সম্পাদকীয়

َلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

করোনা ভাইরাস’: সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে মানুষ বড় অসহায়

প্রাচীন গ্রীক শব্দ করোন থেকে সপ্তদশ দশকে লাতিনে আসে করেনা শব্দটি। করোনা শব্দের শাব্দিক অর্থ পুষ্পমাল্য বা পুষ্পমুকুট। সূর্যের চারিদিকে উজ্জ্বল যে আলোর বলয় সাধারণভাবে পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময়েই কেবল দেখা যায়, তাকে জ্যোতির্বিদ্যায় করোনা বলা হয়। আবার ড্যাফোডিলের পাপড়ি বেষ্টনের মাঝে যে অংশটি ট্রাম্পেটের মতো বেরিয়ে থাকে সেটাকেও উদ্ভিদ বিজ্ঞানে করোনা বলে। করোনা ভাইরাসের জন্য প্রতীকী যে ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও দেখতে এই পুষ্পমাল্যের মতোই।

বর্তমান সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হচ্ছে এই করোনা। চীনের উহান নগরী থেকে শুরু হয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে এখন বিশ্বের সুপার পাওয়ার আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এই করোনা। বাংলাদেশেও এই ভাইরাস আক্রমণ করেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৫,৯৮২ জন এবং অক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১১,৬২,৩৭৭ জন।

সঊদী আরব ও মিশর সহ বহু দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৬ মার্চ বাংলাদেশেও সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কুয়েত ও কাতার সহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় জামা‘আতে ছালাত বন্ধ রয়েছে। লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকা কা‘বা চত্বর অনেকটাই বিরান পড়ে আছে। বায়তুল আক্বছা বন্ধ। আমেরিকাতে যরূরী অবস্থা। ফ্রান্সে রেস্তোরাঁ, ক্যাফেসহ জনসমাগমের জায়গাগুলো বন্ধ। স্পেনে যরূরী প্রয়োজন ছাড়া মানুষজনের ঘর থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ। পৃথিবীর বহু দেশের ফ্লাইট বন্ধ। কার্যত বর্তমানে সারা পৃথিবী অচল হয়ে পড়েছে। মুখ থুবড়ে পড়ছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো।

মানব সভ্যতা তার উন্নতির এত শীর্ষস্থানে পৌঁছার পরও, প্রযুক্তির এত উন্নতি সাধনের পরও অদৃশ্য এক ভাইরাসের সামনে যেন অচল ও অকেজো হয়ে পড়েছে। আজ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী রাষ্ট্রগুলো, তেল ও গ্যাসের সম্পদ নিয়ে যুদ্ধের ডামাডোল বাজানো দাম্ভিকরা, সিরিয়া ও আফগানের মাটিতে হাজারো নিরপরাধের খুনীরা, অর্থনীতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যাওয়া দাম্ভিকরা আজ চরম অসহায় হয়ে পড়েছে ছোট্ট এক ভাইরাসের সামনে। এভাবেই আল্লাহ যুগে যুগে মানুষের অসহায়তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বিশাল হস্তিবাহিনীকে আল্লাহ তা‘আলা সামান্য আবাবিল পাখি ও ছোট্ট ছোট্ট পাথর খণ্ড দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। মহা অহংকারী ও নিজেকে রব্ব দাবীকারী ফেরাঊনকে সামান্য পানির সামনে অসহায় করে ছেড়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তাকে মহান আল্লাহ দেখিয়েছিলেন যে, সে কত অসহায় ও কত দুর্বল।

এই জাতীয় মহামারী বিষয়ে রাসূল (ছাঃ) যা বলেছেন, তার সারর্মম হচ্ছে, ইসলামে কোনো ছোঁয়াচে রোগ নেই (বুখারী, হা/৫৭১৭)। কেননা প্রথম যে ব্যক্তিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত করেছিল তার নিকটে এই ভাইরাস কোথা থেকে এসেছিল? (প্রাগুক্ত, হা/৫৭১৭)। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ যেভাবে আক্রান্ত করেছেন, চাইলে কারও সংস্পর্শ ছাড়াই ঐভাবে সবাইকে আক্রান্ত করতে পারেন। ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ নেই’ এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, ছোঁয়াচে রোগের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই, যা দিয়ে সে যার স্পর্শেই আসবে তাকেই আক্রান্ত করবে। বরং সেও মহান আল্লাহর ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণাধীন। মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে অন্য রোগীর সংস্পর্শ দিয়ে রোগাক্রান্ত করবেন। আর যাকে ইচ্ছা তাকে কোনো প্রকার সংস্পর্শ ছাড়াই আক্রান্ত করবেন। যেমনটা প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। তবে যেহেতু সংস্পর্শে আসা রোগ বিস্তারের কারণগুলোর একটি, সেহেতু সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন আল্লাহ ভরসা বা তাক্বদীরের বিপরীত নয়। বরং সতর্কতা অবলম্বনই বাঞ্ছনীয়। ইসলাম যেমন আল্লাহ ভরসা ও তাক্বদীরে বিশ্বাস করতে বলে, ঠিক তেমনি সতর্কতা অবলম্বনের প্রতিও গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাইতো রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা ছোঁয়াচে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে ঐভাবে পালিয়ে যাও, যেভাবে তোমরা সিংহকে দেখে পালিয়ে যাও’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭২২)। তিনি আরও বলেন, ‘কোনো শহরে অবস্থান করা অবস্থায় যদি সেই শহরে মড়ক লাগে, তাহলে তোমরা সেই শহর ছেড়ে পালিয়ে যেয়ো না। আর যদি তোমরা মড়ক আক্রান্ত শহরে না থাকো, তাহলে সেই শহরের উদ্দেশ্যে সফর করিও না’ (বুখারী, হা/৫৭২৮)।

করোনা ভাইরাস বিষয়ে বিশ্ব সংস্থা যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে তার সবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পৃক্ত। আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ইসলামের হুকুম-আহকাম আরও ব্যাপক ও আরও সুন্দর। দিনে পাঁচবার ওযূ থেকে শুরু করে, পেশাব-পায়খানার পর পানি গ্রহণ, স্ত্রী সহবাসের পর গোসল, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের জন্য মিসওয়াক, রাত্রে পাত্র ঢেকে রাখা, ওযূ করার পূর্বে হাতকে আলাদাভাবে ধুয়ে নেওয়া ইত্যাদি বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ইসলাম ১৪০০ বছর পূর্বেই দিয়ে রেখেছে। তাছাড়া ইসলাম কেবল হালাল খাবারই খেতে বলেছে এবং যাবতীয় হারাম খাবার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম অনুমোদিত সব খাবারই পবিত্র, রুচিকর ও স্বাস্থ্যকর। ইসলামের এসব নির্দেশনা মেনে চললে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন সম্ভব। অন্যদিকে চীনসহ অন্যান্য দেশের অমুসলিমরা সাপ, ব্যাঙ, পোকা-মাকড়সহ এমন কিছু খাবার খায়, যা ইসলামে পরিষ্কার হারাম। আর আল্লাহর হারামকৃত খাদ্য-খাবারে বিষাক্ত জীবাণু থাকে এবং তা মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

পরিশেষে বলতে চাই, করোনা নিয়ে মুসলিমদের ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কিছুই নেই। তাদের উচিত ইসলামের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত নিয়মনীতী ও হালাল-হারামের সীমারেখা যথাসম্ভব অনুসরণের মাধ্যমে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস রেখে আল্লাহ্র উপর ভরসা করে ছবর করা। সাথে সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনা মেনে সতর্কতা অবলম্বন করা। যদি তারা বেঁচে যায় আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তাহলে তারা শহীদের মর্যাদা পাবে ইনশাআল্লাহ।