কাওছারীর বিদ‘আতী চিন্তাধারা

-আহমাদুল্লাহ
সৈয়দপুর, নীলফামারী।

ভূমিকা : মুহাম্মাদ যাহেদ কাওছারী (মৃ. ১৩৭১ হি.) বিশেষভাবে হানাফী দেওবন্দীদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এজন্য যে, তিনি নিকট অতীতে ইমাম আবু হানীফা (রহি.) এবং হানাফী মতবাদের পক্ষে সাধ্যমতো প্রতিরক্ষামূলক লড়াই করেছেন। তিনি আক্বীদায় মাতুরীদী ও জাহমিয়া ছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইমাম ইবনে খুযায়মার ‘কিতাবুত তাওহীদ’ গ্রন্থটিকে ‘কিতাবুশ শিরক’ আখ্যা দিয়েছেন।[1] 

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহি.)-এর ছেলে ইমাম আব্দুল্লাহ-এর ‘কিতাবুস সুন্নাহ’ গ্রন্থটিকে ‘কিতাবুয যাইগ’ (গোমরাহের কিতাব) এবং ইমাম ওছমান ইবনে সাঈদ আদ-দারেমীর ‘আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া’ (জাহমিয়াদের খন্ডন) ও ‘আর-রদ্দু আলা বিশর আল-মুরাইসী’ (বিশর মুরাইসীর খন্ডন) গ্রন্থদ্বয়কে ‘কিতাবুল কুফরি ওয়াল ওয়াছানিইয়া’ (কুফর ও মূর্তিপূজার গ্রন্থ) হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।[2]

চিন্তা করুন! ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহি.) ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ (রহি.) এবং ইমাম ওছমান ইবনে সাঈদ আদ-দারেমী (রহি.) যাদের ইলম, মর্যাদা, আমানত, সততা, হিফয-যবত্ব (আয়ত্তশক্তি) এবং তাওছীক্ব-তা‘দীলের উপর সকল মুহাদ্দিছের ঐকমত্য রয়েছে, যদি তারাই শিরক, মূর্তিপূজা, কুফর ও গোমরাহীর উজ্জীবিতকারী হয়ে থাকেন (নাঊযুবিল্লাহ), তাহলে বলুন, তাওহীদ ও সুন্নাতের আহ্বায়ক কারা?

অনুরূপভাবে শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া (রহি.) ও তার সুযোগ্য ছাত্র ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহি.) সম্পর্কে তিনি ‘মাক্বালাত’ ‘তাবদীদুয যালাম’ ও ‘আল-ইশফাক’ গ্রন্থগুলোতে যা কিছু বলেছেন, তার উপাখ্যান অনেক দীর্ঘ। এমনকি তিনি তাদেরকে বিদ‘আতী, কাযযাব, কাফের, জাহেল, নির্বোধ, নিজে ভ্রষ্ট, অন্যকে ভ্রষ্টকারী, খারেজী, যিনদীক্ব, অল্প দ্বীন পালনকারী ও কম বুদ্ধিসম্পন্ন পর্যন্তও বলেছেন। ইমাম আবু হানীফা (রা)) আর তার ছাত্রদের প্রতিরক্ষায় ইমাম আবু আওয়ানাহ ওয়াযযাহ ইবনে আব্দুল্লাহ, ইমাম আবু ইসহাক্ব আল-ফাযারী ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ, ইমাম আবু ইসহাক্ব ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ আল-মুযাক্কী, ইমাম আহমাদ ইবনে সালমান আন-নিজাদ, ইমাম যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া আস-সাজী, হাফেয ছালেহ ইবনে মুহাম্মাদ আল-জাযারাহ, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল গ্রন্থকার ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আবু মুহাম্মাদ আর-রাযী, ইমাম আবু নু‘আইম আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইসপাহানী, ইমাম আলী ইবনে ওমর আবুল হাসান আদ-দারাকুত্বনী, ইমাম আমর ইবনে আলী আবু হাফছ আল-ফাল্লাস, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা তিরমিযী, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান, আবু হাতেম আল-বুসতী, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার বুনদার, আল-মুসতাদরাক প্রণেতা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ হাকেম এবং ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আমর আল-উকায়লী (রহি.)-দের ন্যায় হাদীছের হাফেয, ইমামদেরকে স্বীয় সমালোচনার নিশানা বানিয়েছেন।

কাওছারীর আক্বীদাসমূহ :

এবার আসুন, তার কিছু আকীদা সম্পর্কে জানা যাক-

(১) কবর পাকাকরণ : তিনি বলেন, ‘যদি কবরের উপর গম্বুজ বানানো নিকৃষ্ট বিদ‘আত হতো, তাহলে ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত উম্মত এর উপর আমল করত না’।[3]   অর্থাৎ (কাওছারীর ভাষ্যমতে) কবরের উপর গম্বুজ বানানো ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত। (নাঊযুবিল্লাহ)।

(২) সাহায্য প্রার্থনা করা ও ফরিয়াদ করা : কাওছারী মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া ও ফরিয়াদ করার প্রবক্তা ছিলেন।[4]   

(৩) রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে আহ্বান করা : কাওছারী রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে ‘হে মুহাম্মাদ! হে আল্লাহর রাসূল! বলে আহ্বান করার ফৎওয়া দিয়েছেন। একটি হাদীছ উল্লেখ করার পর কাওছারী লিখেছেন, ‘এ হাদীছে নবী (ছা.)-এর পবিত্র সত্তা ও তার সত্তার অসীলা গ্রহণ করা এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে আহ্বান করার বৈধতা প্রমাণিত হয়’।[5]   

(৪) মীলাদে মুছত্বফা (ছা.) : কাওছারীর মাক্বালাতে (প্রবন্ধসমগ্র) নবী (ছা.)-এর মীলাদের উপর পুর্নাঙ্গ আলোচনা রয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘ছহীহ এটাই যে, তার জন্ম ৯ই রবীউল আউয়াল মাসে হয়েছে’। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, রবীউল আউয়াল হলো বরকতময় মাস। যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মগ্রহণের সৌভাগ্যময় দিন রয়েছে। আর মুসলিমরা এই মাসে তার জন্মের ব্যাপারে (অন্যান্য মাসের চাইতে অধিক) গুরুত্বারোপ করেন। বরং ইসলামী দেশগুলোতে এই আমলটি (মীলাদুন নবী) ধারাবাহিকভাবে পালিত হয়। তারা রবীউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখের রাতে জন্মগ্রহণের নিমিত্তে আলোচনার জন্য মাহফিলের আয়োজন করেন। কেননা তার জন্ম এই তারিখের পরে হয়নি। ইসলামী দেশগুলোতে চলমান রীতির অনুসরণে ১২ই রবীউল আউয়ালে মীলাদের আয়োজন করা হয়ে থাকে। কেননা মুহাম্মাদ (ছা.)-এর জন্ম এই তারিখের পরে হয়নি।

অর্থাৎ তিনি এগুলোর বিনিময়ে ১২ই রবীউল আউয়ালকেই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন এবং এ দিনে মুসলিমদের মীলাদুন নবী পালনকে সমর্থন করেছেন।

উপসংহার : যাহেদ কাওছারীর ভক্তরা এ দেশে কাজ করে যাচ্ছেন। কাওছারীর নামানুসারে পত্রিকাও প্রকাশ করা হয়। আল্লামা মু‘আল্লিমী ‘আন-তানকীল’ নামক গ্রন্থে যাহেদ কাওছারীর ভুলগুলোকে চমৎকারভাবে খন্ডন করেছেন, যা অবশ্য পাঠ্য। আল্লাহ আমাদেরকে এ সকল গোমরাহ ব্যক্তিদের লেখনী ও শিক্ষা হতে হেফাযত করুন। আমীন।

[1].  মাক্বালাতুল কাওছারী (প্রকাশকাল: ১৯৯৪), পৃ. ৪০৯; আত-তানীব, পৃ. ২৯।|

[2]. মাক্বালাতে কাওছারী, পৃ. ৩০০।

[3]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩৭।

[4]. প্রাগুক্ত।

[5]. প্রাগুক্ত।