গ্রন্থ পরিচিতি-৯ : ছহীহুল বুখারী

-আল-ইতিছাম ডেস্ক



ভূমিকা :
আল্লাহ তাআলা যে সকল মহান ব্যক্তিকে দিয়ে দ্বীনের ব্যাপক খেদমত করিয়ে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)। তার রচিত ‘ছহীহুল বুখারী’ পবিত্র কুরআনের পরে সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ। এতো ছোট্ট পরিসরে এ গ্রন্থের মহিমা বর্ণনা করা মোটেও সম্ভব নয়। তারপরও পাঠকের সমীপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো-

নাম :  الْجَامِعُ الْمُسْنَدُ الصَّحِيحُ الْمُخْتَصَرُ مِنْ أُمُورِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَسُنَنِهِ وَأَيَّامِهِ  ‘আল-জামে‘উল-মুসনাদুছ-ছহীহুল-মুখতাছারু মিন উমূরি রসূলিল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়া সুনানিহী ওয়া আইয়ামিহ’।

নাম বিশ্লেষণ : ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) যে নামটি দিয়েছেন, তার মধ্যে গভীর ইলমী তত্ত্ব লুকিয়ে আছে। এটা নিছকই একটা নাম নয়। বুখারীর নামের মধ্যে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-

(১) আল-জামে‘ : জামে‘ এমন গ্রন্থকে বলা হয়, যার মধ্যে মৌলিক ৮টি বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেগুলো হলো- আক্বীদা, তাফসীর, আহকাম, ফেতনা, কিয়ামত ও পরকাল, সীরাত, আদব, মানাকিব ইত্যাদি।

(২) আল-মুসনাদ : প্রতিটি মারফূ‘ মুত্তাছিল হাদীছকে মুসনাদ বলা হয়।

(৩) আছ-ছহীহ : ছহীহ বলতে বিশুদ্ধ হাদীছকে বুঝায়। যার সনদ ও মতনে কোনরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই সেটাই ছহীহ হিসাবে গণ্য হয়।

এগুলো সবই পরিভাষা। এই পরিভাষাগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে হলে উছূলে হাদীছের গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করতে হবে।

ছহীহ বুখারী’ সম্পর্কে ইমামদের অভিমতসমূহ : গ্রন্থ হিসাবে ছহীহ বুখারীর প্রশংসা বলে শেষ করা যাবে না। যেমন সুনানে নাসাঈর লেখক ইমাম নাসাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৩০৩ হি.) যিনি ইমাম বুখারীর ছাত্র; তার যামানা পর্যন্ত লিখিত গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে বলেছেন, فَمَا فِيْ هَذِهِ الْكُتُبِ أَجْوَدُ مِنْ كِتَابِ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْمَاعِيْلَ الْبُخَارِيِّ ‘এই সকল গ্রন্থসমূহের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারীর গ্রন্থটির চাইতে উত্তম কোনো গ্রন্থ নেই’।[1] ইমাম দারাকুত্বনী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৩৮৫ হি.) বলেছেন,

وَمَعَ هَذَا فَمَا فِي هَذِه الْكتب خير وَأفضل من كتاب مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل البُخَارِيّ رَحمَه الله

‘এরপরও এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কিতাবের চাইতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আর নেই’।[2]

হানাফী আলেমদের মধ্যেও ছহীহ বুখারীর তাৎপর্যপূর্ণ মর্যাদা আছে। মোল্লা আলী কারী হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) লিখেছেন, ‘অতঃপর আলেমদের ঐকমত্য আছে যে, ছহীহাইন সকলের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। আর এ দুটি গ্রন্থই সকল গ্রন্থের মাঝে সর্বাধিক বিশুদ্ধ’।[3]

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘ছহীহ বুখারী ও মুসলিম সম্পর্কে সকল মুহাদ্দিছ একমত আছেন যে, এ দুটি গ্রন্থের সকল মুত্তাছিল ও মারফূ‘ হাদীছ নিশ্চিতরূপে ছহীহ। এ দুটি গ্রন্থই লেখকদ্বয় পর্যন্ত মুতাওয়াতিরভাবে পৌঁছেছে। যে এর সম্মান করে না, সে বিদ‘আতী। সে মুসলিমের তরীকার বিরুদ্ধে চলে’।[4]

ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মর্যাদা : তার পুরো নাম ‘আবূ আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী আল-জু‘ফী’। তিনি ১৬ বছর যাবৎ এ গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে হাদীছ সংখ্যা রয়েছে ৭৫৬৩। হাফেয ইবনে হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম বুখারীকে ছিক্বাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।[5] ছহীহ মুসলিমের লেখক ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম বুখারী সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার সাথে স্রেফ হিংসা পোষণকারী ব্যক্তিই ঘৃণা রাখে। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, দুনিয়াতে তার ন্যায় কেউ নেই’।[6] ইমাম ইবনে খুযায়মা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমি আসমানের নিচে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈলের চাইতে বড় হাদীছের আলেম আর কাউকে দেখিনি’।[7] ইমাম তিনি ১৯৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও ২৫৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। 

মহান আল্লাহ দ্বীনের এই মহান খাদেমকে জান্নাতবাসী করুন- আমীন!


[1]. তারীখে বাগদাদ, ১/৯।

[2]. মুহাম্মাদ ইবনে তাহের মাক্বদেসী, আতরাফুল গারায়েব ওয়াল আফরাদ, হা/১৫।

[3]. মিরকাতুল মাফাতীহ, ১/৫৮।

[4]. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/১৩৪।

[5]. কিতাবুস ছিক্বাত, ৯/১১৩, ১১৪।

[6]. খলীলী, আল-ইরশাদ, ৩/৯৬১।

[7]. মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, হা/১৫৫।