কুরবানীর পশু

মুফতী মো. আব্দুর রঊফ বিন মো. আইয়ূব আলী মাদানী*
* শিক্ষক (ফিক্বহ), মাদরাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া,
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

ভূমিকা : কুরবানী একটি মহৎ ইবাদত। ইসলামের বড় বড় নিদর্শনাবলির অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে কুরবানী। কুরবানীর মাধ্যমে এক দিকে যেমন মহান আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করা যায়, অন্যদিকে এর মাধ্যমে গরীব, দুঃখী, ফক্বীর, মিসকীনদের অন্তত বছরে একবার ভালো খাবারের ব্যবস্থা হয়। কুরবানী বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে কুরবানীর জন্তু বা পশু। কুরবানী যেহেতু একটি ইবাদত, সেহেতু অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় শরী‘আতের দিক-নির্দেশনা মেনেই ইবাদতটি পালন করতে হবে। নিজের খেয়াল-খুশিমত কুরবানী করলে সেটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কুরবানীর পশু সম্পর্কে শরী‘আতের দিক-নির্দেশনা মেনে আমাদের কুরবানী করতে হবে। যে কোনো পশু কুরবানী করা যাবে না। একমাত্র শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত পশুই আমাদেরকে কুরবানী করতে হবে। ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত পশু সম্পর্কে জানতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য ও তাওফীক্ব কামনা করছি, তিনি যেন সংশ্লিষ্ট বিষয়টিতে হক্ব আদায় করে লেখার শক্তি প্রদান করেন- আমীন!

কুরবানীর পশুর জাত : কুরবানীর পশুর জাত দ্বারা উদ্দেশ্য কোন জাতীয় পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। আল্লাহ আমাদের জন্য অনেক পশু হালাল করেছেন, কিন্তু সব হালাল পশু দ্বারা কুরবানী করাকে বৈধ করেননি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,  وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমরা কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে ঐ সকল গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশুর উপর, যেগুলোকে আল্লাহ তাদের জন্য রিযিক্ব হিসাবে দিয়েছেন’ (হজ্জ, ৩৪)।

উক্ত আয়াতে بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ দ্বারা উদ্দেশ্য গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশু তথা উট (إِبل), গরু ((بقر ও ছাগল (غنم)। আরবদের নিকট এটাই সুবিদিত। আর এটি বলেছেন, মুকাতিল।[1]  এছাড়া হাসান, ক্বাতাদাহ এবং আরও অনেকে এমনটিই বলেছেন।

তাছাড়া নবী (ছা.) ছাগল এবং গরু কুরবানী করেছেন। ছহীহ বুখারীতে এসেছে, ضَحَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَزْوَاجِهِ بِالْبَقَرِ ‘রাসূল (ছা.) তার স্ত্রীদের তরফ থেকে একটি গরু দ্বারা কুরবানী করেছিলেন’।[2]   আনাস (রা.) বলেন, كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ، وَأَنَا أُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ ‘নবী (ছা.) দু’টি করে ভেড়া কুরবানী করতেন এবং আমিও দু’টি করে ভেড়া কুরবানী করি’। [3] ছাহাবীগণ উট দ্বারা কুরাবানী করেছেন।[4]  এমনকি নবী (ছা.) কোন জাতীয় পশু দ্বারা কুরবানী যথেষ্ট হবে, তা বর্ণনা করেছেন। তিনি তার বর্ণনার মাঝে কেবল উট, গরু ও ছাগলের কথা উল্লেখ করেছেন।[5]

কুরবানী হজ্জে জবাইযোগ্য হাদির ন্যায়। সুতরাং হাদিতে যেমন উট, গরু, ছাগল ব্যতীত অন্য প্রাণী বৈধ নয়, তেমনি কুরবানীতেও এ তিন জাতীয় পশু ছাড়া জায়েয নয়।[6]

আলেমগণও একমত পোষণ করেছেন যে, কুরবানীর পশু হতে হবে গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশু তথা উট, গরু, ছাগল। কোনো বন্যজন্তু অথবা পাখি জাতীয় প্রাণী দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। আল্লামা ইবনু রুশদ আল-হাফীদ আল-মালেকী (মৃ. ৫৯৫ হি.) বলেন, أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى جَوَازِ الضَّحَايَا مِنْ جَمِيعِ بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ ‘আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন যে, কুরবানী বৈধ সব ধরনের গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশু দ্বারা’।[7]  ইমাম আবু ইসহাক্ব আশ-শীরাযী আশ-শাফেঈ (মৃ. ৪৭৬ হি.) বলেছেন, , وَلَا يُجْزِئُ فِي الْأُضْحِيَةِ إِلَّا الْأَنْعَامُ وَهِيَ الْإِبِلُ وَالْبَقَرُ وَالْغَنَمُ ‘কুরবানীতে গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশু তথা উট, গরু, ছাগল ছাড়া অন্য কিছু যথেষ্ট হবে না’।[8]  আল্লামা ইবনু কুদামাহ আল-হাম্বলী (মৃ. ৬২০ হি.) বলেছেন, وَلَا يُجْزِئُ إِلَّا بَهِيْمَةُ الْأَنْعَامِ ‘কুরবানীতে গৃহপালিত চতুষ্পদ ‘গবাদি পশু ছাড়া চলবে না’।[9] তিনি গবাদি পশুর ব্যাখ্যায় বলেন, তা হলো-উট, গরু ও ছাগল।[10]  আল্লামা আবুল হুসাইন আল-কুদুরী (রহি.) (মৃ. ৪২৮ হি.) বলেছেন, و وَالْأُضْحِيَّةُ مِنَ الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ وَالْغَنَمِ ‘কুরবানীর পশু হতে হবে উট, গরু ও ছাগল হতে’।

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারলাম যে, প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের আলেমগণসহ অধিকাংশ আলেম একমত পোষণ করেছেন যে, কুরবানীর জন্য অবশ্যই গবাদি পশু তথা উট, গরু, ছাগল- এই তিন জাতের হতে হবে। বরং অনেকে এ বিষয়ে ইজমা‘ সঙ্ঘটিত হওয়ার দাবী করেছেন। এটাই সঠিক মত।

তবে যাহিরীদের মতে, সব ধরনের হালাল পশু তা বন্য হোক বা গৃহপালিত হোক, তা দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। অনুরূপভাবে সব ধরনের হালাল পাখি তা গৃহপালিত হোক কিংবা বন্য হোক, তা দ্বারা কুরবানী করা বৈধ।[11]  ইবনু হাযম যাহেরী (মৃ. ৪৫৬ হি.) বলেন, চার পা বিশিষ্ট প্রত্যেক হালাল পশু দ্বারা অথবা হালাল পাখি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। যেমন- ঘোড়া, উট, বুনো গরু, মোরগ এবং অন্য হালাল সমস্ত পশু-পাখি।[12]  তাদের দলীল হচ্ছে,

مَنِ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ، ثُمَّ رَاحَ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الْخَامِسَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً

রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিনে বড় নাপাকির গোসলের ন্যায় পরিপূর্ণভাবে গোসল করে প্রথম সময়ে মসজিদে গমন করল, সে যেন একটা উট কুরবানী করল। যে দ্বিতীয় সময়ে গমন করল, সে যেন একটা গরু কুরবানী করল। যে তৃতীয় সময়ে গমন করল, সে যেন একটি ভেড়া কুরবানী করল। যে চতুর্থ সময়ে গমন করল, সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে গমন করল, সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল’।[13] হাদীছটিতে মুরগী, এমনকি ডিম কুরবানী করার কথা বলা হয়েছে। আর এটা থেকে যাহেরীরা বুঝেছেন যে, মুরগীসহ সব ধরনের হালাল পশু-পাখি দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। কিন্তু তাদের এ বুঝ সঠিক নয়। তারা হাদীছটাকে যথার্থ বোঝেননি। তাই তো আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহি.) (মৃ. ৮৫৫ হি.) বলেছেন, উপর্যুক্ত হাদীছ দ্বারা যাহেরীদের দলীল পেশ করা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ হাদীছটির উদ্দেশ্য হলো জুম‘আর ছালাতের বিভিন্ন সময়ে গমনকারীদের ছওয়াবের পরিমাণ বর্ণনা করা। কী দিয়ে কুরবানী জায়েয, সেটা বর্ণনা করা হাদীছটির উদ্দেশ্য নয়।[14]  অনুরূপভাবে যাহেরীরা বেলাল (রা.)-এর একটি আছার দিয়ে দলীল পেশ করে থাকে, যেখানে বেলাল (রা.)  বলেছেন, مَا أُبَالِي لَوْ ضَحَّيْتُ بِدِيكٍ ‘আমি মোরগ দ্বারা কুরবানী করাতেও পরোয়া করি না’।[15]   এর সনদ ছহীহ।

উক্ত আছারটি দ্বারা যাহেরীদের দলীল পেশ করা আদৌ সমীচীন নয়। কারণ এটা বেলাল (রা.)-এর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ, যা পূর্বে বর্ণিত আয়াতের বিপরীতে, যেটা আদৌ দলীল হিসাবে দাঁড়াতে পারে না।

আবার হাসান ইবন ছালেহ (মৃ. ১৬৯ হি.) থেকে কথিত আছে, বুনো গরু দ্বারা সাত পর্যন্ত এবং একজনের পক্ষ থেকে একটি হরিণ দ্বারা কুরবানী করা বৈধ।[16]   তবে তার এ কথার উপর কোনো দলীল নেই। অতএব তার একথা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন।

পূর্বের আলোচনা থেকে আমাদের নিকট স্পষ্ট হলো যে, بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ গৃহপালিত চতুষ্পদ গবাদি পশু তথা উট, পৃহপালিত গরু ও ছাগল দ্বারাই কেবল কুরবানী বৈধ। বন্য গাধা, বনগরু, হরিণ অথবা অন্যান্য কোনো পশু-পাখি দ্বারা কুরবানী করা বৈধ নয়।

মাসআলা : যদি বন্য এবং গৃহপালিত পশুর সমন্বয়ে কোনো পশু জন্মগ্রহণ করে, তাহলে দেখতে হবে মা কি বন্য, না-কি গৃহপালিত। যদি মা বন্য হয়, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে বাচ্চা দ্বারা কুরবানী চলবে না। আর যদি মা গৃহপালিত হয় তাহলে হানাফী মাযহাবের মতে উক্ত বাচ্চা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। কিন্তু মালেকী, শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাব মতে উক্ত বাচ্চা দ্বারা কুরবানী করা বৈধ নয়।[17]

উল্লেখ্য, যে তিন জাতের পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ, তার প্রত্যেকটির মাদী ও নর দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। অনুরূপভাবে ছাটানো বা প্যারাই করা হোক বা না হোক- তা দ্বারাও কুরবানী করা বৈধ। ফক্বীহগণ এমনটিই বলেছেন।[18]

কুরবানীর পশুর প্রজাতি : আমরা জেনে আসলাম যে, কেবলমাত্র তিন জাতের গবাদি পশু তথা গৃহপালিত উট, গরু ও ছাগল দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। এখন আমরা জানবো যে, এ তিন জাতের পশুর বিভিন্ন প্রজাতি আছে, যেগুলোর সব প্রজাতি দ্বারাই কুরবানী করা বৈধ। যেমন- বাখাতী, ইরাব, মাহারিয়া, আরহাবিয়া, মাজিদিয়া প্রভৃতি প্রজাতির উট আছে। অনুরূপভাবে গরু-ছাগলেরও বিভিন্ন প্রজাতি আছে। এগুলোর প্রত্যেকটি দিয়েই কুরবানী বৈধ।

মহিষ দ্বারা কি কুরবানী বৈধ? : উট ও ছাগলের বিভিন্ন প্রজাতি দ্বারা কুরবানী বৈধ হওয়ার বিষয়ে বিশ্বের ওলামায়ে কেরামের মাঝে কোনো মতভেদ পরিলক্ষিত হয় না। অনুরূপ গরুর বিভিন্ন প্রজাতি দ্বারা কুরবানী বৈধ হওয়ার বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে কোনো মতভেদ না থাকলেও গরুর অন্যতম একটি প্রজাতি মহিষ দ্বারা কুরবানী বৈধ কিনা তা নিয়ে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে বিতর্ক আছে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছের একাংশের নিকট মহিষ দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়। এজন্য মহিষ দ্বারা কুরবানী জায়েয কিনা সে বিষয়টি আমরা পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরামের মতামতসহ পাঠক সমীপে উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।

মহিষ গরুর একটি প্রজাতি। এ হিসাবে মহিষ দ্বারা কুরবানী করা বৈধ হওয়াটাই কুরআন-সুন্নাহর দাবি। মহিষ যে গরুর একটি প্রজাতি এ বিষয়ে অনেকেই বলেছেন। তাদের কয়েকজন হলেন:

(১) বিখ্যাত তাবেঈ লাইছ ইবনে আবী সুলাইম (মৃ. ১৩৮ হি.) : তিনি বলেছেন, মহিষ এবং বাখাতী উট কুরআনে বর্ণিত আট শ্রেণির গবাদি পশুর অন্তর্ভুক্ত। [19]

(২) বিখ্যাত মুফাসসির মুহাম্মাদ তাহের ইবনে আশূর (মৃ. ১৩৯৩ হি.) : তিনি করেছেন যে, মহিষ গরুর একটি প্রজাতি। এটা পাওয়া যেত পারস্য দেশে। পরবর্তীতে তা আরবদেশে প্রবেশ করে।[20]

(৩) প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ছাবুনী : তিনি তার তাফসীরগ্রন্থ صفوة التفاسير -এ وَمِنَ الْبَقَرِ اثْنَيْن-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন গরু হতে দু’টি অর্থাৎ মহিষ এবং গাভী।[21]

(৪) আবুল ইউম্ন আল-উলাইমী (মৃ. ৯২৭ হি.) : তিনি বলেছেন, সর্বসম্মতিক্রমে মহিষ গরুর একটি প্রজাতি।[22]

এছাড়া আরও অনেকেই মহিষকে بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন স্পষ্টভাবে। অতএব মহিষ যেহেতু গরুর একটি প্রজাতি, সেহেতু মহিষ দ্বারা কুরবানী করা বৈধ এবং এটিই সঠিক ও চূড়ান্ত।

যেসব ফক্বীহ স্পষ্টভাবে তাদের কিতাবে মহিষ দ্বারা কুরবানী বৈধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

(১) আল্লামা কাসানী (মৃ. ৫৮৭ হি.) : কুরবানীযোগ্য পশুর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মহিষ গরুর একটি প্রজাতি। দলীল হলো যাকাতের ক্ষেত্রে সেটাকে গরু ও ছাগলের সাথে যুক্ত করা হয়’।[23]

(২) মারগীনানী (মৃ. ৫৯৩ হি.) : তিনি বলেছেন, মহিষ গরুর অন্তর্ভুক্ত। কারণ সেটা গরুর একটা প্রজাতি।[24]

(৩) মুহাম্মাদ আল-আরাবী আল-কুরাবী : তিনি মহিষকে কুরবানীর পশুর ভিতরে উল্লেখ করেছেন।[25]

(৪, ৫ ও ৬) আবু আব্দিল্লাহ আল-মাযেরী আল-মালেকী (মৃ. ৫৩৬ হি.), ক্বাযী আয়ায (মৃ. ৫৪৪), ইমাম কুরতুবী আল-মালেকী (মৃ. ৬৫৬ হি.): তারা সবাই বলেছেন, الجاموس: ضربٌ من البقر ‘মহিষ গরুর একটি প্রকার’।[26]

(৭) ইমাম নববী (মৃ. ৬৭৬ হি.) : তিন বলেছেন, কুরবানীতে যথেষ্ট হওয়ার জন্য পশুকে بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ বা গবাদি পশু তথা উট, গরু ও ছাগল হতে হবে। আর উটের সকল প্রজাতি, যেমন- ইরাব, বাখাতী; গরুর সকল প্রজাতি, যেমন- মহিষ, ইরাব, দুরবানিয়া এবং ছাগলের সকল প্রজাতি, যেমন-  ভেড়া ((ضأن, ছাগল (معز) ইত্যাদি কুরবানীতে বরাবর।[27]

(৮) মারঈ আল-কারামী আল-হাম্বালী (মৃ. ১০৩৩ হি.) : তিনি  বলেছেন, কুরবানীতে উপযুক্ত হওয়ার জন্য গরু ও মহিষের বয়স দুই বছর পূর্ণ হতে হবে। [28]

(৯) ইমাম বুহুতী হাম্বালী (মৃ. ১০৫১ হি.) : তিনি বলেছেন, হাদি এবং কুরবানীতে মহিষ গরুর মতো।[29]

(১০) ইবনে  উছায়মীন (রহি.) : তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল মহিষ দ্বারা কি কুরবানী করা যাবে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, মহিষ এক প্রকার গরু।[30]

(১১) মদীনার বিখ্যাত মুহাদ্দিছ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (হাফি.) : তিনি ‘মহিষ দ্বারা কুরবানী করা যাবে কি না’ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মহিষ গরুর অন্তর্ভুক্ত (অর্থাৎ মহিষ দ্বারা কুরবানী জায়েয)।[31]

পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মহিষ গরুর একটি প্রজাতি এবং তা দ্বারা কুরবানী করা বৈধ এবং যুগে যুগে ওলামায়ে কেরাম একথাই বলেছেন।

উল্লেখ্য, ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মির‘আতুল মাফাতিহ-এর লেখক উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী মত প্রকাশ করেন যে, মহিষ দ্বারা কুরবানী জায়েয হওয়ার বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট নয় এবং তিনি ইঙ্গিতে জানান যে, মহিষ দ্বারা কুরবানী করা বৈধ নয়।[32]

আমি বলতে চাই, মুবারকপুরীর পূর্বে মহিষ কুরবানী নাজায়েযের ফৎওয়া আর কেউ দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।

তাছাড়া মুবারকপুরী তার মতের পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে কোনো দলীল পেশ করেননি; বরং তার একমাত্র অবলম্বন হলো মহিষ এবং গরু ভিন্ন প্রাণী। অথচ আমরা বিভিন্ন সূত্রে প্রমাণ করেছি যে, মহিষ গরুর একটি প্রজাতি। আল্লাহই ভালো জানেন।

কুরবানীর পশুর বয়স : শরী‘আত কুরবানীর উপযুক্ত হওয়ার জন্য পশুর একটা বয়সসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে বয়সে না পৌঁছলে পশু কুরবানীতে চলবে না। রাসূল (ছা.) বলেছেন, لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ ‘তোমরা উপযুক্ত বয়সের প্রাণী ছাড়া কুরবানীতে জবাই করবে না। তবে যদি উপযুক্ত বয়স পাওয়াটা তোমাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, তাহলে তোমরা ছয় মাস বয়সী ভেড়া দ্বারা কুরবানী করতে পারবে।[33]

আলোচ্য হাদীছের বাহ্যিক অর্থ থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভেড়ার জন্যও উপযুক্ত বয়স এক বছর ছাগলের ন্যায়। তবে যদি উপযুক্ত বয়স দুঃসাধ্য হয়, তাহলেই কেবল ভেড়ার ছয় মাসের বাচ্চা দ্বারা কুরবানী চলবে, নতুবা চলবে না। কিন্তু আসলে এখানে বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়, বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো ভেড়ার ক্ষেত্রে মুস্তাহাব হলো, এক বছরের বাচ্চা কুরবানী করা, নতুবা ছয় মাসের ভেড়ার বাচ্চা দিয়ে কুরবানী করা জায়েয এক বছরের বাচ্চা পাওয়া যাক বা না যাক এবং এর উপরেই আলেমগণ ইজমা‘ করেছেন।[34]  ইমাম নববী (রহি.) ও এমনটিই বলেছেন।[35] আওনুল মা‘বূদের লেখক শামসুল হক্ব আযীমাবাদী বলেছেন, এখানে এ ব্যাখ্যাই অপরিহার্য।[36]

পূর্বে উল্লেখিত হাদীছে বর্ণিত مسنة বা উপযুক্ত বয়সের পশু দ্বারা উদ্দেশ্য الثني তথা যার  সামনে থেকে ২টি দুধের দাঁত পড়ে গিয়ে আবার ২টি নতুন দাঁত গজিয়েছে।[37]

ইমাম নববী (রহি.) বলেছেন, গোটা মুসলিম উম্মাহর আলেমগণ ইজমা‘ করেছেন যে, উট, গরু ও ছাগল ثني বা দাঁতালো না হলে কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না। ভেড়া কমপক্ষে ছয় মাসের না হলে যথেষ্ট হবে না।[38]  নাফে‘ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)  কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে এবং হাদির পশুর ক্ষেত্রে ছানী (ثني)-এর কথা বলতেন।[39]

তবে মনে রাখতে হবে যে, মুসিন্নাহ (مسنة) তথা উপযুক্ত বয়স দ্বারা আলেমগণ ছানী (ثني) তথা দাঁতালো উদ্দেশ্য করলেও তারা মূলত মুসিন্নাহ বা ছানী দ্বারা দাঁতের দিকে না দেখে, বরং নির্ধারিত বয়সের দিকে দেখেছেন এবং তারা এটা করেছেন যৌক্তিক কারণে। আর সেটা হলো আরবী ভাষায় এ শব্দগুলো নির্ধারিত একটি বয়স বোঝায়। যেমন جذعة শব্দটি নিঃসন্দেহে এমন পশু, যার দুধের দাঁত পড়ে এখনো নতুন দাঁত ওঠেনি। আর ভেড়ার জাযা‘আহ (جذعة) দ্বারা কুরবানী করা ঐকমত্যের ভিত্তিতে জায়েয। তাহলে যদি বলা হয় جذعة এর নির্ধারিত বয়স নেই; বরং যারই দুধের দাঁত পড়ে এখনো নতুন দাঁত ওঠেনি সেই জাযা‘আহ, তবে এক মাসের বা দুই মাসের ভেড়ার বাচ্চা দ্বারাও কুরবানী জায়েয হয়ে যাবে। অথচ এটা কোনো আলেম বলেননি। এজন্য جذعة তথা যার এখনো দুধের দাঁত পড়ে নতুন দাঁত ওঠেনি, সেটার যেমন একটা নির্ধারিত বয়স আছে, তেমনি মুসিন্নাহ (مسنة) বা ছানী (ثني) তথা যার সামনে দু’টি নতুন দাঁত উঠেছে, তারও একটি নির্ধারিত বয়স আছে। এটি একটি কারণ। দ্বিতীয় কারণ, দেশ ও আবহাওয়া ভেদে পশুর দাঁত উঠতে সময় কমবেশি হতে পারে। এজন্য ফক্বীহগণ দাঁতের দিকে না তাকিয়ে বয়স নির্ধারিত করেছেন। আর এজন্য বয়স নির্ধারণে তাদের মাঝে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

আল্লামা ইবনু উছায়মীন বলেছেন, উটের ছানী হলো যার বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে, গরুর ছানী হচ্ছে যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে, ভেড়ার জাযা‘আহ হচ্ছে, যার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে।[40]

সঊদী আরবের স্থায়ী ফৎওয়া কমিটির ফৎওয়াতে এসেছে, শরী‘আতের দলীলসমূহ প্রমাণ করে যে, ভেড়ার বাচ্চার ছয় মাস পূর্ণ হলে তা দ্বারা কুরবানী চলবে, ছাগলের বয়স এক বছর পূর্ণ হলে, গরুর দুই বছর পূর্ণ হলে এবং উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হলে তা দ্বারা কুরবানী চলবে।[41] আল্লাহই ভালো জানেন।

পরিশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে কুরবানীর বিধান সঠিকভাবে জেনে কুরবানী করার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন!

[1]. তাফসীরে মুকাতিল, ১১/৪৪৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৪৮।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৫৩।

[4]. তিরমিযী, হা/৯০৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩১৩১, হাদীছটি ছহীহ।

[5]. আল-মাউনা আলা মাযহাবী আহলিল মাদীনাহ, ১/৬৫৮।

[6]. আল-হেদায়া শারহু বিদায়াতিল মুবতাদী, ৪/৩৫৯।

[7]. বেদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/১৯২।

[8]. আল-মুহাযযাব ফী ফিক্বহিল ইমাম আশ-শাফেঈ, ১/৪০৩।

[9]. আল-কাফী ফী ফিক্বহিল ইমাম আহমাদ, ১/৫৪৩।

[10]. আল-মুগনী, ৯/৪৪০।

[11]. আল-বেনায়া শরহুল হেদায়া, ১২/৪৫।

[12]. আল-মুহাল্লা বিল আছার, ৬/২৯।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫০।

[14]. আল-বেনায়া শরহুল হেদায়া, ১২/৪৬।

[15]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/৮১৫৬।

[16]. আল-ইশরাফ আলা মাযাহিবিল উলামা, ৩/৪০৬।

[17]. বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৬৯; আল-মুগনী, ৯/৪৪০; হাশিয়াতুল আদাবী, ১/৫৬৮।

[18]. দ্রষ্টব্য: বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৬৯; আয-যাখীরা, ৪/১৪৪; আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাযযাব, ৮/৩৯৩; আল-ফুরু ওয়া তাছহীহুল ফুরু, ৬/৮৫; আল-মুগনী, ৯/৪৪২।

[19]. তাফসীরে ইবনু আবী হাতেম, পৃ. ৭৯৯।

[20]. আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, ৮/১২৯।

[21]. ছফওয়াতুত তাফাসীর, পৃ. ৩৯৪।

[22]. তাফসীরে ফাতহুর রহমান, ৩/২০৪।

[23]. বাদায়েউল সানায়ে, ৫/৬৯।

[24]. আল-হেদায়া, ৪/৩৫৯।

[25]. আল-খুলাছাতুল ফিক্বহিয়্যাহ আলা মাযহাবিস সাদাতিল মালিকিয়্যাহ, পৃ. ২৬৮।

[26]. আল-মুলিম, ১/৩২৬; ইকমালুল মুলিম, ১/৪৮৮; আল মুফহিম, ১/৩৭৯।

[27]. আল-মাজমূ‘, ৮/৩৯৩।

[28]. দালীলুত তলিব, পৃ. ১১২।

[29]. কাশশাফুল কিনা, ২/৫৩৩।

[30]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়াল উছাইমীন, ২৫/৩৪।

[31]. আজুররি ওয়েব সাইট, দারসে তিরমিযী, অডিও ক্লিপ নং ১৭২।

[32].  মিরআতুল মাফাতীহ, ৫/৮১।

[33]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৩।

[34]. তালখীছুল হাবীর, ৫/২৪৫।

[35]. শরুহুল নববী আলা ছহীহ মুসলিম, ১৩/১১১৭।

[36]. আওনুল মা‘বূদ, ৭/৩৫৪।

[37]. কিতাবুল আইন, ৮/২৪৩।

[38]. আল-মাজমূ‘, ৪/৩৬৬।

[39]. মুওয়ত্ত্বা মালেক, হা/১১১৭।

[40]. ফাতাওয়া ‘ইয়াস আলুনাক’, ৩/১১৪।

[41]. ফাতাওয়াল লাজনা আদ-দায়েমা, ১১/৩৭৭।