এক নযরে হেদায়ার অগ্রহণযোগ্য হাদীছগুলোর পর্যালোচনা (কিতাবুত ত্বহারাত)

আহমাদুল্লাহ

ভূমিকা : ‘হেদায়া’ একটি খুবই প্রসিদ্ধ ফিক্বহের গ্রন্থ। এ মহান গ্রন্থটি অনেক বড় একটি সম্পদ। যা যুগে যুগে আলেমদের ইলমের খোরাক জুগিয়েছে। এটি হানাফী মাযহাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আল্লামা বুরহানুদ্দীন মারগীনানী (রহিঃ) (৫১১-৫৯৩ হি.) এই গ্রন্থটি হাদীছের আলোকে রচনা করেছেন। কিন্তু এতে বেশ কিছু হাদীছ রয়েছে, যেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এই লেখায় অতীব সংক্ষেপে সেসব বিষয়ে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

উল্লেখ্য, মুহতারাম লেখক সনদ ও রাবীর নাম সাধারণত লেখেন না। সেজন্যই আমরাও লেখকের মতোই স্রেফ মতন বা মূল বক্তব্যটুকু দিয়েছি যেভাবে তিনি তার গ্রন্থে প্রদান করেছেন। দলীল হিসাবে ‘আশরাফুল হিদায়া’-কে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা এটি মাদরাসার পাঠ্য বইয়ের সহায়ক হিসাবে রাখা হয়েছে। যা বাংলায় অনূদিত হয়ে দেশের সর্বত্র সহজলভ্য হয়েছে।

হাদীছ-১ :

رَوَى الْمُغِيرَةُ بْنُ شُعْبَةَ : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى سُبَاطَةَ قَوْمٍ، فَبَالَ قَائِمًا وَتَوَضَّأَ، وَمَسَحَ عَلَى نَاصِيَتِهِ وَخُفَّيْهِ

অনুবাদ : মুগীরা ইবনে শু‘বা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, ‘একদা নবী করীম (ছাঃ) কোনো এক ক্বওমের আবর্জনা ফেলার স্থানে এসে পেশাব করে ওযূ করলেন। তখন তিনি মাথার সম্মুখভাগ ও মোজার উপর মাসাহ করলেন’।[1]

তাহক্বীক্ব : মুহতারাম লেখক এখানে দু’টি ভিন্ন ভিন্ন হাদীছকে একত্রে লিখে দিয়েছেন।[2]  ফলে পাঠক মনে করতে পারেন যে, এটা মূলত একটাই হাদীছ, যা ভুল। এভাবে দু’টি হাদীছকে একত্রিত করে একটি হাদীছ বানিয়ে দেওয়ার রীতি কোনো মুহাদ্দিছ অবলম্বন করেছেন বলে জানা যায় না। চার ইমামের কোনো ইমাম একে বৈধ বলেছেন বলেও প্রমাণ নেই। এভাবে হাদীছকে বিকৃত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হাদীছ-২ :

নবী ধ বলেছেন,  الْوُضُوءُ مِنْ كُلِّ دَمٍ سَائِلٍ ‘সকল প্রবাহিত রক্তের কারণে ওযূ আবশ্যক’।[3]

তাহক্বীক্ব : ইমাম দারাকুৎনী (রহিঃ) এটা বর্ণনা করার পর বলেছেন, عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ لَمْ يَسْمَعْ مِنْ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ وَلَا رَآهُ , وَيَزِيدُ بْنُ خَالِدٍ , وَيَزِيدُ بْنُ مُحَمَّدٍ مَجْهُولَانِ ‘তামীম দারী (রহিঃ) হতে ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (এটা) শ্রবণ করেননি। তিনি দেখেনওনি। আর ইয়াযীদ ইবনে খালেদ ও ইয়াযীদ ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) উভয়েই মাজহূল রাবী।[4]

হাদীছ-৩ :

নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ قَاءَ، أَوْ رَعَفَ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَنْصَرِفْ وَلْيَتَوَضَّأْ وَلْيَبْنِ عَلَى صَلَاتِهِ مَا لَمْ يَتَكَلَّمْ ‘ছালাত অবস্থায় কারও বমি হলে কিংবা নাক থেকে রক্ত ঝরলে সে যেন ফিরে গিয়ে ওযূ করে এবং পূর্ববর্তী ছালাতের ওপর ভিত্তি করে যতক্ষণ না কথা বলবে’।[5]

তাহক্বীক্ব : হুবহু এ বাক্যে কোনো হাদীছ রয়েছে বলে জানা নেই। তবে ইবনু মাজাহ (রহিঃ)-এর মধ্যে এ মর্মের একটি যঈফ হাদীছ আছে।[6]  যদিও শব্দে পার্থক্য রয়েছে। মুহতারাম লেখক যে বাক্যে বর্ণনা করেছেন তা কোনো হাদীছ গ্রন্থে আছে কি না তা আমি অবগত নই।

হাদীছ-৪ :

নবী (ছাঃ) বলেছেন, لَا وُضُوءَ عَلَى مَنْ نَامَ قَاعِدًا. أَوْ رَاكِعًا. أَوْ سَاجِدًا. إنَّمَا الْوُضُوءُ عَلَى مَنْ نَامَ مُضْطَجِعًا، فَإِنَّهُ إذَا نَامَ مُضْطَجِعًا اسْتَرْخَتْ مَفَاصِلُه ‘দাঁড়িয়ে, বসে, রুকূতে বা সিজদায় যে ঘুমায়, তার উপর ওযূ করা যরূরী নয়। ওযূ যরূরী তার উপর, যে পার্শ্বে ভর দিয়ে ঘুমায়। কেননা পার্শ্বের উপর ভর দিয়ে ঘুমালে তার গ্রন্থি শিথিল হয়ে যায়’।[7]

তাহক্বীক্ব : এটা বর্ণনা করার পর আল্লামা যায়লাঈ হানাফী (রহিঃ) বলেছেন, غَرِيبٌ بِهَذَا اللَّفْظِ ‘এই বাক্যে এ বর্ণনাটি গরীব’।[8]  আল্লামা যায়লাঈ (রহিঃ)-এর একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা রয়েছে। তা হলো, যে বর্ণনাটি তার নযরে আসত না, তিনি সেটাকে ‘গরীব’ বলতেন। আল্লামা ইবনুল মুলাক্কিন (রহিঃ)ও পরবর্তীতে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন।[9]

হাদীছ-৫ :

নবী (ছাঃ)  বলেছেন, مَنْ ضَحِكَ فِي صَلاةٍ قَهْقَهَةً فَلْيُعِدِ الْوُضُوءَ وَالصَّلاةَ جَمِيْعًا ‘কেউ যদি ছালাতের মধ্যে জোরে হাসে, তাহলে সে যেন ওযূ ও ছালাত দু’টোই পুনরায় আদায় করে’।[10]

তাহক্বীক্ব : (১) আলবানী (রহিঃ) যঈফ বলেছেন।[11]  (২) ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহিঃ) বলেছেন, إِسْنَاده ضَعِيف وَهُوَ من رِوَايَة بَقِيَّة وَقد اضْطربَ فِيهِ এর সনদ যঈফ। আর এটি বাকিয়্যার অন্যতম একটি বর্ণনা। তিনি এতে ইযতিরাবের শিকার হয়েছেন’।[12]  (৩) ইবনুল জাওযী (রহিঃ) বলেছেন, ‘এটি ছহীহ হাদীছ নয়। কেননা বাকিয়্যার তাদলীসের অভ্যাস রয়েছে। সম্ভবত তিনি কিছু যঈফ রাবী হতে শুনেছেন। ফলে তিনি তাদের নাম মুছে দিয়েছেন’।[13]  উল্লেখ্য, হাদীছের কোথাও ‘জামী‘আন’ বা দু’টোতেই কথাটি নেই। কিন্তু লেখক তা সংযুক্ত করে দিয়েছেন।

হাদীছ-৬ :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, يُغْسَلُ الْإِنَاءُ مِنْ وُلُوغِ الْكَلْبِ ثَلَاثًا ‘কুকুরের মুখ দেওয়ার কারণে পাত্র তিনবার ধৌত করতে হবে’।[14]

তাহক্বীক্ব : হুবহু এভাবে কোনো হাদীছ নেই। দারাকুৎনীর হাদীছটি মুনকার।[15]  কেননা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে সাতবার ধৌত করা এবং একবার মাটি দিয়ে ধৌত করার কথা রয়েছে।[16]  সুতরাং হেদায়ার হাদীছটি যঈফ হওয়ার সাথে সাথে ছহীহ হাদীছের বিরোধী হওয়ায় মুনকারও হয়েছে।

হাদীছ-৭ :

توضأ به حين لم يجد الماء

‘রাসূল (ছাঃ) পানি না পেয়ে খুরমা ভিজানো পানি দ্বারা ওযূ করেছেন’।[17]

তাহক্বীক্ব : এর কোনো গ্রহণযোগ্য সনদ ও মতন আমাদের নযরে আসেনি।

হাদীছ-৮ :

নবী (ছাঃ) বলেছেন, التَّيَمُّمُ ضَرْبَتَانِ، ضَرْبَةٌ لِلْوَجْهِ، وَضَرْبَةٌ لِلْيَدَيْنِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ ‘তায়াম্মুম হলো মাটিতে দু’বার হাত মারা। একবারের দ্বারা মুখমণ্ডল মাসাহ করবে এবং দ্বিতীয়বারের দ্বারা উভয় হাত কনুই পর্যন্ত মাসাহ করবে’।[18]

তাহক্বীক্ব : যঈফ হাদীছ।[19]

হাদীছ-৯ :

حَدِيث الْمُغيرَة أَن النَّبِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم وضع يَدَيْهِ ومدهما من الْأَصَابِع إِلَى أعلاهما مسحة وَاحِدَة  –

মুগীরা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীছে আছে যে, ‘নবী (ছাঃ) তার উভয় মোজার ওপর নিজের দু’হাত রেখে পায়ের আঙ্গুল থেকে ওপরের দিকে একবার মাসাহ করেছেন’।[20]

তাহক্বীক্ব : ইবনু হাজার (রহিঃ) এর সনদকে ‘মুনক্বাতি‘’ বলেছেন।[21]  হাফেয যায়লাঈ (রহিঃ) ‘গরীব’ (ভিত্তিহীন) বলেছেন।[22]

হাদীছ-১০ :

রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,أقل أقل الْحيض لِلْجَارِيَةِ الْبكر وَالثَّيِّب ثَلَاثَة أَيَّام وَأَكْثَره عشرَة أَيَّام ‘কুমারী ও অকুমারী নারীর মাসিক স্রাবের সর্বনিম্ব মেয়াদ হচ্ছে তিন দিন। আর এর সর্বোচ্চ মেয়াদ হলো দশ দিন’।[23]

তাহক্বীক্ব : ইবনু হাজার (রহিঃ) বলেছেন, إِسْنَاده ضَعِيف ‘এর সনদ যঈফ’।[24]   আলবানী (রহিঃ) মুনকার বলেছেন।[25]

হাদীছ-১১ :

নবী (ছাঃ) বলেছেন, إِنِّي لَا أحل الْمَسْجِد لحائض وَلَا جنب ‘আমি কোনো স্রাবগ্রস্ত নারী ও বড় নাপাক ব্যক্তির জন্য মসজিদে প্রবেশ করাকে হালাল রাখি না’।[26]

তাহক্বীক্ব : যঈফ হাদীছ। কারণ এতে জাসরাহ বিনতে দুজাজা নামক যঈফ রাবী আছেন। [27]

হাদীছ-১২ :

নবী (ছাঃ) বলেছেন, لَا يقْرَأ الْحَائِض وَلَا الْجنب شَيْئا من الْقُرْآن স্রাবগ্রস্ত নারী ও বড় নাপাক ব্যক্তি কুরআন হতে কোনো অংশ পাঠ করবে না’।[28]

তাহক্বীক্ব : এ বর্ণনা ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ (রহিঃ)-এর কারণে যঈফ।[29]

উপসংহার : মোটকথা, হেদায়ার ‘কিতাবুত্ব ত্বাহারাত’ অধ্যায়ে বেশ কিছু ছহীহ হাদীছ থাকার পাশাপাশি যঈফ হাদীছও রয়েছে। যেগুলো আমরা উপরে উল্লেখ করলাম। আলেম ও গবেষক ভাই-বোনেরা যেন সতর্ক হতে পারেন এবং অন্যদরকেও সতর্ক করতে পারেন।

[1]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/৯২।

[2]. নাছবুর রায়াহ, ১/১।

[3]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১০৮।

[4]. সুনানে দারাকুৎনী, হা/৫৮১; বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/১১৯৯-১২০৩; বিস্তারিত দ্র. যঈফাহ, হা/৪৭০।

[5]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১০৮।

[6]. ইবনে মাজাহ, হা/১২২১; যঈফুল জামে‘, হা/৫৪২৬।

[7]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১১৪।

[8]. নাছবুর রায়াহ, ১/৪৪।

[9]. মুনিয়্যাতুল ইলমাঈ, পৃঃ ৯; ইরশাদুল হক্ব আছারী, আহাদীছে হেদায়াহ ফান্নী ওয়া তাহকীকী জায়েযা, পৃঃ ৩৮; অনুবাদ: আহমাদুল্লাহ,  পৃঃ ৫৬।

[10]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১১৬।

[11]. যঈফাহ, হা/৩৮৪৫।

[12]. আদ-দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদীছিল হেদায়া, হা/২৭।

[13]. আল-ই‘লালুল মুতানাহিয়া, হা/৬১০, তাহক্বীক্ব: শায়েখ ইরশাদুল হক্ব আছারী।

[14]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১৬৭।

[15]. দারাকুৎনী, হা/১৯৩, ১৯৪।

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৯।

[17]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/১৭৫।

[18]. প্রাগুক্ত, ১/১৮৩।

[19]. আদ-দিরায়াহ, হা/৫৯; যঈফাহ, হা/৩৪২৭।

[20]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/২০৩।

[21]. আদ-দিরায়াহ, হা/৬৩।

[22]. নাছবুর রায়াহ, ১/১৮০।

[23]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/২১৪।

[24]. আদ-দিরায়াহ, হা/৬৮, ১/৮৪।

[25]. যঈফাহ, হা/১৪১৪।

[26]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/২১৯।

[27]. যঈফ আবুদাঊদ, ১/৮৬ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য; ইরওয়াউল গালীল, হা/১২৪।

[28]. আশরাফুল হেদায়াহ, ১/২২১।

[29]. আদ-দিরায়াহ, হা/৭২, ১/৮৪; যঈফ তিরমিযী, ১/১২।