করোনা আতঙ্ক : মানবতা তুমি কোথায়?

জুয়েল রানা

ভূমিকা :

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আতঙ্ক আর উদ্বেগ বিরাজ করছে ২০৫টিরও বেশি দেশে এক প্রকার দাপট দেখিয়ে বেড়ানো প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোও এই ভাইরাসের সঙ্গে পেরে উঠছে না। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সরকার, ডাক্তার, আলেম-ওলামা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলছে তা এখন মানুষ নিষ্ঠার সাথে মেনে নিচ্ছে। এ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলো মানবজাতি।

একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের গন্ধ :

সারা বিশ্ব যখন মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস (COVID-19)-এর গযবে কাঁপছে, তখন চীনের এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন, নানা উত্তর। অসংখ্য তর্ক-বিতর্ক। হঠাৎ করেই কি এই ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটল? আর চীনেই বা কেন এর উৎস হলো? যারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা চীনে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, এই ভাইরাসটি কৃত্তিমভাবে ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার এক ল্যাবে এটি তৈরি করা হয়। ভাইরাসটি একটি জৈব মারণাস্ত্র। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- চীনের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া। আর পরীক্ষাগারে এমনভাবে এই ভাইরাসটি তৈরি করা হয়েছে, যাতে শুধু এশিয়ার মানুষদেরই তা আক্রান্ত করতে পারে। এই ভাইরাসটিকে বলা হচ্ছে ‘জাতিগত বায়ো উইপন’। উহানে যারা মারা গেছে, তারা সবাই চৈনিক। তবে সেখানে একজন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবরও ছাপা হয়েছে। এখন ঐ মার্কিন নাগরিকের মাধ্যমেই কি এ ভাইরাসটি ছড়ালো? যদিও বলা হচ্ছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক বাজারে প্রথম করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। আবার বলা হচ্ছে, বাদুড়জাতীয় প্রাণী থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। এর পেছনে আদৌ কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনা, কিংবা বাইরের শক্তির কোনো ইন্ধন আছে কিনা, তা চীনা সংবাদপত্রে এখনো জোরালোভাবে প্রকাশিত হয়নি। কিংবা চীনের পক্ষ থেকেও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং শেষ মুহূর্তে এ বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই চীনের উহানে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটল। চীনের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরও বেশি নির্ভরশীল করতে চীনকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যেই এই ভাইরাস তথা জৈব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে- ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সমর্থকরা এভাবে এর ব্যাখ্যা করতে পারেন। তবে এটা ঠিক যে, চীন একটি বড় শক্তি। ভাইরাস চিহ্নিত করার ব্যর্থতা কিংবা তথাকথিত ষড়যন্ত্র রোধ করার ব্যর্থতা বিশ্বে চীনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে হ্রাস করবে। হয়তো চীন এটি বিবেচনায় নেবে!

সিরিয়াস পাঠকরা স্মরণ করতে পারেন ১৯৭৮-১৯৮১ সালে কিউবার পরিস্থিতির কথা। ঐ সময় পাঁচ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অভিযোগ করেছিলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের Biological attackঅর্থাৎ জৈব রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র! যদিও ঐ অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। Covert Geopolitics-এ Julia Papsheva এর প্রবন্ধ থেকে আরেকটি তথ্য পাওয়া যায়। তা হলো- পৃথিবীর ২৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের জৈব রাসায়নিক ল্যাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের Military Therat Reduction এসব ল্যাব পরিচালনা ও গবেষণার জন্য ২.১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। মূলত চারটি দেশ বা অঞ্চল (চীন, রাশিয়া, ইরান ও মধ্য আফ্রিকা তথা পশ্চিম আফ্রিকা)-কে কেন্দ্র করেই এসব জৈব রাসায়নিক ল্যাবে গবেষণা হয়। ঐসব ল্যাবে কী ধরনের গবেষণা হয়, তা অনেকেই জানে না। যুক্তরাষ্ট্র কখনো তা স্বীকারও করেনি। সুতরাং হঠাৎ করেই চীনে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও এর কারণে এ যাবৎ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং সেই সঙ্গে চীনের অর্থনীতিতে ধস্ নেমে আসা- সব মিলিয়ে সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকেই সামনে নিয়ে আসে। আমরা জানি না, এর প্রকৃত রহস্য আদৌ কোনোদিন জানতে পারব কিনা। কিংবা চীন নিজে তা স্বীকার করে বিশ্ববাসীর কাছে তার ‘অযোগ্যতার’ কথা জানান দিতে চাইবে কিনা! এ ধরনের মন্তব্য কতটুকু বাস্তবসম্মত তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। তবে নিঃসন্দেহে এ ধরনের ঘটনা চীনের জন্য একটি বড় শিক্ষা।

আরেক গণমাধ্যমে ইসরাঈলের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি শোহমের সূত্র উল্লেখ করে জানানো হয়েছে যে, হুবেই প্রদেশের উহানের ইনস্টিটিটিউট অব ভাইরোলজি (দ্বিতীয় জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার) চীনের প্যাথজেন লেভেল-৪ মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণু প্রযুক্তি গবেষণাগার। সেখানে জীবাণু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং চীনের এ ধরনের অবহেলা বিশ্বব্যাপী যে বিধ্বংসী অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তার দায়ভার চীনকেই নিতে হবে। এ ধরনের অসর্তকতাকে জৈব সন্ত্রাস নামে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা, যার মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন এক স্বাস্থ্য সাময়িকী জন হপকিন্স। ঐ সাময়িকীতে গত বছরের তথা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, চীনে এমন একটি ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে যা অর্থনীতি টালমাটাল করে দেবে। পরিবেশের ক্ষতি সাধন থেকে শুরু করে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাবে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ দিয়েছে। এখন সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে, তারা এত নিশ্চিতভাবে আশঙ্কা করেছিলেন কেন? কোনোভাবে এটি পূর্বপরিকল্পিত নয় তো? এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

 

করোনার কাছে ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ :

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় গত ২০ জানুয়ারী ২০২০। তারপর থেকে ক্রমান্বয়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। করোনা ভাইরাসে শুধু আক্রান্তেই নয় মৃতের সংখ্যাও শীর্ষ এখন যুক্তরাষ্ট্রে। গত ১১ এপ্রিল ২০২০, শনিবার রাত সাড়ে ৯ টায় আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্য অনুযায়ী ইতালিকে ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখন মৃত্যুর সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৬৬ জন। আর মোট আক্রান্ত ৫ লাখ ৬ হাজার ৮ জন। সুস্থ হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার ২১০ জন। অপরদিকে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৬৮ জন।[1]  তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কতজন আক্রান্ত হয়েছে ও মৃত্যুবরণ করেছে তা সিরিয়াস পাঠক মাত্রই অবগত আছেন।

করোনা মহামারিতে জনস্বাস্থ্য কতটা হুমকিতে পড়বে তা নিয়ে ট্রাম্পের যতটা উদ্বেগ, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ শেয়ার মার্কেট নিয়ে। তিনি কখনো কখনো করোনা ভাইরাসকে ‘চায়নিজ ভাইরাস’ বলেও অভিহিত করেছেন। আবার এই মহামারিকে তিনি তার অভিবাসন বিরোধী নীতি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করেছেন। এটাই হলো মানবতার ধ্বজাধারী রাষ্ট্রের আসল চরিত্র! চলুন আরেকটু সামনে যাই, গত ২৯ মার্চ ২০২০ হোয়াইট হাউসে সান্ধ্যকালীন সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে তার দেশে এক লাখ কিংবা তার বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তবে মৃতের সংখ্যা দুই লাখের কম রাখা গেলে সেটাই হবে বড় সফলতা’। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে অনেকেই অবাক হয়েছেন। বলে কী? দুই লাখের মতো মানুষ মারা গেলেও সফলতা? জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে সর্বোন্নত দেশটির প্রেসিডেন্টকে করোনা ভাইরাসের কাছে কেন এভাবে আত্মসমর্পণ করতে হলো? যুক্তরাষ্ট্রের তো সম্পদের অভাব নেই। আছে পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। তারপরও করোনা পরিস্থিতিতে দেশটিতে এমন হাল কেন? করোনা ভাইরাস নামক মহামারি মোকাবিলায় উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্র কেন এতটা পিছিয়ে- এটি বর্তমান সময়ের একটি বড় প্রশ্ন। তবে এ প্রশ্নের এক কথায় জবাব দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার আর হিল বলেছেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে এমন একজন লোক বসে আছেন, যিনি বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা বিচক্ষণতা কোনো দিক দিয়েই এ পদের যোগ্য নন

কমন ড্রিমস (ঈড়সসড়হ উৎবধসং) নামের একটি আমেরিকার নিউজ পোর্টালের বিশ্লেষণে জানা গেছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার লোকজন ইরানকে যুদ্ধে উস্কানি দেওয়া এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জনমত নিয়ে গবেষণা করতে এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, কখন যে আমেরিকায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে তা তারা টেরও পাননি। অথচ চীন থেকে বিভিন্ন দেশ হয়ে আমেরিকা পর্যন্ত এই ভাইরাস আসার আগে তাদের হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসকেও ট্রাম্প রাজনৈতিক মাপকাঠি দিয়ে পরিমাপ করেছেন। প্রথমে তিনি করোনা ভাইরাসকে গুরুত্ব না দিয়ে আমেরিকায় এটি ছড়িয়ে পড়ার খবরকে ডেমোক্র্যাটদের প্রতারণা বলে উল্লেখ করেছেন। এরপর যখন তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ততদিনে আমেরিকার অবস্থা এতটা নাজুক হয়ে গেছে যে, করোনা ভাইরাস বিরোধী লড়াইয়ের সামনের সারির যোদ্ধা-নার্সরা মাস্কের পরিবর্তে ওড়না দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে রোগীর সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। উক্ত নিউজ পোর্টালটি আরও জানিয়েছে যেআমেরিকায় যখন সামান্য মাস্কের এত অভাব তখন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, ইয়ামান, সোমালিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ হত্যার জন্য আমাদের (আমেরিকার) অস্ত্রাগারে রয়েছে ৫০০ পাউন্ড ও এক হাজার পাউন্ডের অসংখ্য বোমা। অর্থাৎ আমেরিকায় মানুষ মারার জন্য বোমা আছে কিন্তু মানুষ বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট মাস্ক নেই। আহ্, মানবতা!

 

খেঁটে খাওয়া মানুষের কষ্ট :

করোনার ভয়ে থর থর করে কাঁপছে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, ইতালি, আমেরিকা, ফ্রান্সসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। কার্যত পুরো বিশ্বই এক প্রকার লকডাউন। আর এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে খেঁটে খাওয়া মানুষগুলো। উন্নত দেশে তো তবু খাবারের ঘাটতি হচ্ছে না। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষগুলোর খাবারের অভাবে প্রায় মরার অবস্থা। কোথাও কোথাও কর্মহীন হয়ে পড়া শত শত নারী-পুরুষের বিক্ষোভও চোখে পড়ছে। তবে অনেক ব্যক্তি ও সংগঠনের আর্থিক ও ত্রাণ  সহায়তাও এসব কর্মহীন ও দরিদ্র মানুষের বেশ উপকারে আসেছে।

মানবতাবোধ বিবর্জিত নীতির চিকিৎসা চাই :

গত ৮ মার্চ ২০২০ তারিখ থেকে ১২ এপ্রিল ২০২০ তারিখে দুপুর ১২ ঘটিকা পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৪৮২ জন মানুষ এবং মৃত্যুবরণ করেছে ৩০ জন মানুষ।[2]   তারপর থেকে আজ পর্যন্ত এই কয়েক দিনের ব্যবধানে আক্রান্ত ও মৃতের পরিসংখ্যান প্রত্যেক বাংলাদেশি মাত্রই অবগত আছি। এই সংক্রমণ ও আক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশেও কোথাও লকডাউন কঠোর ও  কোথাও লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, কারখানা ও সংস্থা। মসজিদের দৈনন্দিন জামা‘আতে ও জুমা‘আর ছালাতে মুছল্লীদের উপস্থিতি সীমিত করতে ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে- যা ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে সঠিক ও যথার্থ সিদ্ধান্ত। কিন্তু কোথাও কোথাও লকডাউন ও সতর্কবাণী বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ভালোর পাশাপাশি কিছু মানবতা বিবর্জিত পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে প্রশাসন। যেমন, সম্প্রতি যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় মাস্ক না পরার অপরাধে তিন বৃদ্ধকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক কান ধরে উঠ-বস করার ঘটনা দেশজুড়ে সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় তুলেছে, যদিও সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে পরবর্তীতে প্রত্যাখান করার খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে, চীনের উহান প্রদেশে যরূরী ভিত্তিতে নির্মিত লেইশেনশান হাসপাতালের আদলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে দুই বিঘা জমির উপর দেশের শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থা পরিচালক (এমডি) শেখ বশির উদ্দিনের নিজ উদ্যোগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ৩০১ শয্যা বিশিষ্ট অস্থায়ী হাসপাতালের নির্মাণ কাজে স্থানীয় জনতা বাঁধা প্রদান করেছে। স্থানীয়দের দাবি, মহল্লার মাঝে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি করা হলে এলাকার মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। সেই আতঙ্ক থেকেই তারা হাসপাতাল নির্মাণে বাঁধা দিয়েছে। যাইহোক, এই ধরনের হাসপাতাল তৈরির কাজে বাঁধা প্রদান করা সঠিক নাকি ভুল হয়েছে- তা বিজ্ঞ পাঠকগণই নির্ণয় করবেন। এই বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করলাম না।

এমনিতেই মানুষ বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ও সভ্যতায় সন্তুষ্ট নয়। কারণ বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আমরা ট্রাম্পের একলা চলো নীতি দেখেছি, মোদীর উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখেছি, অর্থনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা দেখেছি, দেখেছি রাশিয়াকে বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কৌশলী পদক্ষেপ নিতে। বিশ্ব নেতাদের এসব পদক্ষেপে সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তার শক্তির প্রদর্শন ছিল। কিন্তু মানবতার কোনো আলো বা মুক্তির বার্তার ছিল না। তাই মানুষ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। করোনা নামক মহামারিতে মানুষের অর্থ, অস্ত্র, ক্ষমতা সবই মিথ্যা প্রমাণিত হলো। সামান্য উঁচু-নিচুর ব্যবধানেও যেখানে মানুষ মানুষকে প্রতিপক্ষ-প্রতিযোগী ভাবতো, এখন করোনার আতঙ্ক ও মৃত্যুর ভয় সবাইকে কাছে এসে জড়োসড়ো হওয়ার শিক্ষা দিল। তাই করোনার এই দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা নিজের ভুলগুলো শুধরাতে পারি ও আত্মসমালোচনা করে যেন মানবতার আলো জ্বালাতে পারি। মহান আল্লাহ সবাইকে যেন তাওফীক্ব দেন- আমীন!

আমাদের করণীয় ও বাঁচার পথ :

করোনা ভাইরাসের মতো মহামারিগুলো মূলত  আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য সতর্কতা ও শাস্তিস্বরূপ। কেননা মহান আল্লাহ বলেন,ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ‘স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের দরুন। এর দ্বারা আল্লাহ তাদের কিছু কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (সরল পথে) ফিরে আসে’ (রূম, ৩০/৪১)। এই ধরনের এলাহী গযবগুলোর সাথে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই মোকাবেলা করার। পৃথিবীর সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলেও তা মোকাবেলা করতে পারবে না। তাই ‘করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত’, ‘করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হবই’ এই ধরনের দুঃসাহসী কথা বলা মোটেও ঠিক নয়।

লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সচেতনতা-সতর্কতা, করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারের বার বার ব্যর্থ প্রচেষ্টাসহ শত উদ্যোগ, হাজারো চেষ্টার পরও করোনার সংক্রমণ ও আক্রমণের মাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়ে এই এলাহী গযব ইতিমধ্যেই বিশ্বের বড় বড় নেতাদের বুঝিয়ে দিল যে, তোমরা শক্তিশালী নও, তোমরা আসলে বড়ই দুর্বল। উন্নয়ন ও পরিবেশ যে সমমুখী নয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত করোনা ভাইরাসের প্রভাব। বিশ্বায়নের ফলে মানুষ যেমন মানুষের কাছাকাছি এসেছে তেমনি বিপর্যয়সহ নানা রোগ-জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য  স্থানে সহজে ছড়িয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, করোনার উৎপত্তিসংক্রান্ত যেসব তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসছে তার প্রত্যেকটি পরিবেশের সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।

আমাদের দেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাতে সবকিছুকেই সরকারের ভূমিকাকে আমরা বাঁকা চোখে দেখি। অপরদিকে সরকারও সব সমালোচনাকেই অমূলক জবাবের মাধ্যমে উড়িয়ে দেয়; মাঝখানে প্রকৃত সমস্যা নিশ্চিন্তে অগ্রসর হতে থাকে। করোনা ভাইরাসের গযবে আমাদের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তাতে সরকারের ওপর সম্পূর্ণ দায় চাপানো যথার্থ হবে না। তবে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার  ও ব্যক্তি খাত উভয়কে সতর্ক হতে হবে। করোনা ভাইরাস থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর কাজ সর্বাগ্রে করতে হবে। বিকল্প আমদানি-রফতানির চিন্তা এখন থেকেই যরূরী ভিত্তিতে করতে হবে। একটা শিক্ষা পেঁয়াজ থেকে হয়েছে। শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পেঁয়াজে আমরা উচিত শিক্ষা পেয়েছি। এখন করোনা ভাইরাসের শিক্ষা হচ্ছে আমদানি নির্ভরতা চীনের ওপর থাকায়। কি যন্ত্রপাতি, কি কাঁচামাল, কি মধ্যবতী পণ্য, কি অবকাঠামোগত ঋণ-সবক্ষেত্রেই মাত্র এক-দুই দেশের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এখন থেকে এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় আরেকটি। সেটি হলো- ঋণ খেলাপি সমস্যা। বর্তমান মন্দা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকের ঋণের টাকা ফেরতে আসবে- এই চিন্তা বাতুলতা মাত্র। তবে আশা জাগানিয়া একটি খবর হলো যে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৌনে ৭৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রণোদনা প্যাকেজের সঠিক বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠু তদারকি হলে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে ইনশাআল্লাহ।

করোনা ভাইরাসের এই সংক্রমণ ও আক্রমণ কতদূর দীর্ঘায়িত হবে তা একমাত্র মহাজ্ঞানী আল্লাহই ভালো জানেন। তাই এ ব্যাপারে আমাদের নিশ্চিত করে বলাটা মুশকিল। তবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা অবশ্যই বাহ্যিক উপায়ে সতর্ক থাকব, নিজেকে ও অপরকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু কেবল বাহ্যিক উপায়ে সতর্কতা অবলম্বনেই করোনা ভাইরাসের গযব থেকে মুক্তি বা রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। এই মহামারি ও গযব থেকে রক্ষা পেতে হলে সবধরনের গুনাহ থেকে তাওবা করে দ্বীনের পথে তথা আল্লাহর পথে ফিরে আসতে হবে। তাহলেই আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করবেন। মহান আল্লাহর করুণা ছাড়া করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার বিকল্প কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মুমিন-মুসলিমকে আল্লাহ তা‘আলা ভালো রাখুন- আমীন!

উপসংহার :

আমাদের জীবনে আপদের কোনো শেষ নেই। একটি যায় তো আরেকটি আসে। সর্বশেষ আপদের নাম হলো করোনা ভাইরাস। আর এইসব আপদ ও গযব থেকে মুমিনদের বাঁচার পথ হলো দু’টি। প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও তাওয়াক্কুল। আল্লাহর হুকুম না হলে কোনো ভাইরাসের ক্ষমতা নেই কারও কোনো ক্ষতি করার। আর ভরসা  আল্লাহর উপরেই করতে হবে ও প্রাণ ভরে দু‘আ করতে হবে। সেই সাথে সাধ্যমতো প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।