গ্রন্থ পরিচিতি-৩ : মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ

-আল-ইতিছাম ডেস্ক

ভূমিকা : যুগে যুগে যারা ইসলামের জন্য নিরলস খিদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন, তাদের অন্যতম হলেন, ইমাম ইবনু আবী শায়বাহ (রহিঃ)। তার লিখিত ‘আল-মুছান্নাফ’ খুবই প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থ। ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যেখানে হাদীছ তথা ধর্মীয় গ্রন্থাবলী সংরক্ষণের জন্য মুসলিমগণ অতিশয় বৃহৎ আকারের অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য তা অবারিত করে গেছেন। রেখে গেছেন ইল্ম হাছিলের অমূল্য ভাণ্ডার। আল-হামদুলিল্লাহ। নিচে এ গ্রন্থটি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো-

নাম : ‘আল-মুছান্নাফ’। এটি রচনা করেছেন, আবুবকর ইবনে আবু শায়বাহ আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে ওছমান ইবনে খাওয়াস্তী আল-আবসী (রহিঃ)। তিনি ১৫৯ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ২৩৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।

প্রকাশনা : (১) এই মহা মূল্যবান গ্রন্থটি ‘মাকতাবা রুশদ, রিয়াদ’ হতে অতি বৃহৎ আকারে ৭ খণ্ডে শায়খ কামাল ইউসুফ হূতের তাহক্বীক্বে প্রকাশিত হয়েছে (মাকতাবা শামেলা অনুসারে)। ১৪০৯ হিজরীতে এর প্রথম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। এর হাদীছ সংখ্যা ৩৭৯৪৩টি। (২) শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার তাহক্বীক্বে মুদ্রিত। যা সূচীপত্রসহ ২৬ খণ্ডে সমাপ্ত। এতে ৩৯০৯৮টি হাদীছ রয়েছে। (৩) শায়খ আবু মুহাম্মাদ উসামা ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদের তাহক্বীক্বেও প্রকাশিত। যার হাদীছ সংখ্যা ৩৮৯০৭টি। এটি ১৩ খণ্ডে সমাপ্ত। (৪) শায়খ ড. সা‘দ ইবনে নাছের ইবনে আব্দুল আযীযের তাহক্বীক্বে মুদ্রিত। যা ২০ খণ্ডে সমাপ্য এবং এর হাদীছ সংখ্যা ৩৯৬৩২টি। এছাড়াও আরও বিভিন্ন প্রকাশনী হতে এটি মুদ্রিত হয়েছে।

তাহক্বীক্ব নাকি তাহরীফ : অনেক মুহাক্কিক্বই তাহক্বীক্ব করতে গিয়ে স্বীয় মাযহাবপ্রীতির কারণে তাহরীফ তথা বিকৃতি সাধন করেন। যা ঠিক নয়। যেমন শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার তাহক্বীক্বে একাধিক স্থানে বিকৃত করা হয়েছে। এটি মুহাক্কিক্বের ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকতৃ তা প্রতীয়মান নয়। তবে বিকৃতি সাধিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দুটি হাদীছ দিয়ে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন-

হাদীছ-১ :

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ مُوسَى بْنِ عُمَيْرٍ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلَاةِ

অনুবাদ : ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রাঃ) বলেন, আমি নবী (ছাঃ)-কে ছালাতে ডান হাতকে বাম হাতের উপর রেখে দাঁড়াতে দেখেছি।[1]

হাদীছ-২ :

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ رَبِيعٍ، عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ قَالَ : يَضَعُ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ

অনুবাদ : ইবরাহীম (রহিঃ) বলেন, তিনি ছালাতে ডান হাতকে বাম হাতের উপর করে নাভীর নীচে রাখতেন। [2]

প্রথম হাদীছে ‘নাভীর নিচে’ মর্মে কোনো কিছু বলা নেই। দ্বিতীয় হাদীছে বলা হয়েছে। তবে তা যঈফ। কিন্তু শায়খ আওয়ামার তাহক্বীক্বকৃত নুসখায় প্রথম হাদীছটি এভাবে আছে-

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ مُوسَى بْنِ عُمَيْرٍ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ

অনুবাদ : ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রাঃ) বলেন, আমি নবী (ছাঃ) কে ছালাতে ডান হাতকে বাম হাতের উপর করে নাভীর  নীচে রেখে দাঁড়াতে দেখেছি।[3]

অথচ এটি স্পষ্ট বিকৃতি। আমরা এটা বলব না যে, শায়খ আওয়ামা (রহিঃ) ইচ্ছাকৃত এমনটা করেছেন। মানুষের ভুল হতেই পারে। তবে যারা এ তাহক্বীক্বকৃত নুসখা দিয়ে দলীল দেন, তাদের উচিত বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। এটা যে বিকৃতি, তা সর্বপ্রথম পাকিস্তানের মুহাক্কিক্ব উস্তাদ ইরশাদুল হক্ব আছারী  (হফিঃ) ধরিয়ে দেন। তিনি ‘আল-মুছান্নাফ গ্রন্থে বিকৃতি সাধন : শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার দুঃসাহস’ শিরোনামে একটি বৃহৎ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যা গবেষকগণের অধ্যয়ন করা উচিৎ।[4]

গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : এই অসাধারণ গ্রন্থটি রচনা করেছেন ইমাম ইবনু আবী শায়বাহ (রহিঃ)। তার সম্পর্কে ইমামদের প্রশংসামূলক অসংখ্য বাণী বিদ্যমান। যেমন-

(১)  ইমাম ইজলী (রহিঃ) (মৃ. ২৬১ হি.) বলেছেন, عبد الله بن محمد بن إبراهيم، وهو ابن أبي شيبة:كوفي، ثقة، وكان حافظًا للحديث ‘আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম হলেন ইবনু আবী শায়বাহ। তিনি কূফার অধিবাসী। ছিক্বাহ রাবী। তিনি হাদীছের হাফেয ছিলেন’।[5]

(২) ইমাম ইবনু হিব্বান (রহিঃ) (মৃ. ৩৫৪ হি.) বলেছেন,وَكَانَ متقنا حَافِظًا دينا مِمَّن كتب وَجمع وصنف وذاكر وَكَانَ أحفظ أهل زمانه بالمقاطيع ‘তিনি মুতক্বিন, (হাদীছের) হাফেয, ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাদের অন্যতম, যারা গ্রন্থ রচনা করেছেন, সংকলন ও প্রণয়ন করেছেন এবং মুযাকারাত করেছেন। আর তিনি নিঃসন্দেহে তার যামানার সর্বাধিক হাদীছ মুখস্থকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন’।[6]

অসংখ্য ইমাম তার প্রশংসা করে গেছেন। যা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ইমাম আহমাদ (রহিঃ), ইমাম বুখারী (রহিঃ), ইমাম মুসলিম (রহিঃ), ইমাম আবুদাঊদ (রহি), ইমাম ইবনু মাজাহ (রহি) প্রমুখ ইমামগণ তার ছাত্র ছিলেন।

উপসংহার : ‘মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ’ একটি অনবদ্য রচনা। কুতুবে সিত্তাহ রচিত হবার পূর্বেই এটি রচিত হয়েছে। এতে সর্বাধিক সংখ্যক হাদীছ রয়েছে। প্রতিটি আলেম ও গবেষকদের এই গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা আবশ্যক। এটির উর্দূ অনুবাদ মুদ্রিত হয়েছে। বাংলাতেও তাহক্বীক্বসহ এর অনুবাদ মুদ্রিত হওয়া যরূরী।