গ্রন্থ পরিচিতি-৪ : মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক

আল-ইতিছাম ডেস্ক

ভূমিকা : ইসলামের ইতিহাসে নিরলস খেদমত আঞ্জামের দরুন যারা অমর হয়ে আছেন, তাদের একজন হলেন ইমাম আব্দুর রাযযাক  আছ-ছান‘আনী (রহি.)। তাঁর লিখিত ‘আল-মুছান্নাফ’ সুপ্রসিদ্ধ হাদীছের গ্রন্থ। এ মহান মনীষী মুসলিম জাহানের জন্য রেখে গেছেন ইলম হাছিলের অমূল্য ভাণ্ডার। আল-হামদুলিল্লাহ। নিচে এ গ্রন্থটি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:

নাম : এ গ্রন্থটির নাম المصنف ‘আল-মুছান্নাফ’। এটি রচনা করেছেন আবুবকর আব্দুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম ইবনে নাফে‘ আল-হিমইয়ারী আল-ইয়ামানী আছ-ছান‘আনী (রহি.)। তিনি ইয়ামানের বর্তমান রাজধানী ছান‘আর অধিবাসী ছিলেন। তিনি ২১১ হিজরীতে মারা গিয়েছেন।

বিবরণ : এ গ্রন্থটি ১১ খণ্ডে ‘আল-মাকতাবুল ইসলামী, বৈরূত’ হতে মুদ্রিত হয়েছে। এতে হাদীছ রয়েছে ১৯৪১৮টি। এতে প্রচুর পরিমাণ আছার রয়েছে। এটি কিতাবুত ত্বহারাত দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর কিতাবুল হায়েয, কিতাবুছ ছালাত ইত্যাদি। সর্বশেষে ‘কিতাবু আহলিল কিতাবাইন’ অর্থাৎ দুই আহলে কিতাব তথা ইয়াহূদী ও নাছারাদের সম্পর্কে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যা অত্যন্ত চমকপ্রদ অধ্যায়। এ অধ্যায়ে এমন কিছু হাদীছ পাওয়া যায়, যা সচরাচর অন্য হাদীছের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায় না। এতে সর্বমোট ত্রিশটি অধ্যায় রয়েছে।

মিথ্যাচার : যারা নবী (ছা.)-কে নূরের সৃষ্টি মানেন, তারা প্রায়শই একটি ভিত্তিহীন হাদীছ বলে থাকেন। সেটি হলো, নবী (ছা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা সর্ব প্রথম আমার নূরকে সৃষ্টি করেছেন’। এ হাদীছটি বর্ণনা করার পর দাবী করেন যে, এটি মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাকে রয়েছে! বাস্তবতা হলো, মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাকের ত্রিশটি অধ্যায়ের কোথাও এমন কোনো জাল-বানোয়াট হাদীছের অস্তিত্ব নেই। এমনকি মুহতারাম লেখকের অন্যান্য গ্রন্থেও এ জাতীয় কোনো হাদীছ নেই।

প্রশ্ন : যদি উক্ত হাদীছটি না-ই থেকে থাকে, তাহলে কেন তারা দাবী করেন যে, এ হাদীছটি মুছান্নাফে আছে? এ দাবীর ভিত্তি কী?

জবাব : হাতে লিখিত কপি হতে নকল করতে গিয়ে এমনটা হয়ে থাকে। বর্তমানে আমরা ছাপার মেশিনে মুদ্রিত ঝকঝকে কাগজে উন্নতমানের বইতে যতটা সহজে পড়তে পারি, সে সময় সেটা মোটেও ছিল না। অনেক কষ্টে পাণ্ডুলিপির লেখা উদ্ধার করতে হত। হয়তো কোনো ইমামের পাণ্ডুলিপি হতে কপি করতে গিয়ে এমন কোনো ভুল হয়ে থাকতে পারে। সেখান হতেই এ ধারণা ছড়িয়ে থাকতে পারে। আল্লাহই ভালো জানেন।

পাণ্ডুলিপি পড়তে গিয়ে ভুল সঙ্ঘটিত হয়ে যাওয়ার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মুআম্মাল ইবনে ইসমাঈল (রহি.)। তিনি বুকে হাত বাঁধার হাদীছের রাবী হওয়ার কারণে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যতগুলো বাতিল ধারণা পোষণ করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো, ইমাম বুখারী (রহি.) তাকে ‘মুনকারুল হাদীছ’ বলেছেন বলে দাবী করা হয়। দলীল হিসাবে কিছু ইমামের গ্রন্থ হতে দলীল দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ইমাম বুখারী (রহি.) এমন কোনো কথা বলেননি; বরং তিনি মুআম্মাল ইবনে ইসমাঈলের জীবনী উল্লেখ করলেও তার সম্পর্কে কোনোরূপ নেতিবাচক কথা লিখেননি।[1]  এখানে তিনি ‘মুআম্মাল ইবনে ইসমাঈল’-কে উল্লেখ করেছেন। তবে কোনো সমালোচনা বা প্রশংসা করেননি। অতঃপর তিনি একই পৃষ্ঠায় ‘মুআম্মাল ইবনে সাঈদ’-নামী রাবীকে ‘মুনকারুল হাদীছ’ বলেছেন।[2]

এখানে অনেকেই প্রথম মুআম্মালের নামটা দেখার পর দ্বিতীয় মুআম্মাল সম্পর্কে উল্লেখকৃত ‘মুনকারুল হাদীছ’ কথাটি প্রথম মুআম্মআলে সাথে জুড়ে দিয়েছেন। কেননা হস্তলিখিত গ্রন্থে সবকিছু পরিষ্কারভাবে উদ্ধার করা সবসময় সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অনুরূপভাবেও কোনো ইমাম ভুলক্রমে এটা ইমাম আব্দুর রাযযাকের নামে বলে ফেলেছেন। আর সেটাকেই পুঁজি করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, ইমাম আব্দুর রাযযাক তার গ্রন্থে নবী নূরের সৃষ্টির হাদীছ উল্লেখ করেছেন, যা বাস্তবতার বিপরীত।

লেখকের পরিচয় : আলেমকুল শিরোমণি ইমাম আব্দুর রাযযাক সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি তুলে ধরা হলো-

(১) ইমাম ইজলী (রহি.) (মৃ. ২৬১ হি.) বলেছেন,عبد الرزاق بن همام يماني، ثقة، يكنى أبا بكر ‘আব্দুর রাযযাক ইবনে হুমাম ইয়ামানী একজন ছিক্বাহ রাবী। তার উপনাম আবুবকর’।[3]

(২) হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহি.) (মৃ. ৮৫২ হি.) বলেছেন,عبد الرزاق ابن همام ابن نافع الحميري مولاهم أبو بكر الصنعاني ثقة حافظ مصنف شهير عمي في آخر عمره  আব্দুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম ইবনে নাফে‘ আল-হিমইয়ারী আছ-ছান‘আনী একজন ছিক্বাহ রাবী, হাদীছের হাফেয, সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থকার। তিনি শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।[4]

উপসংহার : মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক একটি বৃহৎ হাদীছের গ্রন্থ। এটি মারফূ‘, মাওকূফ ও মাক্বতূ‘ হাদীছের একটি বড় সঙ্কলন। যা আলেম ও গবেষকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। আর এর লেখকের রয়েছে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। ইমামগণ তাকে এক বাক্যে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনা রয়েছে, যেগুলো বাতিল ও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। সুতরাং সেগুলো দেখে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা এই মহান ইমামকে জান্নাতবাসী করুন- আমীন!

[1]. আত-তারীখুল কাবীর, জীবনী ক্রমিক নং ২১০৭।

[2]. আত-তারীখুল কাবীর, রাবী নং ২১০৮।

[3]. আছ-ছিক্বাত, রাবী নং ১০০০।

[4]. তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৪০৬৪।