খাদীজা g-কে রাসূলুল্লাহ a-এর বিয়ের কারণ

-সাঈদুর রহমান*


খাদীজা g ছিলেন তদানীন্তন সময়ে ধনাঢ্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের ভদ্র মার্জিত একজন নারী। তার চরিত্রের নিষ্কলুষতা সকলের নিকট সমাদৃত ছিল। এজন্য তাকে তাহেরা (নিষ্কলুষ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

রাসূল a-এর সাথে বিয়ে হওয়ার পূর্বে তার দুটো বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন একজন নামিদামি ব্যবসায়ী। অনেক মানুষ তার ব্যবসায়ী পণ্যের পসরা নিয়ে বিভিন্ন দেশে নির্ধারিত একটি লভ্যাংশের বিনিময়ে ব্যবসা করতে যেত। ওই সময় নবী a ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) নামে কিংবদন্তি ছিলেন।

সকলে আল-আমীন নামে এক বাক্যে তাকে চিনত। খাদীজা g-এর কাছেও বিষয়টি দৃষ্টির অগোচরে ছিল না। তাঁর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, আমানতদারিতা ও পরোপকারে সকলে বিমোহিত ছিল। খাদীজা gও সকলের ন্যায় তার চেয়ে বয়সের ছোট মুহাম্মাদ a-কে ভালো জানতেন। কোনো এক ব্যবসামৌসুমে খাদীজা g ব্যবসার উদ্দেশ্যে লোক প্রেরণ করার মনস্থ করেন। 

তিনি যেহেতু মহিলা, সেহেতু এত দূরের পথ সফর করা তার জন্য সমীচীন নয়। কাকে পাঠানো যায় এ নিয়ে তিনি চিন্তার দরিয়ায় ডুব দেন। আচমকা তার মাথায় আসলো মুহাম্মাদ a-এর কথা। তিনি নবী a-এর কাছে লোক পাঠালেন। 

এই প্রস্তাব নবী a সাদরে গ্রহণ করেন। কারণ ওই সময়ে আবূ তালেবের সংসারে কিছুটা আর্থিক টানাপোড়েন চলছিল। তাই তিনি ভাবলেন এই ব্যবসা করে তার সংসারের কিছুটা হাল ধরা যাবে। লোক এসে সুসংবাদ দিল যে, মুহাম্মাদ a সানন্দে এই প্রস্তাবে রাজী হয়েছেন। যেই বলা সেই কাজ। খাদীজা g–এর ব্যবসাপণ্য নিয়ে মুহাম্মাদ a রওনা দিলেন বাছরার পানে।

খাদীজা g ছিলেন একজন চৌকস নারী। নবী a-এর গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য সাথে মাইসারা নামে তার এক দাস প্রেরণ করেন। এতদিন উনি জনমুখে শুধু মুহাম্মাদ a-এর ভূয়সী প্রশংসা শুনেছেন। এবার তিনি বাস্তবে তা প্রত্যক্ষ করবেন। বাছরার বিপণিবিতানে নবী a পণ্যগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন এবং ফেরার পথে কিছু পণ্য কিনেন, যেন মক্কায় তা বিক্রি করতে পারেন। তার এই অভিনব কৌশলে মাইসারা চমকিত হয়।

মক্কায় এসে নবী a বাছরা থেকে বোঝাইকৃত পণ্যগুলো বিক্রি করেন। তারপর খাদীজা g-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। খাদীজা g তো আশ্চর্য হন! তিনি যারপরনাই পুলকিত হন। এই সফরে তার দ্বিগুণ লাভ হয়। তিনি নবী a-এর সাথে চুক্তিকৃত নির্ধারিত লভ্যাংশ দিয়ে দেন।

তারপর মাইসারাকে তলব করেন। তিনি তাকে বলেন, কোনো বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে কি মাইসারা? সে বলল, হ্যাঁ। সফর থেকে ফেরার পথে আমরা এক স্থানে যাত্রাবিরতি করি। এমন সময় খ্রিষ্টানগির্জা থেকে হঠাৎ এক পাদরি আমাদের কাছে আসে। এসে মুহাম্মাদ a-কে লক্ষ্য করে বলল, ইনিই হবেন শেষ নবী।

তোমাদের আসার পথে প্রত্যেকটি বৃক্ষ ও পাথর তাকে সেজদা করছিল। এই ঘটনা খাদীজা g-এর কান বিশ্বাস করতে পারছিল না। তিনি আনন্দের দোলনায় দোল খেতে লাগলেন। আর বিলম্ব করা যাবে না। তিনি মনস্থির করেন যে, মুহাম্মাদ a-কে বিয়ে করবেন।

বিষয়টি তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাফিসাকে অবগত করান এবং নবী a-এর চাচার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য প্রেরণ করেন। খাদীজা g ওই সময় বিধবা ছিলেন। সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে তার বিয়ে আসছিল; কিন্তু তিনি প্রত্যেকটি নাকচ করে দেন।

যার ভাগ্যে আছে ভরা পূর্ণিমার উজ্জ্বল দীপ্তিময় চন্দ্র, তিনি কি অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার পরিবেশ গ্ৰহণ করবেন? এদিকে নাফিসা নবী a-এর চাচা আবূ তালেবের সাথে বিষয়টা খোলাসা করলেন। আবূ তালেব নবী a-এর সাথে পরামর্শ করে নাফিসাকে জানায় যে, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র সম্মত আছে। অতএব, বিয়ের দিন ধার্য করা হোক।

দিন তারিখ ঠিক হয়ে বিয়ে হয়ে গেল। তাদের দিনগুলো খুব ভালো কাটছিল। খাদীজা g-এর শূন্য কোল ভরে গেল ফুটফুটে চার কন্যা ও দুই পুত্রের মাধ্যমে। তবে পুত্রদ্বয় শৈশবেই মারা যান, কেউ জীবিত ছিলেন না। এক পুত্রের নাম ছিল কাসেম। আর এই মৃত কাসেমের নামেই নবী a-কে ‘আবুল কাসেম’ বলা হতো। তাদের দু’জনের বিয়ের ১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল। এখন নবী a-এর বয়স ৪০ বছর। তিনি এখন একাকী নির্জনে নিবৃত্তে থাকতে পছন্দ করেন।

নিঝুম রাতে মহান রবের ধ্যানে মগ্ন থেকে আত্মতৃপ্তি পান। অবিরাম শান্তি বোধ করেন। একপর্যায়ে তিনি চলে যান হেরা পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায়। কিছু দিন পর্যন্ত তিনি ওই পর্বতে ইবাদত অর্চনায় মগ্ন থাকেন। মাঝে মাঝে খাদীজা g নবী a-কে দেখে আসতেন। আঁচল পুরে রাসূল a-এর পছন্দের খাবার নিয়ে আসতেন। নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দিতেন। অপলক দৃষ্টিতে একে অপরের চোখে চাওয়াচাওয়ি হতো। লজ্জা পেতেন মাঝে মাঝে খাদীজা g। বিদায়ক্ষণে অশ্রুর ফোয়ারা গণ্ডদেশ বেয়ে বক্ষে টপ করে পড়ত। শত চাপা কষ্ট হৃদয়ে ধারণ করে প্রিয়তমকে ছেড়ে চলে আসতেন। খাবার শেষ হয়ে গেলে মাঝে মাঝে নবী a নিজেই চলে আসতেন।

একদিন শুভক্ষণে নবী a তাঁর সম্মুখে দেখতে পেলেন দিগন্তবিস্তৃত ৬০০ পাখাবিশিষ্ট এক অবয়ব। জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত যার বিস্তৃতি। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন জিবরীল e। নবী a ফেরেশতাকে দেখে শঙ্কিত হয়ে গেলেন। যেন তিনি সবকিছু ঝাপসা ঝাপসা দেখছেন। ফেরেশতা নবী a-কে লক্ষ্য করে বললেন, اقْرَأْ (পড়ুন)। তখন তিনি বললেন, ‘আমি তো পড়তে পারি না’। এক পর্যায়ে নাযিল হলো-﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾ ‘পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার রব অতিশয় দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/১-৩)

অতঃপর এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসূল a প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর হৃদয় তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদের নিকট এসে বললেন, ‘আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো’, ‘আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো’। তাঁরা তাঁকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। এমনকি তাঁর শঙ্কা দূর হলো। তখন তিনি খাদীজা g-এর নিকট ঘটনাবৃত্তান্ত জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি আমার নিজেকে নিয়ে শঙ্কাবোধ করছি। খাদীজা g বললেন, আল্লাহর কসম! কখনই নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায়-দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং হক্ব পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। অতঃপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা g তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল-এর নিকট গেলেন, যিনি অন্ধকার যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

যিনি ইবরানী ভাষায় লিখতে পারতেন এবং আল্লাহর তাওফীক্ব অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জীল হতে ভাষান্তর করতেন। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা g তাঁকে বললেন, ‘হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন’। ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাতিজা! তুমি কী দেখ?’ আল্লাহর রাসূল a যা দেখেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন। তখন ওয়ারাকা তাঁকে বললেন, এটা সেই বার্তাবাহক যাকে আল্লাহ মূসা e-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার ক্বওম তোমাকে বহিষ্কার করবে’। আল্লাহর রাসূল a বললেন, [‘তারা কি আমাকে বের করে দেবে?’] তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছো অনুরূপ (অহী) কিছু যিনিই নিয়ে এসেছেন, তাঁর সঙ্গেই বৈরিতাপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। আর অহীর বিরতি ঘটে।[1] 

সুধী পাঠক! দেখলেন কীভাবে খাদীজা g রাসূল a-কে আগলে রেখেছেন? কীভাবে তাকে অভয় দান করেছেন? সর্বপ্রথম তিনিই নবী a-এর উপর অবতীর্ণ অহীর সত্যায়ন করেন।

ইসলামের প্রাতে নবী a যখন মক্কার কাফেরদের অপমান-লাঞ্ছনা সহ্য করে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে ঘরে আসতেন, তখন খাদীজা g তাকে সান্ত্বনার জলে সিক্ত করতেন। একবারের জন্যও বিরক্তিবোধ করতেন না। ভালোবাসার চাদরে আগলে রাখতেন। মাঝে মাঝে তাকে প্রণোদনা দিতেন, ধৈর্যধারণ করার কথা বলতেন।

অহীর গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাসূল a ঠিকমতো কাজ করতে পারতেন না। আর ওই সময়ে খাদীজা g নিজ সম্পদ থেকে রাসূল a-এর জন্য এবং সন্তানদের জন্য খরচ করতেন। কখনই তাকে চাপ দিতেন না।

হতদরিদ্র ছাহাবীগণ যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে যেতেন, তখন তিনি তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। এখন বলুন, নবী a যদি ১৮/১৯ বছরের এক তরুণীকে বিয়ে করতেন, তাহলে কী হতো! তরুণী কি এই ভূমিকা পালন করতে পারত? রাসূল a-কে কি আগলে রাখতে পারত?

আল্লাহ তাআলা জানেন যে, মক্কার এই ইয়াতীম মুহাম্মাদ a অচিরেই বিশ্ববাসীর নবী হতে যাচ্ছেন। তাই তিনি তার স্ত্রী হিসেবে নির্ধারণ করেছেন চৌকস, দানশীল, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জীবনযুদ্ধে সংগ্ৰামী তেজস্বী এক রমণী।

মৃত্যু অবধি খাদীজা g রাসূল a-কে হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে রেখেছেন। বিদ্ধ হতে দেননি কাফেরদের বুলির কাঁটা। এজন্যই নবী a খাদীজা g-কে কখনো ভুলে যাননি। বাড়িতে যদি কখনো ভালো কিছু রান্না করা হতো, তাহলে নবী a খাদীজা g-এর কথা স্মরণ করে তার কোনো বান্ধবীর বাড়িতে কিছু খাবার প্রেরণ করতেন।

আয়েশা g বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করতাম খাদীজা g-কে নিয়ে। রাসূল a প্রায়ই তার কথা বলতেন’। তার এই ত্যাগ ও সংগ্রামের কারণেই আল্লাহর কাছে পেয়েছেন মহাপুরস্কার। 

 عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ أَتَى جِبْرِيْلُ النَّبِيَّ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذِهِ خَدِيْجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيْهِ إِدَامٌ أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّيْ وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ لَا صَخَبَ فِيْهِ وَلَا نَصَبَ.

আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরীল e নবী a-এর নিকট হাযির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল a! ওই যে খাদীজা g একটি পাত্র হাতে নিয়ে আসছেন। ওই পাত্রে তরকারি অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌঁছে যাবেন, তখন তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন আর তাঁকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের খোশখবর দিবেন, যার অভ্যন্তর ভাগ ফাঁকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার শোরগোল; কোনো প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।[2]


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩।

2. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮২০।