ঈমান ভঙ্গের কারণ
-সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী*

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


(৫) ইসলামের কোনো বিধানকে অপছন্দ করা :

কোনো ঈমানদার ইসলামের কোনো বিধান অপছন্দ করলে সাথে সাথে তার ঈমান চলে যাবে। কোনো অবস্থাতেই কেউই ইসলামের কোনো বিধানকে অপছন্দ করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি’, অথচ তারা মুমিন নয়’ (আল-বাক্বারা, ২/৮)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর যারা কাফের তাদের জন্য রয়েছে দুর্গতি এবং তিনি তাদের কর্ম বিনষ্ট করে দিবেন। এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব তাদের কর্মসমূহ আল্লাহ ব্যর্থ করে দিবেন’ (মুহাম্মাদ, ৪৭/৮-৯)। 

উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, ঈমান এনে বা না এনে আমলসমূহ বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয় অপছন্দ করা। এ বিষয়ে ঈমানদার হয়ে আমল করলেও অপছন্দ করার কারণে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। অর্থাৎ কারো পর্দার বিধান ভালো লাগে না যদিও সে পর্দা করে অথবা কারো জিহাদের কথা ভালো লাগে না অথবা পুরুষদের একাধিক বিয়ের অনুমতিও ভালো লাগে না। যদি কারো বিশ্বাস এমন হয়, তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। 

(৬) দ্বীনের কোনো বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা :

কোনো ঈমানদার ইসলামকে নিয়ে বা ইসলামের কোনো বিধিবিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করলে তার ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে?’ (আত-তওবা, ৯/৬৫)। অন্যত্র আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী’ (আত-তওবা, ৯/৬৬)

উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা আল্লাহ স্পষ্ট করে দিলেন যে, আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও তাঁর আয়াত নিয়ে কেউ যদি খেল-তামাশা, বিদ্রুপ, মজা ইত্যাদি করে, তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। যেমন— অনেকে দাড়ি রাখা, টাকনুর উপর প্যান্ট পরা, বিভিন্ন বিদআতী কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়া নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, যা কখনোই উচিত নয়। আল্লাহ আরও বলেন, ‘সুতরাং যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না, আমি তাদেরকে তাদের দুষ্টামিতে ব্যতিব্যস্ত করে রাখি’ (ইউনুস, ১০/১১)

তারা আল্লাহ না চাইলে কখনোই হেদায়াত পাবে না। দুষ্টুমিতেই জীবন পার হবে। সুতরাং তাদের সাথে চলাফেরা করা ও যোগাযোগ রাখা যাবে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘আর (আল্লাহ) কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারী করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহর আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ করতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে। অন্যথা তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ মুনাফিক্ব ও কাফেরদেরকে জাহান্নামে একই জায়গায় সমবেত করবেন’ (আন-নিসা, ৪/১৪০)। 

তাদের বন্ধুরূপেও গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্য কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যখন তোমরা ছালাতের জন্য আহ্বান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা মনে করে। কারণ তারা নির্বোধ’ (আল-মায়েদা, ৫/৫৭-৫৮)

সুতরাং দ্বীন নিয়ে যারাই হাসি-ঠাট্টা করবে, তাদের থেকে তৎক্ষণাৎ দূরত্ব সৃষ্টি করতে হবে। কেননা দ্বীন নিয়ে তামাশাকারীরা হচ্ছে মুনাফিক্ব। আর মুনাফিক্বদের জায়গা হচ্ছে জাহান্নামে।

(৭) জাদুটোনা বা কুফরী কালাম করা :

আল্লাহর উপর বিশ্বাসের পরিবর্তে কেউ যদি জাদুটোনা বা শয়তানী কুফরী কাজের মাধ্যমে কিছু পেতে চায় বা কারো ক্ষতি করতে চায়, তাহলে তা হবে সম্পূর্ণ ঈমান বিধ্বংশের কাজ। কুফরী কাজের দ্বারা যত ভালো কাজই হোক না কেন, ইসলামে সকল প্রকার জাদুটোনা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলায়মানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলায়মান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে জাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোনো ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখেরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত’ (আল-বাক্বারা, ২/১০২)

অতএব, যারাই এসব করে, তাদের আর ঈমানের অস্তিত্ব থাকে না। আজ উপমহাদেশের বহু মানুষই জাদুটোনা ও কুফরী কালামে লিপ্ত। 

(৮) ইসলামের বিপক্ষে কাফেরদের সাহায্য করা :

কোনো ঈামানের দাবিদার যদি ইসলামের বিপক্ষে কাফের-মুশরিকদের সাহায্য-সহযোগিতা করে, তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজদের পিতা ও ভাইদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারাই যালেম’ (আত-তওবা, ৯/২৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে তাদের (বিধর্মীদের) সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলা যালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না’ (আল-মায়েদা, ৫/৫১)

অতএব, কখনোই বিধর্মীদের আন্তরিক বন্ধু করা যাবে না। সেই সাথে যারা ইসলামের বিপক্ষে বা কোনো মুসলিমের বিপক্ষে বিধর্মীদের সাহায্য-সহযোগিতা করবে, তাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।

(৯) কাউকে দ্বীন ইসলাম এবং শরীআতের ঊর্ধ্বে মনে করা :

কেউ যদি রাসূলুল্লাহ a-এর আনীত শরীআতের বিধিবিধান মানার চাইতে অন্য কোনো পীর-বুজুর্গের দেওয়া (শরীআত বহির্ভূত) কাজ করে বা করাকে জায়েয মনে করে তাহ‌লে তাঁর ঈমান থাকবে না। কেননা শরীআতের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। ইসলামে যা কিছু চলবে সবই রাসূলুল্লাহ a-এর নির্দেশ এবং সম্মতিতে।

এখন কেউ যদি পীর-ওলী-আউলিয়াকে শরীআতের উৎস ধরে (স্বপ্নের বার্তা, কাশফ) সেইমতো বিভিন্ন বিধিবিধান চালু এবং পালন করে, তাহ‌লে তার ঈমান থাকবে না। কেননা ইসলামে একমাত্র অনুসরণ হবে রাসূলুল্লাহ a-এর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে রাসূল! আপনি) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, দয়ালু’ (আলে ইমরান, ৩/৩১)। অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ করো এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের (শরীআত বহির্ভূত কারোর) অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৩)

অর্থাৎ আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাইলে একমাত্র রাসূল a-এর অনুসরণ করতে হবে। রাসূল a-এর প্রদর্শিত পথ ছাড়া অন্য কারো অনুসরণ করা যাবে না। 

(১০) শরীআতের বিধিবিধানে কম-বেশি বা নতুনত্ব সৃষ্টি করা :

কেউ যদি মনে করে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল কর্তৃক আনীত ইসলামের বিধানে নতুন করে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করলে ভালো হবে। অথবা কেউ যদি রাসূলুল্লাহ a-এর দেওয়া শরীআতের নির্ধারিত বিধিবিধানে (ঈমান, আক্বীদা, আমলে) কম-বেশি বা নতুনত্ব (বিদআত) সৃষ্টি করে বা জায়েয মনে করে এবং সেইমতো আমলও করে, তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। 

নতুনত্ব আনা বা বাদ দেওয়ার মধ্যে তারা রাসূলুল্লাহ a-এর রিসালাতকে অস্বীকার করে। এর দ্বারা আল্লাহ যে তাঁর রাসূল a দ্বারা ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেটা মিথ্যা হয়ে যাওয়া। অথচ আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলিমের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিকে সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থল’ (আন-নিসা, ৪/১১৫)

এটা দ্বারা সুস্পষ্ট যে, ক্বিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষকে একমাত্র রাসূলুল্লাহ a-এর অনুসরণে দ্বীন ইসলামে জীবনযাপন করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম’ (আল-মায়েদা, ৫/৩)

* পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।