গ্রন্থ পরিচিতি-২ : তারীখে দিমাশক্ব!

আল-ইতিছাম ডেস্ক

ভূমিকা : যুগে যুগে যারা ইসলামের জন্য নিরলস খিদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম ইবনু আসাকির (রহিঃ)। তার লিখিত একাধিক গ্রন্থের মধ্যে ‘তারীখে দিমাশক্ব!’ খুবই প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রন্থও বটে। নিম্বে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো :

নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ : গ্রন্থটির পূর্ণ নাম হলো, تاريخ مدينة دمشق وذكر فضلها وتسمية من حلها من الأماثل أو اجتاز بنواحيها من وارديها وأهلها । এটি ‘তারীখে দিমাশক্ব’ নামে প্রসিদ্ধ। বৃহৎ আকারে ৭৪ খণ্ডে প্রকাশিত (মাকতাবা শামেলা অনুসারে)। এটি ‘দারুল ফিকর লিত তিবাআতি ওয়ান নাশরি ওয়াত তাওযী’ এবং ‘দারু ইহ্ইয়া আত-তুরাছ’ সহ একাধিক প্রকাশনা হতে মুদ্রিত হয়েছে। এটি একটি ইতিহাস গ্রন্থ। তবে সাধারণ কোনো ঘটনা, দেশ বা যুদ্ধের ইতিহাস নয়। বরং যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন সেসকল রাবী বা হাদীছ বর্ণনাকারীদের জীবনী বিষয়ক ইতিহাস। সুতরাং ‘তারীখ’ মানে ইতিহাস হলেও এক্ষেত্রে অন্যান্য সাধারণ ইতিহাসের মতো এ গ্রন্থকে বিবেচনা করা যাবে না।

বৈশিষ্ট্যসমূহ : আমাদের জানা মতে, এটি বিশ্বের বুকে রচিত সবচেয়ে বড় গ্রন্থ। শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বরং অন্য কোনো ধর্মের কোনো অনুসারী এত বড় গ্রন্থ রচনা করতে পেরেছেন বলে আমরা অবগত নই। এতে ১০২২৬ জন রাবী তথা হাদীছ বর্ণনাকারীর জীবনী সুবিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। সুবহানাল্লাহ! এটি অভিধান পদ্ধতিতে রচিত হয়েছে। এতে মুহতারাম লেখক কর্তৃক একটি ভূমিকা সংযোজিত হয়েছে। যা যে কোনো ইসলামী গবেষক ও আলেমের জ্ঞান বৃদ্ধিতে প্রভূত সহায়তা করবে। অতঃপর লেখক (রহিঃ) শাম ও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দামেশক্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্যাবলী লিপিবদ্ধ করেছেন। এরপর লেখক (রহিঃ) নবী (ছাঃ)-এর সীরাত তথা জীবনী বিষয়ক আলোচনা করেছেন।

তিনি সর্বপ্রথম যে রাবীর নাম উল্লেখ করেছেন তিনি হলেন ‘আহমাদ ইবনে উতবা’।[1]  আর সর্বশেষ যে রাবীর নাম উল্লেখ করেছেন তিনি হলেন ‘ইউনুস আল-মাদীনী আল-কাতিব’।[2]  প্রতিটি রাবী সম্পর্কে তিনি প্রচুর পরিমাণে তথ্য-উপাত্ত পরিবেশন করেছেন, যা আধুনিক কম্পিউটারকেও হার মানায়।

‘আলিফ’ হতে ‘ইয়া’ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে রাবীদের জীবনী উদ্ধৃত করার পর তিনি এমন কিছু রাবীকে আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন, যারা উপনামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তারপর তিনি উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন এমন রাবীদেরকে সন্নিবেশ করেছেন। এছাড়াও তিনি মাজহূল রাবীদেরকেও আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, তিনি এই গ্রন্থে কেবলমাত্র ঐ সকল রাবীকে উল্লেখ করেছেন, যারা দামেশক্ব শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা এখানে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন কিংবা এই শহরে কিছুদিনের জন্য এসে থেকেছিলেন। কেবলমাত্র তাদের জীবনী তিনি এতে লিপিবদ্ধ করেছেন।[3]

তিনি আরেকটি অসাধারণ কাজ করেছেন। সেটি হলো, তিনি এই গ্রন্থে মহিলা হাদীছ বর্ণনাকারীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রচনা করেছেন। এতে তিনি সর্বাগ্রে প্রথম খলীফা আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর কন্যা আসমা (রাঃ)-এর জীবনী এনেছেন (জীবনী নং ৯২৯৪)। তিনি তার পূর্ণ নামটি এভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘আসমা বিনতে আব্দুল্লাহ আবুবকর ছিদ্দীক ইবনে আবু কুহাফা ওছমান ইবনে আমের ইবনে আমর ইবনে কা‘ব ইবনে সা‘দ ইবনু তাইম ইবনে মুর্রাহ ইবনে কা‘ব ইবনে লুয়াই যাতুন নিতাকাঈন আত-তায়মিইয়া’। তাঁর স্বামীর নাম যুবাইর ইবনে আওয়াম ও সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ইত্যাদি। তিনি তাঁর সম্পর্কে ২৭ পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনা করেছেন।  আল-হামদুলিল্লাহ।

আর সর্বশেষ রাবীর নাম হলো ‘ইমরাআতু উনাইসা’ (জীবনী নং ৯৫১৯)। মোট ২২৫ জন নারীর জীবনী তিনি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি খত্বীব বাগদাদী (রহিঃ) রচিত ‘তারীখে বাগদাদ’-এর রচনাশৈলী ও পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ রাবীদের জীবনীসহ তাদের বর্ণিত কয়েকটি হাদীছ উল্লেখ করতেন, যেভাবে খত্বীব বাগদাদী (রহিঃ) লিখতেন।

তিনি এতে অনেক বিরল তথ্যাবলী একত্র করেছেন। এর কয়েকটি মুখতাছার গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে ইবনু মানযূর রচিত ‘মুখতাছার তারীখে দিমাশক্ব’ ও ইমাম আবু শামাহ আব্দুর রহমান, লিসানুল আরব প্রণেতা জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে মুকরাম আনছারী এবং বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ উমদাতুল ক্বারী প্রণেতা বদরুদ্দীন আইনী রচিত গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও কয়েকটি ‘যাইল’ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। যেমন তার ছেলে ক্বাসেম রচনা করেছেন। যা পূর্ণাঙ্গ হয়নি। ছদরুদ্দীন রচিত ‘যাইলু তারীখে দিমাশক্ব’। ‘যাইলু ওমর ইবনিল হাজিব’ ‘যাইলু আবি ইয়া‘লা আল-কালানসী’ ইত্যাদি। এছাড়াও ইমাম বারযালীও এর যাইল গ্রন্থ রচনা করেছেন।[4]

গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : এই অসাধারণ গ্রন্থটি রচনা করেছেন ইমাম আবুল ক্বাসেম আলী ইবনুল হুসাইন ইবনে হিবাতুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ। যিনি ইবনু আসাকির (রহিঃ) নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ৪৯৯ হিজরীতে (১১০৫ খৃ.) জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ৫৭১ হিজরীতে (১১৭৬ খৃ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি দিমাশক্ব তথা দামেশক্ব শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন। মাত্র ৭০ বছর বয়সে তিনি একাধিক গ্রন্থের পাশাপাশি এত বড় একটি গ্রন্থ কীভাবে রচনা করতে সক্ষম হলেন, তা ভেবে কুল পাওয়া যায় না। তাঁর বাবা বড় মাপের আলেম ও ফক্বীহ ছিলেন।[5]  এছাড়াও তিনি ‘আল-আরবাঊন ফিল হাছছি আলাল জিহাদ’ ‘মু‘জাম ইবনি আসাকির’ ‘আত-তাওবা’ ‘কাশফুল মুগাত্তা ফী ফাযলি মুওয়াত্ত্বা’ ‘ফাযলু শাহরি রামাযান’ ‘যাম্মু মান লা ইয়ামালু বিইলমিহ’ ‘যাম্মুল মালাহী’ ‘ফাযীলাতু যিকরিল্লাহ’ ‘ফাযলু উম্মিল মুমিনীন আয়েশাহ’ ‘মাদহুত তাওয়াযু’ সহ আরও অনেকগুলো অমূল্য সম্পদ জাতিকে উপহার দিয়েছেন।

ইমামগণ যা বলেছেন : তাঁর সম্পর্কে ইমামদের প্রশংসামূলক অসংখ্য বাণী বিদ্যমান। যেমন-

(১) যাহাবী (রহিঃ) (৬৭৩-৭৪৮ হি.) তাকে ‘ইমাম, আল্লামা, আল-হাফিযুল কাবীর, মুজাওয়িদ, সিরিয়ার মুহাদ্দিছ, দ্বীনের নির্ভরশীল ব্যক্তিত্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[6]

(২) ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হি.) অসংখ্য স্থানে তার উক্তি ও মতামত উদ্ধৃত করেছেন। যেমন একজন রাবীর ব্যাপারে ইবনু আসাকির মাজহূল বলেছেন। যা ইবনু হাজার উল্লেখ করেছেন।[7]  এতে বুঝা যায় যে, ইবনু আসাকিরকে তিনি গ্রহণযোগ্য ইমাম হিসাবে গণ্য করতেন।

(৩) হাজী খলীফা (রহিঃ) (১০১৭-১০৬৭ হি.) তাকে ‘ইমাম, হাদীছের হাফেয’ বলেছেন। তিনি ৮০টি খণ্ডে কথা উল্লেখ করেছেন।[8]

(৪) আলবানী (রহিঃ) (মৃ. ১৪২০ হি.) তাকে ‘হাদীছের হাফেয’ বলেছেন। [9]

সংশয় : এ গ্রন্থে ছহীহ-এর সাথে সাথে যঈফ ও জাল সনদও পাওয়া যায় কেন?

নিরসন : তিনি মূলত সব ধরনের বর্ণনা সনদসহ একত্র করেছেন। যেন পরবর্তীরা যাচাই-বাছাই করতে পারেন। সুতরাং তিনি যে সকল যঈফ ও জাল বর্ণনা এনেছেন, সেগুলো তাহক্বীক্ব ও পর্যালোচনা করে গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে হবে।

উপসংহার : ‘তারীখু দিমাশক্ব’ একটি অসাধারণ গ্রন্থ। এত বৃহৎ কলেবরের আর কোনো গ্রন্থ আমাদের নযরে আসেনি। প্রতিটি ইলম পিপাসুর জন্য এটি অধ্যয়ন করা আবশ্যক। বিশেষভাবে যারা আসমাউর রিজাল বিষয়ক গবেষণায় রত, তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। আল্লাহ লেখককে জান্নাত নছীব করুন- আমীন!

[1]. তারীখে দিমাশক্ব, ৫/৩।

[2]. প্রাগুক্ত, ৭৪/৩০৭।

[3]. প্রাগুক্ত, ৬৯/৩-৩০।

[4]. কাশফুয যুনূন, ১/২৯৪।

[5]. তারীখে দিমাশক্ব, (ভূমিকা) ১/১১।

[6]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, রাবী নং ৫১৫৫।

[7]. লিসানুল মীযান, রাবী নং ৪৮৯।

[8]. কাশফুয যুনূন, ১/২৯৪।

[9]. মুখতাছারুল উলূ, পৃঃ ২৫৬।