উপেক্ষিত ধর্ম, নির্বাসিত মূল্যবোধ
-ড. মো. কামরুজ্জামান*
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


আধুনিক যুগ একটি পরিবর্তনের যুগ। দ্রুত পরিবর্তন হয়ে গেছে সৌরজগতের এ ছোট পৃথিবীটি। আর যেটুকু আছে সেটুকুও ভবিষ্যতে ব্যাপক পরিবর্তন অপেক্ষা করছে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষগুলো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তারা হয়ে যাচ্ছে বড্ড অচেনা। ইতোমধ্যে দেশীয় বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অবকাঠামোগত নানা দিকেরও পরিবর্তন সাধিত হতে চলেছে। আর মানব-জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হলো মানুষের নৈতিকতার পরিবর্তন। ন্যায় এবং অন্যায় বিভাজনে মানুষ এখন বড়ই দ্বিধান্বিত। সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলাটা এখন বড়ই দুষ্কর। দেশে কোনটি আলো আর কোনটি অন্ধকার সেটার পার্থক্য করাও বড় কষ্টকর। সততার আলো যেন মানুষের চক্ষুকে এখন ঝলসে দিচ্ছে। মানুষ যেন বুনো বাদুরে পরিণত হয়ে গেছে। পরিণত হয়ে পড়েছে তারা পেঁচায়। দিনের আলো যেন মানুষের এখন ভালো লাগে না। রাতের অন্ধকার তাদের বড়ই প্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ তারা দিনের চেয়ে রাতকেই বেশি ভালোবাসে। অসৎ মানুষেরা রাতটাকে এখন বাদুড়ের মতো আরামদায়ক করে নিয়েছে। আবহমান কাল থেকে বাংলার সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে ‘ঘুষ’ নামে একটি অনৈতিক প্রথার প্রচলন ছিল। অনেকদিন ধরে এটাকে বাঙ্গালিরা ঘুষ বলেই জানত। কিন্তু যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে এ শব্দটির নামও পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়ে এটার নাম এখন ‘তদবির খরচ’। তথাকথিত শিক্ষিতজন কর্তৃক এটি একটি ননঅফিসিয়াল পরিভাষায় রূপান্তর লাভ করেছে। এটা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের মহা এক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এটা মূল্যবোধের এক চরম অবক্ষয় হিসেবে সকল মহলে পরিচিত।

ছোটবেলায় এ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল নৈতিকতা অর্জনের কারখানা। আগেকার দিনে প্রাথমিকে শিশুদেরকে নানা নীতিবাক্য শেখানো হতো। ‘সদা সত্য বলিবে, মিথ্যা বলিবে না। না বলিয়া পরের দ্রব্যে হাত দিবে না। না বলিয়া পরের দ্রব্যে হাত দেওয়াকে চুরি করা বলে। চুরি করা বড় দোষ’ ইত্যাদি নীতিবাক্য শিশুরা রপ্ত করত। কিন্তু বর্তমানে সেই শিক্ষাতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এসব নীতিবাক্যের জায়গায় ‘আগডুম বাগডুমে’র আগমন ঘটেছে। ঘোড়াডুমের মতো অর্থহীন শিখন ও পঠন ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে। কোমলমতি শিশুদেরকে নীতিহীন করেই আমরা বড় করে তুলছি। ছাড়া অন্য কিছু নয়। মূল্যবোধ জলাঞ্জলির বড় উদাহরণ এর চেয়ে আর কী-ই বা হতে পারে!

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। এটা একসময় উন্নত জ্ঞান-গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেখানেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলেই আঁতকে ওঠেন। এটা মানবিক মূল্যবোধের ভয়ানক অবক্ষয়ই বলতে হবে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত প্রাণপুরুষ কবি আল মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয়কে তাই ডাকাতের গ্রাম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন মেধার চর্চা হয় না বললেই চলে। এখানে এখন চর্চা হয় নীতিভ্রষ্ট রাজনীতির। এখানে ব্যাপকভাবে এখন নিয়োগ বাণিজ্যের চর্চা হয়। মেধার পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ সম্পাদিত হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তেলবাজি ও দলবাজিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে দলবাজির কাছে মূল্যবোধ পরাজিত হয়। স্কুল এবং কলেজগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। স্কুল-কলেজের কমিটিগুলোর বিরুদ্ধে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। এ সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে মেধাকে খুব কমই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। নির্লজ্জ দলবাজি আর অর্থই শিক্ষক হওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এ অবস্থা সারা দেশের স্কুল-কলেজে কম-বেশি চলমান রয়েছে। এতে করে বাচ্চাদের হাতেখড়ি হচ্ছে অনৈতিক শিক্ষকের কাছে। এর মাধ্যমে শিশুদের পড়ানোর জন্য আমরা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছি। শিক্ষক যখন দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পান, এমতাবস্থায় তাদের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা অর্থহীন। কারণ তাদের সামগ্রিক নিয়োগপ্রক্রিয়াটাই নৈতিকতা পরিপন্থি। সুতরাং তারা নিজেরাই মূল্যবোধ বিবর্জিত মানুষ। তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা বাতুলতার নামান্তর। এটি তেঁতুল গাছ থেকে কলা পাবার আশা করার মতো অর্থহীন ব্যাপার। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ঐ শিক্ষকের দ্বারা যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাওয়া মোটেই অসম্ভব ব্যাপার নয়। তাইতো শিক্ষাঙ্গনে বারবার ঘটছে যৌন নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য ঘটনা। কিন্তু ভুক্তভোগীরা এ ঘটনার কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাচ্ছেন না। স্বাধীন দেশে আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত লজ্জার ও ঘৃণার। জাতি হিসেবে আমরা এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না। অধিকন্তু এ সমস্ত শিক্ষকের সাথে সচেতন নাগরিকরাই একাট্টা হয়ে মিশে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা দুর্নীতির সাথে আপসকামী হিসেবে তৈরি হয়ে উঠছে। তারা দুনীর্তিকে আর দুর্নীতি মনে করছে না। অন্যায়কেও অন্যায় হিসেবে আর বিবেচনায় নিচ্ছে না। ফলে তাদের বিবেকবোধ অসুস্থ জরাজীর্ণে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তাদের সুকুমার প্রবৃত্তি নিস্তেজ হয়ে গেছে। ফলে তারা রাষ্ট্রের যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই সৃষ্টি করেছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। প্রাচীন বাংলায় কোনো না কোনো একজন শিক্ষক ছিলেন শিক্ষার্থীদের অনুকরণীয় আদর্শ। কিন্তু বিগত কয়েক যুগে সে জায়গাটিরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বলতে গেলে শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো শিক্ষকই এখন আর অনুকরণীয় মডেল নেই। নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা কিংবা কোনো খেলোয়াড় হয়ে গেছে তাদের অনুসরণীয় মডেল। যুবসমাজ থেকে মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ব, সভ্যতা সবই প্রায় হারিয়ে গেছে।

এ সমস্ত শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে রাজনীতি হয়ে পড়েছে কলুষিত। রাজনীতি রাজ্য শাসনের সর্বোচ্চ নীতি হলেও সেটা এখন ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রবীনদের অনৈতিক চতুরতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি হয়ে গেছে নবীন রাজনীতিবিদগণ। কিছু রাজনীতিকদের মন্দ শব্দচয়ন তাদের নীতিবোধকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মনুষ্যত্বকে করেছে কলুষিত। বলতে গেলে দেশের ক্ষয়িষ্ণু রাজনীতি ক্রমান্বয়ে লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটা এখন অবৈধ অর্থ সংগ্রহের মহোৎসবের মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে।

বাঙালি সমাজের প্রতিটি পরিবার একসময় ছিল একটি বিদ্যালয় সমতুল্য। এই পরিবারই ছিল নৈতিকতা অর্জনের সূতিকাগার। এখন সেটা আর সে অবস্থায় নেই। এখন সেটারও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সেটা এখন প্রতিযোগিতার নিকেতনে পরিণত হয়েছে। আমাদের সন্তানদের শুধু দৌড়াতে শিখাচ্ছি। তাদেরকে আমরা বানাতে চাচ্ছি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। বড় করতে চাচ্ছি টাকা উপার্জনকারী এক ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু তাদেরকে আমরা ভালো মানুষ বানাতে চাচ্ছি না। বাচ্চারা এখন পড়াশুনা করছে শুধু A+ পাবার জন্য। তারা আনন্দের জন্য পড়ছে না; ভালো মানুষ হওয়ার জন্য পড়ছে না। তারা তোতাপাখির মতো কিছু বুলি মুখস্থ করছে। তারা পড়ছে শুধু টাকা অর্জনের জন্য। এটা নৈতিক অবক্ষয়ের মারাত্মক এক দিক। প্রাচীন বাংলায় পাত্রীকে পাত্রস্থ করতে মেয়ে এবং মেয়ের বাবা সৎ পাত্রের খোঁজ করত। পাত্র চরিত্রবান কি না সেটাকে অগ্রাধিকার দিত। কিন্তু বর্তমান সমাজের পাত্রী এবং পাত্রির পিতারা পাত্রের টাকাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অর্থাৎ একজন পাত্র সরকারি চাকরি করলেই হলো। সততা সেখানে গুরুত্বহীন। বাড়ি আছে কি না, পাত্রের জমিজমা আছে কি না ইত্যাদি বিষয় এখন প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সৎ, না অসৎ—সামাজিক জীবনে তার কোনো প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে না। তরুণ প্রজন্মও হাঁটছে সেদিকে। জোর কদমে এগিয়ে চলছে তারা অজানা গন্তব্যের দিকে। তারা চলছে ভোগবাদিতার দিকে। এটা জাতির জন্য এক মহা অশনিসংকেত। তরুণ প্রজন্ম পরিণত হয়েছে মানসিক দাসে। আর মানসিক লালসা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এটা একটি দেশ ও জাতির জন্য মারাত্মক বিপদ সংকেত।

সমাজের কতক লোক আবার সততার ছদ্মাবরণে আচ্ছাদিত। বাহ্যিকভাবে তারা ভালো মানুষের রূপ ধারণ করতে বেশ অভ্যস্ত। এ ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ধর্মীয় লেবাস। এসব লেবাসধারিদের অন্তরটা শত জটিল, কুটিল আর নানা অসততায় পরিপূর্ণ। কোনো কারণে যে কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মতের অমিল হলেই তাদের খোলস বেরিয়ে পড়ে। তাদের লেবাসের অন্তরালে জমানো ঘৃণ্য চরিত্র উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের অন্তরে লালিত আসল চেহারা মুখের ভাষায় প্রকাশ পেতে থাকে। লেবাসের আড়ালে মূলত তাদের অনৈতিকতা, অসাধুতা আর চরম নির্লজ্জতাই যাহির হয়ে পড়ে। সরকারি অফিসের অনেক ঘুষখোর আছেন যাদের মুখ দাঁড়িতে ভরা। পরনে থাকে তাদের ধর্মীয় পোশাক। আর মাথা থাকে টুপিতে ঢাকা। এই ঘুষের টাকা দিয়ে তিনি প্রতি বছর হজ্জে যান। এসব মন্দ লোকের বাহিরের আবরণটা বেশ চুপচাপ ও ভদ্রতায় ভরা। কিন্তু তাদের ভিতরটা ভয়ংকর নেকড়ে মানসিকতায় ভরা। সুযোগ পেলেই তারা হিংস্র হয়ে ওঠে। এটাই হলো বর্তমান বাংলার বাস্তব সমাজচিত্র। এ চিত্র প্রতিদিনই মানুষের আত্মাকে একটু একটু করে কলুষিত করে চলেছে। অর্থ আর স্বার্থ ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পরিবেশ মূল্যায়ন করে এভাবে বলা যায় যে, নৈতিকতার যদি কোনো কাঠামো ও অবয়ব থাকত, তাহলে এতদিনে তাকে গুম করা হতো কিংবা গভীর জঙ্গলে নির্বাসন দেওয়া হতো অথবা নদীতে ডুবিয়ে চিরতরের জন্য সলিল সমাধির ব্যবস্থা করা হতো। সুতরাং আমরা ঘোরময় মূল্যবোধশূন্য এক অন্ধকার অমানিশাতে বসবাস করছি।

দেশে টাকাওয়ালা লোকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ধনীরা ক্রমশ ধনী হচ্ছে। তারা সম্পদের পাহাড় তৈরিতে ব্যস্ত। এক্ষেত্রে তাদের কাছে নৈতিকতার কোনো প্রয়োজন নেই। যে কোনো উপায়ে অর্থ উপার্জনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ধনীরা প্রচুর অর্থের মালিক হয়েও তারা মনে কোনো প্রশান্তি পাচ্ছে না। তারা একটু সুখ ও শান্তির জন্য বিভিন্ন ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছে। কিন্তু কোনো ডাক্তারই তাদেরকে সুখি করতে পারছে না। তাদের মনের মধ্যে সুখপাখিটা যেন অধরাই রয়ে গেছে। আনন্দ, হাসি আর স্বস্তি কোনোটাই তাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এর বিপরীতে রয়েছে নিঃস্ব, গরীব ও অসহায় শ্রেণির মানুষ। এ গরীবেরা ক্রমশ গরীব হয়েই চলেছে। তাদের অবস্থাটাও ধনীদেরই মতো। তাদের কাছেও স্বাদের সুখপাখিটা অধরাই রয়ে গেছে। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও যেন এতটুকু শান্তি-স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে না। সবাই আরও ‘কী’ যেন পাবার নেশায় ছুটছে। সবাইই দৌড়াচ্ছে সুখপাখিটা ধরতে। কিন্তু উভয় শ্রেণিই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। সবার মাঝেই ব্যাপক অস্থিরতা কাজ করছে। মূলত এটা হলো অনৈতিক ভোগবাদিতার অন্ধ আসক্তি। তারা এ আসক্তিতে মারাত্মকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। একথাটি আল-কুরআনে নিম্নোক্তভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, ‘এরা তাদের অবাধ্যতার (নীতিহীনতার) মধ্যে অন্ধের মতো পথ খুঁজে মরছে। তারা হেদায়াতের বিপরীতে গোমরাহি কিনে নিয়েছে। তাদের এ সওদাটি মোটেও লাভজনক নয়। আর তারা মোটেও সঠিক পথে অবস্থান করছে না’ (আল-বাক্বারা, ২/১৬)। ফলে তারা মূল্যবোধহীন এক বন্য পশুতে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে তারা আর মনুষ্যত্বে ফিরে আসতে পারছে না। ‘তাদের চোখ থাকলেও তারা দেখতে পাচ্ছে না, কান থাকতেও তারা শুনতে পাচ্ছে না আর হৃদয় থাকতেও তারা অনুধাবন করতে পারছে না। তারাই হলো চতুষ্পদ জন্তু; অধিকন্তু তারা তদাপেক্ষাও নিকৃষ্ট’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৭৯)। মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আল-কুরআন শিক্ষিত হওয়াকে ফরয আমল (আবশ্যিক দায়িত্ব) হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘(হে নবী) আপনি আপনার প্রভুর নামে পড়ুন! যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/১)। হাদীছে এসেছে, ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন করা (ফরয) অবশ্যই কর্তব্য’।[1]

উল্লেখিত শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষিত মানুষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আয়ত্ত করেন। যার কারণে অন্যান্য প্রাণী থেকে তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অর্জন করেন। তিনি অন্যান্য প্রাণী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যান। ফলে তিনি শ্রেষ্ঠ মর্যাদায় আসীন হয়ে যান। আর এ উপাদানগুলোর সামষ্টিক নাম হলো মৌলিক মানবীয় মূল্যবোধ। এ মূল্যবোধ অবলম্বনের কারণেই মানুষ পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা জীবের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এ উপাদানগুলো মানুষের চেতনায় ও প্রতিভায় ঘুমন্ত থাকে। জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাই এটাকে আবিষ্কার করতে হয়। মানুষকে তার জীবন চলার প্রতিটি বাঁকে এটাকে চর্চা করতে হয়। জীবনের সকল সুখে, দুঃখে ও প্রেরণায় এটাকে প্রয়োগ করতে হয়। সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগ আর উদ্যমে এগুলোর ব্যবহার জানতে হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে এ মূল্যবোধের প্রয়োগ ঘটাতে হয়। ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ও পদক্ষেপে এটির প্রয়োগ করতে হয়। প্রতিটি কার্যক্রমে এ উপাদানগুলোর অনুশীলন ও প্রয়োগ ঘটাতে হয়। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা আত্মস্থ করতে হয়। আর এ উপাদানগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। মূল্যবোধের সীমা-পরিসীমা বলে কিছু নেই। মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতি, প্রেম-ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদিকে মূল্যবোধ বলা হয়ে থাকে। আবার ত্যাগ-তীতিক্ষা, সৌজন্য, দয়া, সাধুতা, ক্ষমা, অনুগ্রহ, উদারতা, দূরদৃষ্টি কল্যাণচিন্তা ইত্যাদিও মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত। এসব উপাদান যেসব মানুষ আয়ত্ত করতে পেরেছেন, তাদেরকেই গুণীজন বলা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পিএইচডি ধারী হওয়া যেমন শর্ত নয়, তেমনি রাষ্ট্রের কোনো বড় অফিসার হওয়াও শর্ত নয়। সমাজের যে কোনো মানুষের মাঝে এ গুণাবলি পাওয়া যেতে পারে। যার মাঝে এসব গুণ পাওয়া যাবে, তাকে ভালো মানুষ বা গুণী মানুষ বলা যেতে পারে। মূলত উল্লেখিত গুণাবলি যাদের মধ্যে থাকে তারা ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে থাকেন। তারা সামাজিক যে কোনো কাজে ইতিবাচক মানসিকতা পোষণ করে থাকেন। তারাই সমাজের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পরিচিতি পান। এসব মানুষের মধ্যে অহংকার থাকে না বললেই চলে। তাদের মধ্যে বসগিরি খুঁজে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েও তারা ক্ষমতার বড়াই করেন না। এসব মানুষের মধ্যে থাকে প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম। তাদের কাজে-কর্মে সেবার মানসিকতা প্রকাশ পায়। স্ব স্ব কর্মস্থল কর্মচঞ্চল, স্থির ও কর্মময় হয়ে ওঠে। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। ফলে অধীনস্থদের মাঝে কর্মস্পৃহা তৈরি হয়। পারস্পরিক সহযোগী সম্পর্ক তৈরি করতে সবাই উদ্বুদ্ধ হয়। আর একে অপরকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করে।

মানুষের ঘরে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ শব্দটি লিখতে গেলে দুটি শব্দের প্রয়োজন হয়। আর তা হলো ‘মান’ ও ‘হুশ’ = মানুষ। এখানে ‘মান’ বলতে নিজের সম্মানবোধকে বোঝানো হয়েছে। আর হুঁশ বলতে সামগ্রিক চেতনাকে বুঝানো হয়েছে। এই দুটো গুণ যার মধ্যে আছে তাকেই সাধারণত মানুষ বলা হয়ে থাকে। কারণ পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষের বসবাস। আর তাদের মধ্যে ভালো ও মন্দ-দুই শ্রেণির মানুষই বসবাস করছে। এদের মধ্যে যাদের মানবিক গুণাবলি রয়েছে, তাদেরকে শুধু মানুষ বলা সমীচীন। মানুষের মাঝে অন্তর্নিহিত এসব গুণাবলির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে মানুষের ব্যক্তিত্ব। মানুষের ক্রমান্বয়ে বয়স বাড়তে থাকে। আর ব্যক্তিত্ব নিরিখেই নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা। পৃথিবীতে মানুষ বড়ই অনুকরণপ্রিয়। প্রত্যেক মানুষের একটি ছোটকাল থাকে। এই ছোটকাল থেকেই সে কারো না কারো অনুকরণ করতে থাকে। মনের অজান্তেই তাকে অনুসরণ করতে থাকে। এই ছোট মানুষটি বড় হয়ে তার মতো হতে চায়। তার কথা তার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। অনুকরণীয় ব্যক্তিটি হতে পারে তার বাবা। হতে পারে তার কোনো শিক্ষক। হতে পারে ইতিহাসের কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা অন্য যেকোনো একজন। আমাদের সমাজে এ জাতীয় মানুষের যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। অথচ বর্তমান সময়ের দাবি অনুযায়ী এসব মানুষের খুবই প্রয়োজন। অবশ্য যথেষ্ট আন্তরিকতা দিয়ে খুঁজলে কিছুসংখ্যক গুণী মানুষ পাওয়া অসম্ভব নয়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সমাজ থেকে গুণের কদর লোপ পেয়েছে। এ একই কারণে গুণীজনের কদরও শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে গুণীজনেরা নিজেদেরকে নিভৃতচারী করে রাখার নীতি অবলম্বন করেছেন। নীতিভ্রষ্ট রাজনীতি প্রকৃত গুণীজনদের কোণঠাসা করে রেখেছে। সমাজটা অরাজকতায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সুষ্ঠু সমাজ গড়ার প্রত্যাশা করাটা দুরাশায় পরিণত হয়ে গেছে। অথচ একজন অসৎ লোকের জন্যও সুষ্ঠু ও শান্তিময় সমাজ দরকার। আর শান্তিময় সমাজ পুনঃনির্মাণে উল্লেখিত মূল্যবোধের বিকল্প নেই। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাজ পুনর্গঠনে প্রয়োজন মূল্যবোধের জাগরণ। আর এ জাগরণের নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখতে পারেন গুণীজনেরা। আর তাদের মাঠকর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তরুণ ছাত্র ও যুবসমাজ। এ দুয়ের সম্মিলিত শক্তিই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুন্দর করতে পারে। তাদের সমন্বিত শক্তি আর উদ্যোগই কেবল পারে সামাজিক অবক্ষয় রুখে দিতে। তারাই ফিরিয়ে আনতে পারেন বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া সততা, মননশীলতা, মানবতা আর বদান্যতা। ফিরে আসতে পারে হারানো সকল মানবীয় গুণ। তাদের মাধ্যমে বাংলা আবার পরিণত হতে পারে মূল্যবোধে সিক্ত এক অনুপম জনসমাজ।


* অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[1]. ইবনু মাজাহ, হা/২২৪, হাদীছ ছহীহ।