গ্রন্থ পরিচিতি-১১ : সুনানু আবী দাঊদ
আল-ইতিছাম ডেস্ক*



 ভূমিকা : হাদীছের খেদমতে আমাদের পূর্বসূরী মহান ইমামদের যে অবদান, তা কখনো ভুলার নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা মুসলিমরা বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প গ্রন্থের নাম ও বিবরণ জানলেও হাদীছের গ্রন্থাবলি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানও রাখি না। মুসলিম জাতির অধঃপতনের জন্য এর চাইতে বড় কারণ আর কী হতে পারে? যেখানে কুরআন-হাদীছের বই মুসলিমদের ঘরে ঘরে থাকার কথা, সেখানে তৎপরিবর্তে রয়েছে দুনিয়াবী রাজনীতির বই, কল্প-কাহিনী, উপন্যাস ও দুনিয়া অর্জনের সহায়ক বিভিন্ন বই। যেখানে কুরআন-হাদীছের লাইব্রেরি থাকার কথা সেখানে, টিভি, ফ্রিজ, হরেক রকম আসবাবপত্র পুরো ঘর দখল করে আছে। যাহোক, এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) সংকলিত বিস্ময়কর গ্রন্থ ‘সুনানু আবী দাঊদ’। নিম্নে এ সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।-

নাম : সুনানু আবী দাঊদ (سنن أبي داود) এটি মাঝারি কলেবরের হাদীছের গ্রন্থ।

‘সুনান’ নামের অর্থ : এটি সুনান গ্রন্থ। সুনান হলো, যে সকল গ্রন্থে ‘কিতাবুত ত্বহারাত’ হতে শুরু করে ‘কিতাবুল ওয়াছায়া’ পর্যন্ত আহকাম সংক্রান্ত হাদীছগুলো ফিক্বহী ধারাবাহিকতায় সংকলন করা হয়।

সংকলনকাল : ইমাম আবূ দাঊদ প্রায় ২০ বছর যাবৎ দক্ষিণ তুরস্কের ত্রিপোলির অন্তর্গত তরসূস এলাকায় বসবাস করেছিলেন। সে সময়ে তিনি এ গ্রন্থটি সংকলন করেন। সংকলন সমাপ্ত হলে তিনি স্বীয় গ্রন্থটি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)কে দেখালে তিনি অত্যন্ত প্রশংসা করেন। ইমাম বুখারী ১৬ বছর, ইমাম মুসলিম ১৫ বছর ও আবূ দাঊদের ২০ বছর যাবৎ গ্রন্থ সংকলনে ব্যয় করার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পূর্বের তাক্বওয়াবান ইমামগণ অত্যন্ত ছবরের সাথে ও নিখুঁত করার নিয়্যতে ধীরে-সুস্থে গ্রন্থ সংকলন করতেন। তারা এসব কাজে তাড়াহুড়া করতেন না।

বিবরণ : মাঝারি কলেবরের এই গ্রন্থটিতে হাদীছ রয়েছে ৫২৭৪টি। মোট ৩৬টি কিতাব (অধ্যায়) ও ১৮৭১টি বাব (পরিচ্ছেদ) রয়েছে। লেখক ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) এটি ফিক্বহী ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে সংকলন করেছেন। তিনি প্রতিটি অনুচ্ছেদের শিরোনাম রচনা করেছেন। অতঃপর শিরোনামের সাথে উপযোগী হাদীছসমূহ সন্নিবেশ করেছেন। তিনি প্রতিটি হাদীছ সনদসহ উল্লেখ করেছেন। একটি বিষয়ে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন হাদীছ পেশ করেছেন। এছাড়াও মাঝে মাঝে হাদীছের সনদে ও মতনে থাকা ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্ণনা করেছেন। কতিপয় স্থানে তিনি রাবীদের ব্যাপারে রায় বা মতামত প্রদান করেছেন। হাদীছের যে অংশটুকু দিয়ে মাসআলা প্রমাণ করা যায়, তিনি সে অংশটুকুই বর্ণনা করেছেন। অসংখ্য হাদীছ তিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন যেন বুঝতে সহজ হয়।

গ্রন্থটি স্বীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের পরই অবস্থান পেয়েছে। সুনানে আরবা‘আ-এর মধ্যে আবূ দাঊদ সর্বাগ্রে রয়েছে। ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) এ গ্রন্থে শুধুই ছহীহ হাদীছ বর্ণনা করবেন মর্মে কোনোরূপ শর্তারোপ করেননি। তিনি ছহীহ, যঈফ, হাসান সব হাদীছই বর্ণনা করেছেন।

ফিক্বহী ক্রমধারা অনুসরণপূর্বক উছূলের আলোকে হাদীছ উদ্ধৃতকরণের যে পদ্ধতি এতে অবলম্বন করা হয়েছে, তার কোনো নযীর পূর্বে ছিল না। ফিক্বহের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী ব্যক্তির সুনানু আবী দাঊদ ভালোভাবে অধ্যয়ন করা উচিত। ইমাম সাখাবী ফাতহুল মুগীছ গ্রন্থে অনুরূপ বলেছেন।

উল্লেখ্য, ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) রচিত এই গ্রন্থটি অধ্যয়ন করলে ফিক্বহী মাসআলা, হাদীছের অনেক বিষয়েই প্রভূত জ্ঞান হাছিল হবে।

গ্রন্থকারের পরিচয় : এই মহান গ্রন্থটির সংকলক হলেন, ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ)। তার পুরো নাম হলো,

سليمان ابن الأشعث ابن إسحاق ابن بشير ابن شداد الأزدي السجستاني

সুলায়মান ইবনুল আশআছ ইবনে ইসহাক্ব ইবনে বাশীর ইবনে শাদ্দাদ আল-আযদী আস-সিজিস্তানী। তার উপনাম হলো আবূ দাঊদ।[1] তিনি ২০২ হিজরী মোতাবেক ঈসায়ী ৮১৭ সনে খলীফা মামূনের শাসনামলে জন্মলাভ করেন।[2] তিনি হাদীছের সন্ধানে ইরাক, খুরাসান, মিসর, হিজায, শামসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেন।[3] তিনি বাছরাতে বসবাস করতেন। অসংখ্যবার বাগদাদে গিয়েছিলেন।[4]

উস্তাযগণ : তিনি অসংখ্য উস্তায হতে ইলম হাছিল করেছেন। যেমন আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনু হাম্বল, আবূ সালামা আত-তাবূযাকী, আবুল ওয়ালীদ আত-ত্বয়ালিসী, মুহাম্মাদ ইবনু কাছীর আল-আবদী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ।[5]

ছাত্রগণ : আবূ ঈসা আত-তিরমিযী, আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ, আবূ আলী মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনু আমর, আবুত তাইয়েব আহমাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনে আব্দুর রহমান আল-আশনানী, আবূ উবায়েদ মুহাম্মাদ আল-আজুররী, ইসমাঈল ইবনু মুহাম্মাদ মাতার (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ।

তার সম্পর্কে ইমামদের মূল্যায়ন :

(১) ইমাম ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

أبو داود ثقة حافظ مصنف السنن وغيرها من كبار العلماء من الحادية عشرة

‘ইমাম আবূ দাঊদ একজন ছিক্বাহ (নির্ভরযোগ্য), হাদীছের হাফেয, সুনানে আবূ দাঊদ ও অন্যান্য গ্রন্থের প্রণেতা। তিনি বর্ষীয়ান আলেম ছিলেন। তিনি ১১তম স্তরভুক্ত।[6]

এছাড়াও ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) তার সম্পর্কে অসংখ্য ইমামের প্রশংসাবাণী স্বীয় তাহযীবুত তাহযীব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।[7]

(২) ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

الإِمَامُ شَيْخُ السُّنَّةِ مُقَدَّمُ الحُفَّاظِ أَبُو دَاوُدَ الأَزْدِيُّ السِّجِسْتَانِيُّ مُحَدِّثُ البَصْرَةِ

‘তিনি একজন ইমাম, সুন্নাহ-এর শায়েখ, হাদীছের হাফেযদের অগ্রসেনানী, বাছরার মুহাদ্দিছ’।[8]

গ্রন্থসমূহ : তিনি সুনান আবূ দাঊদ ছাড়াও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সংকলন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। যেমন- রিসালাতু আবী দাঊদ ইলা আহলি মাক্কা, আয-যুহদ, আন-নাসিখ ওয়াল-মানসূখ, আল-ইখওয়াতু ওয়াল-আখাওয়াত, মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, দালায়েলুন নবুঅত, আত-তাফাররুদ ফিস সুনান, কিতাবুল মারাসীল ইত্যাদি।

মৃত্যু : তিনি ২৭৫ হিজরী মোতাবেক ঈসায়ী ৮৮৮ সনে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান।[9] আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন- আমীন।


[1]. তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৫৩৩।

[2]. তাহযীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৯৮।

[3]. প্রাগুক্ত।

[4]. প্রাগুক্ত।

[5]. প্রাগুক্ত।

[6]. তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৫৩৩।

[7]. তাহযীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৯৮।

[8]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, রাবী নং ১১৭।

[9]. তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৫৩৩।