একটি লিফলেটের ইলমী জবাব


-আহমাদুল্লাহ*
(পর্ব-৫)


৮. ফজর ও আসরের পর সুন্নাত না পড়া : এ ব্যাপারে মুহতারাম লেখক একটি হাদীছ পেশ করেছেন। তা হলো-

عن أبي سعيد الخدري  قال سمعت رسول الله يقول لا صلاة بعد الصبح حتى ترتفع الشمس ولا صلاة بعد العصر حتى تغيب الشمس.

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমি নবীজি সা.-কে বলতে শুনেছি, ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত কোন নামায পড়া যাবে না এবং আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোন নামায পড়া যাবে না। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং-৫৮৬)

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি অবশ্যই ছহীহ। সুতরাং এ ব্যাপারে কোনো কথা নেই। কিন্তু ফজরের পূর্বে যদি দু’রাকআত সুন্নাত ক্বাযা হয়ে যায় তাহলে তা ফজরের ফরযের পর সাথে সাথে আদায় করে নিতে হবে।[1] উক্ত হাদীছে ক্বাযা সুন্নাতের ব্যাপারে নয়, বরং সাধারণ নফল ছালাতের ব্যাপারে বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে যোহরের কোনো সুন্নাত কিংবা আছরের পূর্বের চার রাকআত যদি বাদ পড়ে যায়, তাহলে তা আছরের ফরয ছালাতের পর পরই আদায় করা যাবে।[2] এছাড়াও তাহিয়াতুল মসজিদ, তাহিয়াতুল ওযূ, দুখূলুল মাসজিদ ইত্যাদি ছালাত আছরের পরও পড়া যায়। আর নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যে আছরের পর প্রতিদিন দু’রাকআত আদায় করেছেন, সেটি শুধুই তার সাথে খাছ; আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

৯. বিতর নামায তিন রাকআত পড়া : এ শিরোনামে বুখারীর একটি প্রসিদ্ধ হাদীছ পেশ করা হয়েছে। তা হলো-

عن أبى سلمة بن عبد الرحمن t أنه أخبره أنه سأل عائشة i كيف كانت صلاة رسول الله فى رمضان فقالت ما كان رسول الله يزيد فى رمضان ولا فى غيره على إحدى عشرة ركعة يصلى أربعا فلا تسل عن حسنهن وطولهن ثم يصلى أربعا فلا تسل عن حسنهن وطولهن ثم يصلى ثلاثا.

হযরত আবু সালামাহ ইবনে আব্দুর রহমান রা. হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, রমজানুল মোবারকে নবীজি সা.-এর নামায কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, রমজান এবং রমজানের বাইরে তিনি এগারো রাকআতের অধিক নামায পড়তেন না। প্রথমে চার রাকআত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা অবর্ণনীয়। এরপর চার রাকআত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা অবর্ণনীয়। এরপর তিন রাকআত বিতর পড়তেন। (বুখারী শরীফ, ১/১৫৪, মুসলিম, ১/২৫৪, নাসায়ী, ১/২৪৮)

জবাব : এই হাদীছ দ্বারা বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, আহলেহাদীছগণ যে এক রাকআত বিতরের ছালাত আদায় করেন, তা ঠিক নয়। বরং বুখারীতে তিন রাকআত বিতরের কথা রয়েছে। সুতরাং তিন রাকআত বিতর পড়তে হবে। এক রাকআত বিতর পড়া যাবে না।

বস্তুত এটি খুবই হাস্যকর ও চরম অজ্ঞতাপূর্ণ দাবি। কেননা আহলেহাদীছগণ যেমন এক রাকআত বিতর আদায় করেন, অনুরূপভাবে তারা তিন রাকআত বিতরও আদায় করেন। সুতরাং এই হাদীছকে সালাফীদের বিরুদ্ধে পেশ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। যেহেতু আহলেহাদীছগণ তিন রাকআত বিতরের হাদীছের উপর আমল করেন, সেহেতু এ হাদীছের কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। তবে যেহেতু এক রাকআত বিতরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়, সেহেতু নিচে এক রাকআত বিতরের ছালাতের পক্ষে কিছু হাদীছ পেশ করা হলো :

(১) নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এক রাকআত বিতর পড়েছিলেন।[3] হানাফী মুহাক্কিক্ব আলেমে দ্বীন আল্লামা নীমাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এর সনদ ছহীহ’।[4]

(২) ওছমান (রাযিআল্লাহু আনহু) এক রাকআত বিতর পড়তেন।[5] নীমাবী এর সনদকে হাসান বলেছেন।[6]

(৩) সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাযিআল্লাহু আনহু) এক রাকআত বিতর পড়েছিলেন।[7]

(৪) মুআবিয়া ইবনু আবী সুফিয়ান (রাযিআল্লাহু আনহু) এশার পর এক রাকআত বিতর আদায় করেছিলেন।[8]

(৫) আবূ আইয়ূব (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তিন রাকআত বিতর পড়তে চায়, সে যেন তিন রাকআত পড়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি এক রাকআত বিতর পড়তে চায়, সে এক রাকআত বিতর পড়ে নিক’।[9]

(৬) ইবনু উমার (রাযিআল্লাহু আনহুমা) এক রাকআত বিতর পড়েছিলেন।[10]

(৭) ইমাম আতা ইবনু আবী রাবাহ বলতেন, ‘যদি চাও, তাহলে এক রাকআত বিতর আদায় করো’।[11]

(৮) আলে সা‘দ এবং আলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার এক রাকআত বিতর ছালাত আদায় করতেন।[12]

(৯) নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ফজর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে এক রাকআত বিতর পড়ে নিতে বলেছেন।[13]

এ ব্যতীত এক রাকআত বিতরের পক্ষে আরও অসংখ্য ছহীহ হাদীছ রয়েছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সেগুলো উল্লেখ করা হলো না।

১০. দু ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তিন তাকবীর সহ প্রত্যেক রাকআতে চার তাকবীর : এ শিরোনামে নিচের হাদীছটি পেশ করা হয়েছে। যেমন-

أن سعيد بن العاص سأل أبا موسى الأشعري وحذيفة بن اليمان كيف كان رسول الله يكبر في الأضحى والفطر؟ فقال أبو موسى كان يكبر أربعا تكبيره على الجنائز فقال حذيفة صدق فقال أبو موسى كذلك كنت أكبر في البصرة حيث كنت عليهم.

হযরত সাঈদ ইবনুল আস বলেন, আমি হযরত আবু মূসা আশআরী রা. ও হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রা.-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের নামায প্রত্যেক রাকআতে কয় তাকবীর আদায় করতেন? উত্তরে হযরত আবু মূসা রা. বললেন, জানাযার নামাযের মত চার তাকবীর বলতেন (প্রথম রাকআতে তাকবীরে তাহরীমা ও দ্বিতীয় রাকআতে রুকুর তাকবীরসহ)। হযরত হুযায়ফা রা. (হযরত আবু মুসা আশআরী রা.-এর কথার সত্যায়ন করে) বলেন, তিন সত্য বলেছেন। হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. বলেন, আমি বসরায় গভর্নর থাকাবস্থায় সেখানেও এরূপ করতাম। (আবু দাউদ শরীফ ১/১৬৩, হাদীস নং ১১৫৩)

তাহক্বীক্ব : প্রথমত, হাদীছটি যঈফ। কেননা এর রাবী আবূ আয়েশা মাজহূল। তার সম্পর্কে কোনো কিছু জানা যায় না। শায়েখ আলবানী নিজেও তাকে অপরিচিত বলেছেন।[14] অপর রাবী ইবনু ছাওবানও বিতর্কিত।[15] সুতরাং হাদীছটির সনদ দুর্বল। আর হাদীছটির পক্ষে কোনো শাহেদ বা মুতাবাআতও নেই। সুতরাং হাদীছটির সনদ ও মতন উভয়ই যঈফ, যা দলীলের অযোগ্য। দ্বিতীয়ত, এটি মুযত্বারিব হাদীছ। এখানে মাওকূফ হাদীছকে মারফূ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, যেমন ইবনু মাসঊদ (রাযিআল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এ বিষয়ে উপরিউক্ত ফতওয়া দেন।[16] মোটকথা, হাদীছটির সনদ যঈফ হওয়ার পাশাপাশি মতনও ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। সুতরাং এটি গ্রহণযোগ্য হাদীছের পর্যায়ে পড়ে না।

১২ তাকবীর সম্পর্কে কতিপয় ছহীহ হাদীছ :

(১) আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) বলেন,كَانَ يُكَبِّرُ فِي الْعِيدَيْنِ فِي الْأُولَى سَبْعًا قَبْلَ الْقِرَاءَةِ وَفِي الْآخِرَةِ خَمْسًا قَبْلَ الْقِرَاءَةِ ‘রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহাতে প্রথম রাকআতে সাত তাকবীর ও দ্বিতীয় রাকআতে পাঁচ তাকবীর দিতেন (রুকূর তাকবীর ব্যতীত)’।[17]

(২) আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু আছ (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, التَّكْبِيْرُ فِي الْفِطْرِ سَبْعٌ فِي الْأُولَى، وَخَمْسٌ فِي الْآخِرَةِ ‘ঈদুল ফিত্বরের প্রথম রাকআতে সাত তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকআতে পাঁচ তাকবীর রয়েছে’।[18]

(৩) ইবনু উমার (রাযিআল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,فِي تَكْبِيْرِ الْعِيدَيْنِ فِي الرَّكْعَةِ الْأُولَى سَبْعًا وَفِي الثَّانِيَةِ خَمْسَ تَكْبِيْرَاتٍ ‘ঈদায়েনের প্রথম রাকআতে সাত এবং দ্বিতীয় রাকআতে পাঁচ তাকবীর রয়েছে’।[19]

(৪) আম্মার বর্ণনা করেছেন যে,كَبَّرَ فِي الْعِيدِ فِي الرَّكْعَةِ الْأُولَى سَبْعًا ثُمَّ قَرَأَ وَكَبَّرَ فِي الثَّانِيَةِ خَمْسًا ‘ইবনু আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহুমা) ঈদের ছালাতের প্রথম রাকআতে সাত তাকবীর দিতেন। অতঃপর ক্বেরাআত পাঠ করতেন। এরপর দ্বিতীয় রাকআতে পাঁচ তাকবীর দিতেন’।[20] এছাড়াও ১২ তাকবীরের পক্ষে আরও অনেক ছহীহ হাদীছ রয়েছে।[21]

(চলবে)


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. তিরমিযী, হা/১১৫১; সিলসিলা ছহীহা, হা/২৫৮৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩৪।

[3]. দারাকুত্বনী, হা/১৬৫৬।

[4]. আসারুস সুনান, হা/৫৯৭।

[5]. দারাকুত্বনী, হা/১৬৫৭।

[6]. আসারুস সুনান, হা/৬০৫।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৫৬।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৬৪, ৩৭৬৫।

[9]. নাসাঈ, হা/১৭১৩, সনদ ছহীহ।

[10]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, ৩/২৭, সনদ ছহীহ; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৬৮০৬, সনদ ছহীহ।

[11]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৬৮১১, সনদ ছহীহ।

[12]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৬৮১২, সনদ ছহীহ।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭২, ৪৭৩, ৯৯০, ৯৯৩, ৯৯৫, ১১৩৭।

[14]. সিলসিলা ছহীহা, হা/২৯৯৭-এর আলোচনা দ্র.।

[15]. বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/৬৮৮৩।

[16]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৬১৮৩।

[17]. ইবনু মাজাহ, হা/১২৭৭-১২৭৯; তিরমিযী, হা/৫৩৬; মিশকাত, হা/১৪৪১।

[18]. আবূ দাঊদ, হা/১১৫১; আহমাদ, হা/৬৬৮৮; তিরমিযী, হা/৫৩৬।

[19]. শারহু মাআনিল আছার, হা/৭২৬৮; তারীখে বাগদাদ, হা/৩৪৯৩।

[20]. ত্ববারানী, হা/১০৭০৮; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৫৭০১, ৫৭২৪; শারহু মাআনিল আছার, হা/৭২৮১; বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৬১৮১।

[21]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৬১৭৭, ৬১৭৯, ৬১৮০; কাশফুল আসতার, হা/৬৫৫; মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/৪৮৯৫; সুনানে দারাকুত্বনী, হা/১৭২৭; ইমাম মুহাম্মাদ, মুওয়াত্ত্বা মুহাম্মাদ, হা/২৩৭; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৫৭১৮, ৫৭২০, ৫৭২১।