গ্রন্থ পরিচিতি-৮ : ইমাম বায়হাক্বীর ‘আস-সুনানুল কুবর’
-আল-ইতিছাম ডেস্ক


মিকা : আমাদের পূর্বসূরী ইমামদের অবদান ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, তাদের খেদমতকে যথাযথভাবে তুলে ধরা অসম্ভব প্রায়। তারপরও এ সম্পর্কে পাঠকদেরকে যৎসামান্য ধারণা দেওয়ার প্রচেষ্টা আমরা অব্যাহত রেখেছি। এ পর্বে আমরা আলোচনা করব ইমাম বায়হাক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) রচিত অমর গ্রন্থ ‘আস-সুনানুল কুবরা’। নিম্নে এ সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো :

নাম : আস-সুনানুল কুবরা  (اَلسُّنَنُ الْكُبْرَى)।

গ্রন্থটির মানহাজ : এটি অত্যন্ত বড় কলেবরের একটি হাদীছের গ্রন্থ। এতে হাদীছ রয়েছে ২১৮১২। এখানে মোট ৭২টি অধ্যায় রয়েছে। শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুল ক্বাদির আত্বা এই গ্রন্থটির তাহক্বীক্ব করেছেন। যা লেবাননের বৈরূতে অবস্থিত ‘দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়া’ হতে মুদ্রিত। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে এর তৃতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে, যা মাকতাবা শামেলায় যুক্ত করা হয়েছে। লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) এটি ফিক্বহী ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে রচনা করেছেন। তিনি প্রতিটি অনুচ্ছেদের শিরোনাম রচনা করেছেন। অতঃপর শিরোনামের সাথে উপযোগী হাদীছসমূহ সন্নিবেশ করেছেন। তিনি প্রতিটি হাদীছ সনদসহ উল্লেখ করেছেন। একটি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন একাধিক বর্ণনা পেশ করেছেন। প্রতিটি বর্ণনার মাঝে বিদ্যমান পার্থক্যসমূহ উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও হাদীছের সনদে ও মতনে থাকা ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্ণনা করেছেন। কোনটি ছহীহ আর কোনটি যঈফ সেটাও নির্ণয় করেছেন। কঠিন শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনেক স্থানে তিনি রাবীদের ব্যাপারে মতামত প্রদান করেছেন। তাখরীজও করেছেন। গ্রন্থটির অনন্য বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে হাফেয যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) এর একটি ‘ইখতিছার’ (সংক্ষিপ্তরূপ) রচনা করেছেন। এর নাম দিয়েছেন ‘আল-মুহাযযাব ফী ইখতিছারিস সুনানিল

কাবীর’। ইবনুত তুরকুমানী হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) এই গ্রন্থটির ‘তা‘লীক’ তথা পাদটীকা রচনা করেছেন। অবশ্য তিনি বায়হাক্বীর টীকা লেখার মাধ্যমে এ গ্রন্থটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং স্বীয় হানাফী মাযহাবের প্রতিরক্ষায় যাবতীয় প্রচেষ্টা-সংগ্রাম চালিয়েছেন। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তিনি সঠিক বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন, যা তার তাক্বওয়ার বহিঃপ্রকাশ।

ভারতীয় আলেম শায়খ যিয়াউর রহমান আল-আ‘যমী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু: ৩০/০৭/২০২০) সুনানে বায়হাক্বীর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, ‘আল-মিন্নাতুল কুবরা শারহু ওয়া তাখরীজুস সুনানিছ ছুগরা লিল-বায়হাক্বী’।  

গ্রন্থকারের পরিচয় : এই অমূল্য গ্রন্থটির গর্বিত রচয়িতা হলেন, আহমাদ ইবনু হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মূসা আল-খুসরাওজেরদী আল-খুরাসানী’ (أَحْمَدُ بْنُ الْحُسَيْنِ بْنِ عَلِيِّ بْنِ مُوْسَى الخُسْرَوْجِرْدِيُّ الْخُرَاسَانِيُّ أَبُوْ بَكْرٍ الْبَيْهَقِيُّ)।[1] তার উপনাম হলো আবূ বকর।

ইমামদের বক্তব্য :

(১) ইমাম ইবনু নুকতা (রাহিমাহুল্লাহ) তার সম্পর্কে বলেছেন, الْحَافِظُ الْإِمَامُ صَاحِبُ كِتَابِ السُّنَنِ الْكَبِيْرِ وَالسُّنَنِ الصَّغِيْرِ وَدَلَائِلِ النُّبُوَّةِ وَكِتَابِ الْأَدَبِ وَغَيْرِ ذَلِكَ ‘তিনি হাদীছের হাফেয, ইমাম, সুনানে কাবীর, সুনানে ছগীর, দালায়েলুন নুবুওয়াহ, কিতাবুল আদাবসহ অন্যান্য গ্রন্থপ্রণেতা’।[2]

(২) তাক্বীউদ্দীন আবূ ইসহাক্ব ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ আস-সারীফীনী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৬৪১ হি.) বলেছেন, الإِمَامُ الْحَافِظُ الْفَقِيهُ الأُصُولِيُّ الدَّيِّنُ الْوَرعُ، وَاحِدُ زَمَانِهِ فِي الْحِفْظِ ‘তিনি একজন ইমাম, হাদীছের হাফেয, ফক্বীহ, উছূলী, অত্যন্ত উদার মনের, খুব তাক্বওয়াবান, হিফযের ক্ষেত্রে তার যামানার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছিলেন’।[3]

মৃত্যু : ৪৫৮ হিজরীতে এই মহান মনীষী আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান (রাহিমাহুল্লাহ)।  

উপসংহার : ইমাম বায়হাক্বী রচিত এই গ্রন্থটি সুখপাঠ্য। এটি অধ্যয়ন করলে ফিক্বহী মাসআলা, রাবীদের জীবনী, হাদীছের মানসহ যাবতীয় বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান হাছিল হবে। আল্লাহ লেখককে জান্নাতবাসী করুন। ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার লিখিত গ্রন্থসমূহকে কবুল করুন- আমীন!        


[1]. ইবনু নুকতা, ইকমালুল ইকমাল, রাবী নং ১৫৭।

[2]. প্রাগুক্ত।

[3]. আল-মুনতাখাব, রাবী নং ২৩১।