ঐক্যবদ্ধ থাকুন, মতানৈক্য পরিহার করুন



[৩০ রবীউল আওয়াল, ১৪৪৩ হি. মোতাবেক ৫ নভেম্বর, ২০২১। মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ আলী ইবনু আব্দুর রহমান আল-হুযায়ফী (হাফিযাহুল্লাহ) উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ‘আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ’-এর সম্মানিত গবেষণা সহকারী মো. তরিকুল ইসলাম। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

 প্রথম খুৎবা



সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি মহান ও মর্যাদাবান, যিনি মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও সম্মানের অধিকারী। আমি আমার রবের প্রশংসা করছি এবং তাঁর নেয়ামতসমূহের জন্য শুকরিয়া আদায় করছি, যেগুলো তিনি ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারবে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মাবূদ নেই, যিনি অনুগ্রহ ও করুণা করার একমাত্র অধিকারী। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী ও নেতা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল, যিনি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যে বিশেষিত। হে আল্লাহ! ছালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন আপনার বান্দাহ ও রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও ছাহাবীদের ওপর, যারা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করতেন।

আল্লাহ তাআলা যা ভালোবাসেন এবং যাতে সন্তুষ্ট হন, সেগুলোর মাধ্যমে এবং তিনি যাতে অসন্তুষ্ট হন সেগুলো পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আপনারা তাক্বওয়া অবলম্বন করুন। হে মুসলিম জনতা! তাক্বওয়া জীবনের সকল কিছু সংশোধন করে দেয় এবং মৃত্যুর পরে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা যায় একমাত্র তাক্বওয়ার মাধ্যমেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন’ (আত-তালাক, ৬৫/)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘সেই জান্নাত, আমি যার উত্তরাধিকারী বানাবো আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যারা মুত্তাক্বী’ (মারইয়াম, ১৯/৬৩)

হে মুসলিমগণ! দ্বীন ইসলামকে সংরক্ষণ করার জন্য এই পবিত্র শরীআত ঐক্যবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়েছে এবং বিচ্ছিন্নতা ও মতভেদ থেকে নিষেধ করেছে। কারণ এই দ্বীন ব্যতীত জীবন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং এই দ্বীন অনুযায়ী আমল ছাড়া জান্নাত লাভ করাও যাবে না। এই আদেশ দেওয়ার আরো কারণ হলো, যাতে এর মাধ্যমে সমাজ বিচ্ছিন্নতা, অরাজকতা, ঝগড়া-বিবাদ এবং ফাসাদ থেকে রক্ষা পায়। এছাড়াও সংঘর্ষ, শত্রুতা ও একে অপরের উপর বাড়াবাড়ি থেকে রক্ষা পায়। পাশাপাশি বিভিন্ন কল্যাণ এবং সাধারণ ও নির্দিষ্ট হক্বসমূহ সংরক্ষিত হয় আর নিরাপত্তা ও ন্যায়ের বাস্তবায়ন হয়। এসব কারণে আল্লাহ তাআলা ঐক্যবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়েছেন এবং মতভেদ থেকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়। অতঃপর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হও (আলে ইমরান, ৩/১০)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নেক কাজ ও তাক্বওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। তিনি আরো বলেন, ‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু’ (আত-তাওবা, ৯/৭১)। তিনি আরো বলেন, ‘মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১০)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা ছালাত ক্বায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে মযবূতভাবে অবলম্বন করো। তিনিই তোমাদের অভিভাবক, তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক আর কতই না উত্তম সাহায্যকারী!’ (আল-হজ্জ, ২২/৭৮)। তিনি আরো বলেন, ‘আর কেউ আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলে সে অবশ্যই সরল পথে হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে’ (আলে ইমরান, ৩/১০১) । আবূ মূসা আল-আশআরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য ইমারত তুল্য, যার এক অংশ অন্য অংশকে সুদৃঢ় করে। আর তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এক হাতের আঙুল আর এক হাতের আঙুলে প্রবেশ করিয়ে দেখালেন’।[1] নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মুমিনদের উদাহরণ তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়ার্দ্রতা ও সহানুভূতির দিক থেকে একটি মানবদেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সমস্ত দেহ ডেকে আনে তাপ ও অনিদ্ৰা’।[2] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও’।[3]

ঐক্যবদ্ধ থাকা, পরস্পরকে অনুগ্রহ করা, হক্বকে সাহায্য করা এবং মতভেদ ও বিচ্ছিন্নতাকে পরিহার করা এমন একটি দুর্গ, যেখানে সমাজ আশ্রয় নেয়। এই দুর্গটি হলো সকলের নিরাপদ স্থান, দ্বীনের শক্তি, দুনিয়ার সকল কল্যাণের হেফাযতের মাধ্যম, পথভ্রষ্টকারী সকল ফেতনা থেকে আশ্রয়স্থল এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তার মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা সমাজে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, সমাজের শক্তিকে ধরে রাখতে এবং পরস্পর অনুগ্রহ করতে আদেশ করেছেন আর পরস্পর বিচ্ছিন্নতা, শত্রুতা ও মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি’ (আলে ইমরান, ৩/১০৫)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে’ (আল-আনফাল, ৮/৪৬)। তিনি আরো বলেন, ‘আর তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে। প্ৰত্যেক দলই যা তাদের কাছে আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল’ (আর-রূম, ৩০/৩১-৩২)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না, তার বিষয়ে মিথ্যা বলবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সম্মান, সম্পদ ও রক্ত হারাম’।[4] ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করবে না’।[5] এগুলো এমন সকল হক্ব নষ্ট করা থেকে সতর্কবাণী, যেই হক্ব নষ্টের কারণে মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব অছিয়ত করেছেন, সেগুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আদেশ রয়েছে। সাথে সাথে বিচ্ছিন্নতা, মতভেদ ও বিদআত থেকেও নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অছিয়তসমূহে দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়সমূহকে একত্রিত করা হয়েছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ছাহাবীদের বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার এবং (রাষ্ট্রনেতার আদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (রাষ্ট্রনেতা) ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু মতভেদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাত ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গোমরাহি’।[6]

মুসলিমদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ হলো, তিনি তাদেরকে সব ধরনের ফেতনা থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর তোমরা সেই ফেতনা থেকে বেঁচে থাকো, যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা যালেম শুধু তাদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর’ (আল-আনফাল, ৯/২৫)। এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরগণ বলেছেন, তোমরা প্রত্যেক অনিষ্টকর ফেতনার কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যেই কারণগুলো তোমাদেরকে আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন করে।

পবিত্র শরীআত আম ফেতনা থেকে নিষেধ করেছেন। সাথে সাথে খাছ বা নির্দিষ্ট ফেতনা থেকেও নিষেধ করেছেন। কোনো ব্যক্তির জামাআত থেকে বের হওয়াকে শরীআত নিষেধ করেছে। আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (মুসলিম) জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেল, সে ইসলামের রজ্জু তার গর্দান থেকে খুলে ফেলল’।[7] আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মিনাতে চার রাকআত ছালাত আদায় করার বিরোধিতা করেছেন। তারপর তিনি তার সাথে চার রাকআত ছালাতই আদায় করলেন। তাকে বলা হলো, আপনি আমীরুল মুমিনীনের সমালোচনা করলেন। তারপর আপনি নিজেই সেই কাজটি করলেন। তখন তিনি বললেন, মতভেদ করা মন্দ কাজ।[8]

ইসলাম আরো সতর্ক করেছে দুনিয়ার ফেতনা, আখেরাতের আমলসমূহে অবহেলা করা ও আখেরাতকে ভুলে যাওয়া থেকে। আখেরাতের জন্য আমল করা, দুনিয়ার বিষয়সমূহকে সংশোধনের জন্য কাজ করা এবং প্রত্যেক কল্যাণকর ও উপকারী কাজসমূহের দ্বারা দুনিয়াকে আবাদ করাই হলো সফলতা, যেটি দ্বীনকে সম্মানিত করে, মুসলিমদের প্রয়োজনকে পূরণ করে, অন্যের কাছে নত হওয়া থেকে বিরত রাখে এবং কল্যাণকর রাস্তায় দান করতে হাতকে প্রসারিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে। আর বড় প্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে প্রতারণা না করে’ (ফাত্বির, ৩৫/৫)। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী’ (আলে ইমরান, ৩/১৮৫)

হালাল ও হারাম বিবেচনা না করে সব জমা করে দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী হওয়া সেই জমাকারীর জন্য আযাবস্বরূপ এবং সমাজের জন্য অনিষ্টকর ও অকল্যাণকর। অন্যের ওপর সীমালঙ্ঘন করে এবং তাদের হক্ব ও সম্পদে তাদের ওপর যুলুম করার মাধ্যমে মুসলিমদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়। এটি মুসলিমদের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ককে দুর্বল করে। প্রচণ্ড আগ্রহ ও লোভের সাথে দুনিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করার ফলে মানুষের অন্তরের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা ও বিরোধ সৃষ্টি হয়। উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহুদের শহীদদের জন্য (কবরস্থানে) এমনভাবে দু‘আ করলেন, যেমন কোনো বিদায় গ্রহণকারী জীবিত ও মৃতদের জন্য দু‘আ করেন। তারপর তিনি (ফিরে এসে) মিম্বারে উঠে বললেন, ‘আমি তোমাদের জন্য অগ্রগামী এবং আমিই তোমাদের সাক্ষীদাতা। এরপর (কাওছার) হাওযের ধারে তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটবে। আমার এ স্থান থেকেই আমি হাওয দেখতে পাচ্ছি। তোমরা শিরকে জড়িয়ে যাবে আমি এ ভয় করি না। তবে আমার আশঙ্কা হয় যে, তোমরা দুনিয়ার সুখ-শান্তি লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করবে’।[9]

উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতের সময় কিছু মুনাফিক্বের বের হওয়ার মাধ্যমে এই উম্মতে প্রথম মতভেদের সৃষ্টি হয়েছিল। দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাই তাদেরকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেমনটি ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে এবং সেটি প্রমাণিত। পরিতাপ, লাঞ্ছনা ও ঘৃণা ছাড়া তারা আর কোনো কিছু অর্জন করতে পারেনি। আর তারা একে একে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় ধ্বংস হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ আর তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল করা হয়েছে, যেমন আগে করা হয়েছিল এদের সমপন্থীদের ক্ষেত্রে’ (সাবা, ৩৪/৫৪)

নবুঅতের অনেক পরের বর্তমান এই যুগটিতে দুনিয়া অনেকের জন্য ফেতনায় পরিণত হয়েছে। দুনিয়ার কোনো স্বার্থে পরস্পর বন্ধুত্ব রাখা, পরস্পর ঘৃণা ও শত্রুতা করা এবং দুনিয়ার কারণেই সম্মান করা- এগুলোর কারণে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আবেগ প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে। একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা ও শত্রুতা করার পরিমাণ অনেক কমে গিয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, এখন মানুষের অধিকাংশ বন্ধুত্ব পরিণত হয়েছে দুনিয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে। আর এটি তাদের কোনোই উপকারে আসবে না।

দুনিয়ার ফেতনা থেকে বাঁচার উপায় হলো, যিনি দুনিয়া সম্পর্কে সবেচেয়ে বেশি জানেন, সেই আল্লাহ তাআলার নিকটে দুনিয়ার মূল্যটা জানা। সাহল ইবনু সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যদি দুনিয়ার মূল্য আল্লাহ তাআলার কাছে মশার ডানার পরিমাণও হতো, তাহলে তিনি কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না’।[10]

পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ থেকে বাঁচার উপায় হলো যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তুমি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে’।[11] যুহদ হলো হারাম পরিত্যাগ করা, আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন তাতেই পরিতৃপ্ত থাকা, আখেরাতের জন্য কাজ করা, দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে না পড়া, মানুষের কাছে যা আছে, সেটির প্রতি কামনা বাসনা না করা এবং আল্লাহ তাআলা কাউকে কিছু দিলে সেই মানুষের প্রতি হিংসা না করা।

আল্লাহ তাআলা আমাকে ও আপনাদেরকে কুরআনের বরকত দান করুন এবং এতে যে আয়াত ও হিকমতপূর্ণ উপদেশ আছে, সেগুলো দিয়ে যেন তিনি আমাদের উপকার করেন। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে ইস্তেগফার করছি। আপনারাও একমাত্র তারই কাছে ইস্তেগফার করুন। নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

দ্বিতীয় খুৎবা



সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি সর্বজয়ী, হিকমতওয়ালা, ধৈর্যশীল ও পরম দয়ালু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো মাবূদ নেই আর আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।

অতঃপর গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহ তাআলার তাক্বওয়া অবলম্বন করুন। কেননা তাক্বওয়াই হলো বর্তমানে বিদ্যমান নেয়ামতসমূহ সংরক্ষণের মাধ্যম আর ভবিষ্যতে আসা নেয়ামতসমূহের নিশ্চয়তাদানকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে’ (আল-আহযাব, ৩৩/৭০-৭১)

হে মুসলিমগণ! নিশ্চয় ইসলাম মানুষকে জবানের ত্রুটি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। কেননা কথা অথবা লেখনীর দ্বারা ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়, মতভেদের রাস্তা প্রশস্ত হয়। তাই নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাত দিবসে ঈমান আনে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে’।[12] নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসব ফেতনা থেকে একাধিকবার স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। বাতিল কথা বলাতেই ধ্বংস বিদ্যমান বলে তিনি সতর্ক করেছেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘জিহ্বার ব্যবহার তখন (ফেতনার সময়) তরবারির আঘাতের চেয়েও মারাত্মক হবে’।[13] হে আল্লাহর বান্দাগণ! গোপনে ও প্রকাশ্যে ইবাদত করে ও হারাম থেকে দূরে থেকে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে নিরাপত্তা ও সচ্ছলতাকে স্থায়ী রাখুন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, তারা ইবাদত করুক এ ঘরের রবের। যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় খাদ্য দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছে’ (কুরাইশ, ১০৫/৩-৪)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দু‘আ-ইস্তেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর ছালাত পাঠ করো এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৬)। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর এক বার ছালাত পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশ বার রহমত নাযিল করেন। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর এবং তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত নাযিল করুন, যেমনভাবে আপনি ইবরাহীমের ওপর এবং তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত নাযিল করেছিলেন। হে আল্লাহ! আপনি খুলাফায়ে রাশেদীন আবূ বকর, উমার, উছমান ও আলীসহ সকল ছাহাবীর ওপরে এবং তাদেরকে যারা ইহসানের সাথে অনুসরণ করে, তাদের ওপরও সন্তুষ্ট হয়ে যান। আর হে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! আপনি আমাদেরকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ তাআলাকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা বর্ণনা করো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৪১-৪২)। মহান আল্লাহকে স্মরণ করুন, তাহলে তিনি আপনাদেরকে স্মরণ করবেন। আর তার নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করুন, তাহলে তিনি আরো বাড়িয়ে দিবেন। আল্লাহর যিকিরই বড়। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা জানেন।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৫।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৩।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/২৩১০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮০।

[6]. তিরমিযী, হা/২৬৭৬।

[7]. আবূ দাঊদ, হা/৪৭৫৮।

[8]. আবূ দাঊদ, হা/১৯৬০।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৯৬।

[10]. তিরমিযী, হা/২৩২০।

[11]. ইবনু মাজাহ, হা/৪১০২।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৯।

[13]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৬৫।