কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
তাওহীদের আলো ও শিরকের অন্ধকার

মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী
অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হুসাইন

(পর্ব-৫)

শাফাআত বা সুপারিশ প্রসঙ্গে :

প্রথমত:

شَفَاعَةُ এর শাব্দিক অর্থ- একই ধরনের কোনো কিছুকে আরেকটার সাথে মিলানো, বিজোড়কে জোড় করা’।[1]

পারিভাষিক অর্থে বলা হয়- উপকৃত হওয়ার জন্য অথবা ক্ষতি দূর করার জন্য কাউকে মধ্যস্থতা করা’।[2]

যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফা‘আতের বা সুপারিশের দাবি করে ও তার নিকট শাফা‘আত বা সুপারিশ কামনা করে, তাদের জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা হচ্ছে- একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই হচ্ছেন শাফা‘আতের অর্থাৎ সুপারিশের মালিক। মহান আল্লাহ বলেন,  قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ‘হে নবী! আপনি বলুন, শাফা‘আত সম্পূর্ণ আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আসমান ও যমীনের রাজত্ব তারই, অতঃপর তার কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে’ (যুমার, ৩৯/৪৪)।

দ্বিতীয়ত :

যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফা‘আত বা সুপারিশ কামনা করে, তাদেরকে নিম্বে বর্ণিত জ্ঞানগর্ভ কথার মাধ্যমে জবাব:

(১) সৃষ্টিকুল  স্রষ্টার মতো হতে পারে না :

যারা এরূপ কথা বলে থাকে যে, নবীগণ, সৎ ব্যক্তিবর্গ, ফেরেশতাম-লী ও সৃষ্টিজীবের কেউ, আল্লাহ তা‘আলার নিকটে তাদের মর্যাদা, সম্মান ও সমুচ্চ স্থান রয়েছে, বিধায় তারা আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। যেমনিভাবে দুনিয়াবী যিন্দেগীতে বাদশাহ, শাসকের নিকট তাদের নিকটবর্তী মন্ত্রী, উযীরগণ তাদের অধিনস্থদের জন্য সুপারিশ করে থাকে, তাদের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করে নেয়। এরূপ ধারণা নেহায়েত ভ্রান্ত। কেননা তারা রাজাধিরাজ, অমুখাপেক্ষী আল্লাহ তা‘আলাকে অভাবী ও জনগণের মুখাপেক্ষী দুনিয়ার সাময়িক বাদশাহদেরকে তুলনা করে, যেসব বাদশাহ তাদের মালিকানা ও ক্ষমতা বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মুখাপেক্ষী। দুনিয়াবী শাসক ও জনগণের সহিত সাধারণত তিনটি কারণে মধ্যস্থতা হয়ে থাকে:

প্রথম কারণ : জনগণের অবস্থা সম্পর্কে শাসকের অবহিত করা, যা তারা জানে না।

দ্বিতীয় কারণ : শাসকগণ রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণ নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হলে সাহায্যকারীর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়।

তৃতীয় কারণ : শাসক জনগণের কল্যাণ ও উন্নতি করতে চায় না, কিন্তু যখন তাদের উদ্দেশ্য, বক্তব্য ও উপদেশমূলক কিছু বলা হয়, তখন জনগণের প্রয়োজন পূরণে শাসকদের আগ্রহ, উৎসাহ, ইচ্ছা বৃদ্ধি পায়।

মহান আল্লাহ এরূপ দুর্বল, অসহায় শাসকদের মতো নন। তার নিকট কিছুই গোপন থাকে না। তিনি সবার থেকে অমুখাপেক্ষী। পিতা সন্তানের প্রতি যে দয়া করেন, আল্লাহ তার চেয়েও তার বান্দাদের প্রতি বেশি দয়ালু। দুনিয়াবী শাসকের নিকট সুপারিশকারী হতে পারে পৃথক শাসনব্যবস্থার মালিক, বা বাদশাহর অংশীদার অথবা তাদের সাহায্যকারী। যার ফলে শাসকগণ তিনটি কারণে তার সুপারিশ গ্রহণ করে থাকেন।

(ক) কখনো তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে। (খ) সুপারিশকারীর অনিষ্টের ভয়ে। (গ) কখনো তার প্রতিদানের বিনিময় দেওয়ার লক্ষ্যে।

বান্দাদের একজনের জন্য অন্যের সুপারিশ এ ধরনের। কেউ কারও সুপারিশ ভয় বা আকাক্সক্ষা ব্যতীত গ্রহণ করে না। আল্লাহ তা‘আলা কারও থেকে কিছু পাওয়ার আশা করেন না, কাউকে ভয় করেন না, কারও মুখাপেক্ষীও নন’।[3]  আর এই কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তিনি ব্যতীত অন্যের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,

قُلِ ادْعُواْ الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللهِ لا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلا فِي الأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ، وَلا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلاَّ لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ

‘বলুন, আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে (ইলাহ) মনে করতে, তাদেরকে ডাকো। তারা আসমান ও যমীনে অণু পরিমাণও কোনো কিছুর মালিক নয়। এদুইয়ে তাদের এতটুকু অংশ নেই, আর তাদের কেউ আল্লাহর সাহায্যকারীও নয়। তার কাছে সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, তবে তাদের ব্যতীত যাদেরকে তিনি অনুমতি দিবেন। অতঃপর তাদের (অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্যলাভকারী ফেরেশতার কিংবা অন্যের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি প্রাপ্তদের) অন্তর থেকে যখন ভয় দূর হবে, তখন তারা পরস্পর জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের পালনকর্তা কী নির্দেশ দিলেন? তারা বলবে, যা সত্য ও ন্যায় (তার নির্দেশই তিনি দিয়েছেন), তিনি সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ’ (সাবা, ৩৪/২২-২৩)।

আয়াতটি আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের সকল শিরকী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সকল রাস্তা বা উপায় চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। একজন আবেদ অর্থাৎ ইবাদতকারী ঐ মা‘বূদের সাথে সম্পর্ক রাখে, যার কাছ থেকে উপকারের আশা করা যায়। সুতরাং মা‘বূদকে হতে হবে তার বান্দার উপকার করার সকল উপায়ের মালিক, তার বিপদে সাহায্যকারী, সকল কর্মের কার্যনির্বাহী, সহযোগী, সম্মান ও মর্যাদাবান, যে তার নিকট সুপারিশ করতে সক্ষম। অতএব, উল্লেখিত চারটি দিক যখন পাওয়া যাবে না, তখন শিরকের সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে ও শিরকের মূলোৎপাটন হবে’।[4]

(২) শাফাআতের বা সুপারিশের প্রকরণ : শাফাআত বা সুপারিশ দুধরনের। যথা-

(ক) শরী‘আতসমর্থিত শাফা‘আত বা সুপারিশ, যা আল্লাহর নিকট চাইতে হয়। এটির দু’টি শর্ত- (১) সুপারিশ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার সুপারিশকারীর অনুমতি থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ ‘কে সেই ব্যক্তি, যে তার অনুমতি ব্যতীত তার নিকট সুপারিশ করবে?’ (বাক্বারাহ, ২/২৫৫)। (২) সুপারিশকারী ও যার জন্য সুপারিশ করবে, উভয়ের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকতে হবে। তিনি এরশাদ করেন, وَلا يَشْفَعُونَ إِلا لِمَنِ ارْتَضَى  ‘তিনি যাদের প্রতি খুবই সন্তুষ্ট, তাদের ব্যাপারে ব্যতীত তারা কোনো সুপারিশ করে না’ (আম্বিয়া, ২১/২৮)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন, يَومَئِذٍ لاَّ تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إلا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ ‘ সেদিন কারও সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, দয়াময় যাকে অনুমতি দিবেন আর যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন তার (সুপারিশ) ব্যতীত’ (ত্ব-হা, ২০/১০৯)।

(খ) শরী‘আতবিরোধী শাফা‘আত বা সুপারিশ, যা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট চাওয়া হয়, যে অক্ষম। আল্লাহর অনুমতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত সুপারিশ ও কাফেরদের জন্য সুপারিশ করা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, فَمَا تَنفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ ‘তখন সুপারিশকারীদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না’ (মুদ্দাছছির, ৭৪/৪৮)। তবে রাসূলুল্লাহ ধ-এর চাচা আবু ত্বালেবের শাস্তি হালকা করার সুপারিশ (অন্যান্য কাফেরদের সুপারিশ থেকে) ভিন্ন’।[5]

(৩) আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফাআত বা সুপারিশ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কুরআন-হাদীছের বক্তব্য ও ইজমাদ্বারা দলীল উপস্থাপন :

নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তার পূর্বের কোনো নবী এটি মানুষের জন্য শরী‘আত নির্ধারণ করে যাননি যে, তারা ফেরেশতাদের, নবীদের ও সৎলোকদের নিকট দু‘আ করবে এবং তাদের নিকট শাফা‘আত বা সুপারিশ কামনা করবে। কোনো ছাহাবী, তাবেঈও এরূপ করেননি। মুসলিম মিল্লাতের কোনো ইমাম, চার ইমামের কোনো ইমাম বা অন্য কেউ, নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ ও ইজমা‘র মাসআলায় গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তিও এটাকে উত্তম বলেননি। অতএব, সকল প্রশংসা জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’।[6]

যিনি সকল নেমতদাতা, তিনিই ইবাদতের যোগ্য :

মুশরিকদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার কৌশল হচ্ছে তাদেরকে আল্লাহর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, ইহকালীন-পরকালীন সকল নে‘মতের দিকে দৃষ্টি ও মনাকর্ষণ করতে হবে। তাহলে প্রমাণিত হবে তিনিই তার বান্দাদের উপর সকল নে‘মতদাতা। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,  وَمَا بِكُم مِّن نِّعْمَةٍ فَمِنَ اللهِ ‘যে নে‘মতই তোমরা পেয়েছো, তা-তো আল্লাহ্র নিকট হতেই’ (নাহ্ল, ১৬/৫৩)। মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল প্রাণী বশভূত করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত তার বান্দাদের উপর নে‘মতের মাধ্যমে অনুগ্রহ করাটাই প্রমাণ করে, তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। বান্দাদের উপর আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ এভাবে বর্ণনা করেন।

প্রথমত, সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الأَرْضِ جَمِيعاً… ، ‘পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন…..’ (বাক্বারাহ, ২/২৯)। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,أَ أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً ‘তোমরা কি লক্ষ্য করো না যে, যা কিছু আসমানসমূহে আর যমীনে আছে, আল্লাহ সমস্তই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নে‘মতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন’ (লুক্বমান, ৩১/২০)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন, وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ جَمِيعًا مِّنْهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ‘আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন যা আছে আকাশে আর যা আছে যমীনে সেগুলোর সবকিছুকে, এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য অবশ্যই অনেক নিদর্শন আছে’ (জাছিয়া, ৪৫/১৩)। উল্লেখিত বর্ণনাগুলো আল্লাহর সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নে‘মত অন্তর্ভুক্ত করে। আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই মানুষের অনুগত। আদম সন্তানের কল্যাণার্থে এবং অকল্যাণ ও ক্ষতি হতে উপকার ও উপদেশ পাওয়ার জন্য। সৃজিত সকল বস্তু যেমন, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, স্থির ও বিচরণশীল বস্তু, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, সাগর, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, গাছপালা, ফলমূল, ও প্রাকৃতিক সম্পদ। সবকিছুই প্রমাণ করে, একমাত্র আল্লাহই হলেন প্রকৃত মা‘বূদ। তিনি ব্যতীত ইবাদতের, ভালোবাসার, সম্মানের কেউ নেই। সুতরাং বিবেকপ্রসূত সন্দেহ-সংশয়বিহীনভাবে প্রমাণিত হয় আল্লাহই হলেন প্রকৃত মা‘বূদ। অন্যসব বাতিল’।[7] তিনি এরশাদ করেন,  ذَلِكَ بِأَنَّ اللهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ ‘এজন্য যে, আল্লাহ- তিনি সত্য, আর তাকে বাদ দিয়ে তারা অন্য যাকে ডাকে তা অলীক, অসত্য। আর আল্লাহ, তিনি তো সর্বোচ্চ, সুমহান’ (হজ্জ, ২২/৬২; লুক্বমান, ৩১/৩০)।

দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনা করেছেন। তিনি এরশাদ করেন,

اللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَّكُمْ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْفُلْكَ لِتَجْرِيَ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ وَسَخَّرَ لَكُمُ الأَنْهَارَ، وَسَخَّر لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَآئِبَينَ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ، وَآتَاكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَتَ اللهِ لاَ تُحْصُوهَا إِنَّ الإِنسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ

‘তিনি আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, যা দিয়ে নানা প্রকার ফলফলাদি জন্মে তোমাদের জীবিকার জন্য। তিনি নৌযানগুলোকে তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন, যাতে সেগুলো তার নির্দেশে সমুদ্রে চলাচল করে আর তিনি নদীগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন, তারা অনুগত হয়ে নিজ পথে চলছে। আর তিনি রাত ও দিনকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন। তিনি তোমাদেরকে সেসব কিছুই দিয়েছেন যা তোমরা চেয়েছ (তোমরা তোমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই  পেয়েছ) আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাইলে কখনও তার সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই বড়ই যালিম, বড়ই অকৃতজ্ঞ’ (ইবরাহীম, ১৪/৩২-৩৪)। অসংখ্য নে‘মতের কথা উল্লেখ করে অন্যত্র তিনি এরশাদ করেন,

وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُواْ مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُواْ مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا وَتَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيهِ وَلِتَبْتَغُواْ مِن فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ، وَأَلْقَى فِي الأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ وَأَنْهَارًا وَسُبُلاً لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ، وَعَلامَاتٍ وَبِالنَّجْمِ هُمْ يَهْتَدُونَ، أَفَمَن يَخْلُقُ كَمَن لاَّ يَخْلُقُ أَفَلا تَذَكَّرُونَ، وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَةَ اللهِ لاَ تُحْصُوهَا إِنَّ اللهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ

‘তিনিই সমুদ্রকে কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন, যাতে তোমরা তাত্থেকে তাজা গোশত খেতে পার, আর তাত্থেকে তোমরা রত্নরাজি সংগ্রহ করতে পার, যা তোমরা অলঙ্কার হিসাবে পরিধান কর। আর নৌযানগুলোকে তোমরা দেখতে পাও ঢেউয়ের বুক চিরে তাতে চলাচল করে, যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ তালাশ করতে পার আর শোকর আদায় করতে পার। তিনি যমীনে সুদৃঢ় পর্বত সংস্থাপিত করেছেন যাতে যমীন তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়, আর সংস্থাপিত করেছেন নদী নির্ঝরণী আর পথ, যাতে তোমরা পথের সন্ধান পেতে পার। আর দিক-দিশা প্রদানকারী চিহ্নসমূহ, আর তারকারাজির সাহায্যেও তারা পথনির্দেশ লাভ করে। যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি তার মতো, যে সৃষ্টি করে না? তবে কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? তোমরা আল্লাহর নে‘মতসমূহকে গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। আল্লাহ অবশ্যই বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু’ (নাহ্ল, ১৬/১৪-১৮, ৩-১২)।

যে সত্তা সকল মাখলূক ও নে‘মতের সৃষ্টিকর্তা, তিনি কি তার মতো হতে পারেন, যে কোনো কিছুই সৃষ্টি করেনি? এটি দৃঢ়ভাবে সকলেই অবগত যে, আল্লাহর কোনো বান্দা তার শরীরের এক অঙ্গের নে‘মত গণনা করে শেষ করতে পারবে না। তাহলে এটি ব্যতীত তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গে ও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে/পদ্ধতিতে বান্দার নিকট প্রেরিত নে‘মতগুলোর কী অবস্থা হতে পারে?’। [8] এটা সাব্যস্ত হওয়ার পর বিবেক এটাই বলবে যে, যিনি বান্দাদের উপর সকল নে‘মত পরিপূর্ণভাবে দিয়েছেন, তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য; তার কোনো শরীক নেই।

(চলবে)

[1]. আল-কামূসুল মুহীত্ব, عين অধ্যায়, ش অনুচ্ছেদ, পৃঃ ১২৪০।

[2]. মুহাম্মাদ ছালেহ আল-উছায়মীন, শরহু নাম‘আতুল ই‘তিক্বাদ, পৃঃ ৮০।

[3]. ফাতাওয়া ইবনু তায়মিয়াহ, ১/১২৬, ১২৯।

[4]. তাফসীরে ইবনুল ক্বাইয়্যিম, পৃঃ ৪০৮।

[5]. ফাতহুল বারী, ‘মানাকিবুল আনছার, আবু ত্বালেব’ অনুচ্ছেদ, ৭/১৯৩, হা/৩৮৮৩; ছহীহ মুসলিম, ‘কিতাবুল ঈমান’ অধ্যায়, ‘জাহান্নামীদের হালকা শাস্তি’ অনুচ্ছেদ, ১/১৯৫, হা/২১১।

[6]. ফাতাওয়া ইবনু তায়মিয়াহ, ১/১১২, ১৫৮, ১৪/৩৯৯-৪১৪, ১/১০৮-১৬৫, ১৪/৩৮০, ৪০৯, ১/১৬০-১৬৬, ১৯৫, ২২৮, ২২৯, ২৪১; দারউ তা‘আরুযুল আক্বল ওয়াল নাক্বলি, ৫/১৪৭; আযওয়াউল বায়ান, ১/১৩৭।

[7]. তাফসীরে বাগাভী, ১/৫৯, ৩/৭২; ইবনু কাছীর, ৩/৪৫১, ৪/১৪৯; শাওকানী, ১/৬০, ৪/৪২০; সা‘দী, ১/৬৯, ৬/১৬১, ৭/২১; শানকিতী, আযওয়াউল বায়ান, ৩/২২৫-২৫৩।

[8]. ফাতহুল ক্বাদীর, ৩/১৫৪, ৩/১১০; আযওয়াউল বায়ান, ৩/২৫৩।