কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
তাওহীদের আলো ও শিরকের অন্ধকার

মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী
অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হুসাইন

(পর্ব-৭)

(৮) কবরের উপর গম্বুজ বানানো এবং ছবি অঙ্কন করা :

রাসূল (ছাঃ) শিরকের সকল মাধ্যম থেকে যমীনকে পবিত্র করেছেন এবং কতক ছাহাবীকে কবরের উপর থেকে উঁচু গম্বুজ ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। আর ছবিগুলোকে মুছে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। আবুল হাইয়্যাজ আল-আসাদী (রহিঃ) থেকে  বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَالَ لِى عَلِىُّ بْنُ أَبِى طَالِبٍ أَلاَّ أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِى عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ لاَ تَدَعَ تِمْثَالاً إِلاَّ طَمَسْتَهُ وَلاَ قَبْرًا مُشْرِفًا إِلاَّ سَوَّيْتَهُ

‘আলী (রাঃ) আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাব না, যে কাজে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে পাঠিয়েছিলেন?  তা হচ্ছে, কোনো (জীবের) প্রকৃতি বা ছবি দেখলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে এবং কোনো উঁচু কবর দেখলে তা ভেঙ্গে দিবে’।[1]

(৯) তিনটি মসজিদ ব্যতীত ভ্রমণ করা :

শিরকে পৌঁছে দিতে পারে এমন সকল রাসূল (ছাঃ) পথ বন্ধ করেছেন। তেমনিভাবে তাওহীদকে শিরকমুক্ত সুরক্ষিত করেছেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

لاَ تَشُدُّوا الرِّحَالَ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِى هَذَا وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى

‘আমার এই মসজিদ (মসজিদে নববী), মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আক্বছা (বায়তুল মুকাদ্দাস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো মসজিদে (ছওয়াবের) উদ্দেশ্যে তোমরা সফর করো না’।[2]

এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কবর ও মাযার যিয়ারত অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী থেকে ছাহাবীগণ এমনটাই বুঝেছিলেন। আর এজন্য যখন আবু হুরায়রাহ ‘তূর’ (তূর নামক স্থানের)-এর দিকে গেলেন, ‘তখন বছরা ইবনু আবী বছরা আল-গিফারী (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? আমি বললাম, ‘তূর’ হতে। তিনি বললেন, যদি তোমার সেখানে যাওয়ার পূর্বে তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ হত, তাহলে তুমি সেখানে যেতে না। আমি তাঁকে বললাম, তুমি এমন কথা কেন বলছ? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনটি মসজিদ ব্যতীত সফর করা যাবে না।…….’। [3]

আর এ কারণে শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহিঃ) বলেছেন,

وَقَدْ اتَّفَقَ الْأَئِمَّةُ عَلَى أَنَّهُ لَوْ نَذَرَ أَنْ يُسَافِرَ إلَى قَبْرِهِ صَلَوَاتُ اللهِ وَسَلَامُهُ عَلَيْهِ أَوْ قَبْرِ غَيْرِهِ مِنْ الْأَنْبِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ؛ لَمْ يَكُنْ عَلَيْهِ أَنْ يُوفِيَ بِنَذْرِهِ بَلْ يُنْهَى عَنْ ذَلِكَ

‘সকল ইমাম ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি রাসূল (রহিঃ)-এর কবর বা তিনি ব্যতীত অন্য কোনো নবী-রাসূল বা অলি-আউলিয়ার কবর যিয়ারতের জন্য সফর করার মানত করে, তবে তার সে মানত পুরা করা লাগবে না। বরং তাকে তা পূরণ করতে নিষেধ করতে হবে’।[4]

 

(১০) বিদআতী কবর যিয়ারত শিরকের মাধ্যম : কবর যিয়ারত হচ্ছে দুপ্রকার:

প্রথম প্রকার : শরী‘আত সম্মত যিয়ারত: এ প্রকার যিয়ারতের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে কবরবাসীর জন্য শান্তি কামনা ও তাদের জন্য দু‘আ করা। অনুরূপভাবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় জানাযার ছালাত আদায় (কখনও কখনও), মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ। তবে শর্ত হলো কবর যিয়ারতের জন্য সফর করা যাবে না।

দ্বিতীয় প্রকার: শিরকী ও বিদআতী যিয়ারত[5] : ইহা আবার তিন ভাগে বিভক্ত:

(ক) যারা মৃত ব্যক্তির কাছে চায়। এরা হচ্ছে মূর্তিপূজক শ্রেণীর।

(খ) যারা মৃত ব্যক্তিকে মাধ্যম করে আল্লাহর নিকট কিছু চায়। যেমন বলে, আমি তোমার নবীর মাধ্যমে অথবা অমুক শায়খের অছীলায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। এটা ইসলামের মধ্যে নতুন নবাবিষ্কৃত বিদ‘আত। তবে এটা বড় শিরকে পৌঁছাতে পারবে না। সেকারণে এ প্রকার ইসলাম থেকে বের করে দিবে না, যেমনিভাবে প্রথম প্রকার বের করে দিবে।

(গ)  যারা ধারণা করে, কবরের নিকট দু‘আ করলে তা কবুল হয় বা মসজিদে দু‘আ কারার চাইতে কবরের পাশে দু‘আ করা উত্তম। এ প্রকার ইজমার ভিত্তিতে গর্হিত কাজ।[6]

 

(১১) সূর্য উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময় ছালাত আদায় করা শিরকের মাধ্যম :

কেননা যারা সূর্যের পূজারী তারা এই দুই সময়ে সূর্যের পূজা করে থাকে। অতএব এই সময়ে ছালাত আদায় করা তাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

لاَ تَحَرَّوْا بِصَلاَتِكُمْ طُلُوعَ الشَّمْسِ وَلاَ غُرُوبَهَا فَإِنَّهَا تَطْلُعُ بِقَرْنَىْ شَيْطَانٍ

‘তোমরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় তোমাদের ছালাতের সংকল্প করো না। কারণ সূর্য শয়তানের দু’শিং-এর মাঝখান দিয়ে উদিত হয়’।[7]

সারকথা :

শিরকের মাধ্যম বলতে এমন সব মাধ্যমকে বুঝায়, যা বড় শিরকের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়। এমন আরও অনেক মাধ্যম রয়েছে, যা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। যথা: যার রূহ আছে তাদের মূর্তি বানানো, মূর্তিপুজার স্থানে মান্নত বাস্তবায়ন করা বা জাহেলি যুগে যে স্থানে উৎসব করা হতো সেসব স্থানে উৎসব প্রতিষ্ঠা করা। এসবই হচ্ছে শিরকে পৌঁছার মাধ্যম’।[8]

শিরকের প্রকারভেদ :

প্রথমত, শিরকের অনেকগুলো প্রকার রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে-

প্রথম প্রকার : শিরকে আকবার বা বড় শিরক। যার দ্বারা মানুষ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيدًا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে চরমভাবে গোমরাহীতে পতিত হলো (নিসা, ৪/১১৬)। আর এই শিরক চার ভাগে বিভক্ত:

(১) দুআর মাধ্যমে শিরক : আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ

‘তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন একনিষ্ঠভাবে তারা আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে নিরাপদে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তারা (অন্যকে আল্লাহর) শরীক করে বসে’ (আনকাবূত, ২৯/৬৫)।[9]

 

(২) ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও নিয়্যতের ক্ষেত্রে শিরক : আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لاَ يُبْخَسُونَ، أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلاَّ النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُواْ فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ

‘যারা এ দুনিয়ার জীবন আর তার শোভা সৌন্দর্য কামনা করে, তাদেরকে এখানে তাদের কর্মের পুরোপুরি ফল আমি দিয়ে দিই। আর তাতে তাদের প্রতি কোনো কমতি করা হয় না। কিন্তু আখিরাতে তাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নেই। এখানে যা কিছু তারা করেছে তা নিস্ফল হয়ে গেছে। আর তাদের যাবতীয় কর্ম ব্যর্থ হয়ে গেছে’ (হূদ, ১১/১৫-১৬, ইসরা ৮, শূরা ২০)।

 

(৩) আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক : আর তা হলো, আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হয়ে আলেম, দরবেশ এবং অন্যদের আনুগত্য করা। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

اتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُواْ إِلاَّ لِيَعْبُدُواْ إِلَهًا وَاحِدًا لاَّ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

‘আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে; আর মারইয়াম পুত্র মাসীহকেও। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ ব্যতীত (অন্যের) ইবাদত করার আদেশ দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, পবিত্রতা আর মহিমা তারই, (বহু ঊর্ধ্বে তিনি) তারা যাদেরকে (তার) অংশীদার গণ্য করে তাত্থেকে’ (তওবা, ৯/৩১)।

(৪) ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরক : আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللهِ

‘আর কোনো কোনো লোক এমনও আছে, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহর ভালোবাসার মতো তাদেরকে ভালোবাসে’ (বাক্বারাহ, ২/১৬৫)।

 

সারকথা : যে কোনো ইবাদত আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করাই হচ্ছে শিরকে আকবার বা বড় শিরক। যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দো‘আ করা, অন্যের জন্য পশু জবাই করা, মানত করা। অথবা কবরবাসী, জিন, শয়তানের নৈকট্য লাভের জন্য কোনো ইবাদত করা। অথবা মৃত ব্যক্তিরা ক্ষতি করতে পারে ভেবে তাদেরকে ভয় করা। অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট প্রয়োজন পূরণ বা বিপদাপদ দূরীকরণের আশা করা, যার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ রাখে না। এসবগুলোই ইবাদত, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা যাবে না’।[10]

 

দ্বিতীয় প্রকার : শিরকে আছগার বা ছোট শিরক: এ প্রকার শিরক কাউকে ইসলাম হতে বের করে দেয় না। সামান্য পরিমাণ রিয়া বা লৌকিকতা এ প্রকার শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

فَمَن كَانَ يَرْجُواْ لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

‘কাজেই যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎ আমল করে আর তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’ (কাহফ, ১৮/১১০)। এ প্রকার শিরকের মধ্যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে কসম করা আরেকটি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী,

مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করল, সে কুফরী অথবা শিরক করল’।[11]

অনুরূপভাবে কারও এমন উক্তি করা যে, ‘যদি আল্লাহ এবং আপনি না থাকতেন অথবা’ ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন’।

শিরকের আরেক প্রকার হচ্ছে, শিরকে খাফী বা গোপন শিরক :

আর এই শিরকটি হচ্ছে, অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপর দিয়ে কালো পিঁপড়া হেঁটে যাওয়ার মতো সূক্ষ্ম বা গোপনীয়’।[12]   এর কাফফারা হচ্ছে, এই দু‘আ পড়া,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ

‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি জেনে-শুনে শিরক করা হতে এবং আমি তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ঐ সমস্ত পাপ থেকে, যা আমার জানা নেই’।[13]  ইবনু আব্বাস (রাঃ) নিম্বে বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, فَلاَ تَجْعَلُواْ لِلّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ ‘কাজেই জেনেবুঝে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না’ (বাক্বারাহ, ২/২২): ‘আনদাদ হচ্ছে শিরক, যা অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়া চলার চেয়েও সূক্ষ্ম। আর তা হলো এমন উক্তি করা যে, হে অমুক! আল্লাহর কসম, তোমার জীবনের কসম ও আমার জীবনের কসম। আরও একথা বলা যে, যদি এই কুকুরটি না থাকত, তবে গত রাতে আমাদের কাছে চোর আসত। যদি ঘরে হাঁস না থাকত, তবে চোর আসত। অনুরূপভাবে কারো তার সঙ্গীর সাথে একথা বলা যে, আল্লাহ যা চেয়েছেন এবং তুমি যা চেয়েছো। আর একথা বলা, আল্লাহ এবং অমুক যদি না থাকত (তবে এই হত)’। [14]  নবী (ছাঃ) বলেন, مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِاللهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করল, সে যেন কুফরী অথবা শিরক করল’।[15]  ইমাম তিরমিযী (রহিঃ) বলেন, এ হাদীছের ব্যাখ্যায় কয়েকজন অভিজ্ঞ আলেম বলেছেন, ‘সে কুফরী করল অথবা শিরক করল’ কথাটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ধমক ও শাসনের সূরে বলেছেন। তারা নিম্বের হাদীছটি নিজেদের দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন: ওমর (ছাঃ)-কে পিতার নামে শপথ করতে শুনে নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘সাবধান! তোমাদেরকে নিজেদের পিতার নামে শপথ করতে আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন’।[16]  আরো একটি হাদীছে এসেছে, وحديث أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ حَلَفَ مِنْكُمْ فَقَالَ فِي حَلِفِهِ بِاللَّاتِ وَالْعُزَّى فَلْيَقُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ  আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে লোক নিজের শপথে বলে, লাতের শপথ! উযযার শপথ! সে যেন বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!’। [17]

আর শিরকে খাফী শিরকে আছগার বা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হতে পারে। সুতরাং শিরক দাঁড়ায় দু’প্রকারে : (১) বড় শিরক। (২) ছোট শিরক। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন’।[18]

 

সারকথা : ছোট শিরক দু’প্রকার। প্রথম প্রকার : প্রকাশ্য শিরক। এটা কাজ ও কথার মাধ্যমে হবে। কথার মাধ্যমে যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম করা। ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন’ বলা। ‘তুমি এবং আল্লাহ যদি না থাকত’ বলা। ‘এটা আল্লাহ এবং তোমার পক্ষ হতে হয়েছে’ বলা। ‘এই বরকত আল্লাহ এবং আপনার পক্ষ থেকে’ ইত্যাদি।

এ ক্ষেত্রে বলার সঠিক নিয়ম হচ্ছে, ‘এক আল্লাহ তা‘আলা যা চেয়েছেন’ অথবা ‘আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর আপনি যা চেয়েছেন’। ‘যদি এক আল্লাহ তা‘আলা না থাকতেন’। অথবা ‘যদি এক আল্লাহ তা‘আলা না থাকতেন অতঃপর তুমি না থাকতে’। অথবা ‘এটা এক আল্লাহর পক্ষ হতে’ অথবা ‘এটা আল্লহর পক্ষ হতে অতঃপর আপনার পক্ষ হতে’।

কর্মের মাধ্যমে শিরক : যেমন- বিপদাপদ দমন বা দূরীভূত করার জন্য ধাগা, সুতা বা আংটি ব্যবহার করা। অথবা কু-দৃষ্টির ভয়ে বা জিনের ভয়ে তাবীয লটকানো। যে ব্যক্তি এসব কাজ করল এই বিশ্বাস নিয়ে যে, এই সমস্ত বস্তু বিপদ মুক্ত করবে অথবা দমন করবে, সে ব্যক্তি বড় শিরক করে ফেলল। এটা একদিক দিয়ে রুবূবিয়্যাত বা প্রভূত্বের ক্ষেত্রে শিরক, কারণ সে এর দ্বারা সৃষ্টি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে ফেলেছে। অন্য দিক দিয়ে এটা ইবাদতের ক্ষেত্রেও শিরক, কারণ এর মাধ্যমে সে একে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে এবং এর উপকারের আশায় স্বীয় হৃদয়টাকে সেদিকে লাগিয়ে রেখেছে।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এসব কাজ করল এই বিশ্বাস নিয়ে যে, মহান আল্লাহই বালা-মুছীবত দমনকারী বা দূরীভূতকারী, কিন্তু এগুলো বালা-মুছীবত প্রতিহত করার মাধ্যম মাত্র, তাহলে সে এমন কিছুকে মাধ্যম বানালো, যার অনুমোদন ইসলাম দেয়নি। তার এই কাজ হারাম এবং শরী‘আত ও তাক্বদীরের উপর মিথ্যারোপ। শরী‘আতের উপর মিথ্যারোপ একারণে যে, শরী‘আত এই কাজ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আর শরী‘আতনিষিদ্ধ কোনো বিষয় উপকারী কারণ হতে পারে না। আর তাক্বদীরের উপর মিথ্যারোপ একারণে যে, উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার মতো কোনো মাধ্যম এটা নয় আবার বৈধ কোনো ওষুধও নয়। অতএব, এটা শিরকের অন্যতম একটি মাধ্যম। কেননা যে এর সাথে জড়িত, তার হৃদয়টাও এর সাথে জড়িত হয়ে যায়। আর এটা এক ধরনের শিরক এবং শিরকের মাধ্যম।

দ্বিতীয় প্রকার: ছোট শিরক : এটা গোপন শিরক। এটা হয়ে থাকে মানুষের মনের ইচ্ছা, নিয়্যত ও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে। এটা আবার দুই প্রকার :

প্রথম প্রকার : রিয়া বা লৌকিকতা, জনশ্রুতির জন্য কাজ করা। রিয়া বা লৌকিকতা হচ্ছে, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য তাদের দেখিয়ে ইবাদত করা। লৌকিকতা ও জনশ্রুতির মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, যে আমল দেখা যায়, তার ক্ষেত্রে রিয়া হয়ে থাকে। যেমন: ছালাত, ছাদাক্বাহ, হজ্জ, জিহাদ ইত্যাদি। আর যা শোনা যায়, তার ক্ষেত্রে সুম‘আ বা জনশ্রুতি হয়ে থাকে। যেমন: কুরআন পড়া, ওয়ায করা, যিকির করা ইত্যাদি। মানুষ তার নিজের আমল সম্পর্কে আলোচনা করলে বা কাউকে জানালে তাও সুম‘আ বা জনশ্রুতির আওতাভুক্ত হবে।

দ্বিতীয় প্রকার : দুনিয়ার স্বার্থে আমল করা। অর্থাৎ যে আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়, তার মাধ্যমে দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ উদ্দেশ্য হওয়া। এটাই হচ্ছে নিয়্যত ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে শিরক। এটা পূর্ণাঙ্গ তাওহীদের পরিপন্থী এবং এর দ্বারা এর সাথে সংশ্লিষ্ট আমল নষ্ট হয়ে যায়’।[19]  আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার নিকট পানাহ চাই।

[1]. ছহীহ মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘কবর সমান করার নির্দেশ’ অনুচ্ছেদ, ২/৬৬৬, হা/৯৬৯।

[2]. ছহীহুল বুখারী ফাতহুল বারীসহ, ‘মক্কা ও মদীনার মসজিদে ছালাতের মর্যাদা’ অধ্যায়, ৩/৬৩, হা/১১৮৯; ছহীহ মুসলিম নিজ শব্দে, ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ‘মহিলাদের মাহরামের সঙ্গে হজ্জ অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সফর করা’ অধ্যায়, ২/৯৭৬।|

[3]. নাসাঈ, ‘জুম‘আহ’ অধ্যায়, ‘যে সময় জুম‘আর দিনে দু‘আ কবুল হয়’ অনুচ্ছেদ, হা/১৪৩০, ৩/১১৪; মুওয়াত্ত্বা মালিক, ‘জুম‘আহ’ অধ্যায়, হা/৩৬৪; মুসনাদে আহমাদ, ৬/৭, হা/৩৯৭; ফাতহুল মাজীদ, পৃঃ ২৮৯; ছহীহ নাসাঈ, ১/৩০৯।

[4]. ফাতাওয়া ইবনু তায়মিয়া, ১/২৩৪।

[5]. ফাতাওয়া ইবনু তায়মিয়া, ১/২৩৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১২৩।

[6]. আদ-দাররু সানাইয়্যা, ৫/১৬৫-১৭৪।

[7]. ছহীহ মুসলিম, ‘মুসাফিরদের ছালাত’ অধ্যায়, ‘যে সকল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ, ১/৫৬৮, হা/৮২৮।

[8]. ড. ছালেহ আল-ফাওযান, আল-ইরশাদ ইলা ছহীহিল ই‘তিক্বাদ, পৃঃ ৫৪-৭০, ১১৩-১৫২।

[9]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জুয়াবুল কাফী, পৃঃ ২৩০-২৪৪; ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ১/৩৩৯-৩৪৬।

[10]. আল্লামা ফাওযান, কিতাবুত তাওহীদ, পৃঃ ১১।

[11].  তিরমিযী, ইবনু ওমর (রাঃ) হতে। ‘মানত ও শপথ’ অধ্যায়, ‘আল্লাহ্র নাম ব্যতীত অন্যের নামে শপথ করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ, ৪/১১০, হা/১৫৩৫, আলবানী ছহীহ বলেছেন; ছহীহ সুনানে তিরমিযী, ২/৯৯।

[12]. হাকেম; তিরমিযী; ছহীহুল জামে‘, ৩/২৩৩; আরনাউত, তাখরীজুত ত্বাহাবীয়্যাহ, পৃঃ ৮৩।

[13]. হাকেম; তিরমিযী; ছহীহুল জামে‘, ৩/২৩৩; মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব ও ইবনু তায়মিয়া, মাজমূ‘আতুত তাওহীদ, পৃঃ ৬।

[14]. ইমাম ইবনু কাছীর স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ১/৫৬; তাহক্বীক্ব ইবনু কাছীর, ১/১৫৪; আর ইবনু আবী হাতেম দৃঢ়তার সাথে বর্ণনা করেছেন।

[15]. তিরমিযী, ৪/১১০, হা/১৫৩৫।

[16].  তিরমিযী, ইবনু ওমর (রাঃ) হতে ‘মানত ও শপথ’ অধ্যায়, ‘আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে শপথ করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ, ৪/১১০; ছহীহ সুনানে তিরমিযী, ২/৯৯।

[17].  তিরমিযী, ইবনু ওমর (রাঃ) হতে ‘মানত ও শপথ’ অধ্যায়, ‘আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে শপথ করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ, ৪/১১০; ছহীহ সুনানে তিরমিযী, ২/৯৯, হা/১৫৪৫।

[18]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দাওয়া আশ-শাফী, পৃঃ ২৩৩।

[19]. সাদলান, আল-ক্বাওলুস সাদীদ ফী মাক্বাছিদুত তাওহীদ, পৃঃ ৪৩; ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দাওয়া আশ-শাফী, পৃঃ ২৪০; ড. ছালেহ ইবনু আল-ফাওযান আল-ফাওযান, পৃঃ ১১-১২; আল-ইরশাদ ইলা ছহীহিল ই‘তিক্বাদ, পৃঃ ১৩৪-১৪৩।