করোনা ভাইরাস নিয়ে কতিপয় ভুল প্রচারণার জবাব

-জুয়েল রানা
উত্তর পলাশবাড়ী, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর। 

ভূমিকা : করোনায় জীবনহানি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে সারা বিশ্বে এবং আমাদের দেশে কারও দুশ্চিন্তার কমতি নেই এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেই যে গত ডিসেম্বরে শুরু হলো কোভিড-১৯ এর তা-বলীলা, তা এখন পর্যন্ত ক্ষান্ত হয়নি কোনো দেশে। প্রাণহানি কোন পর্যায়ে যাবে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কোন রূপ নেবে তা উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত কোনো দেশই নিশ্চিত নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ব বিদ্যালয় টীকা উদ্ভাবনে আশার আলো নিয়ে এগিয়ে এসেছে, মানবদেহে তার পরীক্ষণ শুরু হলেও বলা হচ্ছে- আগামী সেপ্টেম্বরের আগে প্রতিরোধী টীকা হিসাবে এর সাফল্য নিশ্চিত হয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব নাও হতে পারে। তার মানে ২০২০ সালে কম করে হলেও বিশ্ব  এবং আমাদের দেশে এর তাণ্ডব চলমান থাকতে পারে ধরে নেওয়া যায়।

উপলব্ধি : বিশ্ব ব্যাপী বিভিন্ন সমাজে অনেক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে দেখা গেছে কিছু মানুষকে সেই রোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। ইংরেজিতে এটাকে বলে সোশ্যাল স্টিগমা (সামাজিক কালিমা)। এই প্রবণতা নিজেই একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো। এটা এখন করোনা ভাইরাসের চেয়েও বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এটা নতুন প্রবণতা নয়। অতীতে অনেক দেশে অনেক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় এই প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন গত ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাস মহামারীর সময় পশ্চিম আফ্রিকার মানুষ ব্যাপকভাবে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। ২০০৯ সালেও সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের সময়ও মেক্সিকান ও লাতিন বংশোদ্ভূত মানুষদের সাথেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মধ্যযুগেও প্লেগ মহামারীর সময় একই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে সারা ইউরোপ জুড়ে ইয়াহূদীদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, অনেককে মেরে ফেলা হয়েছিল। অনেক মহিলাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল ‘ডাইনি’ উপাধি দিয়ে। ঠিক করোনা ভাইরাসের বেলায়ও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অনেক জাতিবিদ্বেষমূলক, বর্ণবিদ্বেষমূলক ঘটনার খবর শোনা গেছে। বিশেষ করে চীনা বংশোদ্ভূত মানুষদের সঙ্গে লন্ডনে ‘আমরা তোমাদের চায়নিজ ভাইরাস’ চাই না বলে চীনা মানুষদের লাঞ্ছিত করা, মারধর করার খবরও প্রচারিত হয়েছে। আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকেও একই ধরনের নির্যাতনের খবর এসেছে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এ ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। এখন আমরা করোনা ভাইরাস নিয়ে কতিপয় ভুল প্রচারণা ও তার জবাব নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

(১) কাফন-দাফনে বাধা প্রদান : করোনা আক্রান্ত হয়ে অথবা করোনা উপসর্গ তথা সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়া নিয়ে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের কাফন-দাফন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বজনরা আতঙ্ক, বিড়ম্বনা ও অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন, কবর স্থানে দাফন করতে এমনকি মসজিদের লাশ বহনকারী খাটিয়া দিতেও অস্বীকার করা হচ্ছে। ঢাকার একটি সুপরিচিত কবরস্থানের বাইরে ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সেখানে যেন করোনা আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির লাশ দাফন করা না হয়। বগুড়ায় সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃতের লাশ দাফন নিয়ে এক শ্রেণির লোক বাধার সৃষ্টি করলে অবশেষে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এক শ্রেণির মিডিয়া টকশো করে করোনা আক্রান্ত লাশ পুড়িয়ে ফেলার ওপর জোর দিয়েছে। অথচ কোনোক্রমেই করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া একজন মুসলিমের মৃতদেহ দাহ করা যাবে না। এটা শরী‘আসম্মত নয়। গত দেড় হাজার বছরে এর কোনো নযীর নেই। এমনকি এর কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই। রীতি অনুসারে জানাযা ও দাফন করতে হবে; তবে অধিক জনসমাগম এড়িয়ে।[1]

জবাব : মৃতের প্রতি অমানবিক ও নির্দয় আচরণ কারও কাম্য না হলেও এই পরিস্থিতির পেছনে গুজব, অজ্ঞতা এবং দ্বীনের জ্ঞানের অভাব অনেকাংশে দায়ী। করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তির লাশ থেকে বাতাসে ভাইরাস ছড়ায়, কেউ কাছে গেলে বা ছুঁলেই তিনি আক্রান্ত হবেন, পাড়া বা মহল্লার কবরস্থানে কবর দিলেই সেই কবর থেকে আপনা-আপনি বাতাসে পুরো এলাকায় ভাইরাস ছড়াবে- এ জাতীয় ভুল ধারণা সমাজে প্রচারিত হয়ে গেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই নিশ্চিত হয়েছেন যে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাইরাস ছড়ায় না বা কোনো ক্ষতি করতে পারে না। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, লাশ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায়। গত ২৪ মার্চ ২০২০ Infection Prevention and Control for the Save Management of a Dead Body in the Context of COVID-19  শিরোনামের একটি নিবন্ধে বিশ্ব  স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত ব্যক্তিদের পুড়িয়ে ফেলা উচিত- এমন গুজব চালু রয়েছে। তবে তা সত্য নয়। যথাসম্ভব লাশ দ্রুত সমাধিক্ষেত্রে নিয়ে যেতে হবে। লাশ পরিবহনে বিশেষ গাড়ির কিংবা সমাধিক্ষেত্রে পাঠানোর সময় লাশের ওপর জীবাণুনাশক ছিটানোর প্রয়োজন নেই। রীতি মেনে লাশ সৎকারের আগে স্বজনরা শেষবারের জন্য প্রিয়জনের মুখ দেখতে পারেন। তবে লাশ স্পর্শ করা বা চুমু খাওয়া যাবে না। থাইল্যাণ্ডের ডিপার্টমেন্ট অব মেডিক্যাল সার্ভিসের ডিরেক্টর Dr. Somsak Akhasilp বলেছেন, হোস্ট (মানব শরীর) মারা যাওয়ার সাথে সাথে তার দেহের ভেতরে থাকা ভাইরাসেরও মৃত্যু ঘটেসে আর বংশ বৃদ্ধি করতে পারে নাভাইরাস সবসময় জীবিত প্রাণীর দেহের জীবিত কোষে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করে থাকেমৃত কোষের ভেতরে সেও মৃত ভাইরাস[2]  যারা লাশটি নাড়া-চাড়া করবেন, তাদের অবশ্যই হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে প্রয়োজনীয় পিপিই (গ্লাভস, মাস্ক, গগলস/শিল্ড, গাউন) পরে নিতে হবে। মারা যাওয়ার সাথে সাথেই শরীরের ছিদ্রগুলো অথবা কাটা জায়গা (মুখ, নাক, পায়ু পথ, কান, ইনজেকশন পয়েন্ট প্রভৃতি) তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ বা কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। সবধরনের বাড়তি জিনিস যেমন- মাস্ক, অক্সিজেন, ক্যাথেটার, আইভি অথবা গয়নাপত্র প্রভৃতি খুলে ফেলতে হবে। এগুলো খোলার পর যথাযথ গার্বেজ বা গয়নাগুলো সাথে সাথে সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এ সময়ে লাশকে বারবার নাড়া-চাড়া না করাই ভালো। লাশকে পরিষ্কার কাপড় বা পলিথিনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং দাফনের আয়োজন করতে হবে। আশার খবর হচ্ছে, যেখানে নিজের সন্তানরা ও পরিবারের লোকজনেরা কোথাও কোথাও মৃতকে ফেলে দিচ্ছে, সেখানে দেশের বিভিন্ন জায়গার কলেজ ও মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক এবং সন্দ্বীপের আজিজিয়া ইসলাম প্রচার সংস্থা, ঢাকার ‘পাথওয়ে’ নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ঢাকার আল-মারকাযুল ইসলামীসহ বেশকিছু এনজিও ও সেবাসংস্থা করোনায় মারা যাওয়া মানুষের কাফন-দাফনে এগিয়ে এসেছে। উপজেলা বা অঞ্চলভিত্তিক সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যদি মানবতাবোধে উজ্জীবিত হয়ে লাশের কাফন-দাফনে এগিয়ে আসে, তাহলে আতঙ্ক ও বিড়ম্বনার অবসান ঘটতে পারে ইনশাআল্লাহ।

(২) মসজিদ নয়, বিজ্ঞান বাঁচায় : নাস্তিকেরা বুক ফুলিয়ে অনলাইনে ও অফলাইনে প্রচার করে বেড়াচ্ছে-

‘যদি বেঁচে যাও এবারের মতো,

যদি কেটে যায় এ মৃত্যুর ভয়!

তবে মনে রেখো বাঁচিয়ে ছিলো বিজ্ঞান;

মন্দির-মসজিদ নয়’। (নাউযুবিল্লাহ)।

কবিতাটি পড়ে মনে হলো, বিজ্ঞান বোধ হয় কোনো নব দেবতা! আরোগ্যের ঝাণ্ডা দিয়ে স্পর্শ করে তুলছে! তবে সবাইকে পারছে না। মসজিদ-মন্দির সব অকাজের। তাই এবার বিজ্ঞানের পূজা শুরু করতে হবে।

জবাব : এই কবিতাতে তারা অপযুক্তি দিয়ে মসজিদ বাদ দিতে চাইছে। কারণ নাস্তিকতার বিশ্বাসের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো বিজ্ঞান পূজা। সুপ্রিয় পাঠক/পাঠিকা! বিজ্ঞান কোনো দেবতা নয়, বরং মানুষের বানানো জ্ঞানার্জনের একটি পদ্ধতি মাত্র। এর ভিত্তিতে বস্তুজগতের সীমিত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলে। সময়ের সাথে সেই ব্যাখ্যায় নানা বদল আসে। একসময় পুরনো ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে একদম আনকোরা ব্যাখ্যা বেছে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলো পারমাণবিক বোমা। আবিষ্কার করেই তা মজুদ করলো পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। বিজ্ঞানতো আবিষ্কার করেই খালাছ। কিন্তু এই পারমাণবিক বোমা কোথায় ব্যবহার করা যাবে আর কোথায় ব্যবহার করা যাবে না- এই বিষয়ে বিজ্ঞানের স্পষ্ট কোনো বাণী নেই। কিন্তু আমাদের সামনে এই বাণী হাযির করে একমাত্র দ্বীন ইসলাম। দ্বীন ইসলাম আমাদেরকে শেখায় মানুষ এবং প্রকৃতির বিনাশ সাধিত হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ যদি কোনো মানুষ হত্যার প্রতিশোধ ছাড়া কিংবা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগ ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। আবার কেউ যদি কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সব মানুষেরই জীবন রক্ষা করল’ (মায়েদাহ, ৩২)। তাই বিজ্ঞান আমাদেরকে যে উত্তর দেয় না, তা দ্বীন ইসলাম দেয়। আবার ধরেন, যদি কোনোভাবে প্রমাণ হয় যে, এই করোনা ভাইরাস চীনের ল্যাবে তৈরি (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আগ্রহী পাঠক-পাঠিকাগণকে গত মে/২০২০ সংখ্যায় এই পত্রিকার সাময়িক প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত করোনা আতঙ্ক : মানবতা তুমি কোথায়?’ নিবন্ধটি পাঠ করার জন্য অনুরোধ করছি) তখন এইসব বিজ্ঞানবাদীর কী অবস্থা হবে? যদি জানা যায়, বিজ্ঞান দিয়েই এই ভাইরাস তৈরি, তাহলে এখানে বিজ্ঞান রক্ষাকর্তার ভূমিকায় থাকবে নাকি হন্তারকের ভূমিকায় থাকবে? এর সাফ জবাব সুচিন্তিত পাঠক-পাঠিকা মাত্রই দিবেন। তাছাড়া ইসলামই আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে, অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে।

(৩) ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই : জনৈক গল্পকার ওয়ায়েয বলেছেন যে, ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই অর্থাৎ করোনা মহামারী/ভাইরাস কোনো সংক্রামক ব্যাধি নয়।

জবাব : ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেইএই ভুল প্রচারণার উৎস হলো জ্ঞান সঠিকভাবে প্রয়োগের অভাব কারণ একটা বা দুইটা হাদীছ থেকে কোনো ফিক্বহী সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। বরং সেই বিষয় সংক্রান্ত কুরআনের সব আয়াত, সব হাদীছ ও ছাহাবীগণের আমল জানতে হবে। তারপরেই কেবল সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত বহুল প্রচারিত ছহীহ হাদীছটি হলো- রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই’।[3]  এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেছেন, এখানে রাসূল (ছাঃ) যেটা বলেছেন, সেটা হলো- আল্লাহর  হুকুম ছাড়া সংক্রামক ব্যাধি ও অশুভ লক্ষণের নিজের কোনো শক্তি নেই অর্থাৎ সংক্রামক ব্যাধি নিজে নিজে ছড়াতে পারে না, আল্লাহর  হুকুম থাকলেই শুধু এটা ছড়ায়। এখন প্রশ্ন হলো- এই ব্যাখ্যায় ইসলামী চিন্তাবিদগণ কীভাবে আসলেন? এর উত্তর হচ্ছে- ইসলামী চিন্তাবিদগণ অন্যান্য অনেক হাদীছ ঘেটে দেখেছেন যে, এরকম অনেক ছহীহ হাদীছ এসেছে, যেখানে রাসূল (ছাঃ) সংক্রামক ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছেন। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো’।[4]  তিনি আরও বলেছেন, ‘কোনো এলাকায় তোমরা মহামারীর সংবাদ শ্রবণ করলে সেখানে প্রবেশ করবে না। আর যদি কোনো এলাকায় থাকাবস্থায় মহামারী শুরু হয়, তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না’।[5] সুধী পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ! রাসূল (ছাঃ)  যদি সংক্রামক ব্যাধি বিশ্বাস না করতেন, তাহলে উপরের হাদীছগুলো তিনি কখনোই বলতেন না।

(৪) করোনা ভাইরাস মুসলিমদের ওপর গযব নয় : জনৈক গল্পকার ওয়ায়েয বলেছেন, করোনা ভাইরাস আল্লাহর  গযব- বিশেষ করে কাফেরদের ওপর। এই ভাইরাসে শুধু কাফেররা (ও শী‘আরা) মারা যাবে। প্রকৃত মুমিন ও মুসলিমদের এতে কিছু হবে না। তিনি এমনও বলেছেন, আপনারা মসজিদে এসে নামায (ছালাত) আদায় করুন। করোনা ধরবে না। যদি করোনা ধরে তাহলে কোরআন মিথ্যা। নাউযুবিল্লাহ। এই ধরনের ভুল-ভাল কথা এরকম নাজুক পরিস্থিতে খুবই ভয়ঙ্কর। এই প্রচারণা যে কত বড় ভুল, তা কুরআন মাজীদ ও ছহীহ হাদীছ দিয়েই প্রমাণ করা যাবে। করোনা ভাইরাস সামষ্টিকভাবে আল্লাহর  গযব হলেও এই গযব কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য পরীক্ষা এমনকি কারও জন্য রহমত পর্যন্ত হতে পারে। কেননা, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষতি দ্বারা। যেসব লোক (এরূপ অবস্থায়) ধৈর্য ধারণ করে, তাদেরকে সুসংবাদ শোনাও’ (বাক্বারাহ, ১৫৫)। আবার এই করোনা ভাইরাসের ভয়ে যদি কেউ পাপের পথ ছেড়ে দিয়ে সত্যের পথে ফিরে আসে, তাহলে এই ভাইরাস তার জন্য রহমত হবে ইনশাআল্লাহ। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুণ স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তিনি চান তাদেরকে তাদের কতিপয় কর্ম (কর্মের শাস্তি) আস্বাদন করাতে, যাতে করে তারা ফিরে আসে’ (রূম, ৪১)। উদাহরণস্বরূপ, গত ১৬ এপ্রিল ২০২০ ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া অস্ট্রিয়ান রেসলিং তারকা উহইলহেম অট ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ঘোষণা দেনমুসলিম হওয়ার পর নাম পাল্টে রেখেছেন খালিদ উইলহেম অটতিনি বলেছেন, করোনা সঙ্কট আমাকে সঠিক বিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার সময় করে দিয়েছে[6]

আমীরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর শাসনামলে ১৮ হিজরীতে আমওয়াস অঞ্চলের ভয়াবহ মহামারীতে (ঐতিহাসিকদের মতে) ২৫ হাজার মুসলিম মৃত্যুবরণ করেন। তাতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ছাহাবী আবু উবায়দাহ আমের ইবনুল র্জারাহও মুত্যুবরণ করেন।[7]  এত বড় ছাহাবীকে যেখানে মহামারী ছেড়ে দেয়নি, সেখানে আমি-আপনি এমন কোন ঈমানদার হয়ে গেছি যে, আমাদেরকে মহামারী ছেড়ে দিবে?

(৫) করোনা ভাইরাসে মারা গেলেই শহীদ : কিছু কিছু মুসলিম বলেছেন, করোনা ভাইরাসে মারা গেলে শহীদ হয়ে যাব। এত সাবধান থাকার কি দরকার আছে?

জবাব : এটা অবশ্যই ভুল ধারণা। কেননা কেউ যদি সুস্থ থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা না করে নিজেকে নিজ হাতে মুত্যুর মুখে ঠেলে দেন, তাহলে শহীদ হওয়াতো দূরের কথা, সেটা আত্মহত্যা হয়ে যাবে। কেননা, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর  পথে (তোমাদের সম্পদ) ব্যয় করো, (অন্যথা) নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না। আর ভালো কাজ করো; যারা ভালো কাজ করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন’ (বাক্বারাহ, ১৯৫)।

(৬) মাথা মুণ্ডন করা, আযান দেওয়া ও কালোজিরা খাওয়া : করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে যেসব গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তার মধ্যে আরও দু’টি গুজব হলো- (ক) মাথা মুণ্ডন করলে নাকি করোনা ভাইরাস আক্রমণ করবে না। (খ) রং চা, আদা, লবণ ও কালো জিরা খেলে এবং মসজিদে আযান দিলে করোনা উক্ত ব্যক্তিকে এবং ঐ এলাকায় আক্রমণ করবে না। এরই ভিত্তিতে গত ২৬ মার্চ ২০২০ অনেক হুজুগে বাঙালি (রাত এগারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত) অনেক মসজিদে আযান দেয়, কোনো কোনো মসজিদে জামা‘আত সহকারে ছালাত আদায়েরও খবর পাওয়া গেছে।

জবাব : এগুলো সবই ভুল প্রচারণা ও গুজব বৈ কিছুই নয়। যাদের প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই, তারাই মূলত এই সমস্ত ভুল প্রচারণায় বিশ্বাস করে থাকে। কারণ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম মালেক (রহিঃ)-এর মতে, মহামারীকে কেন্দ্র করে কোনো ছালাত নেই। বর্তমান মহামারীর ক্ষেত্রেও বিধান একই। বরং শরী‘আত নির্দেশিত বিভিন্ন দু‘আ ও অন্যান্য ছালাতের মাধ্যমেই আশ্রয় চাইতে হবে। আল্লাহই অধিক জানেন।[8]

(৭) সুরাইয়া তারকার উদয় ও করোনার বিদায় : ‘যখন তারাটি (সুরাইয়া) উদিত হবে, তখন প্রতিটি শহরবাসী থেকে ব্যাধি উঠিয়ে নেওয়া হবে’।[9] এই যঈফ হাদীছকে কেন্দ্র করে জনৈক মুফতী সাহেব ফেসবুকে ফৎওয়া দিলেন যে, ১২ মে ২০২০ রামাযানে সুরাইয়া তারকাপুঞ্জ (কৃত্তিকা/চষবরধফবং) এর উদয় হলে পৃথিবী থেকে করোনা ভাইরাসের পরিসমাপ্তি হবে।

জবাব : এই হাদীছ সম্পর্কে সঊদী আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ড. শায়খ ছালেহ আস-সুহাইমী (রহিঃ) বলেছেন, চারটি কারণে এই হাদীছ প্রচার করা জায়েয নেই। যথা: (১) হাদীছটি যদি ছহীহ (কেননা, কিছু কিছু মুহাদ্দিছ উক্ত হাদীছটিকে ছহীহও বলেছেন -লেখক) হয়ে থাকে, তাহলে তা দ্বারা ফসলের রোগ-ব্যাধি উদ্দেশ্য। মানুষ যে সকল রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে, সেগুলো উদ্দেশ্য নয়। (২) যে সকল মানুষ ইতিমধ্যে আল্লাহর  দিকে ফিরে এসেছিল এবং যাদের ঈমান মযবূত হয়েছিল, এখন এই হাদীছের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে তাদের ঈমান দুর্বল হয়ে যেতে পারে। (৩) ভূ-পৃষ্ঠের কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার উপর আকাশের নক্ষত্রের কোনো প্রভাব আছে- এমন বিশ্বাস পোষণ করা হলো ভ্রান্ত বিশ্বাস। বরং তা আল্লাহর  সাথে শিরক। (৪) যদি সুরাইয়া তারকা উদিত হওয়ার পরেও বালা-মুছীবত না কাটে, তাহলে লোকেরা আমাদের দ্বীন ইসলামকে হাসি-ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করবে। অথচ এটা আমাদের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ মহামারী উঠে যাওয়া যে উক্ত হাদীছের অর্থ তা কিন্তু সাব্যস্ত নয়।[10]  সুধী পাঠক/পাঠিকা! ১৩ মে ২০২০ দুপুর ১২ টা পর্যন্ত খোদ বাংলাদেশেই নতুন করে ১১ জনের মৃত্যু ও ৯৬৯ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে।[11]  তাছাড়া এখনও প্রতিদিনইতো কোনো না কোনো মানুষ নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করছেন, যা মিডিয়ার মাধ্যমে আমি/আপনি সকলেই ওয়াকিবহাল আছি, তো এখন মুফতী সাহেব তার ভবিষ্যৎ বাণীর কী জবাব দেবেন?

(৮) গো-মূত্র পান : করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসাবে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা বারংবার গোমূত্র খাওয়ার কথা বলেছেন। তারা এমনকি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লীতে বিশাল গোমূত্র পার্টিরও আয়োজন করেছেন।

জবাব : গো-মূত্র পান করে ফলাফল কিছুই হয়নি। বরং ভারতে আগের চেয়ে করোনার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যারা গোমূত্র খেয়েছে, তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া গোমূত্র খেয়ে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়ার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই এবং গোমূত্রে কোনো পুষ্টি উপাদানও নেই। বরং গোমূত্র খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।[12]

পরিশেষে বলবো, করোনা ভাইরাসের দাপট এখনো অনেক দেশে বেশ প্রবল। তবে এটি ঠিক, একদিন এই মহামারীর অবসান ঘটবে ইনশাআল্লাহ। তবে তা ঘটবে বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বজনহারানোর বুকভরা কান্না দিয়ে। সেই সাথে এটি বিশ্ব  অর্থনীতিকে যেভাবে তছনছ করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও দিয়ে যেতে পারে, তার গতিপ্রকৃতি কী হবে? তা কেউ আন্দাজ করতে পারছে না। তবে এর পরিণতি যে ভয়াবহ হবে সে সম্পর্কে সবাই একমত। এর পরিণতিতে আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি আমাদের চির চেনা বিশ্ব  অর্থনীতিকে। আমাদের হয়তো ভাবতে হবে নতুন ধারার কোনো বিশ্ব  অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা। এখন একটি দেশকে ভাবতে হবে, তার দেশ অন্য দেশের ওপর কতটুকু নির্ভরশীল থাকবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে হিফাযত করুন। আমীন!

 

[1].  ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, কাফন-দাফনে বিড়ম্বনা, উপসম্পাদকীয়, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২০ এপ্রিল ২০২০।

[2]. সেরিন ফেরদৌস, প্রবাসী সাংবাদিক ও কানাডায় কর্মরত নার্স, ঢাকা: দেশ রূপান্তর, ৭ এপ্রিল ২০২০।

[3]. ছহীহ মুসলিম (ঢাকা: হাদীস একাডেমী), হা/৫৬৮২।

[4]. ছহীহ বুখারী (ঢাকা: তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হা/৫৭০৭।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭২৯।

[6]. দৈনিক নয়া দিগন্ত (অনলাইন সংস্করণ), ২২ এপ্রিল ২০২০।

[7]. শাইখ মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী, কিয়ামতের ছোট-বড় নিদর্শনসমূহ (ঢাকা: দারুল ইরফান, ২য় প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১৩), পৃ. ৩৪।

[8]. প্রফেসর ড. খালিদ বিন আলী আল-মুশাইকীহ (শরী‘আহ বিভাগ: আল-কাসীম বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব), মহামারী করোনা ও প্রাসঙ্গিক ফিক্বহী মাসায়েল (অনুবাদ: শুব্বান রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা, ৯ মে, ২০২০), পৃ. ৩৮-৩৯।

[9].  ইবনু আদী, আল-কামেল, ৮/২৪৫; আলবানী, সিলসিলাহ যঈফাহ, হা/৩৯৭।

[10]. ইবনু আদী, আল-কামেল, ৮/২৪৫; আলবানী, সিলসিলাহ যঈফাহ, হা/৩৯৭।

[11]. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ মে ২০২০, (অনলাইন সংস্করণ)।

[12].  shodalap.org/smraihan/42808.