ক্বদরের রাত কোনটি?
-মাক্বছুদুর রহমান*



রামাযান আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। অফুরন্ত ছওয়াব ও অধিক কল্যাণে পরিপূর্ণ এ মাস। এ উম্মতের জন্য এই মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিষেশ নিয়ামত ও রহমত। এ মাসে লায়লাতুল ক্বদর রাতের বরকত ও কল্যাণের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ – فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ – أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ – رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.

‘আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে। নিশ্চয় আমি রাসূল প্রেরণকারী। আপনার প্রতিপালকের রহমতস্বরূপ। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (আদ-দুখান, ৪৪/৩-৬)

মহান আল্লাহ এ রাতকে বরকতময় করেছেন। তাই এ রাত কল্যাণ, বরকত ও মর্যাদায় পরিপূর্ণ। আল-কুরআনের অবতরণই এ রাতকে মহিমান্বিত করেছে। এ রাতের মর্যাদা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মানুষের রিযিক্ব, বয়সসীমা, ভালো ও মন্দ সবকিছু এ রাতেই লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ – وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ – تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَة وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ – سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ.

‘নিশ্চয় আমি ক্বদরের রাতে কুরআন নাযিল করেছি। আর আপনি কি জানেন, ক্বদরের রাত কী? ক্বদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ সকল বিষয়ের (সিদ্ধান্ত) নিয়ে তাদের রবের অনুমতিক্রমে নাযিল হন। ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে রাত শান্তিময় থাকে (আলক্বদর, ৯৭/)

কিন্তু কোনটি ক্বদরের রাত, তা নির্ধারণে আলেমগণের মধ্যে অনেকগুলো মতামত পাওয়া যায়। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘লায়লাতুল ক্বদর নির্ধারণে আলেমগণ ব্যাপক মতপর্থক্য করেছেন। এ ব্যাপারে আমাদের নিকট আলেমগণের চল্লিশেরও অধিক মতামত রয়েছে’।[1]

তিনি ৪৬টি মত উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এই মতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য মত হলো শেষ দশকের যে কোন বিজোড় রাত্রি হলো লায়লাতুল ক্বদর। তবে এই রাতটি স্থানান্তরিত হতে থাকে, যেমনটি এ সংক্রান্ত হাদীছগুলো থেকে জানা যায়। শেষ দশকের বিজোড় রাতে লায়লাতুল ক্বদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি’।[2] আবার শেষ দশকের জোড় রাতগুলোতেও হওয়ার সম্ভাবনাও একেবারে কম নয়। দলীলগুলোর পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

বিজোড় রাতগুলোতে লায়লাতুল ক্বদর হওয়ার দলীল :

১. আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يُجَاوِرُ فِي رَمَضَانَ العَشْرَ الَّتِي فِي وَسَطِ الشَّهْرِ فَإِذَا كَانَ حِينَ يُمْسِي مِنْ عِشْرِينَ لَيْلَةً تَمْضِي وَيَسْتَقْبِلُ إِحْدَى وَعِشْرِينَ رَجَعَ إِلَى مَسْكَنِهِ وَرَجَعَ مَنْ كَانَ يُجَاوِرُ مَعَهُ وَأَنَّهُ أَقَامَ فِي شَهْرٍ جَاوَرَ فِيهِ اللَّيْلَةَ الَّتِي كَانَ يَرْجِعُ فِيهَا فَخَطَبَ النَّاسَ، فَأَمَرَهُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ كُنْتُ أُجَاوِرُ هَذِهِ العَشْرَ ثُمَّ قَدْ بَدَا لِي أَنْ أُجَاوِرَ هَذِهِ العَشْرَ الأَوَاخِرَ فَمَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِي فَلْيَثْبُتْ فِي مُعْتَكَفِهِ وَقَدْ أُرِيتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ ثُمَّ أُنْسِيتُهَا، فَابْتَغُوهَا فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ وَابْتَغُوهَا فِي كُلِّ وِتْرٍ وَقَدْ رَأَيْتُنِي أَسْجُدُ فِي مَاءٍ وَطِينٍ فَاسْتَهَلَّتِ السَّمَاءُ فِي تِلْكَ اللَّيْلَةِ فَأَمْطَرَتْ فَوَكَفَ المَسْجِدُ فِي مُصَلَّى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ لَيْلَةَ إِحْدَى وَعِشْرِينَ فَبَصُرَتْ عَيْنِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَنَظَرْتُ إِلَيْهِ [ص:47] انْصَرَفَ مِنَ الصُّبْحِ وَوَجْهُهُ مُمْتَلِئٌ طِينًا وَمَاءً.

‘আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসের মাঝের দশকে ই‘তিকাফ করতেন। ২০ তারিখ দিবাগত সন্ধ্যায় এবং ২১ তারিখের শুরুতে তিনি এবং তাঁর সঙ্গে যারা ই‘তিকাফ করেছিলেন সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে প্রস্থান করেন এবং তিনি যে মাসে ই‘তিকাফ করেন, ঐ মাসের যে রাতে ফিরে যান সে রাতে লোকদের সামনে ভাষণ দেন। আর তাতে মাশাআল্লাহ, তাদেরকে বহু নির্দেশ দান করেন। অতঃপর বলেন, আমি এই দশকে ই‘তিকাফ করেছিলাম। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শেষ দশকে ই‘তিকাফ করব। যে আমার সঙ্গে ই‘তিকাফ করেছিল, সে যেন তার ই‘তিকাফস্থলে থেকে যায়। আমাকে সে রাত দেখানো হয়েছিল, পরে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। (আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,) শেষ দশকে ঐ রাতের তালাশ করো এবং প্রত্যেক বিজোড় রাতে তা তালাশ করো। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ঐ রাতে আমি কাদা-পানিতে সিজদা করছি। ঐ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘের সঞ্চার হয় এবং বৃষ্টি হয়। মসজিদে আল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছালাতের স্থানেও বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। এটা ছিল ২১ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের ছালাত শেষে ফিরে বসেন, তখন আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তাঁর মুখমণ্ডল কাদা-পানি মাখা’।[3]

২. আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, تَحَرَّوْا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي الوِتْرِ مِنَ العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করো’।[4]

৩. আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أُنْسِيتُهَا وَأَرَانِي صُبْحَهَا أَسْجُدُ فِي مَاءٍ وَطِينٍ قَالَ فَمُطِرْنَا لَيْلَةَ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ فَصَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ فَانْصَرَفَ وَإِنَّ أَثَرَ الْمَاءِ وَالطِّينِ عَلَى جَبْهَتِهِ

‘আমাকে ক্বদরের রাত দেখানো হয়েছিল। তারপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাকে ওই রাতের ভোর সম্পর্কে স্বপ্নে আরও দেখানো হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি’। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তেইশতম রাতে বৃষ্টি হলো এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সাথে (ফজরের) ছালাত আদায় করে যখন ফিরলেন, তখন আমরা তাঁর কপালে কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম’।[5]

জোড় রাত্রে লায়লাতুল ক্বদর হওয়ার দলীলসমূহ :

১. ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

هِيَ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ هِيَ فِي تِسْعٍ يَمْضِينَ أَوْ فِي سَبْعٍ يَبْقَيْنَ يَعْنِي لَيْلَةَ القَدْرِ وَعَنْ خَالِدٍ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ التَمِسُوا فِي أَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ

‘তা শেষ দশকে, তা অতিবাহিত নবম রাতে, অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে’। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে অন্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, ‘তোমরা (লায়লাতুল ক্বদর) ২৪তম রাতে তালাশ করো’।[6]

২. আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّهَا كَانَتْ أُبِينَتْ لِي لَيْلَةُ الْقَدْرِ وَإِنِّي خَرَجْتُ لِأُخْبِرَكُمْ بِهَا فَجَاءَ رَجُلَانِ يَحْتَقَّانِ مَعَهُمَا الشَّيْطَانُ فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، الْتَمِسُوهَا فِي التَّاسِعَةِ وَالسَّابِعَةِ وَالْخَامِسَةِ قَالَ قُلْتُ يَا أَبَا سَعِيدٍ إِنَّكُمْ أَعْلَمُ بِالْعَدَدِ مِنَّا قَالَ أَجَلْ نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْكُمْ قَالَ قُلْتُ مَا التَّاسِعَةُ وَالسَّابِعَةُ وَالْخَامِسَةُ قَالَ إِذَا مَضَتْ وَاحِدَةٌ وَعِشْرُونَ فَالَّتِي تَلِيهَا ثِنْتَيْنِ وَعِشْرِينَ وَهِيَ التَّاسِعَةُ فَإِذَا مَضَتْ ثَلَاثٌ وَعِشْرُونَ فَالَّتِي تَلِيهَا السَّابِعَةُ فَإِذَا مَضَى خَمْسٌ وَعِشْرُونَ فَالَّتِي تَلِيهَا الْخَامِسَةُ.

‘হে লোক সকল! আমাকে লায়লাতুল ক্বদর সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল এবং আমি তোমাদের তা জানানোর জন্য বের হয়েছিরাম, কিন্তু দুই জন ব্যক্তি ঝগড়ারত অবস্থায় উপস্থিত হলো আর তাদের সাথে শয়তান ছিল, ফলে আমি তা ভুলে গেছি। অতএব তোমরা তা রামাযান মাসের শেষ ১০ দিনে অন্বেষণ করো। তোমরা তা ৯ম, ৭ম ও ৫ম রাতে অন্বেষণ করো’। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আবূ সাঈদ! আপনি সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমরা এ বিষয়ে তোমাদের চেয়ে অধিক জানি। আমি বললাম ৯ম, ৭ম, ৫ম সংখ্যাগুলো কী? তিনি বললেন, ‘যখন ২১তম রাত অতিবাহিত হয়ে যায় এবং ২২তম রাত শুরু হয় তখন তা হচ্ছে ৯ম তারিখ, ২৩তম রাত অতিক্রান্ত হবার পরবর্তী রাত হচ্ছে ৭ম তারিখ এবং ২৫তম রাত অতিবাহিত হবার পরের রাতটি হচ্ছে ৫ম তারিখ’।[7] অর্থাৎ এই হাদীছে বর্ণিত রাতগুলো হলো বাইশ, চব্বিশ ও ছাব্বিশ তারিখ।

৩. শেষ দশক লায়লাতুল ক্বদর: শেষ দশকের যে কোন দিন লায়লাতুল ক্বদর হতে পারে। জোড় কিংবা বিজোড় কোনোটিকে নির্দিষ্ট না করে বেশ কিছু রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। যেখানে সাধারণভাবে শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করার কথা বলা হয়েছে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, تَحَرَّوْا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করো’।[8]

তবে বিজোড় রাতে লায়লাতুল ক্বদর সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে ২৭শ তারিখের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করা যায়। ইবনু হুবাইস (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

سَمِعْتُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ يَقُولُ وَقِيلَ لَهُ إِنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ مَنْ قَامَ السَّنَةَ أَصَابَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ فَقَالَ أُبَيٌّ وَاللهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِنَّهَا لَفِي رَمَضَانَ يَحْلِفُ مَا يَسْتَثْنِي وَوَاللهِ إِنِّي لَأَعْلَمُ أَيُّ لَيْلَةٍ هِيَ هِيَ اللَّيْلَةُ الَّتِي أَمَرَنَا بِهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ بِقِيَامِهَا هِيَ لَيْلَةُ صَبِيحَةِ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ وَأَمَارَتُهَا أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ فِي صَبِيحَةِ يَوْمِهَا بَيْضَاءَ لَا شُعَاعَ لَهَا.

যখন উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলা হলো, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সারা বছর রাত জেগে ছালাত আদায় করবে, সে লায়লাতুল ক্বদর পাবে’। তখন তিনি বললেন, ‘যিনি ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই, সেই মহান আল্লাহর কসম! নিশ্চিতভাবে লায়লাতুল ক্বদর রামাযান মাসে। এ কথা বলে তিনি কসম করলেন কিন্তু ‘ইনশাআল্লাহ’ বললেন না (অর্থাৎ তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝতেন যে, রামাযান মাসেই লায়লাতুল ক্বদর আছে)’। এরপর তিনি আবার বললেন, ‘আল্লাহর কসম! কোন রাতটি ক্বদরের রাত তাও আমি জানি। সেটি হলো সেই রাত, যে রাতে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের ছালাত আদায় করতে আদেশ করেছেন। ২৭শে রামাযান দিন শুরুর পূর্বে যে রাত সেই রাত সেটি। আর ওই রাতের নিদর্শন হলো, সে রাত শেষে সকালে যে সূর্য উদিত হবে, তা উজ্জ্বল হবে কিন্তু (উদয়ের) সময় তার কোনো তীর্যক আলোকরশ্মি থাকবে না (অর্থাৎ, অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ হবে)’।[9]

মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা ২৭শের রাতে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করো’।[10]

আবার শেষ দশকের শেষ সাত দিনে লায়লাতুল ক্বদর সংঘটিত হওয়া অধিক প্রত্যাশিত বিষয়। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত,

أَنَّ رِجَالًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ أُرُوا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي المَنَامِ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ.

নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কতিপয় ছাহাবীকে রামাযানের শেষের সাত রাতে লায়লাতুল ক্বদর স্বপ্নে দেখানো হয়। (এ শুনে) আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব যে ব্যক্তি এর সন্ধান করবে, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে’।[11]

কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ২৭শের রাতই লায়লাতুল ক্বদর বা শেষ সাত দিনেই লায়লাতুল ক্বদর রয়েছে অথবা কেবল বিজোড় রাতে অনুসন্ধান করলেই এই রাত পাওয়া যাবে, বরং শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করতে হবে। এমনটিই বুঝেছেন ইমাম ইবনু তায়মিয়্যা, ইমাম ইবনু বায, ইমাম ইবনু উছায়মীন প্রমুখ বিদ্বানগণ (রাহিমাহুল্লাহ)। তাদের গবেষণালব্ধ ফৎওয়ার অনুবাদ-

ফৎওয়া-১ : ৮ম হিজরীর অবিস্মরণীয় মুজাদ্দিদ শায়খুল ইসলাম ইমাম তাক্বীউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আব্দুল হালীম ইবনু তায়মিয়্যা আল-হাররানী আল-হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু : ৭২৮ হি.)-কে লায়লাতুল ক্বদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘লায়লাতুল ক্বদর রামাযান মাসের শেষ দশকে রয়েছে। বিশুদ্ধ সূত্রে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এরূপই বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, এই রাত রামাযান মাসের শেষ দশকে রয়েছে। এটা শেষ দশকের বিজোড় রাতেও হতে পারে। কিন্তু বিজোড় (রাত) গত হয়ে যাওয়ার পরও হতে পারে। তখন তুমি লায়লাতুল ক্বদর তালাশ করবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতগুলোতে।[12]

আবার বিজোড় (রাত) অবশিষ্ট থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। যেমনটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, অবশিষ্ট নবম, সপ্তম, পঞ্চম ও তৃতীয় রাত্রিগুলোতে লায়লাতুল ক্বদর তালাশ করো।[13]

এর উপর ভিত্তি করে মাস যখন ৩০ হবে, তখন পূর্বোক্ত রাতগুলো (অর্থাৎ, গত হয়ে যাওয়ার বিবেচনায় ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতগুলো) জোড় রাত্রি হবে। তখন ২২তম রাতটি হবে অবশিষ্ট ৯ম রাত্রি এবং ২৪তম রাতটি হবে অবশিষ্ট ৭ম রাত্রি। বিশুদ্ধ হাদীছে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)।[14] আর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবেই রামাযান মাসে শেষ দশক সম্পন্ন করেছেন। পক্ষান্তরে মাস যদি ২৯শে হয়, তবে যে তারিখ অবশিষ্ট থাকার বিবেচনায় হয়েছে, তা গত হয়ে যাওয়ার বিবেচনায় যে তারিখ তার মতো হবে।[15]

বিষয়টি যখন এমনই, তখন মুমিনের উচিত পুরো শেষ দশকেই ওই রাত তালাশ করা। যেমনটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা ওই রাতটি শেষ দশকে তালাশ করো’।[16] তবে ওই রাতটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শেষ সাতটি রাতের মধ্যে হয়ে থাকে। তবে ২৭শের রাতে লায়লাতুল ক্বদর বেশি হয়ে থাকে। যেমন, ছাহাবী উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হলফ করে বলেছেন যে, ওই রাতটি হলো ২৭শের রাত। তাকে বলা হলো, কীসের মাধ্যমে আপনি এটা জেনেছেন? তিনি বললেন, নিদর্শনের মাধ্যমে, যে নিদর্শনের ব্যাপারে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের অবহিত করেছেন। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, ওই দিন সকালে সূর্য উদিত হবে, সেদিন সকালের সূর্যটা হবে একটা প্লেটের মতো, আর তার কোনো কিরণ থাকবে না। এই নিদর্শনটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন। এটা হাদীছে বর্ণিত প্রসিদ্ধ নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিদর্শনের বিষয়টি এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘নিশ্চয়ই ঐ রাতের ঊষার আলো অনেক উজ্জ্বল হবে’। এই রাতটি হবে প্রশান্তিদায়ক রাত; না হবে খুব গরম, আর না হবে খুব ঠাণ্ডা। কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো কোনো ব্যক্তিকে ঘুমন্ত বা জাগ্রত অবস্থায় এই রাতটি সম্পর্কে জানিয়ে দিতে পারেন। সে হয়ত তখন এর আলো দেখবে বা কোনো ব্যক্তিকে দেখবে, যে তাকে বলছে, এটা হলো ক্বদরের রাত। আল্লাহ তাকে এই রাতটি প্রত্যক্ষ করার জন্য তার অন্তরকে উন্মুক্ত করে দিবেন, যার মাধ্যমে তার কাছে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত’।[17]

ফৎওয়া-২ : সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী যুগশ্রেষ্ঠ ফক্বীহ ও মুহাদ্দিছ ইমাম আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু : ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.) বলেছেন, ‘নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়েছেন, লায়লাতুল ক্বদর রামাযানের শেষ দশকে রয়েছে। আর তা বিজোড় রাতগুলোর কোনো একটিতে সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেমন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা তা রামাযানের শেষ দশকের, বিজোড় রাতে অনুসন্ধান কর’।[18]

একাধিক বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত, ওই রাতটি শেষ দশকের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে থাকে। প্রতি বছর নির্দিষ্ট এক রাতে হয় না। তাই তা কখনো ২১শের রাতে, কখনো ২৩শের রাতে, কখনো ২৫শের রাতে, কখনো ২৭শের রাতে হতে পারে। তবে এই রাতটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কখনো ২৯শের রাতে হতে পারে, আবার কখনো জোড় রাতগুলোতেও হতে পারে।

সুতরাং কেউ যদি শেষ দশকের প্রত্যেক রাতে ঈমানের সাথে এবং ছওয়াবের আশায় ক্বিয়াম করে, তবে নিঃসন্দেহে সে ওই রাতটি পেয়ে যাবে। আর আল্লাহ যে অঙ্গীকার এই রাতের অধিবাসীদের (যারা এই রাতে ক্বিয়াম করে) দিয়েছেন, তা লাভ করে সফলকাম হবে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দশকের রাতগুলোতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে ইবাদত করতে যে অতিরিক্ত সাধনা করতেন, তা তিনি প্রথম ২০ রামাযানে করতেন না। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন, ‘নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযানের শেষ দশকে ইবাদত করতে যে সাধনা করতেন, সে সাধনা তিনি অন্য সময় করতেন না’।[19]

তিনি আরও বলেছেন, ‘রামাযানের শেষ দশক শুরু হবার সাথে সাথে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা রাত জেগে থাকতেন ও নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগাতেন। তিনি নিজেও ইবাদতের জন্য জোর সাধনা করতেন এবং লুঙ্গি কষে বাঁধতেন (ইবাদতে খুব সচেষ্ট থাকতেন)’।[20]+[21]

ফৎওয়া-৩ : বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ ও উছূলবিদ আশ-শায়খুল আল্লামা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু : ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.) বলেছেন, ‘লায়লাতুল ক্বদর নির্ধারণের ব্যাপারে আলেমগণ চল্লিশেরও অধিক মত পেশ করেছেন। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বুখারীর ব্যাখ্যায় মতগুলো উল্লেখ করেছেন। আর লায়লাতুল ক্বদরের ব্যাপারে আরও কিছু আলোচনা আছে।

১ম আলোচনা : লায়লাতুল ক্বদর কি এখনো অবশিষ্ট আছে, না-কি এটা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে?

উত্তর : বিশুদ্ধ মতানুসারে, কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা অবশিষ্ট আছে। আর যে হাদীছে এটা উঠিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সেই বছরে নির্দিষ্টভাবে ওই রাতটি জানার ইলম তথা জ্ঞানকে উঠিয়ে নেওয়া। কেননা ওই বছর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই রাতটি দেখেছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীবর্গকে এ ব্যাপারে জানানোর জন্য বের হন। তখন দুই ব্যক্তি বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল ফলে ওই বছরে নির্দিষ্টভাবে রাতটি সম্পর্কিত ইলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল’।[22]

২য় আলোচনা : এই রজনি কি রামাযান মাসে না-কি অন্য কোনো মাসে?

উত্তর : এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই রজনি রামাযান মাসেই রয়েছে। এটা অনেক দলীলের আলোকে সাব্যস্ত। তার মধ্যে প্রথমত মহান আল্লাহর বাণী, ‘রামাযান সেই মাস, যেই মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে’ (আলবাক্বারা, /১৮৫)। সুতরাং কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে রামাযান মাসে। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি কুরআনকে অবতীর্ণ করেছি ক্বদরের রাতে’ (আলক্বদর, ৯৭/)। সুতরাং যখন তুমি এই আয়াতকে আগের ওই আয়াতের সাথে মিলাবে, তখন লায়লাতুল ক্বদর রামাযান মাসেই নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। কেননা এই রাত যদি রামাযান মাসে না হয়, তবে এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, ‘রামাযান সেই মাস, যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে’ (আলবাক্বারা, /১৮৫)। এটা হলো যৌক্তিক দলীল। আর যৌক্তিক দলীল হলো সেই দলীল, যাতে একটি দলীলকে আরেকটির সাথে না মিলানো পর্যন্ত তা থেকে ইস্তিদলাল (দলীল গ্রহণ করা) পূর্ণ হয় না। যৌক্তিক দলীলের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তার মধ্যে একটি হলো, গর্ভধারণের সর্বনিম্ন সময়কাল হচ্ছে ছয় মাস, যখন বাচ্চা জীবিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এটা আমরা জেনেছি মহান আল্লাহর বাণী থেকে, ‘তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ৩০ মাস’ (আলআহক্বাফ, ৪৬/১৫)। তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে’ (লুক্বমান, ৩১/১৪)

সুতরাং যখন আমরা ৩০ মাস থেকে দুই বছর বাদ দিব, তখন অবশিষ্ট থাকবে ছয় মাস। আর এটাই হলো গর্ভধারণের সর্বনিম্ন সময়কাল।

৩য় আলোচনা : রামাযানের কোন রাতে লায়লাতুল ক্বদর সংঘটিত হয়?

উত্তর : কুরআনে এই রাত নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে কোনো বর্ণনা নেই। কিন্তু হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, এই রাত রামাযানের শেষ দশকেই রয়েছে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসের প্রথম দশকে ই‘তিকাফ করলেন। এরপর তিনি মাঝের দশকেও ই‘তিকাফ করলেন। অতপর শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদরের কথা তাঁকে অবহিত করা হলো আর ওই রাতটি তাঁকে স্বপ্নেও দেখানো হয়েছিল, যে রাতে তিনি কাদা ও পানির মধ্যে ফজরের (ছালাতের) সিজদা করছিলেন। সেটা ছিল রামাযানের ২১তম রাত। তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ই‘তিকাফরত অবস্থায় ছিলেন। সে রাতে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হলো। ফলে ছাদ থেকে মসজিদে পানি বর্ষিত হলো। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মসজিদে খেজুর পাতার ছাউনি ছিল। তিনি তাঁর ছাহাবীদেরকে নিয়ে ফজরের ছালাত পড়লেন। তিনি যমীনের উপর সিজদা করলেন। (বর্ণনাকারী) আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, তিনি কাদা ও পানিতে সিজদা দিলেন। এমনকি আমি স্বচক্ষে তাঁর কপালে কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম।[23]

একদল ছাহাবী (রামাযানের) শেষ সাত রাতে লায়লাতুল ক্বদর প্রত্যক্ষ করেছেন। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে’। অর্থাৎ, একই রকম হয়েছে। ‘অতএব যে ব্যক্তি এর সন্ধান করবে, সে যেন শেষ সাত রাতে এর সন্ধান করে’। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, শেষ দশকের মধ্যে শেষ সাত রাত হলো বেশি প্রত্যাশিত। যদি না রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথাটির দ্বারা এই উদ্দেশ্য হয় যে, এটা কেবল সেই বছরের জন্যই নির্দিষ্ট- ‘আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে’।[24]

এটি একটি সম্ভবনাময় বিষয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুঅবধি সম্পূর্ণ শেষ দশকে ই‘তিকাফ করেছেন। সুতরাং এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাঁর কথা ‘আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে’-এর অর্থ হলো, এটা সেই বছরের জন্য নির্দিষ্ট ছিল যে, শেষ সাত রাতের মধ্যেই লায়লাতুল ক্বদর নিহিত রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, আগামী সব রামাযানে লায়লাতুল ক্বদর শেষ সাত রাতের মধ্যে থাকবে। বরং এই ভাগ্য রজনিটি শেষ দশকের পুরোটার মধ্যেই অবশিষ্ট থাকবে।

৪র্থ আলোচনা : প্রত্যেক বছর লায়লাতুল ক্বদর কি এক রাতেই হয়ে থাকে, না-কি এটা স্থানান্তরিত হয়?

উত্তর : এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, এই রাতটি স্থানান্তরিত হয়। সুতরাং কোনো বছর ২১তম রাত লায়লাতুল ক্বদর হতে পারে, আবার কোনো বছর ২৯তম রাত, কোনো বছর ২৫তম রাত, কোনো বছর ২৪তম রাত লায়লাতুল ক্বদর হতে পারে এবং অনুরূপভাবে (শেষ দশকের বাকি রাতগুলোতেও) হতে পারে। কেননা এই সিদ্ধান্ত ব্যতীত আর অন্য কোনো সিদ্ধান্তের উপর এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব নয়। তবে অধিক সম্ভাবনাময় রাত হলো ২৭শের রাত। কিন্তু ‘নির্দিষ্টভাবে এই রাতটিই লায়লাতুল ক্বদর নয়, যেমনটি কতিপয় লোক ধারণা করে থাকে। কোনো কোনো ব্যক্তি তার ধারণার উপর ভিত্তি করে, এই একটি রাতেই অধিক পরিমাণে পরিশ্রম করে এবং অন্যান্য রাতগুলোতে শিথিলতা প্রদর্শন করে। এই রাতটি (নির্দিষ্টভাবে একই রাতে না হয়ে, বিভিন্ন রাতে) স্থানান্তরিত হওয়ার পিছনে হিকমা এই যে, এই ভাগ্য রজনিটি যদি নির্দিষ্ট কোনো রাতে হতো, তবে অলস বান্দা এই একটি রাতে ক্বিয়াম করেই ক্ষান্ত হয়ে যেত। কিন্তু ‘যখন রাতটি স্থানান্তরিত হবে এবং প্রতিটি রাতেই লয়লাতুল ক্বদর হওয়ার সম্ভবনা থাকবে, তখন ব্যক্তি পুরো শেষ দশকেই ক্বিয়াম করবে। এ ব্যাপারে আরো হিকমা এই যে, এতে অলসতা পরিহার করে এই রাত তালাশ করার ব্যাপারে আগ্রহী বান্দার জন্য রয়েছে পরীক্ষা’।[25] ইমাম ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন, ‘তবে শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো অধিক সম্ভাবনাময়। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদর তালাশ করো, আর তা প্রত্যেক বিজোড় রাতে তালাশ করো’।[26] শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো হলো ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাত। এই পাঁচটি রাত এই দশকের মধ্যে অধিক সম্ভাবনাময়। এর অর্থ এই নয় যে, লায়লাতুল ক্বদর কেবলমাত্র বিজোড় রাতেই সংঘটিত হয়। বরং এই রাতটি জোড়-বিজোড় উভয় রাতগুলোতে হতে পারে’।[27]

কিছু দূর এগিয়ে ইমাম ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন, ‘বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে ক্বদরের রাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে ২৭তম রাত অন্যতম। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে ২৭তম রাতে লায়লাতুল ক্বদর হবে একথা বলা যাবে না’।[28]

উল্লিখিত আলোচনা থেকে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, অগ্রগণ্য মতানুসারে লায়লাতুল ক্বদর শেষ দশকের মধ্যে রয়েছে। তাই এই রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকের জোড়-বিজোড় সব রাতেই তালাশ করতে হবে। আর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আমল এরকমই ছিল। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ ‘যখন রমযানের শেষ ১০ দিন আসত, তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিধেয় বস্ত্রকে শক্ত করে বাঁধতেন, রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগাতেন’।[29] আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অবগত।


* শিক্ষক, মাদ্রাসা ইশাআতুল ইসলাম আস-সালাফিয়্যাহ্, রাণীবাজার, রাজশাহী।

[1]. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ), ফাতহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (আল-মাকতাবাতুস সালাফিয়্যাহ কর্তৃক প্রকাশিত সন-তারিখবিহীন), ৪/২৬২, হা/২০২২-এর ভাষ্য।

[2]. প্রাগুক্ত, ৪/২৬৬।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৭।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৮।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২২।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৯।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬২।

[10]. ছহীহুল জামে‘, হা/১২৪০, সনদ ছহীহ।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৫।

[12]. অর্থাৎ, শুরু থেকে এই দশকের রাতগুলো অতিবাহিত বা গত হওয়ার ভিত্তিতে শুরু হবে এই বিজোড় রাতের গণনা। যেমন, এই দশকের প্রথম রাত ২১তম। এই রাত থেকে বিজোড় গণনা শুরু হবে। এভাবে হবে ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতগুলোও। -লেখক

[13]. অর্থাৎ, শেষ দশক শুরু হলে অবশিষ্ট রাতগুলো হয় শেষের দিকে। অর্থাৎ, ৩০ বা ২৯তম রাত থেকে ২১তম রাত পর্যন্ত। সুতরাং এই বিবেচনায় বিজোড় গণনা শুরু হবে শেষের দিক থেকে। শেষের দিক থেকে বিজোড় গণনা করলে হয়, অবশিষ্ট ১ম রাত্রি হলো ৩০তম রাত্রি, অবশিষ্ট ৩য় রাত্রি হলো ২৮তম রাত্রি, অবশিষ্ট ৫ম রাত্রি হলো ২৬তম রাত্রি, অবশিষ্ট ৭ম রাত্রি হলো ২৪তম রাত্রি, আর অবশিষ্ট ৯ম রাত্রি হলো ২২তম রাত্রি। ইমাম ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) এটাই বুঝাতে চেয়েছেন। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। -লেখক

[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[15]. গত হয়ে যাওয়ার বিবেচনায় তারিখগুলো হয় ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতগুলো। আর অবশিষ্ট থাকার বিবেচনায় ২৯শে মাস হলে শেষের দিক থেকে গণনা করতে হবে। তখনো তারিখগুলো বিজোড়ই হবে। অর্থাৎ ২৯, ২৭, ২৫, ২৩ ও ২১তম রাত হবে। -লেখক

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৯।

[17]. ইমাম ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূঊ ফাতাওয়া (বাদশাহ ফাহাদ প্রিন্টিং প্রেস, মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত, ১৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.), ২৫/২৮৪-২৮৬।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[19]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৭৫।

[20]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৭৪।

[21]. ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যাআহ (দারুল ক্বাসিম, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত, ১৪২১ হি.), ১৫/৪২৬-৪২৮।

[22]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২৩।

[23]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[24]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৫।

[25]. ইমাম ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ), আশ-শারহুল মুমতি‘ আলা যাদিল মুস্তাক্বনি (দারু ইবনিল জাওযী, দাম্মাম কর্তৃক প্রকাশিত, ১৪২৪ হি.), ৬/৪৮৯-৪৯২।

[26]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[27]. প্রাগুক্ত ৬/৪৯৪।

[28]. প্রাগুক্ত, ৬/৪৯৫।

[29]. ছহীহ বুখারী, ‘রামাযানের শেষ দশকের আমল’ অনুচ্ছেদ, হা/২০২৪।