করোনা-পরবর্তী বিতর্ক : বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ভাবনা ও আমাদের প্রস্তাবনা

জুয়েল রানা
সহকারী শিক্ষক,
আলহাজ্ব শাহ্ মাহ্তাব-রওশন ব্রাইট স্টার স্কুল,
উত্তর পশাশবাড়ী, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

পূর্ব কথা :

সাম্প্রতিককালে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটানা দীর্ঘতম ছুটির অভিনব ঘটনায় বৈশ্বিক স্থবিরতার আরেক কাণ্ডে পৃথিবীই যেন জনশূন্য এক বিরানভূমি। নানা দেশে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ একসঙ্গে ঘরবন্দি হয়ে আছেন। এশিয়া থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে রাশিয়া সর্বত্রই করোনার সর্বগ্রাসী বিচরণে চরম সঙ্কাটাপন্ন সব ধরনের ব্যবস্থাপনা। যদিও চীন, ইরান, রাশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।

করোনা-পরবর্তী বিতর্ক :

আপাতত বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে এর প্রকোপ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ও পাচ্ছে। অন্যদিকে উন্নত ব্যবস্থাপনা, বিস্তৃত পরিকাঠামো সত্ত্বেও অগণিত মৃত্যুর ঘটনায় ইউরোপ ও আমেরিকা রীতিমতো বিপর্যস্ত। উন্নত বিশ্বের এহেন দুরবস্থায় মারাত্মক জনভীতি সঞ্চারিত হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে গভীর সঙ্কটে পড়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা।

ভাইরাসের উৎপত্তি, তৎপরবর্তী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা, পরিত্রাণের সম্ভাব্য উপায় এবং অসংখ্য মৃত্যু, আশু পদক্ষেপ ইত্যাদি বিষয়ে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তনজনিত ধরন কী হতে পারে, তা এখনই পরিষ্কারভাবে নিরুপণ করা দুরূহ। তবে এতটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, বিশ্বের অর্থনৈতিক চেহারায় একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তন অত্যাসন্ন। যে প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি দু’টি ধারা সক্রিয় হতে পারে। এই পথ ধরে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে চায়না পণ্যের প্রবেশ কিছুটা জটিলতার মুখে পড়ার আশঙ্কাটিই চীনের জন্য সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে ইউরোপ-চীন বাণিজ্য কাট-ছাঁট অনিবার্য হলে তা উভয় অঞ্চলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। কিন্তু এর রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করবে আমেরিকা। এর বিপরীতে আফ্রিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে উল্টো পশ্চিমাকেই বিপদে ফেলাতে পারে চীন। তাই এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাণিজ্য। যেটি বিশ্ব নেতৃত্বের আসন থেকে ছিটকে পড়া আমেরিকার জন্য একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার সুযোগ হিসাবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সামরিক উত্থানের এ পর্যায়ে চীনের বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়ার সামগ্রিক অভিপ্রায় কতটা বাস্তবসম্মত তার স্পষ্ট মহড়াই হচ্ছে করোনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্কের উত্তাপ। তাই আগামী বিশ্ব নেতৃত্বের লড়াইয়ে চীন-মার্কিন চলমান দ্বৈরথের ফলাফল নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, চীন পরাশক্তি হয়ে ওঠার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তাদের ল্যাবরেটরি থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। পক্ষান্তরে চীন বলছে যে, চীনকে দুর্বলতর করার জন্য অলিম্পিক গেমের সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। এই দুই দেশের পাল্টা-পাল্টি দুই দাবির মধ্যে কোনটি সঠিক? এসব দাবি খতিয়ে দেখা দরকার। আসলে এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অর্থনীতি। এই অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অর্থনীতিটা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির বাইরেই থেকে যায়। এ সম্পর্কে ‘স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ কোভিড-১৯ এর জিন কাঠামো নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেছে যে, করোনা ভাইরাস ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। অতএব, এর উদ্ভব ঘটেছে নিজে নিজে, প্রাকৃতিক রূপান্তর বা মিউটেশনের মাধ্যমে অর্থাৎ এই করোনা ভাইরাস সৃষ্টির পেছনে কোনো দেশেরই হাত ছিল না। এটি নতুন ধরনের একটি ভাইরাস পরিবার। তবে সুপরিচিত মেডিক্যাল জার্নাল ‘ল্যান্সেট’ জানিয়েছে যে, ৪৩ জন করোনা রোগীর মধ্যে ১৩ জন রোগী ছিল উহান প্রদেশের বাইরের এবং এদের সাথে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের উহান প্রদেশের কোনো করোনা রোগীর সংস্পর্শ ছিল না কিংবা সেখানকার ‘ওয়েট মার্কেট’-এর সাথেও তাদের কোনো যোগসূত্র ছিল না। উহানের ‘ওয়েট মার্কেট’ হচ্ছে একটি স্থানীয় ছোট মাছ বাজার। অনেক গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে- উহানের এই ‘ওয়েট মার্কেট’ থেকেই বিশ্বব্যাপী এই করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। কিন্তু ‘স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ সেই ‘ওয়েট মার্কেট’র সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রত্যাখান করেছে। তাদের মতে, মিউটেশনের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ও এর জিন কাঠামোর যেভাবে উদ্ভব ঘটেছে, তার জন্য প্রয়োজন প্রাণীদের ঘনবসতি। আর একমাত্র সম্ভাব্য স্থান হচ্ছে, যেখানে শিল্প উৎপাদন হিসাবে পশু উৎপাদন চলে এবং উৎপাদনের পর এগুলোকে একসাথে রাখা হয়। মুরগি ও শূকরের খামারে ঠিক এভাবেই এ কাজটি চলে। গবেষণাসূত্রে বলা হয়েছে যে, যেহেতু শূকরের ও মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি, তাই এই কোভিড-১৯ মানবদেহে এসেছে শূকরের মাধ্যমে।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ভাবনা :

কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে পত্র-পত্রিকায় কোভিড-১৯’র আলোচনা হয়। সঙ্গত কারণে সংক্রমণ রোধের প্রায়োগিক দিক সেই আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের ওপর প্রভাব, সম্ভাব্য প্রণোদনামূলক নীতিমালা এবং আপৎকালে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য করণীয় বিষয়গুলো অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা তুলে ধরতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুর্নীতি ও সুশাসনের বিবিধ দিকও আলোচনায় এসেছে।

করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন, দিচ্ছেন। আর এসব ভবিষ্যদ্বাণী প্রধানত অর্থনৈতিক অবস্থা কী হবে বা হতে পারে তা নিয়ে। তাছাড়া পুঁজিবাদের প্রসার বা অন্তর্ধান নিয়ে কিংবা আন্তদেশীয় বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি নিয়েও কম-বেশি ভাবনা চলছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য সঙ্কট, চরম বেকারত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছেন অনেকে। অন্যদিকে মানবজাতির সংস্কৃতি তথা সম্পূর্ণ জীবন ধারণের রীতি-প্রকৃতি, আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্রের ওপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করবে বা কতটুকু পাল্টে দেবে, তার হিসাব-নিকাশ করছেন কেউ কেউ।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সরকারের প্রত্যয় ও কর্মসূচীকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে করোনা। নিজ নিজ আবাসস্থলে অবস্থান করে অফিস-আদালত, যরূরী এমনকি স্বাভাবিক কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে অনেক সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-সংস্থা। লকডাউন মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অফিসে কাজ-কর্ম চলছে। ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে এখন আর শুধু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মিটিং হয় না, বলতে গেলে সব ধরনের সভা এমনকি পেশাজীবী সংগঠন বা সমিতিগুলোর সভাও অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে হচ্ছে। অনলাইনে বেচা-কেনা এবং হোম ডেলিভারি এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, কোম্পানী বা ফার্মগুলো অর্ডার নিতে পারছে না আর অর্ডার নিলেও এক-দুই সপ্তাহ পরে মালামাল বাসায় পৌঁছে দিচ্ছে। এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ইতিমধ্যেই তাদের স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর বিশ্লেষণ মতে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৭ কোটি মানুষের মারাত্মক খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবার কেউ কেউ বলেছেন, এমনও দিন আসতে পারে যেখানে সরকার বা মানুষের হাতে টাকা থাকবে কিন্তু খাদ্য পাওয়া যাবে না। এর আগে অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় কোনো কোনো রাষ্ট্র কাগুজে নোট ছাপিয়ে ফল পেয়েছে উল্টো। কারণ, এতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। তখন বাজারদর মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। মানুষের প্রাথমিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলোর জন্যই জীবিকা। সব কিছুরই বিকল্প হতে পারে কিন্তু খাদ্যের কোনো বিকল্প হতে পারে না। কোনো কারণে যদি বাঙালির খাদ্যের প্রধান উপাদান ‘ধান’ চাষের ঘাটতি ঘটে, তখন বিদেশ থেকেও চাল আমদানি করা দুরূহ হয়ে পড়বে। কারণ পৃথিবীব্যাপীই চলছে এখন মন্দাভাব, যা কাটিয়ে উঠতে গিয়ে বড় রাষ্ট্রগুলোই হিমশিম খাচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের খাদ্যের চাহিদা মেটানো কিন্তু প্রয়োজনমতো খাদ্যই যদি মজুদ না থাকে তবে সরকার খাদ্যের চাহিদা মেটাবে কীভাবে?

আমাদের প্রস্তাবনাসমূহ :

আমাদের দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সংবাদকর্মীসহ যারা এই করোনাকালে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন যদি আমরা তাদের অবদানের কথা স্মরণ না করি, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই করোনাকালীন সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা আক্রান্ত হয়ে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন, তাদের পরিবার যাতে অন্ধকারে হাবুডুবু না খায় সে জন্য ব্যবস্থা হিসাবে একটা প্রেষণা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ রইল।

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের জীবিকা নির্বাহের শেষ পথটিও। এ দুর্দিনে এগিয়ে আসছেন সমাজের বিত্তশালীরা, বাড়িয়ে দিচ্ছেন মানবতার হাত। কিন্তু সম্প্রতি একটা বিষয় ভীষণভাবে আমাদের ব্যথিত করে তুলেছে। সেটা হলো- ত্রাণ দেওয়ার সময় যাকে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে নিজেকে জনপ্রিয় করার ধান্দায়। আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা চক্ষু লজ্জার ভয়ে আত্মসম্মানবোধের দিকে তাকিয়ে কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। এ মহাদুর্যোগে আপনি একজনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন- এটা প্রশংসনীয় ও মানবিক; কিন্তু পাশাপাশি তা আত্মসম্মানবোধে আঘাত করা মোটাদাগে নিন্দনীয় ও অমানবিক। এটা কখনোই মানবতার দৃষ্টান্ত হতে পারে না। তাই জাতির এ দুঃসময়ে যারা মানবতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ রইল- ত্রাণ বিতরণের সময় দয়া করে ছবি তুলবেন না।

অন্যদিকে, জনগণের কাছে ত্রাণ সাহায্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও চুরির ঘটনা বেড়েই চলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ত্রাণ বিতরণ যেখানে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সরকারি দল ও জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণ বিতরণে পক্ষপাতিত্ব ও চুরির খবর আসছে অব্যাহতভাবে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

দুনিয়ার এই জীবনে প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো নিজের স্ত্রী ও সন্তানরা। সেই প্রিয়জনদের থেকে প্রত্যক্ষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যদি ন্যূনতম সাহায্য, সহানুভূতি, ভালোবাসা না মেলে, তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে। অথচ প্রিয়জন, স্বজনের কাছে একজন মানুষের শেষ চাওয়াতো সম্ভবত ওইটুকুই! তাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যইতো জীবনের শেষ সামর্থ্যটুকু দিয়েও মানুষ কাজ-কর্ম করে, অর্থ উপার্জন ও সঞ্চয় করে। প্রিয় মানুষদের নিয়ে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে। করোনায় আক্রান্ত মানুষের সেই শেষ চাওয়াটুকু পূরণ হচ্ছে না তার স্বজনদের কাছ থেকে। নিজের গর্ভধারিণী মাকে গভীর রাতে বনের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে যায় যে পেটের সন্তান, জন্মদাতা বাবার জানাযায় শরীক না হয়ে তার দাফনের দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যায় যে ছেলে এবং নিজ স্বামীকে গভীর রাতে ঘরে জায়গা না দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বলে যে স্ত্রী, তাদের হৃদয় কী দিয়ে তৈরি তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু তারা প্রমাণ করেছেন, এ সমাজে এমনও মানুষ আছে, যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই। করোনা ভাইরাস সেই প্রিয়জনদের তথাকথিত ভালোবাসার প্রকৃত বীভৎস ও কুৎসিত স্বরূপটি উন্মোচন করে দিয়েছে। করোনা ভাইরাসই প্রমাণ করে দিয়েছে তারা জোর গলায় ভূপেনের গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গাইতে কিংবা এর সাথে সুর মেলাতে যতই পসন্দ করুক না কেন তাদের মধ্যে মানুষোচিত  স্নেহ-মায়া-মমতা, মানুষের প্রতি দরদ অর্থাৎ মানবিকতার বোধ কতটা ক্ষীণ! বরং বলা যায়, প্রমাণ হয়ে গেছে তারা কতটা পশু, কতটা বর্বর! যেখানে ‘সকলের তরে সকলে আমরা’ এই নীতি আমাদের সকলেরই হওয়া উচিত, তখন তারা এ কী করছে!

পৃথিবীতে মজুদ সমুদয় স্বর্ণের বিরাট একটি অংশই আজ আমেরিকার হাতে। পৃথিবীতে সর্বাধিক স্বর্ণের মালিক আমেরিকার হাতে রয়েছে ৮,১৩৪ টন স্বর্ণ। দ্বিতীয় সর্বাধিক স্বর্ণের দেশ জার্মানির হাতে রয়েছে ৩,৩৬৭ টন স্বর্ণ। এরপর ইতালির কাছে রয়েছে ২,৪৫২ টন স্বর্ণ, ফ্রান্সের কাছে রয়েছে ২,২১৯ টন স্বর্ণ, চীনের কাছে রয়েছে ১,৯৩৭ টন স্বর্ণ, সুইজারল্যান্ডের কাছে রয়েছে ১,০৪০ টন স্বর্ণ, জাপানের কাছে রয়েছে ৭৬৫ টন স্বর্ণ, ভারতের কাছে রয়েছে ৬১৮ টন স্বর্ণ, নেদারল্যান্ডের কাছে রয়েছে ৬১৩ টন স্বর্ণ। দেখা যাচ্ছে যে, স্বর্ণ মজুদের তালিকায় বিশ্বের প্রথম দশটি রাষ্ট্রের মধ্যে কেবল আমেরিকার হাতেই রয়েছে এক-তৃতীয়াংশের বেশি স্বর্ণ। এত স্বর্ণ সে পেল কোথায়? নিজেরা স্বর্ণ তৈরি করেছে? নিজ দেশের খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করেছে? কখনোই না। বরং সে বিশ্বকে ডলার নামে কিছু কাগজের টুকরো দিয়ে স্বর্ণ গ্রহণ করে নিজ দেশে স্বর্ণের বৃহৎ মজুদ গড়ে তুলেছে।  দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ করা সত্ত্বেও আমেরিকা আজ পর্যন্ত যতটুকু টিকে আছে, তা শুধু এ ধোঁকাপূর্ণ ডলার ব্যবস্থার কারণেই। যদিও ইদানিং তাদের অর্থব্যবস্থায় বড় ধরনের ধ্বস নামতে যাচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত বিশ্বকে বোকা বানানোর যতগুলো কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, তন্মধ্যে ডলারভিত্তিক এ মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলনটা ছিল সবচেয়ে ভয়ানক, সূক্ষ্ম ও ক্ষতিকর। আজ যদিও বিশ্বের অনেক দেশ ধোঁকাপূর্ণ এ ব্যবস্থার বিষয়টি বুঝতে পারছে কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ আজ যদি আমেরিকা ডলারকে বাতিল ঘোষণা করে গোল্ড সিস্টেম মুদ্রা চালু করে, তাহলে আমরা সবাই হয়ে পড়ব কপর্দহীন পথের ফক্বীর। আমাদের দশ বিলিয়ন ডলার দিয়ে শুধু ঘরের দেয়ালটাই সাজাতে পারব, অন্য কিছু নয়। এ আশঙ্কা এতদিন হালকাভাবে দেখা হলেও বর্তমান বিশ্বের নানা প্রেক্ষাপটে এটা এখন ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা হয়ে দেখা দিচ্ছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতনের পর নতুন দীনার ইস্যু করা হলো, তখন পুরাতন সব দীনার হয়ে গেল একেবারে মূল্যহীন। মানুষ তাদের দীনারের নোটগুলো রাস্তায় ফেলে দিল। এক টুকরো সাদা কাগজের মূল্যও ছিল না তখন! কারণ, ওই দীনারগুলো দিয়ে আর কোনো লেনদেন করার সুযোগ ছিল না। অনুরূপ করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক নানা সমস্যার কারণে এদেশের অর্থব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। আর সেটা হলে আমরাও কিন্তু বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়ব। তখন আমাদের টাকাগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়বে। যেমনটি ভারতে একবার ঘটেছিল। আর ব্যাংক যদি দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়, তাহলে আমাদের সারাজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের কী অবস্থা হবে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? এগুলো বাস্তবে ঘটতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ ও গবেষক কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। সবগুলো বিষয় সামনে রাখলে বিবেকবান মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে, ব্যাংকে কাগুজে টাকা রাখা ও এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকাটা কত বড় বোকামি এবং এই ফালতু কাগুজে মুদ্রাব্যবস্থার কারণে আমরা কতটা রিস্কের মধ্যে আছি!? এটা ঠিক যে, জঘন্য এ ডলার ব্যবস্থা বা কাগুজে মুদ্রা আমরা এখন ইচ্ছে করলেও পরিবর্তন করতে পারব না। তবে আমরা সবাই সচেতন হয়ে কমপক্ষে নিজে বা নিজের ঘনিষ্ঠদের তো ডলার ও কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থার ধোঁকাপূর্ণ অর্থনীতির এই ভয়ঙ্কর জাল সম্পর্কে সতর্ক করতে পারব।

মনে রাখা দরকার যে, দেশের সরকার বহাল থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসুক বা না আসুক, মুদ্রা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ুক বা না পড়ুক, সর্বাবস্থায় আমাদের স্বর্ণ, রূপা ও ভোগ্য পণ্যসমূহের মূল্য কখনোই পরিবর্তন হবে না। কারণ এগুলোর নিজস্ব মূল্য (সেলফ ভ্যালু) ও উপযোগ আছে। কেউ চাইলেও তা বাতিল করতে পারবে না। মুদ্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটার নিজস্ব মূল্য বা তার উপযোগ থাকতে হবে এবং তা কখনো মূল্যহীন বস্তু (যেমন, কাগজ) হতে পারবে না। স্বর্ণ-রূপা এমন দু’টি পদার্থ, যা মানবসভ্যতার শুরু থেকে নিয়ে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মূল্যবান বস্তু হিসাবে পরিগণিত। এ দু’টি জিনিস কখনো ভ্যালু হারিয়ে মূল্যহীন হবে না। অনুরূপ চাল, ডাল, গম, চিনি, আটা, লবণ ইত্যাদি প্রতিটি ভোগ্য পণ্যেরও নিজস্ব উপযোগ আছে এবং তা হলো আমাদের ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে, সরকারের অধ্যাদেশে এসব ভোগ্য পণ্যের উপযোগ কখনো বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই পৃথিবীর যেখানেই যান না কেন, প্রতিটি ভোগ্য পণ্যের উপযোগ প্রায় একই থাকে অর্থাৎ তাদের নিজস্ব একটা মূল্য সব সময়ই থাকে। একইভাবে গবাদি পশু-পাখির কথাও বলা যায়। এগুলোর উপযোগেও কোনো পরিবর্তন হয় না।

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্তত ক্বওমী অঙ্গনের মাদরাসাগুলো খুলে দেওয়া উচিত।

শেষ কথা :

যেহেতু ধ্বংসলীলা শুরু ও শেষ হওয়ার দিন ক্ষণ মহান আল্লাহ নির্ধারণ করেন, সেহেতু মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস থেকে বিশ্ব কখন মুক্তি পাবে তা এখনো আঁচ করা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা আগামী জানুয়ারী-২০২১ সালের কথা বলাবলি করছেন। কিন্তু নির্ভর করার মতো আশ্বাস কেউ দিতে পারছেন না।