কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
তাওহীদের আলো ও শিরকের অন্ধকার

মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী
অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হুসাইন

(জুলাই’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-৪)

(৪) একথা দৃঢ়ভাবে জ্ঞাত যে, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে, তারা হচ্ছেন, নবীগণ, সৎ ব্যক্তিবর্গ, ফেরেশতাগণ ও ইসলাম গ্রহণকারী জিন। তারা প্রত্যেকেই নিজের সৎকর্মের মাধ্যমে  আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আল্লাহর রহমত পাওয়ার আশায় ও শাস্তির ভয়ে তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করছেন। তাহলে যার এরূপ অবস্থা, কীভাবে তার ইবাদত করা যায়’।[1] মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا ‘তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো তাদের প্রতিপালকের নিকট পৌঁছার পথ অনুসন্ধান করে যে, কে তাঁর অধিক নিকটবর্তী হতে পারবে, আর তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। তোমার প্রতিপালকের শাস্তি তো ভয় করার মতই’ (ইসরা, ১৭/৫৭)।

(৫) এটি সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয়, তারা সর্ববিষয়ে এমনকি দু‘আ কবুলের ক্ষেত্রেও অক্ষম। তারা আসমান ও যমীনের অণু পরিমাণ বস্তুর মালিক নয়। এককভাবে নয়, সমষ্টিগতও নয়। রাজত্ব পরিচালনার জন্য এসব মিথ্যা মা‘বূদের কোন প্রয়োজন আল্লাহ তা‘আলার নেই। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশও করতে পারবে না এবং সুপারিশ কোন কাজেও লাগবে না’।[2]  আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللهِ لا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلا فِي الأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ، وَلا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ ‘বলুন, আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে (ইলাহ) মনে করতে, তাদেরকে ডাকো। তারা আসমান ও যমীনে অণু পরিমাণও কোন কিছুর মালিক নয়। এ দু’য়ে তাদের এতটুকু অংশ নেই, আর তাদের কেউ আল্লাহর সাহায্যকারীও নয়। তাঁর কাছে সুপারিশ কোন কাজে আসবে না, তবে তাদের ব্যতীত যাদেরকে তিনি অনুমতি দেবেন’ (সাবা, ৩৪/২২-২৩)। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ذَلِكُمُ اللهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ، إِن تَدْعُوهُمْ لا يَسْمَعُواْ دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُواْ مَا اسْتَجَابُواْ لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ ‘এই হলেন আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক। রাজত্ব তাঁরই। তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা তো খেজুরের আঁটি সংলগ্ন (অত্যন্ত পাতলা ও দুর্বল) আবরণের মালিকও নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না আর যদি শুনেও, তবুও তোমাদের (ডাকে) সাড়া দিতে পারবে না। আর তোমরা যে তাদেরকে (আল্লাহর ) অংশীদার গ্রহণ করতে, ক্বিয়ামতের দিন তা তারা অস্বীকার করবে। কেউই তোমাদেরকে সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত খবর জানাতে পারবে না’ (ফাত্বির, ৩৫/১৩-১৪)।

(৬) আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ ‘হে নবী আপনি বলুন! তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছ যে, ‘আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, নির্ভরকারীরা তাঁর উপরই নির্ভর করে’  (যুমার, ৩৯/৩৮)।

(৭) মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللهِ مَا لاَ يَنفَعُكَ وَلاَ يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ، وَإِن يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلاَ رَآدَّ لِفَضْلِهِ يُصيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ‘আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে আহ্বান কর না এমন কিছুকে, যা না পারে তোমার কোনো উপকার করতে, আর না পারে ক্ষতি করতে। যদি তুমি তা করো, তাহলে তুমি যালিমদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে। আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই, আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান অনুগ্রহ দিয়ে ধন্য করেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু’ (ইউনুস, ১০/১০৬-১০৭)।

মূলতঃ এটা প্রত্যেক সৃষ্টিরই বৈশিষ্ট্য। সে অন্যের কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক নয়; বরং স্রষ্টাই তথা আল্লাহই হলেন কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কাউকে ডাকবে, যে উপকার-ক্ষতি করতে পারে না, সে ব্যক্তি বড় শিরকের মাধ্যমে নিজেকে অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করবে। এমনকি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকতেন, তাহলে তিনিও শিরককারী ও অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হতেন। তাহলে অন্যদের অবস্থা কেমন হবে?’। [3]   কেবলমাত্র প্রকৃত মা‘বূদই হলেন কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। তিনি এরশাদ করেন, وَإِن يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدُيرٌ ‘আল্লাহ তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাইলে তিনি ছাড়া কেউ তা সরাতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তবে তো সব কিছুই করার তাঁর ক্ষমতা রয়েছে’ (আন‘আম, ৬/১৭)।

(৮) আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ، وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ ‘তার চেয়ে অধিক গোমরাহ কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে, যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাকে সাড়া দিবে না আর তাদের ডাকাডাকি সম্পর্কেও তারা বেখবর? ক্বিয়ামতের দিন মানুষকে যখন একত্রিত করা হবে, তখন ঐগুলো (অর্থাৎ উপাস্যকরা) হবে মানুষের শত্রু আর মানুষ যে তাদের ইবাদত করেছিল তা তারা অস্বীকার করবে’ (আহক্বাফ, ৪৬/৫-৬)।

অতএব যারা ডাকের সাড়া দিতে পারে না এমন অস্থায়ী ইলাহদের যারা ইবাদত করে, তাদের চেয়ে কে অধিক পথভ্রষ্ট হতে পারে। তারা সামান্য পরিমাণ উপকার করতে পারে না, তারা দু‘আ শুনতে পায় না, দু‘আ কবুলও করতে পারে না। এটা তাদের দুনিয়ার অবস্থা। আর পরকালে তাদের সকল শিরককে অস্বীকার করবে, তাদের শত্রু হবে, পরস্পরকে অভিশাপ দিবে, পরস্পর থেকে নিজে দায়মুক্ত থাকার চেষ্টা করবে’।[4]

(৯) বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে উদাহরণ পেশ করা একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী নীতি। মূর্তিপূজারীদের ভ্রান্ত আক্বীদা এবং সম্মান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সমতা করার বিষয়টি বাতিল করার ক্ষেত্রে এটা অতীব শক্তিশালী পদ্ধতি। কুরআনে কারীমে এরকম বহু দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য সেগুলো হতে তিনটি উপমা পেশ করা হলো-

(ক) মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُواْ لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللهِ لَن يَخْلُقُواْ ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُواْ لَهُ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ، مَا قَدَرُواْ اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ‘হে মানব সকল! একটা দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে, সেটা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা কখনো একটা মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না, এজন্য তারা সবাই একত্রিত হলেও। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তারা তার থেকে তা উদ্ধারও করতে পারে না। পূজারী ও দেবতা কতই না দুর্বল। তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় না, আল্লাহ নিশ্চিতই ক্ষমতাশালী, মহা পরাক্রান্ত’ (হজ্জ, ২২/৭৩-৭৪)।

উল্লেখিত দৃষ্টান্তটিতে মনোযোগ আকর্ষণ ও চিন্তা-ভাবনা করা প্রত্যেকের উচিত। কেননা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয়, তারা সকল সৃষ্টি একত্রিত হয়ে একটি মাছি সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। তাহলে মাছির চেয়ে বড় কিছু করা ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা কেমন। এমনকি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিলে তারা তা ফিরিয়ে নিতে সক্ষম নয়। সৃষ্টি জগতের দুর্বলতম প্রাণী মাছি সৃষ্টি করতেও তারা সক্ষম নয়; সক্ষম নয় তার ছিনিয়ে নেওয়া বস্তু ফিরিয়ে নিতেও। অতএব এসব বাতিল মা‘বূদের চেয়ে অক্ষম, দুর্বল আর কে আছে। তাহলে কীভাবে সুস্থ বিবেক আল্লাহ ব্যতীত অন্যের (এসব মিথ্যা মা‘বূদের) ইবাদতের কথা ভাবতে পারে? শিরক প্রত্যাখ্যাত ও শিরককারীদের মূর্খতা, অজ্ঞতা প্রমাণে উল্লেখিত উপমা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বর্ণিত চমৎকার উপমা’।[5]

(খ) শিরক প্রত্যাখ্যান, শিরককারীদের ক্ষতিগ্রস্ততা ও শিরক পরিহার করে একত্ব গ্রহণের ব্যাপারে নীচের আয়াতটি একটি উত্তম নমুনা ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُواْ مِن دُونِ اللهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ لَوْ كَانُواْ يَعْلَمُونَ، إِنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ مِن شَيْءٍ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ، وَتِلْكَ الأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلا الْعَالِمُونَ ‘যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে, তাদের দৃষ্টান্ত হল মাকড়সার মতো। সে ঘর বানায়, আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সবচেয়ে দুর্বল; যদি তারা জানত। আর আল্লাহর পরিবর্তে যা কিছুকে ডাকে, আল্লাহ তা জানেন, তিনি মহাপরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাময়। এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষদের জন্য বর্ণনা করছি, কেবল জ্ঞানীরাই তা বুঝে’ (আনকাবূত ২৯/৪১-৪৩)।

আল্লাহ ব্যতীত যারা অন্যের ইবাদত করে ও অন্যকে ওলী হিসাবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা উল্লেখিত উদাহরণের মাধ্যমে বর্ণনা করেন যে, যাদেরকে তারা মা‘বূদ হিসাবে গ্রহণ করে, তারা তাদের চেয়েও দুর্বল ও অসহায়। একটা দুর্বল প্রাণী মাকড়সার মতো যার বাসস্থানও দুর্বল। সুতরাং যারা আল্লাহ ব্যতীত দুর্বল বা অক্ষমকে মা‘বূদ হিসাবে গ্রহণ করবে, তাদের দুর্বলতাই বৃদ্ধি পাবে’।[6]

(গ) মুশরিকের বিক্ষিপ্ততা ও হতভম্বতার চমৎকার উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, ضَرَبَاللهُ مَثَلاً رَّجُلاً فِيهِ شُرَكَاءُ مُتَشَاكِسُونَ وَرَجُلاً سَلَمًا لِّرَجُلٍ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلاً الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لا يَعْلَمُونَ ‘আল্লাহ একটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, এক ব্যক্তি যার মুনিব অনেক- যারা পরস্পরে বিরোধী। আরেক ব্যক্তি যার সম্পূর্ণ মালিকানা একজনের, তুলনায় এ দু’জন কি সমান? যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু মানুষদের অধিকাংশই জানে না’ (যুমার, ৩৯/২৯)। উল্লেখিত উদাহরণ আল্লাহ তা‘আলা শিরককারী ও তাওহীদবাদীদের জন্য বর্ণনা করেছেন। একজন মুশরিক যে একাধিক মা‘বূদের ইবাদত করে তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো, যার মালিক কয়েকজন, যারা কর্মে পরস্পর ভিন্ন ও বিরোধী, মন্দ আচরণ। সে তাদের সকলের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে না। যার ফলে সে অশান্তির মধ্যে নিমজ্জিত।

কিন্তু যে তাওহীদবাদী, যে এক আল্লাহর ইবাদত করে, তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করে না, সে ঐ ব্যক্তির মতো, যার মালিক কেবল একজন। সে তার কাছে বিনয়াবনত, সে তার লক্ষ্য সম্পর্কে জানে এবং তাকে খুশী করার রাস্তাও তার জানা। যার ফলে মালিকদের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও মতভেদ থেকে মুক্ত। বরং তার মালিক তার প্রতি দয়া, অনুগ্রহ, মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা ও কল্যাণ করে থাকেন। তাহলে এই দুই ধরনের বান্দা কি সমান হতে পারে? জবাব, কখনই না, তারা উভয়ে কখনই সমান হতে পারে না’।[7]

(১০) তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য যিনি সবকিছুর ক্ষমতার মালিক, সবকিছু পরিবেষ্টনকারী, প্রত্যেক বিষয়ে জ্ঞানী, প্রত্যেক বিষয় সংরক্ষণকারী, প্রত্যেক বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাধর, কতৃত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী, ইহকাল-পরকালের মালিক, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক, কেবলমাত্র তাঁর হাতেই দেওয়া ও না দেওয়ার ক্ষমতা। যিনি এসব গুণে গুণান্বিত তিনিই প্রকৃত মা‘বূদ, তাঁকেই স্মরণ করতে হবে, ভুলে যাওয়া যাবে না, তাঁরই শুকরিয়া আদায় করতে হবে, অকৃতজ্ঞ হওয়া যাবে না। আনুগত্য করতে হবে, অবাধ্য হওয়া যাবে না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না’।[8]  পূর্ণ গুণাবলী কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য নয়। তাঁর কিছু গুণ নিম্বে উল্লেখ করা হলো-

(ক) এককভাবে উলূহিয়্যাতের মালিক : ইলাহ হওয়ার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। যিনি জীবিত, কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না, তিনি নিজে চিরঞ্জীব, সকল সৃষ্টিকুল হতে অমুখাপেক্ষী, সব কিছু তাঁরই মুখাপেক্ষী। তিনি এমনই জীবিত ও চিরঞ্জীব যে, তাঁকে ঘুম ও তন্দ্রা স্পর্শ করে না, আসমান ও যমীনের সকলেই তাঁর বান্দা, তাঁরই অধীনস্থ ও রাজত্বের আওতাধীন। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, , إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ إِلاّ آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا، لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا ‘আসমান ও যমীনে এমন কেউ নেই যে, দয়াময়ের নিকট বান্দা হয়ে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন আর তাদেরকে বিশেষভাবে গুণে গুণে রেখেছেন’ (মারইয়াম, ১৯/৯৩-৯৪)।

তাঁর পূর্ণ রাজত্ব, মহানত্ব ও দাম্ভিকতা হচ্ছে, তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। প্রত্যেক সুপারিশকারীই হচ্ছে তাঁর দাস। তাদের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তারা সুপারিশ উপস্থাপন করতে পারবে না। তিনি যাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন, তাদেরকেই সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। তাঁর ইলম (জ্ঞান) সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তিনি যাকে জানান, সে ব্যতীত কেউ তাঁর ইলম (জ্ঞান) সম্পর্কে অবগত হতে পারে না। তাঁর বড়ত্ব হচ্ছে, তাঁর কুরসী আসমান ও যমীন বিস্তৃত। তিনি আসমান, যমীন এবং উভয়ের মধ্যে সকল সৃষ্টিকুল সংরক্ষণ করছেন। এতে তাঁর কোনো ক্লান্তি নেই, তার কাছে কঠিন মনে হয় না। বরং তাঁর কাছে এটি খুবই সহজ। কেননা তিনি সর্ববিষয়ে পরাক্রমশালী। সকল সৃষ্টিজীবের চেয়ে সমুচ্চ। বড়ত্ব, শ্রেষ্টত্ব ও দাম্ভিকতায় সুমহান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার এসব মহান গুণ তাঁর আয়াতে প্রমাণ করে-

اللهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ

‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোনো মা‘বূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা রক্ষণাবেক্ষণকারী। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহে ও যমীনে যা কিছু আছে, তাঁরই। কে সেই ব্যক্তি, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করে? তিনি লোকদের সমুদয় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থা জানেন। পক্ষান্তরে মানুষ তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুই আয়ত্ত করতে সক্ষম নয়, তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা করেন সেটুকু ব্যতীত। তাঁর কুরসী আসমান ও যমীন পরিবেষ্টন করে আছে এবং এ দু’এর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না, তিনি উচ্চ মর্যাদাশীল, মহান’ (বাক্বারাহ, ২/২৫৫)।

(খ) তিনি এমনই ইলাহ, যার রাজত্বের নিকট সবকিছু বিনয়ী। সকল মাখলূক্বাত বা সৃষ্টিকুল: জড়পদার্থ, পশু-পাখি, মানুষ, জিন ও ফেরশেতাগণ তাঁর অনুগত। মহান আল্লাহর বাণী,وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ ‘তারা কি আল্লাহর দ্বীন ব্যতীত অন্য দ্বীনের অনুসন্ধান করছে? অথচ আসমান ও যমীনে যা আছে, সবই ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং তারই দিকে সকলের প্রত্যাবর্তন’ (আলে ইমরান, ৩/৮৩)।

(গ) তিনি এমন মা‘বূদ, যার হাতে রয়েছে কল্যাণ ও অকল্যাণ। সমস্ত সৃষ্টিকুল একত্রিত হয়ে কারও উপকার করতে চাইলে আল্লাহর নির্ধারিত কল্যাণ ব্যতীত কোনো কল্যাণ সাধিত করতে পারবে না। অনুরূপ সবাই মিলে কারও অকল্যাণ করতে চাইলে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তার কল্যাণ করতে পারবে না। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, وَإِن يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلاَ رَآدَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ‘আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই, আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান অনুগ্রহ দিয়ে ধন্য করেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু’ (ইউনুস, ১০/১০৭)।

(ঘ) তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাধর, তাঁকে কেউ অক্ষম করতে পারবে না। মহান আল্লাহর বাণী, إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ‘তাঁর কাজকর্ম কেবল এ রকম যে, যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাকে হুকুম করেন যে, হয়ে যাও, আর অমনি তা হয়ে যায়’ (ইয়াসীন, ৩৬/৮২)।

(ঙ) তিনি সকল বিষয়ে জ্ঞানী। তিনি গায়েব জানেন। যা ছিল, যা হবে, যা হচ্ছে, যা হয়নি তা যদি হতো, তাহলে কীভাবে হতো সবই তিনি জানেন’।[9]  আল্লাহ তা‘আলার বাণী, إِنَّ اللهَ لاَ يَخْفَىَ عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ ‘নিশ্চয়ই ভূম-লের ও নভঃম-লের কোনো জিনিসই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না’ (আলে ইমরান, ৩/৫)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন, وَمَا يَعْزُبُ عَن رَّبِّكَ مِن مِّثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَلاَ أَصْغَرَ مِن ذَلِكَ وَلا أَكْبَرَ إِلاَّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ‘এমন অণু পরিমাণ বা তাত্থেকে ছোট বা তাত্থেকে বড় বস্তু না আছে পৃথিবীতে, আর না আছে আসমানে যা তোমার প্রতিপালকের দৃষ্টির আড়ালে আছে। তা আছে এক সুস্পষ্ট কিতাবে’ (ইউনুস, ১০/৬১)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন, وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لاَ يَعْلَمُهَا إِلاَّ هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلاَّ يَعْلَمُهَا وَلاَ حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الأَرْضِ وَلاَ رَطْبٍ وَلاَ يَابِسٍ إِلاَّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ‘সমস্ত গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছে, তিনি ব্যতীত আর কেউ তা জানে না, জলে-স্থলে যা আছে তা তিনি জানেন, এমন একটি পাতাও পড়ে না, যা তিনি জানেন না। যমীনের গহীন অন্ধকারে কোন শস্য দানা নেই, নেই কোনো ভেজা ও শুকনো জিনিস যা স্পষ্ট কিতাবে নেই’ (আন‘আম, ৬/ ৫৯)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন, إِنَّ اللهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞানী’ (আনফাল, ৮/৭৫)। এতে কোনো সন্দেহ নেই, উল্লেখিত গুণাবলী যে সত্তার মাঝে পূর্ণভাবে বিদ্যমান, তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য ও প্রকৃত মা‘বূদ।

(চলবে)

[1]. তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৩/৪৮; তাফসীরে সা‘দী ৪/২৯১।

[2]. তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৩/৩৭; তাফসীরে সা‘দী ৬/২৭৪।

[3]. তায়সীরুল কারীমির রাহমান লিস সা‘দী, পৃঃ ৩৩১।

[4]. তায়সীরুল কারীমির রহমান, পৃঃ ৭২৪।

[5]. ইবনুল ক্বাইয়িম রচিত, ‘আমছালুল কুরআন, পৃঃ ৪৭; ইবনুল ক্বাইয়িম, তাফসীরে কাইয়্যিম, ২/৪৯; তাফসীরে বাগাভী, ৩/২৯৮; তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৩/২৩৬; ইমাম শাওকানী, ফাৎহুল ক্বাদীর, ৩/৪৭০; তাফসীরে সা‘দী, ৫/৩২৬।

[6]. তাফসীরে বাগাভী, ৩/৪৬৮; আমছালুল কুরআন, ২১; ইমাম শাওকানী, ফাৎহুল ক্বাদীর, ৪/২০৪।

[7]. তাফসীরে বাগাভী, ৪/৭৮; ইবনু কাছীর, ৪/৫২; তাফসীরে ক্বাইয়িম, ৪২৩; ইমাম শাওকানী, ফাৎহুল ক্বাদীর, ৪/৪৬২; তাফসীরে সা‘দী, ৬/৪৬৮; তাফসীরে জাযাইরী, ৪/৪৩।

[8]. তাফসীরে বাগাভী, ১/২৩৭, ৩/৭১, ২/৮৮; ইবনু কাছীর, ১/৩০৯, ২/৫৭২, ৩/৪২, ২/১২৭, ৪৩৫, ৫৭০, ১/৩৪৪, ২/১৩৮; তাফসীরে সা‘দী, ১/৩১৩, ৭/৬৮৬, ২/৩৮১, ৩/৩৯৭, ৬/৩৬৪, ১/৩৫৬, ২/৩৭২; আযওয়াউল বায়ান, ২/১৮৭, ৩/২৭১।

[9]. তাফসীরে ইবনু কাছীর ১/৩৪৪, ২/১৩৮; তাফসীরে সা‘দী ২/৩৫৬, ২/৩৭২।