করোনার হানা, বন্যার্তদের বেদনা ও সিন্ডিকেট চক্রের অট্টহাসি

-জুয়েল রানা
খত্বীব, গছাহার বেগপাড়া জামে মসজিদ,
গছাহার (১২ নং আলোকডিহি),চিরিরবন্দর, দিনাজপুর;
সহকারী শিক্ষক, আলহাজ্ব শাহ্ মাহ্তাব-রওশন ব্রাইট স্টার স্কুল,
উত্তর পলাশবাড়ী, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

সূচনা :

বন্যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মতো এই ঘাতক বন্যা দেশের মানুষের কাছে চিরায়িত সংস্কৃতির এক অভিন্ন অংশে পরিণত হয়েছে। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে এটি বন্ধ করা আমাদের পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। তারপরও বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব যতটুকু পারা যায়, ততটুকু কমানোর চেষ্টা করা উচিত।

ফিরে দেখা :

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বড় বন্যাগুলো হয়েছিল যথাক্রমে ১৯৭৪ সালে, ১৯৭৭ সালে, ১৯৮০ সালে, ১৯৮৭ সালে, ১৯৮৮ সালে, ১৯৮৯ সালে, ২০০৪ সালে, ২০০৭ সালে। তবে ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালের বন্যায় দেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। এদিকে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় থেকে সৃষ্ট বন্যা সাম্প্রতিককালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় মৌসুমি বন্যা দেখা দেয়। এতে কয়েক লক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। ব্যাপক ক্ষতি হয় গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের। অনেকের ফসলি জমি ও বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা অর্থাৎ মোট ভূখণ্ডে ১৮ শতাংশ বন্যায় প্লাবিত হয়। দেখা গেছে, প্রতি ১০ বছরে একবার বাংলাদেশে বড় ধরনের বন্যা হয়। যেমন ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালের বন্যা। এসব বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। সে জন্য সাংবাৎসরিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।

দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও দেশবাসীর কান্না :

এবারের বন্যায় দেশের প্রায় ৩০টি জেলা কম-বেশি প্লাবিত হয়েছে। মানুষ শুধু ঘরবন্দী নয়; পানিবন্দী হয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। করোনা সংকটের মধ্যে এ বন্যা যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। খবর পাওয়া গেছে, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এর ফলে বন্যার কবলে পড়েছে ১৫-২০ লাখ মানুষ। তাদের অনেকেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে গরু-বাছুর ও সংসারসামগ্রী নিয়ে চলে গেছে কাছাকাছি কোনো উঁচু জায়গায়। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে বন্যা কবলিত লোকদের স্বাভাবিক আয়-রোজগার। ফলে করোনা মহামারীর এই সময়ে বন্যা বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে বাড়তি চ্যালেঞ্জ। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রধান বলেছেন, এবারের বন্যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ধরনের বন্যা।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, পাশের দেশ ভারতের আসাম, সিকিম এবং নেপালেও এই বন্যা আঘাত হেনেছে। আসামের ২৮টি জেলার ৩৩ লাখের মতো মানুষ ইতোমধ্যেই এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার কারণে এরই মধ্যে আসামে মৃত্যু হয়েছে ৮৫ জনের। অপরদিকে নেপালে বন্যার পাশাপাশি চলছে ভূমিধ্বসের ঘটনাও।

বন্যা যে আমাদের জন্য সাংবাৎসরিক একটি সমস্যা, তা আমরা বাজেট প্রণয়নের সময় যেন ভুলে যাই। তাই বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো এবং কৃষি ও কৃষক পুনর্বাসনে আমাদের হাতে থাকে না প্রয়োজনীয় অর্থ। এবারের বাজেট যখন প্রণীত হয়, ততদিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত কৃষিখাতেই বন্যার অভিঘাত পড়ে সবচেয়ে বেশি। অতএব, এ বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষিখাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কার্যত তা হয়নি। কৃষিখাতের বরাদ্দে নেই কোনো বিশেষত্ব। বাজেটে কৃষকদের জন্য পুনঃঅর্থায়নের যে ঘোষণা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এবারের এই দীর্ঘমেয়াদী বন্যা এমন সময় এলো, যখন আমরা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আমপানের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজে ব্যস্ত। এর ওপর রয়েছে করোনা চিকিৎসায় যরূরী নানা স্বাস্থ্য-পদক্ষেপ। আর এ কাজটি করা হচ্ছে পুরো দেশজুড়ে।

এবারের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কতটুকু সম্ভব হবে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা বলা মুশকিল। এভাবে আমরা আর কত বন্যার ধকল বয়ে বেড়াব। এর একটা সমাধানের উপায় আমাদের খুঁজতেই হবে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে, পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার জন্য একটি সমন্বিত নেক্সাস প্লানিং প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথ খোঁজা। উল্লেখ্য, ‘নেক্সাস প্লানিং’ বা ‘নেক্সাস থিঙ্কিং’ অর্থাৎ সংক্ষেপে ‘নেক্সাস’ বলতে আমরা বুঝি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকে, যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এবং একই সাথে কমিয়ে আনে সম্পদের অভাব আর খাত সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি। আশা করি, আমাদের নীতি নির্ধারকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন।

দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপন বাঙালি মুসলিমদের জন্য নতুন কিছু নয়। বৃষ্টি বর্ষণ তো মাঝেমধ্যেই, থই থই বন্যার কারণে নৌকায় দাঁড়িয়ে ঈদের ছালাত আদায়ের নযীরও এ দেশে রয়েছে। করোনা এবং বন্যা এই দুর্যোগে মানুষের আর্থিক ও মানসিক অবস্থা বর্তমানে বেশ শোচনীয়। নিম্নবিত্ত এবং সিংহভাগ মধ্যবিত্তের জন্য এবার ঈদুল আযহার উৎসব স্পষ্টতই দীর্ঘশ্বাসের বার্তাবাহক। কুরবানীর পশুর হাটে ক্রেতা সংকট ও গণপরিহণে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের তেমন ভিড় না থাকা এটারই সাক্ষী। কাজ-কর্ম প্রায় স্বাভাবিক হলেও সর্বশেষ ঈদুল ফিতরের মতো এবারের ঈদুল আযহার উৎসবও ছিল নানাবিধ নিষেধের বেড়াজালে সীমাবদ্ধ। বিগত এক শতকে দেশে এমন পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপন হবার কোনো নযীর নেই।

ভারতীয় গরু প্রবেশে দেশি খামারিরা সর্বস্বান্ত :

কুরবানীর ঈদকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু এসেছে। কিছু কিছু স্থানে কড়াকড়ি থাকলেও বেশ কয়েকটি করিডোর দিয়ে গত বছরের তুলনায় বেশি গরু এসেছে এমন অভিযোগও উঠেছে। গরু এসেছে পুবের মিয়ানমার সীমান্ত দিয়েও। এতে কমে গেছে দেশি গরুর দাম। ফলে হতাশায় পড়েছেন দেশি খামারিরা। তারা ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। হাটে দেশি গরুর চেয়ে ভারতীয় গরুর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় দেশি গরুর দাম পায়নি ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া এবার বন্যার কারণে অনেকেই গবাদি পশু বিক্রি করে দিয়েছেন। কারণ বন্যায় গবাদি পশু পালন করা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে করোনা মহামারীর জন্য কুরবানীর পশুর হাট তেমন জমেনি। করোনা আর বন্যার কারণে এবার এমনিতেই পশুর দাম কম। এ অবস্থায় ভারতীয় গরু আমদানিতে দাম আরও কমেছে। বাধ্য হয়ে কম দামেই গবাদি পশু বিক্রি করতে হয়েছে খামারিদের। এতে তারা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এক বছর আগে যদি গবাদি পশুর খামারিরা জানতেন যে, করোনা মহামারী দুনিয়াকে বিপর্যস্ত করে দেবে, তাহলে তারা সেই মতো ব্যবস্থা নিতেন। অপরদিকে এমন বন্যা হবে তাও তারা অনুমান করেননি। তাহলে হয়তো তারা এতটা বিনিয়োগ করতেন না। গত বছর আমি গরুর খামারি ও কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের কাঁদতে দেখেছি। ভেবেছিলাম, ভবিষ্যতে এমনটি আর হবে না। দেশি খামারিদের স্বার্থে গরু আমদানি কমানোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। কিন্তু চোরাচালানিরা বসে নেই। টেলিভিশনে দেখেছি গরু চোরাচালানের দৃশ্য। যেভাবে কলা গাছের সঙ্গে বেঁধে খরস্রোতা নদীতে সীমান্তের ওপর থেকে গরু আনা হচ্ছে, তা শুধু বেআইনিই অপরাধ নয়; চরম নিষ্ঠুরতা। নদীপথে গরু পারাপার করতে গিয়ে ট্রলার ডুবিতে বহু গরু মারা গেছে। সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক খামারি। চোরাচালানিরা খামারিদের ক্ষতি করেছে, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি করেছে। ভারতীয় পশু আসার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কঠোর হবেন এবং দেশি খামারির স্বার্থ রক্ষা করবেন- এমনটিই প্রত্যাশিত। 

চামড়া শিল্পে নৈরাজ্য ও দুস্থদের পেটে চরম আঘাত :

কুরবানীর পর কাঁচা চামড়া চোরাচালানের রমরমা ব্যবসা শুরু হয়েছে। কাঁচা চামড়ার দাম না পেয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা বা ড্রেনে ফেলে দেওয়া যেমন ক্ষতিকর, চোরাচালান হওয়াও তেমন ক্ষতিকর। বিশ্বব্যাপী এই দুঃসময়ে আমরা আমাদের একটি টাকার সম্পদও নষ্ট হতে দিতে পারি না। পাট শিল্পের মতো চামড়া শিল্প ধ্বংস হোক, তা সহ্য করা যায় না। প্রতি বছর কুরবানী এলেই যে সিন্ডিকেট চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠে, তা হলো চামড়ার বাজার সিন্ডিকেট। চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়লেও প্রতি বছরই কমছে কুরবানীর পশুর চামড়ার দাম। সবমিলিয়ে চামড়ার বাজারে ধ্বস নেমেছে। এবার একেবারে পানির দরে বিক্রি হয়েছে কুরবানীর পশুর চামড়া। কুরবানীদাতারা সাধারণত পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করে না। তারা সেই চামড়া গরীব, অসহায় ও দুস্থ’দের মাঝে বণ্টন করে দেয়। তাই পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণে দুস্থরা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের প্রাপ্য হক্ব থেকে। মূলত সিন্ডিকেট চক্রের কারণেই কুরবানীর চামড়া নিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় ও হচ্ছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্মের কথা শুনে থাকি। বিশেষত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীসমূহ তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। যেমন রামাযান আসলেই পেঁয়াজের সিন্ডিকেট; চাল, ডাল, চিনি, তেল এমনকি গোশতের বাজারের সিন্ডিকেট। তারা অনেকটা প্রেশার গ্রুপ। অনেক ক্ষেত্রে তারা মজুদ বা সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা করে থাকে। বরাবরের মতো এবারের অর্থনীতির চালচিত্র একেবারেই ভিন্ন। করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু অর্থনীতিই নয়, সমাজ বিশ্বাসেও ফাটল ধরেছে। মানুষের দুর্দশা-দুর্বিপাক এমনকি মহামারী কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মানুষ উচ্চমূল্যে সুরক্ষা ও জীবনরক্ষা সামগ্রী কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে সিন্ডিকেট চক্রটি অট্টহাসিতে মেতে উঠেছে।

মন্তব্য :

মানুষের এখন চোখে-মুখে কষ্ট রয়েছে। একদিকে মহামারী করোনা, অন্যদিকে দফায় দফায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। এই দুইয়ের মধ্যে আবার চামড়ার বাজারে ধ্বস। মাদরাসার ইয়াতীম, দুস্থ, অসহায় অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী কুরবানীর চামড়া বিক্রির টাকার মাধ্যমে উপকৃত হয়। চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় মাদরাসার ইয়াতীম ও অসহায় ছাত্র-ছাত্রীরা আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।