কুরআন মাজীদে বর্ণিত শ্রেষ্ঠ প্রাণী পরিচিতি
   এস.এম. আব্দুর রঊফ*


ভূমিকা : মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ

‘পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, এমন কোনো উড়ন্ত জীব নেই, যারা তোমাদের মতো শ্রেণির (Community) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আমি এ গ্রন্থে কোনো কিছুর বর্ণনা করতে ছাড়িনি। অবশেষে তারা সকলেই একত্রিত হবে তাদের প্রভুর সমীপে’ (আল-আনআম, ৬/৩৮)

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের উক্ত আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রাণিজগতের প্রত্যেক শ্রেণি গঠিত হয় তাদের নিজস্ব প্রজাতির আলোকে। এ প্রজাতিভুক্ত প্রাণীরা পৃথিবীর বুকে কেউ হামাগুঁড়ি দিয়ে চলে, কেউবা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করে, আবার কেউ বাতাসে উড়ে বেড়ায়। পৃথিবীতে প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অতি নিবিড়। বিজ্ঞান আবিষ্কারের পূর্বে এ সম্পর্ক তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না, বরং বৈরী ভাবাপন্ন ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির দরুন মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। আল-কুরআনে মানুষ ব্যতীত অন্য যেসব কীটপতঙ্গ ও জীবজন্তুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। যেমন: মৌমাছির চালচলন, মাকড়সার জাল বুনন, মরুভূমির উট, ভারবাহী পশু, শূকর, মৃত পশু-পাখি এসবের উপস্থাপনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।[1] 

আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে ৩০টি শ্রেণির প্রাণীর নাম উল্লেখ করেছেন। সকল জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে অর্থ করতে بهيمة- دابة- أنعام (বাহীমাত, দাব্বাত, আনআম) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় বিশেষ প্রাণীর নাম উল্লেখপূর্বক নির্দেশিত হয়েছে। আল-কুরআনে উল্লিখিত প্রাণীদের বর্ণনা, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, উপকারিতা, অপকারিতা এবং এদের প্রাপ্তিস্থান বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রবন্ধে কুরআনে বর্ণিত সৃষ্টির সেরা প্রাণী মানুষের পরিচিতি, অবস্থা ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

মানুষ : মানুষ শব্দের আরবী প্রতিশব্দ কুরআনেإنْسَانُ- بشر- ناس (ইনসান, বাশার, নাস) উল্লেখ আছে। إنسان শব্দটি পবিত্র কুরআনে ৩৯টি সূরায় ৫৮টি আয়াতে মোট ৫৮ বার উল্লেখ করা হয়েছে। إنسان শব্দটি ال ছাড়া ১ বার (আল-ইসরা, ১৭/১৩), الإنسان তথা ال সহ ৫৬ বার। الناس তথা ال সহ ১৭২ বার। আর তন্মধ্যে ৩৩টি মাক্কী সূরা আর বাকী ৬টি যথা- সূরা আন-নিসা, আল-হজ্জ, আল-আহযাব, আর-রহমান, আল-ইনসান, আয-যিলযাল মাদানী সূরা। إنسان শব্দটি পবিত্র কুরআনের ৫৬টি সূরায় ৫৮ বার পুনঃআবৃতি করা হয়েছে।

মহান আল্লাহর সকল সৃষ্টির সেরা প্রাণী হলো মানুষ। আল্লাহ তাআলার বাণী, لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম অবয়বে’ (আত্ব-ত্বীন, ৯৫/৪)। এই মহাগ্রন্থ অবতীর্ণের একমাত্র উদ্দেশ্য মানবজাতির হেদায়াত; সাথে জিন জাতিরও। মানবজাতির এ হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার উপর কোথাও সংক্ষিপ্ত আবার কোথাও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

হেদায়াতের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে স্রষ্টার সন্ধান লাভ।[2] আর স্রষ্টার জ্ঞান যেহেতু অসীম, তাই সসীম জ্ঞান দিয়ে কোনো সৃষ্টির পক্ষেই অসীম স্রষ্টাকে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। সুতরাং সৃষ্টি তার স্রষ্টা সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করে মাত্র। বিচিত্র এ জগত, তার চেয়েও বিচিত্র এ জগতের মানুষ ও প্রাণীকুল। আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি মানুষ। মানুষ আশরাফুল মাখলূক্বাত। সৃষ্টির সেরা বিভিন্ন বর্ণ, ধর্ম এবং গোত্রের মানুষ ও প্রাণী দ্বারা এ জগৎ পরিপূর্ণ। মানুষ প্রধানত প্রাণী। প্রাণী হিসাবে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। প্রাণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রাণত্ত্ব বা প্রাণবৃত্তি। মানুষেরও একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রাণবৃত্তি।

তবে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত এক স্বতন্ত্র গুণ রয়েছে, যা তাকে অন্যান্য জীব ও প্রাণীকুল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে। এই অতিরিক্ত স্বতন্ত্র গুণ হচ্ছে তার ‘বুদ্ধি’। এ বুদ্ধির কারণেই মানুষ শুধু প্রাণী নয়; সে মানুষ এবং মানুষ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। এখানেই অন্যান্য প্রাণী থেকে তার শ্রেষ্ঠত্ব। আর এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই পৃথিবীর সকল সৃষ্টি তার কর্তৃত্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণে। বস্তুত মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আর মানুষের প্রয়োজন, কল্যাণ ও উপকারার্থে সৃষ্টি করেছেন সকল প্রকার প্রাণী।

মানুষের সাধারণ পরিচিতি : মানুষের আরবী শব্দ ‘আল-ইনসান’। বৈজ্ঞানিক নাম Homo Sapiens.

মানুষের গঠন : দেহ এবং আত্মা- এই দুইয়ের সমন্বয়ে মানুষ গঠিত।

মানুষের প্রধান অন্ত্রসমূহ : ১. ত্বকতন্ত্র ২. কংকালতন্ত্র ৩. পেশীতন্ত্র ৪. পরিপাকতন্ত্র ৫. সংবহনতন্ত্র ৬. শ্বসনতন্ত্র ৭. রেচনতন্ত্র ৮. স্নায়ুতন্ত্র ৯. অন্তঃরেখা গ্রন্থিতন্ত্র ১০. প্রজননতন্ত্র।

মানুষের আদি উৎস (The origin of man) : পৃথিবীতে মানুষের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। এগুলোর মধ্যে অগ্রহণযোগ্য ও ভুল মতবাদ হচ্ছে, চার্লস ডারউইনের ‘মানব বিবর্তনবাদ’ তত্ত্বটি।

এতে ডারউইন বলেছে, প্রতিটি জীব বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বলেই বর্তমান আধুনিক মানব প্রজাতি বিবর্তনের আওতাভুক্ত এবং আদি Primate (chordata) (Legs) এর একটি শাখার উন্নত সংস্করণই বর্তমান সুন্দর মানব।

বহু কোষী কর্ডাটা (chordata) পর্বের মেরুদণ্ডী ও স্তন্যপায়ী চার পা বিশিষ্ট বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি এবং মানুষ প্রাইমেট শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আদি প্রাইমেটের বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন শাখায় কেউ হয়েছে বানর, কেউ হয়েছে গরিলা, কেউ শিম্পাঞ্জি এবং সর্বাধিক বিবর্তনের ফলে সহায়ক প্রজাতির একটি শাখা মানুষে পরিণত হয়েছে।[3]

ঊনবিংশ শতাব্দির বিজ্ঞানীরা ডারউইনের উক্ত মতবাদটি সঠিক নয় বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। কেবল কিছু সংখ্যক নাস্তিক বুদ্ধিজীবী এখনো এ তত্ত্বকে সঠিক বলে থাকে। বাস্তববাদী বিজ্ঞানীরা ডারউইনের উক্ত মতবাদটি অবাস্তব বলে যুক্তি দিয়েছেন যে, ‘যদি বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির বিবর্তনের ফলে মানুষ সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে মানুষের বিচার ক্ষমতা, প্রজ্ঞা, বিবেক, বুদ্ধিমত্তা, আত্মশক্তি, উদ্ভাবনীশক্তি, চিন্তাশক্তি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যও কি বিবর্তনের ফল? যা বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রাণী জগতের মধ্যে একমাত্র মানুষই কথা বলতে পারে।

স্বরযন্ত্রের সাহায্যে শব্দ তৈরি করে কথা বলার জন্য মানুষের মস্তিষ্কে একটা অঞ্চল রয়েছে, যার নাম ‘ব্রোকার জোন’। বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি কিংবা অন্য যে কোনো প্রাণীর মস্তিষ্কে ‘ব্রোকার জোনের’ সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাই অন্যান্য প্রাণীরা কথা বলতে পারে না। এসব বৈশিষ্ট্য ছাড়াও ৬টি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মানুষের আছে, যা বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির মধ্যে নেই।[4] যেমন-

১. চলন : শুধু মানুষই দু’পায়ে হাঁটতে সক্ষম।

২. মুষ্ঠিবদ্ধতা : মুষ্টিবদ্ধ করার ক্ষমতা কেবল মানুষের রয়েছে। লিখা, ইচ্ছামতো নাড়াচাড়া করা, অস্ত্র চালানোর কাজ ও অন্যান্য কাজ করতে পারে মানুষ।

৩. মস্তিষ্কের বিকাশ : মানুষের মস্তিষ্ক এতো বেশি উন্নত, যার ফলে পৃথিবী ভ্রমণ, মহাকাশে অভিযান চালাতে পারে।

৪. শৈশব ও প্রাক-বয়ঃসন্ধিকাল : মানুষের শৈশব ও প্রাক-বয়ঃসন্ধিকাল দীর্ঘ হওয়ায় মা ও শিশুর সম্পর্ক ঘনিষ্ট হয়েছে এবং মায়ের কাছ থেকে শিশু শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছে।

৫. সামাজিক জীবন : উন্নত সামাজিক জীবন মানুষের অন্যতম সাফল্য এবং পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তারের অন্যতম মূল শক্তি।

৬. নৈতিক বিকাশ : নীতিগতভাবে মানুষ সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ও আলো-আঁধার ইত্যাদি পার্থক্য করতে পারে ।

‘মলিকুউল’ ভিত্তিক কার্বন ব্যবহারের ফলে যেসব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, সেসব বিক্রিয়ার ধারাবাহিকতার মধ্যে সৃষ্ট যে প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞনীরা জীবন (Life) হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ প্রক্রিয়া দ্বারা জীবন একটি সিস্টেমে পরিণত হয়েছে এবং জীবনের এ সিস্টেম বৃদ্ধি ও প্রজনন কাজে সাহায্য করেছে। যেসব কোষ দ্বারা মানুষ সৃষ্টি হয়, সেসব কোষকে প্রধানত চার ধরনের জৈব পদার্থ (organic substance) দেখাতে পারে। এসব জৈব পদার্থ হলো- কার্বোহাইড্রেট, ফেটস, নিউক্লিক অ্যাসিড এবং প্রোটিন।

এ চার ধরনের উপাদানের সাথে অজৈব বস্তু (inorganic substance) জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে যে আধুনিক চিন্তা-ভাবনা তা হলো কীভাবে জৈব বস্তু অস্তিত্ব লাভ করেছে। প্রাণীদেহ তৈরি হয় একটার পর একটা কোষ সাজিয়ে। কোষের অভ্যন্তরে যে নিউক্লিয়াস রয়েছে, তার মধ্যে আছে DNA (Dioxiribo Nucleic Acid)। জীবনের শুরু অবশ্যই DNA থেকে। DNA এর গঠন পদ্ধতি এতই জটিল যে, এটিকে দেখতে কিছুটা মোচড়ানো (twisted) মইয়ের মতো মনে হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলে Double Helix (স্ক্রুর ন্যায় পেঁচানো)। এ মইয়ের ধাপগুলো চার ধরনের মলিকুউলের বহুবিধ জোড়ার সংযোগে তৈরি হয়ে থাকে। এরা হলো অ্যাডানিন (adenin), থাইমিন (thyamine), গুয়ানিন (guanine) ও সাইটোসিন (cytosine )।

মানুষ যে দেখতে ঠিক মানুষের মতো, বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির মতো নয়, তার কারণ মানুষের ডিএনএ (DNA) ওদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণীরই রয়েছে আলাদা আলাদা DNA.[5]

কুরআনের আলোকে মানব সৃষ্টি : মানুষের সৃষ্টি প্রসঙ্গে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যাবে যে, এই মানুষের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِيٍّ يُمْنَى ‘মানুষ কি সেই সামান্যতম শুক্র ছিল না, যা সজোরে নির্গত হয়েছিল?’ (আল-ক্বিয়ামাহ, ৭৫/৩৭)। পক্ষান্তরে মানবদেহে এই শুক্র এলো কোথা থেকে? পৃথিবীতে আমরা যা কিছু দেখি এসবের মূল উপাদান হলো মাটি। মাটি থেকেই সমস্ত কিছু সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ মাটি থেকে উৎপন্ন খাদ্য আহার করে। দেহ এবং দেহের অভ্যন্তরে যা কিছু আছে, তা গঠিত হয় গ্রহণকৃত খাদ্যের সার নির্যাস থেকে। মানুষের দেহ থেকেই শুক্র নির্গত হয়। অতএব শুক্রের মূল উপাদান হলো মাটি। এজন্যই বলা হয়, মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে। অসংখ্য কোষ (Cell) দিয়ে মানবদেহ গঠিত। এই অসংখ্য কোষ সর্বপ্রথম বিস্তৃতি লাভ করেছে একটিমাত্র কোষ থেকে। একটি পুরুষ প্রজনন কোষ, যাকে বলা হয় শুক্রানু (Sperm) এবং আরেকটি স্ত্রী প্রজনন কোষ, যাকে বলা হয় ডিম্বানু ((Ovum)। এ দু’টি কোষের কোষ মিলিত হয়ে অন্য একটি কোষ উৎপন্ন হয়, যাকে বলে জাইগোট (Zygote)। বিভাজনের মাধ্যমে এই জাইগোট মহান আল্লাহর নির্দেশে ক্রমশ মাতৃগর্ভে বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। মাতৃগর্ভের জরায়ু (Uterus) থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ভ্রুণ তৈরি হয়।

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

‘হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট অধিকার দাবি করে থাকো এবং আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন আছেন’ (আন-নিসা, ৪/১)

মাতৃগর্ভে আল্লাহর সুনিপুণ ব্যবস্থাপনায় ভ্রুণ বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। এভাবে প্রায় ৪০ সপ্তাহ পর অপূর্ব সুন্দর মানব শিশু পৃথিবীতে আগমন করে। মহান রব্বুল আলামীন বলেন, خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ ‘তিনি মানুষকে এক ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছেন’ (আন-নাহল, ১৬/৪)

নুত্বফা শব্দ দ্বারা শুক্রানু ও ডিম্বানুকে বুঝানো হয়েছে। এসব পদার্থকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যার একটি সাইটোপ্লাজম এবং অপরটি নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসের মধ্যে অবস্থান করে DNA। মূলত এ জিনিসটিই হচ্ছে প্রাণীজগতের বংশগতির ধারক-বাহক। প্রতিটি প্রাণীর DNA ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের। ফলে এক প্রাণীর গর্ভ থেকে ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী জন্মগ্রহণ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا ‘তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্টি করেছেন’ (আন-নূহ, ৭১/১৪)

মানুষ মাতৃগর্ভে কীভাবে অবস্থান করে এবং কয়টি পর্যায় অতিক্রম করে এই পৃথিবীতে আসে? এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,

خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ

‘তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে। অতঃপর তা থেকে তার যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদের জন্য আট প্রকার চতুষ্পদ জন্তু অবতীর্ণ করেছেন। তিনিই মাতৃগর্ভে তিনটি অন্ধকারময় আবরনের মধ্যে তোমাদেরকে একের পর এক সজ্জিত করেছেন। তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদের রব। প্রভুত্ব সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই, তিনি ব্যতীত রাজত্ব লাভের অধিকারী কারো নেই’ (আয-যুমার, ৩৯/৬)

আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর তাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তার আত্মা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যার নাম হাওয়া। তিনি সমগ্র মানবজাতির আদি মাতা। আদম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-এর শুভ বিবাহ হওয়ার পর থেকে সন্তানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরাসরি মানুষ সৃষ্টির আর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًاوَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا

‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের দুজন থেকে বিস্তার করেছেন অগণিত নারী-পুরুষ। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট অধিকার দাবি করে থাকো এবং আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন’ (আন-নিসা, ৪/১)

বর্তমান মেডিক্যাল সাইন্স এই তিনটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আবরণকে বলেছে, (chromosome)। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুসারে প্রতিটি মানুষের দেহে যে কোষ রয়েছে, তার ভিতরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম (chromosome) রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২ জোড়া উভয় লিঙ্গে একই রকম এবং সেগুলোকে অটোসোম (autosome) বলে। কিন্তু ২৩তম জোড়ার ক্রোমোজোম নারী ও পুরুষ সদস্যের ভিন্নতর এবং এগুলোকে হেটারোজোম (heterosome) বা সেক্স ক্রোমোজোম (sex chromosome) বলে। মানব দেহে দু’ধরনের সেক্স ক্রোমোজম রয়েছে, যা (x) ও (y) ক্রোমোজোম নামে পরিচিত। যার দেহে ২৩তম ক্রোমোজোম জোড় দুটি (x) ক্রোমোজোমে (x x) গঠিত সে ব্যক্তি নারী। অন্যদিকে যার দেহে ২৩ ক্রোমোজোম জোড়ের একটি (x) ও অন্যটি (y) ক্রোমোজোম (x y) সে ব্যক্তি পুরুষ। স্ত্রী গ্যামিট (ডিম্বানু) যদি (y) ক্রোমোজোমবাহী পুরুষ গ্যামিট দিয়ে নিষিক্ত হয়, তাহলে সন্তান হবে পুত্র (x y)। আর যদি (x) ক্রোমোজোমবাহী গ্যামিট দিয়ে নিষিক্ত হয়, তাহলে সন্তান হবে কন্যা (x x)। অর্থাৎ পিতার গ্যামিটই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য দায়ী; এ ক্ষেত্রে মায়ের কোনো ভূমিকা নেই।[6] মহান আল্লাহ বলেন,وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ جَعَلَكُمْ أَزْوَاجًا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنْثَى وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ‘আল্লাহ তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর শুক্রকীট থেকে। এরপর তোমাদেরকে জোড়ায় পরিণত করা হয়েছে। তার জ্ঞানের বাইরে কোনো নারী গর্ভবতী হয় না বা সন্তান প্রসব করে না’ (ফাতির, ৩৫/১১)। তিনি আরও বলেন,

ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ

‘অতঃপর আমি ওকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আঁধারে। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিণ্ডে, অতঃপর রক্তপিণ্ডকে পরিণত করি গোশতপিণ্ডে এবং গোশতপিণ্ডকে পরিণত করি হাড়সমূহে; অতঃপর হাড়সমূহকে ঢেকে দিই গোশত দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে; অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান’ (আল-মুমিনূন, ২৩/১৩- ১৪)

মানুষ আশরাফুল মাখলূক্বাত। মহান আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের দুটি পরিচয় আছে। এক আল্লাহর দাস এবং অপরটি আল্লাহর প্রতিনিধি। একদিক থেকে মানুষ জন্মগতভাবেই আল্লাহর প্রতিনিধি আর অপরটি হলো দাস। তাতে সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, প্রতিনিধি হিসাবে মহাবিশ্বে বা জান্নাতে তার গন্তব্যস্থল এলাকা নির্ধারিত হয়ে আছে। দাস হিসেবে তাকে যাবতীয় বিধান মেনে চলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।[7] এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا لِيُعَذِّبَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ وَيَتُوبَ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا

‘তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।


* পি-এইচ.ডি গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; এ্যারাবিক লেকচারার, শরীফবাগ কামিল মাদরাসা, ধামরাই, ঢাকা।

[1]. মুহাম্মাদ আবু তালেব, Al Quran is all science (চতুর্থ সংস্করণ, আরজু পাবলিকেশন্স), পৃ. ২৩৫।

 [2]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।

[3]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।

[4]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।

[5]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।

[6]. গাজী আজমল ও গাজী আসমত, উচ্চ মাধ্যমিক জীব বিজ্ঞান, ২য় পত্র, প্রাণিবিজ্ঞান, পৃ. ৪৯-৫০।

[7]. মানুষ ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য (ই.ফা.বা.), পৃ. ১৪২।