কিয়ামতের দিন মুমিনের জন্য নিরাপদ আর কাফের-মুনাফেক্বদের জন্য আতঙ্ক


[১৩ জুমাদাল উলা, ১৪৪৩ হি. মোতাবেক ১৭ ডিসেম্বর, ২০২১মদীনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ছালেহ আল-বুদাইর (হাফিযাহুল্লাহ) উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ‘আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ’-এর সম্মানিত গবেষণা সহকারী মো. তরিকুল ইসলাম। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]


প্রথম খুৎবা

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি মানুষকে এমন এক দিনে একত্রিত করবেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। যিনি বান্দার গোপন ও প্রকাশ্য সকল কিছুই জানেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মা‘বূদ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। এই সাক্ষ্য কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষাকারী। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, যার সুন্নাতের যে ব্যক্তি অনুসরণ করবে, সে এমন কিছুকে আঁকড়ে ধরবে যেটা তার জন্য যথেষ্ট। ছালাত ও সালাম নাযিল হোক তাঁর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও ছাহাবীদের উপর, যে ছালাত সকল দুশ্চিন্তা দূর করে দেয় এবং সকল পাপ মোচন করে দেয়।

অতঃপর, হে মুসলিমগণ! আপনারা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করুন। কেননা মুত্তাক্বীগণই হলো সৌভাগ্যবান। আপনারা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করুন আর জেনে রাখুন যে, আপনাদের সকলকে তাঁর কাছেই একত্রিত করা হবে। হে মুসলিমগণ! নিশ্চয় দুনিয়া বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। আজকের দিন দ্রুত চলে যাচ্ছে আর আগামী দিন দ্রুত এগিয়ে আসছে। অচিরেই মানুষজন কষ্ট ও অস্থায়ী জগৎ থেকে প্রতিদান ও স্থায়ী জগতের দিকে স্থানান্তরিত হবে। তাই আপনারা ভালো আমল নিয়ে সেই জগতে স্থানান্তরিত হোন। পুনরায় জীবিত হওয়ার এবং হিসাবের দিনকে স্মরণ করুন। স্মরণ করুন কিয়ামতের ভয়াবহতা, সেই কঠিন মুহূর্তকে। দুনিয়া যেন আপনাদেরকে সেই প্রতিশ্রুত দিনকে ভুলিয়ে না রাখে। কিয়ামতের ভূমিকম্পনের কথা স্মরণ করুন। যেদিন পৃথিবী প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে। আর তা ফেটে বিদীর্ণ হবে এবং অস্থির হয়ে পড়বে। মানুষ নত হয়ে পড়বে। সেদিন স্তন্যদানকারিণী মা তার সন্তানের কথা ভুলে যাবে, গর্ভবতীর গর্ভ খসে পড়বে। মানুষ দিশেহারা ও ভীত হয়ে পিছন দিকে পলায়ন করবে। সেদিন আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো রক্ষাকারী থাকবে না। স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়া শেষ হওয়ার অনুমতি দিবেন এবং শিঙাওয়ালাকে তার শিঙায় ফুঁক দিতে আদেশ দিবেন, যেই শিঙার ফলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে মারা যাবে, তখন তিনি ভয়ানক শিঙায় ফুঁক দিবেন। এর ভয়াবহতায় অন্তরসমূহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং ভয়ে প্রচণ্ডভাবে ভীত হয়ে যাবে। যখন মানুষজন তাদের হাটে-বাজারে থেকে তাদের অভ্যাস অনুযায়ী তারা একে অপরের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করবে, ঠিক এমন সময় শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে। ফলে তারা কোনো অছিয়তও করতে পারবে না এবং তারা তাদের পরিবারের কাছে ফিরেও যেতে পারবে না। বরং এই প্রচণ্ড শব্দে তারা সেখানেই অজ্ঞান হয়ে মারা যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন, তারা ছাড়া আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে’ (আয-যুমার, ৩৯/৬৮)। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে (এ অবস্থায়) যে, দু’ব্যক্তি (বেচাকেনার) জন্য পরস্পরের সামনে কাপড় ছড়িয়ে রাখবে। কিন্তু তারা বেচাকেনার সময় পাবে না। এমনকি তা ভাঁজ করারও সময় পাবে না। আর কিয়ামত (এমন অবস্থায়) অবশ্যই সংঘটিত হবে যে, কোনো ব্যক্তি তার উষ্ট্রীর দুধ দোহন করে রওয়ানা হবে কিন্তু তা পান করার সুযোগ পাবে না। কিয়ামত (এমন অবস্থায়) সংঘটিত হবে যে, কোনো ব্যক্তি (তার পশুকে পানি পান করানোর জন্য) চৌবাচ্চা তৈরি করবে কিন্তু সে এ থেকে পানি পান করানোর সময়ও পাবে না। কিয়ামত (এমন অবস্থায়) ক্বায়েম হবে যে, কোনো ব্যক্তি তার মুখ পর্যন্ত খাবার উঠাবে, কিন্তু সে তা খাওয়ার সময় পাবে না’।[1]

মেরুদণ্ডের নিম্নভাগের একটি হাড় ছাড়া মানুষের সকল কিছুই পচে যাবে। এই একটি হাড় থেকেই তাকে আবার পুনরায় গঠন করা হবে। সেদিন আসমান বিদীর্ণ হবে, তারকাগুলো ঝরে পড়বে, সেগুলোর আলো হারিয়ে যাবে, সূর্যকে গুটিয়ে নিয়ে আলোহীন করা হবে, পাহাড়গুলোকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করা হবে, সেগুলোর উঁচুনিচু সব সমান হয়ে যাবে, সাগরগুলোকে প্রবল বেগে প্রবাহিত করা হবে, সেগুলোর পানি হারিয়ে যাবে এবং সেখানে আগুন জ্বলে উঠবে। সেদিন আসমানসমূহ আল্লাহ তাআলা ভাঁজ করে তার ডান হাতে নিবেন। তারপর তিনি বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়? তারপর তিনি যমীনকে তার বাম হাতে ভাঁজ করে ধরবেন। তারপর বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়? সেদিন চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক আল্লাহ তাআলাই একমাত্র অবশিষ্ট থাকবেন, যিনি প্রথমে ছিলেন, তিনিই সকলের শেষেও থাকবেন। তখন তিনি বলবেন, আজকে রাজত্ব কার? তারপর তিনি নিজেই উত্তর দিয়ে বললেন, এক ও প্রতাপশালী আল্লাহর (গাফের, ৪০/১৬)। দুই শিঙার মাঝের ব্যবধান আল্লাহ যতদিন চাইবেন, ততদিন হবে। যখন আল্লাহর নির্ধারিত সময় শেষ হবে, তখন আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে হালকা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তাতেই কবরে সকল সৃষ্টির দেহ গজিয়ে উঠবে, যেমনভাবে পানির ফলে মাটিতে বীজ অঙ্কুরিত হয়। যখন দেহের গঠন পূর্ণ হবে, তখন আল্লাহ তাআলা শিঙাওয়ালাকে দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁক দেওয়ার আদেশ দিবেন, যাতে সকলেই তাদের কবর থেকে বের হয়। মৃতরা জীর্ণ হাড় থাকার পরে তারা আবার জীবিত হয়ে দাঁড়াবে। কিয়ামতের ভীষণ ভয়াবহতা দেখে মানুষজন সেদিন বলবে, পালাব কোথায়?

সেদিন প্রথম যিনি কবর ফেটে বের হবেন, তিনি হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। হাশরের জন্য মানুষ আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিবে। সেদিন এই আসমান ও যমীন বদলে দিয়ে আরেক আসমান ও যমীন হবে। আল্লাহ তাআলা পূর্বের ও পরের সকল আদম সন্তানকে সেদিন কিয়ামতের মাঠে একত্রিত করবেন। সেদিন কেউ বাদ পড়বে না। আল্লাহ বলেন, ‘সেটি এমন এক দিন, যেদিন সমস্ত মানুষকে একত্র করা হবে; আর সেটি এমন এক দিন, যেদিন সবাইকে উপস্থিত করা হবে’ (হূদ, ১১/১০৩)। মানুষজন তাদের কবর থেকে বের হবে খালি পায়ে, নগ্ন দেহে এবং খাতনাবিহীন অবস্থায়। ‘সেদিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা, যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে’ (আবাসা, ৮০/৩৭)

সেদিন নবী, ছিদ্দীক্ব ও সৎকর্মশীলগণের কাপড় পরিধান করানো হবে। কিয়ামতের দিন প্রথম যাকে কাপড় পরানো হবে, তিনি হলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)। সৎ-অসৎ সকলেই সেদিন হাযির হবে এবং সকল ফেরেশতাগণ হাযির হবেন। এমনকি মানুষ, জিন, পাখি, বন্যপশু সবকিছুকেই একত্রিত করা হবে। কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে যুবক বৃদ্ধে পরিণত হবে। সেদিন হলো হিসাব ও প্রতিদানের দিন। সেদিন সূর্য এক মাইল অথবা দুই মাইল নিকটে চলে আসবে। মানুষজন তাদের আমল অনুপাতে ঘামের মধ্যে ডুবতে থাকবে। কারো ঘাম হবে তার টাখনু পর্যন্ত, কারো হবে হাঁটু পর্যন্ত, কারো হবে কোমর পর্যন্ত আবার কেউ সেই ঘামের মধ্যে ডুবতে থাকবে। সেদিন কয়েক প্রকার মানুষ রহমানের আরশের ছায়ার নিচে থাকবে। তারা প্রচণ্ড গরম ও সূর্যের তাপ থেকে নিরাপদে থাকবে। তারা হলেন— ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. সে যুবক, যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে, ৩. সে ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, ৪. সে দু’ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর ওয়াস্তে, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য, ৫. সে ব্যক্তি, যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’, ৬. সে ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানে না, ৭. সে ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে, ফলে তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে।[2]

সেদিন ভীষণ গরম হবে। ফলে পিপাসা ও মহাসংকট দেখা দিবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য একটি হাওয দিবেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমার ‘হাওয’-এর ব্যবধান এক মাসের রাস্তা, তার সকল কোণ এক সমান, তার পানি রূপার চেয়ে শুভ্র, তার ঘ্রাণ মিশক-এর চেয়ে সুগন্ধিযুক্ত এবং তার পাত্রের পরিমাণ আসমানের তারকার ন্যায়। যে লোক তা থেকে পান করবে, সে তারপরে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত এই হাওযের কাছে আসবে। এক ব্যক্তিকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব! সে আমার উম্মত। তখন বলা হবে, আপনি জানেন না যে, আপনার পরে এরা কত নতুন আমল তৈরি করেছে’।[3] আর প্রত্যেক নবীর জন্যই হাওয থাকবে। তার উম্মতের সৎ ব্যক্তিগণ সেখান থেকে পানি পান করবে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে হাওয হবে। আর এ নিয়ে তারা পরস্পর গর্ববোধ করবেন যে, কার হাওযে কত বেশি লোক অবতরণ করবে। আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি যে, আমার হাওযেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোক আসবে’।[4] তারপর মানুষজন দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকবেন। আল্লাহ তাআলা তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না। তখন তাদের এমন দুশ্চিন্তা ও সংকট দেখা দিবে, যা তারা বহন করতে সক্ষম নয়। তখন তারা বলবে, তোমাদের অবস্থা তো তোমরা দেখছই। তোমরা কি এমন একজনের কাছে যাবে না, যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের কাছে সুপারিশ করবেন? তখন ‍কিছু মানুষ বলবে যে, তোমরা আদমের কাছে যাও। তখন তারা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসবে। তারপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসবে। সকলেই বলবে যে, আমি এর যোগ্য নই। তারপর তারা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসবে। তখন তিনিও বলবেন যে, আমি এর যোগ্য নই। বরং তোমরা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে যাও। তখন তারা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসবে, যাতে সৃষ্টির বিচার শুরু করা হয়। মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান এবং সবচেয়ে বড় সুপারিশকারী। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলবেন, তারা সকলে আমার কাছে আসবে। তখন আমি বলব, আমিই এর উপযুক্ত। আমি আমার রবের কাছে অনুমতি চাইব। তিনি আমাকে অনুমতি দিবেন। আর তিনি আমার কাছে এমন কিছু প্রশংসার বাণী ইলহাম করবেন, যেগুলো দিয়ে আমি তার প্রশংসা করব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আপনার মাথা তুলুন, আপনি বলুন, আপনার কথা শোনা হবে। আপনি চান, আপনাকে দেওয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে। তখন আমি বলব, হে রব! আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের কোনো হিসাব হবে না, তাদেরকে জান্নাতের ডান দিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাও। তারা অন্য মানুষদের সাথে অন্য দরজা দিয়েও যেতে পারবে। এটিই হবে প্রথম ও সর্ববৃহৎ সুপারিশ। তারপর আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির বিচার করার জন্য আসবেন। পুরো যমীন তাঁর নূরে আলোকিত হয়ে যাবে। তারপর আমলসমূহকে পেশ করা হবে এবং আমলনামা দেওয়া হবে। তাতে ছোট বড় সকল কিছুই লিখা থাকবে। ছোট বড় কোনো পাপই বাদ দেওয়া হবে না। বরং সকল কিছুই সংরক্ষণ করা থাকবে। হিসাবের ভয়ে সকল উম্মতকে নতজানু অবস্থায় দেখতে পাবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে নিকটে ডাকবেন। তারপর তার পাপগুলো স্বীকার করাবেন। যখন সেই ব্যক্তি দেখবে যে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি দুনিয়াতে এগুলো গোপন রেখেছিলাম। আর আজকেও তোমাকে মাফ করে দিলাম। তারপর তাকে তার ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। ফলে সে সৌভাগ্যবান হবে এবং অত্যন্ত আনন্দিত হবে। যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হবে, তাকেই সে বলবে, নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো। আমি দৃঢ়বিশ্বাস করতাম যে, আমাকে আমার হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে। কাজেই সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে (আল হাক্কাহ, ৬৯/১৯-২২)

আমি যা বললাম, তা আপনারা শুনলেন। আমি আমার ও আপনাদের জন্য সকল পাপ থেকে আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করছি। আপনারাও তারই কাছে ইস্তেগফার করুন। কারণ নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, দয়াবান।

দ্বিতীয় খুৎবা

সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় বিচারের দিন সুনির্ধারিত’ (সূরা নাবা, ৭৮/১৭)। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মা‘বূদ নেই, তার কোনো শরীক নেই । আর আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল। ছালাত ও সালাম নাযিল হোক তার ওপর, তার পরিবার-পরিজন ও সকল ছাহাবীর ওপর। অতঃপর, হে মুসলিমগণ! আপনারা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করুন, তাঁরই আনুগত্য করুন এবং তাঁর অবাধ্য হয়েন না।

হে মুসলিমগণ! কিয়ামতের দিন মীযান বা দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে, যাতে অণু পরিমাণ ভালো-মন্দও ওযন করা হবে। কোনো বান্দার নেকীর পাল্লা হালকা হবে অথবা কোনো বান্দার নেকীর পাল্লা ভারী হবে। সেদিন আল্লাহ তাআলা বলবেন, যে যার ইবাদত করছিলে, সে যেন তার অনুসরণ করে। তারপর যারা সূর্যের ইবাদত করত, তারা সূর্যের অনুসরণ করবে। যারা চন্দ্রের ইবাদত করত, তারা চন্দ্রের অনুসরণ করবে। আর যারা ত্বাগূতদের পূজা করত, তারা তাদের অনুসরণ করবে। তারপর যারা শুধু আল্লাহর ইবাদত করত এমন পুণ্যবান এবং পাপীরা অবশিষ্ট থাকবে। বিশ্বজাহানের রব তাদের কাছে আসবেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর পায়ের গোছা বের করে দিবেন। তখন যারা আল্লাহর জন্য সিজদা করত, তারা সকলেই সিজদা করবে। কিন্তু যারা লোক দেখানোর জন্য করত, তাদের পিঠ শক্ত কাঠের মতো হয়ে যাবে। যখনই তারা সিজদা দিতে যাবে, তখনই তারা উলটা হয়ে পড়ে যাবে।

কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ওপর দিয়ে ছিরাত বা ব্রিজ স্থাপন করা হবে। কঠিন অন্ধকার মানুষকে ঘিরে ধরবে। এমনকি তারা তাদের হাতের তালুও দেখতে পাবে না। মুমিনদেরকে তাদের আমল অনুপাতে আলো দেওয়া হবে। মুনাফেক্ব নারী- পুরুষরা বলবে, আমাদের জন্য একটু থামো, তোমাদের থেকে আলো নিই। তখন তাদেরকে বলা হবে, পিছনে ফিরে যাও এবং সেখানে গিয়ে নূর তালাশ করো। এই ব্রিজের পাশে কাঁটাযুক্ত তৃণের মতো বড় বড় আঁকড়া থাকবে। শুধু মুমিনগণই এই ছিরাত পার হতে পারবে। প্রথম যাকে এই ছিরাত পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে, তিনি হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। নবীগণ ছাড়া সেদিন আর কেউ কথা বলবে না। সেদিন নবীগণের কথা হবে, হে আল্লাহ! রক্ষা করো, রক্ষা করো। যখন মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং ছিরাত পার হয়ে জান্নাতের কাছে আসবে, তখন আরেকটি কানতারা বা ছোট ব্রিজে তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে দুনিয়ায় একে অপরের ওপর যুলুমের ক্বিছাছ নেওয়া হবে। যখন তারা একেবারে পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এরপর যখন তারা জান্নাতের কাছে আসবে, তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে আর ফেরেশতাগণ তাদেরকে সালাম দিবেন।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মানিত করুন, কাফের ও মুশরিকদেরকে লাঞ্ছিত করুন এবং এই দ্বীনকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! আমাদের এই দেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকেও নিরাপদ বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! হারামাইনের এই দেশকে ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্র, সীমালঙ্ঘনকারীর শত্রুতা এবং হিংসাকারীর হিংসা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০৬।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬০।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৯২।

[4]. তিরমিযী, হা/২৪৪৩।