কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
তাওহীদের আলো ও শিরকের অন্ধকার

মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী
অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হুসাইন

(শেষ পর্ব)

দ্বিতীয়ত, বড় শিরক এবং ছোট শিরকের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে বর্ণনা :

(১) বড় শিরকের দ্বারা একজন মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু ছোট শিরকের দ্বারা ইসলাম থেকে বের হবে না।

(২) বড় শিরককারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। আর ছোট শিরককারী  জাহান্নামে গেলেও চিরস্থায়ী হবে না।

(৩) বড় শিরক সমস্ত নেক আমলকে নষ্ট করে দিবে। আর ছোট শিরক সমস্ত নেক আমলকে নষ্ট করবে না। লোকদেখানোর জন্য বা দুনিয়ার জন্য যে আমল করা হয়েছে, শুধু সে আমল নষ্ট হবে।

(৪) বড় শিরককারীর রক্ত ও মাল বৈধ। কিন্তু ছোট শিরককারীর ক্ষেত্রে এ রকম নয় (অর্থাৎ তার জান-মাল নিয়ে নেওয়া বৈধ হবে না)’। [1]

(৫) বড় শিরক মুমিন ও শিরক সম্পাদনকারীর মধ্যে শত্রুতা সাব্যস্ত করে। সুতরাং মুমিনের জন্য মুশরিকের সাথে বন্ধুত্ব করা জায়েয হবে না যদিও নিকট আত্মীয় হয়। আর ছোট শিরক সাধারণভাবে বন্ধুত্বকে নিষেধ বা হারাম করবে না। বরং ছোট শিরককারীর সাথে তাওহীদ অনুসারে বন্ধুত্ব করা যাবে। আর ছোট শিরক যার মাঝে থাকবে তাকে শিরক অনুযায়ী ঘৃণা ও শত করা যাবে।[2]

শিরকের ক্ষতি ও প্রভাবসমূহ :

শিরকের মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর প্রভাব। বড় ধরনের ফাসাদ ও ধ্বংসাত্মক ক্ষতি। এগুলোর কয়েকটি সংক্ষিপ্তভাবে নিম্বে বর্ণনা করা হলো :

(১) দুনিয়া এবং আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

(২) শিরক দুনিয়া ও আখিরাতে দুঃখ-কষ্ট পাওয়া বড় মাধ্যম।

(৩) শিরক দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়ের কারণ এবং নিরাপত্তা না থাকার মাধ্যম।

(৪) শিরককারী দুনিয়া ও আখিরাতে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيدًا

‘আর যে ব্যক্তি  আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে চরমভাবে গোমরাহীতে পতিত হয়’ (নিসা, ৪/১১৬)।

(৫) বড় শিরককারী তওবা না করে মারা গেলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না :

আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا

‘আল্লাহ্ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে মহাপাপে জড়িয়ে মিথ্যা রচনা করল’ (নিসা, ৪/৪৮)।

(৬) বড় শিরক সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয় : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَوْ أَشْرَكُواْ لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ

‘তারা যদি শিরক করত, তবে তাদের সব আমল বিনষ্ট হয়ে যেত’ (আন‘আম ৬/৮৮)। তিনি আরও বলেন,

لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

‘তুমি যদি (আল্লাহর) শরীক স্থির করো, তাহলে তোমার আমল অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তুমি অবশ্যই অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার, ৩৯/৬৫)।

(৭) বড় শিরককারীর উপর জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেয় এবং তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায় : জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর  সাথে কোনো কিছু শরীক করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জাহান্নামে যাবে’।[3]   আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর  সাথে অংশীদার স্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। আর তার আবাসস্থল হলো জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই’ (মায়িদাহ, ৫/৭২)।

(৮) বড় শিরককারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُوْلَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

‘আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনের মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির সর্ব নিকৃষ্ট’ (বাইয়িনাহ, ৯৮/৬)।

(৯) শিরক বড় ধরনের যুলুম ও মিথ্যা অপবাদ : আল্লাহ তা‘আলা লুক্বমান (আঃ)-এর সন্তানের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন,

يَا بُنَيَّ لا تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

‘হে বৎস! আল্লাহর  সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না, নিশ্চয়ই শিরক হচ্ছে বড় যুলুম’ (লুক্বমান, ৩১/১৩)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا

‘যে আল্লাহর  সাথে শরীক করল, সে মহাপাপে জড়িয়ে মিথ্যা রচনা করল’ (নিসা, ৪/৪৮)।

(১০) মুশরিকের সাথে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাঃ)-এর কোনো সম্পর্ক নেই : আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

وَأَذَانٌ مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الأَكْبَرِ أَنَّ اللهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ

‘আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ হতে বড় হজ্জের দিনে মানুষদের কাছে ঘোষণা দেওয়া হলো যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কহীন এবং তার রাসূলও’ (তওবা, ৯/৩)।

(১১) শিরক গযব, আল্লাহর  শাস্তি এবং তার রহমত থেকে দূরে চলে যাওয়ার মাধ্যম

(১২) শিরক জন্মগত নূরকে (আলোকে) নিভিয়ে দেয় : কেননা তিনি মানুষকে জন্মগতভাবে তার একত্ব ও আনুগত্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فِطْرَتَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ

‘এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতি তিনি মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহর  সৃষ্টিকার্যে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’ (রূম, ৩০/৩০)। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ

‘প্রতিটি নবজাতকই জন্মগ্রহণ করে ফিৎরাতের (তাওহীদের) উপর। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী বা খ্রীস্টান বা অগ্নিপূজক রূপে গড়ে তোলে’।[4]   অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ হাদীছে কুদসীতে বলেন,

إِنِّى خَلَقْتُ عِبَادِى حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ وَإِنَّهُمْ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ يُشْرِكُوا بِى مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا

‘আমি আমার সকল বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে সরিয়ে দেয়। আমি যে সমস্ত জিনিস তাদের জন্য বৈধ করেছিলাম, সে তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু সে তাদেরকে আমার সাথে এমন বিষয়ে অংশীদার করার জন্য নির্দেশ প্রদান করে, যে বিষয়ে আমি কোনো প্রমাণ পাঠাইনি’।[5]

(১৩) শিরক উত্তম চরিত্রকে ধ্বংস করে ফেলে। কারণ উত্তম চরিত্র স্বভাবজাত বিষয়; কিন্তু যখন সে শিরক করে, তখন সে তার স্বভাবজাত বিষয়কে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে এমনি এমনি তার চরিত্র ধ্বংস হয়ে যায়।

(১৪) শিরক আত্মমর্যাদাকে ধ্বংস করে ফেলে। কারণ সে পৃথিবীর সমস্ত ত্বাগূতের কাছে নিজেকে অবনত করে। কেননা সে বিশ্বাস করে, তারা ব্যতীত তার কোনো আশ্রয়দাতা নেই। ফলে সে নিজেকে অবনত করে এমন সত্ত্বার কাছে, যে শোনে না, দেখে না, বুঝে না। এভাবে সে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করে বসে (এবং আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেয়)।

 

(১৫) বড় শিরক রক্ত ও সম্পদকে বৈধ করে দেয় : এ বিষয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর বাণী,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهَ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ

‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসূল, ছালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করল। অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোনো কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত’।

(১৬) বড় শিরক শত্রুতা ওযাজিব করে মুমিন এবং শিরক সম্পাদনকারীর মাঝে। সুতরাং মুমিনদের জন্য জায়েয নেই মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করা যদিও নিকট আত্মীয় হয়।

(১৭) ছোট শিরক ঈমান কমিয়ে দেয় এবং বড় শিরকের মাধ্যম হয়ে যায়।

(১৮) গোপন শিরক হচ্ছে রিয়া এবং দুনিয়ার জন্য আমল। এ শিরক কেবল সেই আমলকে নষ্ট করে, যার সাথে তা মিশে আছে। আর এটা মাসীহ দাজ্জালের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ এটা খুবই গোপন এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মতের জন্য বিপজ্জনক।

হে আল্লাহর  বান্দা! তুমি ছোট-বড় সব ধরনের শিরক থেকে সাবধান থাকো। আমরা আল্লাহর  নিকট এ থেকে আশ্রয় চাই। তার নিকট দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাই।

দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর, তার ছাহাবীদের উপর এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার সকল যোগ্য অনুসারীদের উপর।

 

[1]. ড. ছালেহ আল-ফাওযান, কিতাবুত তাওহীদ, পৃঃ ১২।

[2]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৫।

[3]. ছহীহ মুসলিম, ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘শিরক না করা অবস্থায় যার মৃত্যু হয়, সে জান্নাতী, মুশরিক অবস্থায় যার মৃত্যু হয়, সে জাহান্নামী’ অনুচ্ছেদ, ১/৯৪, হা/৯৩।

[4]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীছ হতে, ছহীহুল বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, ‘কোনো বালক ইসলাম গ্রহণ করে মারা গেলে তার জন্য (জানাযার) ছালাত আদায় করা যাবে কি? বালকের নিকট ইসলামের দাওয়াত দেওয়া যাবে কি’ অনুচ্ছেদ, হা/১৩৫৮; ছহীহ মুসলিম, ‘তাক্বদীর’ অধ্যায়, ‘প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ’ অনুচ্ছেদ, হা/২৬৫৮।

[5]. ছহীহ মুসলিম, ‘জান্নাত’ অধ্যায়, ‘পৃথিবীতে জান্নাতী ও জাহান্নামী লোকদের পরিচয়’ অনুচ্ছেদ, ১/২১৯৭, হা/২৮৬৫।