخْلَقُ في جَوْفِ أحدِكُمْ كما يَخْلَقُ الثَّوْبُ فاسْأَلُوا اللَّهَ تعالى أن يُجَدِّدَ الإِيمانَ في قُلُوبِكُمْ.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের হৃদয়ে ঈমান জীর্ণ হয়, যেমন জীর্ণ হয় পুরনো কাপড়। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করো, যাতে তিনি তোমাদের হৃদয়ে তোমাদের ঈমান নবায়ন করে দেন’।[10]

একজন মুসলিমের জীবনে ঈমান হচ্ছে আসল পুঁজি। ঈমানবিহীন পরকালে কোনো নাজাতের কোনো রাস্তা খুঁজে পাবে না। বিধায় মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত পন্থায় ঈমান আনা আবশ্যক। পাশাপাশি ঈমান ভঙ্গের কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখা যরূরী। আর ঈমান নবায়ন ও তার উপর দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর  নিকট বেশি বেশি প্রার্থনা করতে হবে।

ঈমান ও ইসলাম ভঙ্গের কারণসমূহ :

১. আল্লাহর  ইবাদতে শিরকের মিশ্রণ করা (اَلشِّرْكُ فِىْ عِبَادَةِ اللهِ) : ইবনু মানযুর বলেছেন, ‘আশ-শিরকাতু’ ও ‘আশ-শারকাতু’ الشركة و الشركة সমার্থবোধক দু’টি শব্দ। যার অর্থ হলো, দুই শরীকের সংমিশ্রণ। তিনি আরও বলেন, ‘ইশতারাকনা’ اشتركنا ‘আমরা শরীক হলাম’ শব্দের অর্থ হলো, ‘তাশারাকনা’ تشاركنا ‘আমরা পরস্পর শরীক হলাম’। দু’জন শরীক হলো আর পরস্পর শরীক হলো বা একে অপরের সাথে শরীক হলো কিংবা শরীক হওয়া- এ সকল শব্দের অর্থ হলো, ‘আল-মুশারিক’ المشارك বা অংশীদার।[11]

আল-মুনজিদ নামক অভিধানে বলা হয়েছে, أشرك في أمره অর্থাৎ ‘তার কাজে সে (অপর কাউকে) শরীক করে নিয়েছে’। أشرك بالله অর্থাৎ ‘আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করেছে’। আর যে তা করল, সে মুশরিক হয়ে গেল’।[12]  যেমন আল্লাহ বলেন, أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ‘তবে কি আকাশমণ্ডলীতে তাদের অংশীদারিত্ব রয়েছে’ (আহক্বাফ, ৪৬/৪)।

পরিভাষায় ড. ইবরাহীম বুরাইকান শিরকের পারিভাষিক অর্থ বর্ণনায় বলেন, ‘গায়রুল্লাহকে আল্লাহর  বৈশিষ্ট্যের সমকক্ষ করা’।[13]

ড. খালিদ ইবনে আব্দুল্লাহ শিরকের পরিচয় প্রদান করে বলেছেন, ‘আল্লাহর রুবূবিয়াত, উলূহিয়াত এবং আসমা ওয়া ছিফাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমান করাকে শিরক বলে’।[14]   

ইবনুল ক্বাইয়িম (মৃত্যু ৭৫১ হি.) বলেছেন, শিরক হলো সৃষ্টিকর্তার অনুরূপ বা তুলনীয় হওয়া অথবা সৃষ্টকে আল্লাহর  সাথে তুলনা করা। আর এ দু’টি বিষয়ই শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তার সাথে তুলনীয় হবে, অতঃপর মানুষের নিকট হতে ইবাদত তালাশ করবে, তাহলে সে শিরক করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর  সাথে কোনো সৃষ্টিকে তার রুবূবিয়াত, উলূহিয়াত এবং আসমা ওয়াছ ছিফাতের ব্যাপারে তুলনা করবে, সে শিরকে পতিত হবে।

 (চলবে)

 

[1]. ইবনু তায়মিয়াহ, আল-আক্বীদাতুল ওয়াসেত্বিয়্যাহ, তাহক্বীক্ব : আশরাফ ইবনে আব্দুল মাক্বছূদ (রিয়ায : আযওয়া আস-সালাফ, ২য় প্রকাশ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), পৃ. ১১৩।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/১০২; আবুদাঊদ, হা/৪৬৯৫; নাসাঈ, হা/৪৯৯০; আহমাদ, হা/৩৬৭; ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ, হা/২৫০৪; মিশকাত, হা/২।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৮; আহমাদ, হা/১৫৪৫৪; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৯৪২; বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, হা/৪৯২৪; ত্বাবারানী কাবীর, হা/৬৩৯৮; মিশকাত, হা/১৫।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৪২০৩; নাসাঈ, হা/২৯৫৮; দারেমী, হা/১৯১৯।

[5].  তিরমিযী, হা/২৫৯৮; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৪৫০, সনদ ছহীহ।

[6]. মুসতাদরাকে হাকেম, হা/২৩৪, সনদ ছহীহ।

[7].  আহমাদ, হা/২২২২০; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৭৬; মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৩৩; বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, হা/৫৭৪৬; মিশকাত, হা/৪৫, সনদ ছহীহ।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২; আবুদাঊদ, হা/৪৬৭৬; নাসাঈ, হা/৫০০৫; ইবনু মাজাহ, হা/৫৭; আহমাদ, হা/৯৩৫০।

[9]. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৮১; আল-মুসনাদুল জামে‘, হা/১২৬৬৩; কানযুল উম্মাল, হা/৮৪, সনদ ছহীহ।

[10]. মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৫; কানযুল উম্মাল, হা/১৩১৩; মাজমাঊয যাওয়ায়েদ, হা/১৫৮; ছহীহুল জামে‘, হা/১৫৯০; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৫৮৫, সনদ হাসান।

[11]. ইবনু মানজুর, লিসানুল আরব, الشرك শব্দমূল, ১০/৪৪৮-৪৫০।

[12]. অধ্যাপক আনতুয়ান, আল-মুনজিদ (বৈরুত : দারুল মাশারিক, ২১ তম সংস্করণ, ১৯৭২ খ্রি.), পৃ. ৩৮৪।

[13]. ইবরাহীম বুরাইকান, আল-মাদখালু লিদিরাসাতিল ‘আক্বীদাতিল ইসলামিয়্যাহ ‘আলা মাযহাবি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ (আল-খুবার : দারুস সুন্নাহ লিন নসরি ওয়াত তাওযী, ১৯৯২ খ্রি.), পৃ. ১২৫।

[14]. খালিদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মুছলিহ, শারহু কাশফিশ শুব্হাত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩।