اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

‘উলামায়ে কেরামের গোশত বিষাক্ত’

ইসলাম ইলম ও আলেম-উলামার সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে (আল-মুজাদালাহ, ৫৮/১১; আল-আন‘আম, ৬/৫০; আয-যুমার, ৩৯/২৯)। দ্বীনী ইলমের এ পথ জান্নাতের পথ (মুসলিম, হা/২৬৯৯)। হাদীছে আলেম-উলামাকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করা হয়েছে (আহমাদ, হা/২১৭১৫)। কারণ তারাই নবীগণের উত্তরাধিকারী (ঐ), তারাই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয়কারী (ফাতির, ৩৫/২৮), আল্লাহও তাদের কল্যাণকামী (বুখারী, হা/৭১) এবং তারাই জাতির কাণ্ডারী, সঠিক পথের দিশারী। আবু মুসলিম খাওলানী (রহিঃ) বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে উলামায়ে কেরাম হচ্ছেন আসমানে তারকারাজির মতো। যখন সেগুলো মানুষের জন্য উদিত হয়, তখন তারা সেগুলো দ্বারা পথ খুঁজে পায়। আর সেগুলো অস্তমিত হলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে’ (নববী, আল-মাজমূ‘, ১/১৯)। ইয়াহইয়া ইবনে মু‘আয (রহিঃ) বলেন, ‘আলেম-উলামা উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি তাদের মাতা-পিতার চেয়ে বেশি দয়ালু। জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে?, তিনি বললেন, তাদের মাতা-পিতা তাদেরকে দুনিয়ার আগুন থেকে রক্ষা করে; কিন্তু আলেম-উলামা তাদেরকে পরকালের আগুন থেকে রক্ষা করে’ (এহইয়া উলূমিদ্দীন, ১/১১)। তাদের মর্যাদা, গুরুত্ব ও সার্বজনীন কল্যাণকামিতার কারণেই ফেরেশতা থেকে শুরু করে পানির নীচের মাছ পর্যন্ত সবাই তাদের জন্য কল্যাণের দু‘আ করে (আহমাদ, হা/২১৭১৫)। এভাবে আলেম-উলামার মর্যাদার বহু বিবরণ কুরআন-হাদীছে পাওয়া যায়।

সেকারণে যেসব আলেম-উলামা সালাফে ছালেহীনের মাসলাক অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও হাদীছ বুঝেন, মানেন ও দাওয়াত দেন, তাদের দোষত্রুটি মানুষের কাছে প্রচার করে দ্বীন প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি করা কস্মিনকালেও উচিত নয়, তিনি যেই হোক না কেন, যে দল বা সংগঠনেরই হোক না কেনো। সাধারণভাবে যে কোনো মুমিনের রক্ত, মাল ও সম্মানে আঘাত হানা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১২; আল-আহযাব, ৩৩/৫৮; বুখারী, হা/৬৭; মুসলিম, হা/২৫৬৪ ইত্যাদি) আর বিশেষভাবে আলেম-উলামার ব্যাপারে সেই নিষেধাজ্ঞা আরো বেশি কঠিন। মানুষের গীবত করা, দোষত্রুটি বর্ণনা করা এমনিতে জঘন্য অপরাধ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১২); আর তা যদি হয় কোনো আলেমের ক্ষেত্রে, তাহলে তার পরিণতি ভীষণ ভয়াবহ। একজন সাধারণ মানুষের মন্দ কিছু ছড়ালে তার ক্ষতিটা সাধারণত নিন্দুক ও নিন্দিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একজন আলেমের মন্দ কিছু ছড়ালে তার ক্ষতি হয় সীমাহীন। জনমনে তার প্রতি অভক্তি তৈরি হয়, তার সাময়িক গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়, ফলে তারা তার মাধ্যমে হক্ব গ্রহণ থেকে দূরে সরে যায়। সেকারণে তার মন্দ দিক প্রচার করা মানে তার প্রচারিত ইলমের নিন্দা করা। আর ঐ ইলমের নিন্দা করা মানে নবী (ছাঃ)-এর মীরাছের নিন্দা করা এবং প্রকারান্তরে খোদ আল্লাহকে নিন্দা করা -না‘ঊযুবিল্লাহ-। হাদীছে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো অলীর সঙ্গে দুশমনি করবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব’ (বুখারী, হা/৬৫০২)। ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহিঃ) এ হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এখানে আল্লাহর অলী দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তি, যিনি সর্বদা তার আনুগত্য করেন’ (ফাতহুল বারী, ১১/৩৪২)। ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) বলেন, ‘দুনিয়া ও আখিরাতে ফক্বীহ ও আলেমগণ যদি আল্লাহর অলী না হবেন, তাহলে আল্লাহর কোনো অলী নেই’ (খত্বীব বাগদাদী, আল-ফাক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, ১/১৫০)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ফক্বীহকে কষ্ট দিলো, সে রাসূল (ছাঃ)-কে কষ্ট দিলো। আর যে রাসূল (ছাঃ)-কে কষ্ট দিলো, সে খোদ মহান আল্লাহকে কষ্ট দিলো’ (নববী, আল-মাজমূ‘, ১/২৪)। এককথায় আলেমের মন্দ কিছু ছড়িয়ে দেওয়া মানে সরাসরি ইসলামকে নিন্দা করা এবং এর প্রচারকে বাধাগ্রস্ত করা। সেজন্যই ইবনে আসাকের (রাঃ) এবং তার সূত্র ধরে পরবর্তী অনেক আলেম-উলামা বলেছেন, ‘উলামায়ে কেরামের গোশত বিষাক্ত’ (إِِنَّ لُحُوْمَ الْعُلَمَاءِ -رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِمْ- مَسْمُوْمَةٌ) (তাবঈনু কাযিবিল মুফতারী, পৃঃ ২৯)। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আলেম-উলামার নিন্দা করে তার জিহ্বাকে পিচ্ছিল করে ফেলে, আল্লাহ তার মৃত্যুর আগে তার অন্তরকে মেরে ফেলে তাকে মুছীবতে ফেলবেন’ (ঐ)। কারণ আলেমের নিন্দা করার মাধ্যমে তার বিষাক্ত গোশত খেলে এর বিষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান ফেসবুক, ইউটিউব সহ আধুনিক নানা মিডিয়ায় হরহামেশা আলেম-উলামার নিন্দার ঝড় বইতে দেখা যাচ্ছে। যে যাকে যেভাবে পারছেন আক্রমণ করার চেষ্টা করছেন। দুর্বল জায়গাগুলো দেখে দেখে আঘাত করছেন, ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। দুর্বল জায়গা না থাকলেও অন্যায়ভাবে ক্ষত সৃষ্টি করে সেখানে আঘাত করার চেষ্টা করছেন। আলেম-উলামাকে নিয়ে চলছে গীবত, অপবাদ, হাসিঠাট্টা আর উপহাসের প্রতিযোগিতা। হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণা, অন্ধ ব্যক্তি বা দলপূজা, প্রবৃত্তিপূজা, গোঁড়ামি, অন্ধভক্তি, নিফাক্বী, হকের প্রতি অশ্রদ্ধা, নিজেকে পণ্ডিত মনে করা, সুবিধাবঞ্চিত হওয়া- এসব কারণ থেকে মানুষ আজ পরস্পরের গোশত নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে। কিছু মানুষকে দেখে মনে হয়, আলেম-উলামার ছিদ্র অন্বেষণের যিম্মাদারি নিয়েই পৃথিবীতে তাদের আগমন। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) বলেন, ‘আপনি কত মানুষকে অন্যায়-অপকর্ম ও যুলম থেকে বিরত থাকতে দেখবেন; কিন্তু জীবিত ও মৃতদের মানহানির ক্ষেত্রে তার জিহ্বা তরবারীর মতো চলে। সে কী বলে তার পরোয়া করে না’ (আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ: ১৫৯)। আচ্ছা, বলুন তো কেউ কি ভুলের ঊর্ধ্বে আছেন? আলেম বা জাহেল সবার মধ্যেই কমবেশি ভুল আছে; আলেম-উলামা তো আর ফেরেশতা নন। তাহলে কোনো আলেমের ব্যক্তিগত দোষত্রুটি বা দুর্বলতা মানুষের সামনে প্রকাশ করে তার দাওয়াতী স্রোত বাধাগ্রস্ত করলে কার লাভ হবে?! এতে বরং সেই আলেমের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পয়দা হবে, নিন্দুক গোনাহগার হবে এবং জনগণ কুরআন-সুন্নাহর দাওয়াত থেকে বঞ্চিত হবে। মানুষের দোষ লুকানোর হাদীছগুলোর কথা কি আমরা বেমালুম ভুলে গেছি? গীবতের ভয়াবহতা সম্পর্কে কি আমাদের কিছুই জানা নেই? বলুন তো, বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে মন্দের চেয়ে ভালো দিক কি বেশি নয়? তাহলে আমরা কি পারি না, তাদের মন্দ দিকগুলো লুকিয়ে ভালো দিকগুলো উল্লেখ করতে? তার সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে তার ব্যাপারে মন্তব্য করতে? আমরা কি পারি না, দুয়েকটা মন্দ দিক গোপন করে নছীহতের মাধ্যমে ঠিক করার চেষ্টা করতে? দুয়েকটা দোষের নীচে কি এতসব ভালো দিক ঢাকা পড়বে? দুয়েকটা ভুলত্রুটির কারণে কি তার এতসব অবদান ম্লান হয়ে যাবে?

তবে হ্যাঁ, দাওয়াতী ময়দানে যদি তিনি ইসলামপরিপন্থী প্রচারণা চালান, তাহলে তা ভিন্ন কথা। অপরাধীর দুরভিসন্ধি ফাঁস করে দেওয়া পবিত্র কুরআন নির্ধারিত একটি নীতি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এমনিভাবে আমি নিদর্শনসমূহ সবিস্তার বর্ণনা করি, যাতে অপরাধীদের পথ সুস্পষ্ট হয়ে যায়’ (আল-আন‘আম, ৬/৫৫)। যেসব নামধারী আলেম শিরক, বিদ‘আত, কুফর বা ভ্রষ্টতার দিকে মানুষকে ডাকে, তাদের ভ্রষ্টতার মুখোশ উন্মোচন করাও যরূরী। তাহলে সাধারণ জনগণ ধোঁকাগ্রস্ত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমি তোমাদের উপর বিভ্রান্তকারী আলেমদের ব্যাপারে ভয় পাই’ (ইবনে মাজাহ, হা/৩৯৫২, ছহীহ)। বরং তিনি পথভ্রষ্টকারী আলেমদের ব্যাপারে দাজ্জালের চেয়েও বেশি ভয় পেতেন (আহমাদ, হা/২১২৯৬, ছহীহ লিগয়রিহী)। সেজন্য, ইসলামের নামে প্রচলিত বিভ্রান্তিসমূহ এবং এগুলোর ধ্বজাধারীদের সম্পর্কে জানা ও জানানোও খুব দরকার। অন্যথায় আমজনতার কে কখন, কীভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবে, বলা মুশকিল। ওমর (রাঃ) বলতেন, ‘ইসলামের রশি একটি একটি করে ছিড়ে যাবে, যদি ইসলামে এমন ব্যক্তি লালিত-পালিত হয়, যে জাহিলিয়াত চিনে না’ (মিনহাজুস সুন্নাহ, ৪/৫৯০)।

তবে, সবকিছু যেন বাঁধা হয় কুরআন-হাদীছের ফ্রেমে এবং আবৃত হয় হিকমত ও প্রজ্ঞার চাদরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সদ্ভাবে’ (আন-নাহল, ১৬/১২৫)। কারণ যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়েছে (আল-বাক্বারাহ, ২/২৬৯)।

অতএব, আমাদের আলেম-উলামার প্রতি যথাযথ সম্মান, মর্যাদা, ভক্তি, আদব ও ভালোবাসা থাকতে হবে। তাদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করতে হবে। তাদের ভুলত্রুটি ন্যায়সঙ্গত উপায়ে হিকমতের সাথে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। আর আলেম-উলামার উচিত, নিজেদেরকে নিরাপদ স্থানে রাখা; নিজেদেরকে ইলম ও আমলের মডেল বানানো। পরিশেষে বলতে চাই, মন পরিষ্কার না থাকলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে (বুখারী, হা/৫২; মুসলিম, হা/১৫৯৯) এবং জিহ্বা ও লজ্জাস্থান হিফাযতের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে জান্নাতের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না (বুখারী, হা/৬৪৭৪)। বরং বেফাঁস কথা বললে জাহান্নামে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি (ঐ, হা/৬৪৭৭)। নিজেদের ভুলত্রুটি নিয়েই বেশি কাজ করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের মনমনন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার তাওফীক্ব দান করুন, ঠিক পবিত্র কুরআনের এই বক্তব্যের মতো, ‘যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না’ (আল-হাশর, ৫৯/১০)। আমীন!