গ্রন্থ পরিচিতি-১ : তাফসীর তবারী

আল-ইতিছাম ডেস্ক

ভূমিকা : যুগে যুগে যারা ইসলামের জন্য নিরলস খিদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম ইবনু জারীর আত-তবারী (রহিঃ)। তার লিখিত একাধিক গ্রন্থের মধ্যে তাফসীর তবারী খুবই প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ। নিম্বে এ সম্পর্কে যৎসামান্য আলোকপাত করা হলো:

নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ : جامع البيان في تأويل القرآن ‘জামেঊল বায়ান ফী তাবীলিল কুরআন’। এটি ‘তাফসীরে তবারী’ বা ‘তবারীর তাফসীর’ নামে প্রসিদ্ধ। বৃহৎ আকারে ২৪ খণ্ডে প্রকাশিত (মাকতাবা শামেলা অনুসারে)। এটি তাহক্বীক্ব করেছেন মুহাম্মাদ আহমাদ শাকের (রহিঃ)। যা কায়রোর দারুল মা‘আরিফ হতে মুদ্রিত। তবে মুহতারাম মুহাক্কিক্ব তার তাহক্বীক্ব শেষ করে যেতে পারেননি। সূরা ইবরাহীমের ২৮ নং আয়াত পর্যন্ত সমাপ্ত করেছেন। তিনি এতে মুহাদ্দিছদের মানহাজ অনুসারে তাখরীজও করেছেন। এছাড়াও রিয়াদের ‘দারু আলামিল কুতুব’ হতে মুহাক্কিক্ব আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুহসিন আত-তুর্কীর তাহক্বীক্বে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে মুদ্রিত হয়েছে।

‘দারুল কুতুব মিছরিয়া’তে-এর হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে যা ২৫ খণ্ডে সমাপ্য। অন্যদিকে ‘মাতবাআ আমীরিইয়া’ ৩০ খণ্ডে প্রকাশ করেছে। ফন্ট ও পৃষ্ঠার সাইজের ভিন্নতার কারণে খণ্ড সংখ্যায় কম-বেশি হয়।

এটি একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলা ভাষাতেও অনুবাদ করা হয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ।

বৈশিষ্ট্যসমূহ : এতে সূরা ফাতেহা হতে সূরা নাস পর্যন্ত ১১৪টি সূরার তাফসীর করা হয়েছে। এটি মূলত হাদীছ ভিত্তিক তথা ‘তাফসীর বিল মাছূর’। প্রতিটি আয়াতের তাফসীরে অসংখ্য ছাহাবী ও তাবেঈর উক্তি বিদ্যমান। মারফূ‘ হাদীছও রয়েছে। তবে মাওকূফ ও মাক্বতূ‘ বর্ণনাই বেশি। প্রতিটি বর্ণনা সনদসমেত উল্লেখিত হয়েছে। মুহতারাম লেখক গ্রন্থের শুরুতে একটি ভূমিকা সংযোগ করেছেন। যা আলেম ও গবেষকদের অবশ্য পাঠ্য। এতে তিনি উছূলে তাফসীর, প্রাচীন মুফাসসিরগণের নিয়ে বাণীবদ্ধ আলোচনা করেছেন। তাফসীর ও মুফাসসিরগণের প্রশংসাবাণী লিপিবদ্ধ করেছেন। তাফসীর বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে এটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত।

মানহাজ : এই গ্রন্থটির মানহাজ তথা রচনা প্রদ্ধতি নিম্নরূপ-

(১) আয়াত দিয়ে আয়াতের ব্যাখ্যা। (২) মারফূ‘ হাদীছ দিয়ে আয়াতের ব্যাখ্যাকরণ। যা সনদ ও মতন সহ একাধিক সূত্রে উল্লেখ থাকে। (৩) ছাহাবীগণের উক্তিসমূহ সনদ ও মতনসহ পূর্ণাঙ্গভাবে উল্লেখ রয়েছে। (৪) তাবেঈগণের বক্তব্যসমূহ একাধিক সনদে ও একাধিক মতনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকে। (৫) ফিক্বহী আহকামগুলোও লেখক প্রয়োজন মাফিক আলোচনা করেছেন। (৬) প্রচুর পরিমাণে ইসরাঈলী বর্ণনা রয়েছে। (৭) অসংখ্য কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : এই অসাধারণ গ্রন্থটি রচনা করেছেন ইমাম আবু জা‘ফর আত-তবারী (রহিঃ)। তার পূর্ণ নাম হলো ‘মুহাম্মাদ ইবনে জারীর ইবনে ইয়াযীদ ইবনে কাছীর ইবনে গালিব’। তার উপনাম হলো আবু জা‘ফর তবারী।  তিনি ২২৪ হিজরীতে (৮৩৯ খৃ.) তবারিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন এবং ‘আমুল’ নামক এলাকার অধিবাসী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মিসরে গমন করেন এবং তথায় তাফসীর গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি অনেক চমৎকার গ্রন্থ রচনা করেছেন। যা তার ইলমী প্রশস্ততার প্রমাণ বহন করে। তিনি ৩১০ হিজরীতে (৯২৩ খৃ.) বাগদাদে শাওয়াল মাসে মৃত্যুবরণ করেন।

ইমামগণ যা বলেছেন : তার সম্পর্কে ইমামগণের প্রশংসামূলক অসংখ্য বাণী বিদ্যমান। যেমন-

(১) ইবনু ইউনুস মিসরী (রহিঃ) (মৃ. ৩৪৭ হি.) বলেছেন, ‘তিনি একজন ফক্বীহ ছিলেন।  (২) খলীলী (রহিঃ) (মৃ. ৪৪৬ হি.) বলেছেন, جَامِعٌ فِي الْعُلُومِ ‘তিনি সকল ইলম সংগ্রহ (আয়ত্ব) করেছেন’।  (৩) আবূ ইসহাক শীরাযী (রহিঃ) (মৃ. ৪৭৬ হি.) বলেছেন, هو صاحب التاريخ والمصنفات الكثيرة ‘তিনি ইতিহাস ও অসংখ্য গ্রন্থ প্রণেতা’।  (৪) ইবনু আসাকির (রহিঃ) (মৃ. ৫৭১ হি.) বলেছেন,الإمام صاحب التصانيف المشهورة ‘তিনি একজন ইমাম, প্রসিদ্ধ (অনেক) গ্রন্থসমূহের রচয়িতা’।   (৫)  যাহাবী (রহিঃ) (মৃ. ৭৪৮ হি.) বলেছেন,محمد بن جرير بن يزيد بن كثير الإمام العلم الفرد الحافظ ‘মুহাম্মাদ ইবনে জারীর ইবনে ইয়াযীদ ইবনে কাছীর একজন ইমাম, অদ্বিতীয় আলেম, হাফেয’।  তিনি অন্যত্র বলেন,الإِمَامُ، العَلَمُ، المجتهدُ، عَالِمُ العَصر، أَبُو جَعْفَرٍ الطَّبَرِيّ، صَاحِبُ التَّصَانِيْفِ البَدِيْعَة ‘আবু জা‘ফর তবারী হলেন ইমাম, আলেম, মুজতাহিদ, যুগশ্রেষ্ঠ আলেম, বিস্ময়কর গ্রন্থ প্রণেতা’।  (৬) সুয়ূতী (রহিঃ) (মৃ. ৯১১ হি.) বলেছেন, رأس المفسرين على الإطلاق ‘তিনি সার্বজনীনভাবে সকল মুফাসসিরের প্রধান’।

তার আরও অসংখ্য প্রশংসাবাণী পাওয়া যায়। যা এখানে উল্লেখ করা হলো না।

সংশয় : তাফসীর তবারীতে ছহীহ-এর সাথে সাথে যঈফ ও জাল বর্ণনাও পাওয়া যায় কেন?

নিরসন : তিনি মূলত সব ধরনের বর্ণনা সনদসহ একত্র করেছেন। যেন পরবর্তীরা যাচাই-বাছাই করতে পারেন। সুতরাং তিনি যে সকল যঈফ ও জাল বর্ণনা এনেছেন, সেগুলো তাহক্বীক্ব ব্যতীতই গ্রহণ করা যাবে মনে করা যাবে না। বরং পর্যালোচনা করে গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে হবে।

উপসংহার : তাফসীর তবারী একটি অনন্য গ্রন্থ। এর মতো দ্বিতীয় আর কোনো গ্রন্থ আমাদের নযরে আসেনি। প্রতিটি ইলম পিপাসুর জন্য এটি বারংবার অধ্যয়ন করা আবশ্যক।