ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের একাল-সেকাল
মো. হাসিম আলী*


সাধারণ অর্থে যিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন তিনি ছাত্র এবং যিনি শিক্ষাদান করেন তিনি শিক্ষক। আর তাদের মধ্যকার সম্পর্কই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক হচ্ছে অতি পবিত্র, আত্মিক, মধুর ও অবিচ্ছেদ্য, যার মূলভিত্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

‘শিক্ষা’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক। তাই ছাত্র-শিক্ষক উভয়েরই সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষা সম্পর্কে জানা। বাংলায় ‘শিক্ষা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘শাস’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ শাসন করা, নিয়ন্ত্রণ করা, নির্দেশ দান করা, উপদেশ দান করা। সাধারণভাবে বিদ্যা অর্জন, বিদ্যা আহরণ অর্থেও ‘শিক্ষা’ শব্দটির ব্যবহার হয়। এ ‘বিদ্যা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা বা জ্ঞান আহরণ করা। ‘শিক্ষা’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো EDUCATION। এটি ল্যাটিন শব্দ। ল্যাটিন ভাষায় EDUCATION সংক্রান্ত তিনটি মৌলিক শব্দ পাওয়া যায়, যথা— EDUCARE, EDUCERE, EDUCATUM। শব্দগুলো সমার্থক হলেও এগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। প্রথমত, Educare অর্থ লালনপালন করা, পরিচর্যা করা। অর্থাৎ শিশুকে আদর-যত্মের মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। দ্বিতীয়ত, EDUCERE অর্থ ভেতর থেকে বাইরে আনা বা অন্তর্নিহিত শক্তি বা গুণাবলি বিকাশে সহায়তা করা। তৃতীয়ত, EDUCATUM অর্থ শিক্ষক বা শিক্ষাদান সংক্রান্ত। এ তিনটি শব্দের মধ্যে EDUCERE শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ‘শিক্ষা’র ক্ষেত্রে EDUCERE শব্দটি গ্রহণ করে আমরা বলতে পারি, ‘যা অন্তর্নিহিত গুণাবলি ও শক্তি সম্ভাবনার বিকাশ ঘটায় তা-ই শিক্ষা’। অন্যকথায়, ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক অর্থাৎ সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধনের নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হলো শিক্ষা। সুতরাং ‘শিক্ষা’ বলতে যদি সার্টিফিকেট প্রাপ্তি ও ডিগ্রিকে বুঝি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বলতে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক বুঝি, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ হয় না।

শিক্ষার সাথে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সুতরাং যথার্থ ছাত্র ও শিক্ষকের পরিচয়ও তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছাত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো STUDENT। এ শব্দটির প্রতিটি অক্ষর থেকে আলাদা আলাদা যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্য পেতে পারি, তা এরকম হতে পারে— S=STUDY (অধ্যয়ন), T=TRUTHFULNESS (সত্যবাদিতা), U=UNITY (ঐক্য), D=DISCIPLINE (শৃঙ্খলা), E=EAGERNESS (আগ্রহ), N=NEUTRALITY (নিরপেক্ষতা), T=TIME BOUND (সময়নিষ্ঠ)। একজন ছাত্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইমাম শাফেঈ p-এর শিক্ষক আল্লামা ওয়াকী p বলেন, ‘ছাত্রের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো সকল পাপকাজ বর্জন করা’। সুতরাং বলা যায়, যিনি নিয়মিত অধ্যয়ন করেন, সত্যের আলোতে নিজেকে উদ্ভাসিত করেন, ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেন, শেখার প্রতি যিনি আগ্রহী ও যত্মশীল থেকে প্রতিটি কর্তব্য যথাসময়ে সম্পাদন করেন, তিনিই ছাত্র। আর শিক্ষকতার মতো একটি মহান পেশায় যিনি জড়িত, তিনিই শিক্ষক। শিক্ষক শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ— TEACHER। শব্দটি খুবই বিশ্লেষণধর্মী, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষক উপলব্ধি করতে পারবেন তার স্বরূপ ও দায়িত্ব। আবার শিক্ষার্থীও উপলব্ধি করতে পারবেন তার প্রিয় শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি। একজন শিক্ষককে সবসময় মনে রাখতে হবে যে, তিনি কে? তাঁর দায়িত্ব কী? তাকে অবশ্যই শিক্ষক শব্দের মধ্যে লুক্বায়িত গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। একজন ব্যক্তিকে যথার্থ অর্থে শিক্ষক হতে গেলে ‘শিক্ষক’ শব্দের ‘শি’ দ্বারা ‘শিক্ষণ’, ‘শিক্ষা’, ক্ষ’ দ্বারা ‘ক্ষমা’, ‘ক্ষমতা’, ‘ক’ দ্বারা কর্মঠ, কৌশলী ইত্যাদি গুণ অর্জন করতে হয়।

মোটকথা, শিক্ষক হতে গেলে ব্যক্তিকে সর্বপ্রথম বিষয়গত জ্ঞানে অগাধ ক্ষমতাধর হওয়ার পাশাপাশি ছাত্রের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে কৌশলী ও কৌতূহলী হতে হবে। ছাত্রকে স্নেহের শাসনের পাশাপাশি তার প্রতি ক্ষমাশীল ও মহানুভবও হতে হবে। TEACHER শব্দটির মাঝে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে যা ছাত্র-শিক্ষকের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক তৈরিতে সহায়ক হবে। যেমন— TALENTED (প্রতিভাধর), TACFUL (কৌশলী), TRAINED (প্রশিক্ষিত), TRUTHFUL (সত্যবাদি)। E=EXPERT (দক্ষ), EARNEST (আন্তরিক), ENERGETIC (উদ্যমশীল)। A=AESTHETIC (রুচিশীল), ACTIVE (কর্মঠ), ARTIST (শিল্পী), ADMINISTRATOR (প্রশাসক)। C=CAREFUL (যত্নশীল), COMPETENT (যোগ্য), CREATIVE (সৃজনশীল), CHEERFUL (উৎফুল্ল)। H=HONEST (সৎ), HUMORIST (রসিক), HELPER (সাহায্যকারী), HEALTHY (স্বাস্থ্যবান)। E=EVALUATOR (মূল্যায়ক), ELOQUENT (বাকপটু), EDITOR (সম্পাদক), EMOTIONAL (আবেগদীপ্ত)। R=READER (পাঠক), RELIABLE (নির্ভরযোগ্য), RESPONSIBLE (দায়িত্বশীল), RESEARCHER (গবেষক)।

ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হলো আত্মার সম্পর্ক। এটি পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ন্যায়। পিতা-মাতা সন্তানকে জন্মদান করেন। তাকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলেন একজন শিক্ষক। তাইতো কবি বলেছেন—

“সকলের মোরা নয়ন ফুটাই, আলো জ্বালি সব প্রাণে

নব নব পথ চলিতে শেখাই জীবনের সন্ধানে।

পরের ছেলেরে এমনি করিয়া শেষে

ফিরাইয়া দেই পরকে আবার অকাতরে নিঃশেষে।”

পুত্র পিতা থেকে সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। আর ছাত্র শিক্ষক থেকে জ্ঞানের উত্তরাধিকারী হন। তাঁদের সম্পর্ক ভালোবাসা, স্নেহের, বন্ধুত্বের, আস্থার ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মুহাম্মাদ a। ছাহাবীগণ ছিলেন তাঁর ছাত্র। তিনি ছাহাবীদের নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। ছাহাবীগণও তাকে ভালোবাসতেন পৃথিবীর যেকোনো কিছুর তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি ছাহাবীগণ মহানবী a-এর সামনে উঁচুস্বরে কথাও বলতেন না। একজন শিক্ষার্থীর অনেক প্রত্যাশা থাকে শিক্ষকের নিকট। সে প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমে শিক্ষক স্থায়ী আসন লাভ করেন ছাত্রের হৃদয়ের ভেতরে। এজন্য শিক্ষককে আজীবন ছাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। প্রকৃতপক্ষে ছাত্র-শিক্ষক পরস্পর পরস্পরের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করে থাকেন। ছাত্র যত বড়ই হোন না কেন তাঁর জীবনে শিক্ষকের অবদান কোনো দিন অস্বীকার করতে পারেন না। আবার ছাত্রকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কেউ মহান শিক্ষকও হতে পারেন না। কারণ ছাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে শিক্ষকের সকল যোগ্যতা ও প্রচেষ্টা মূল্যহীন। বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিক বিপর্জয় এমন পর্যায়ে পৌঁছছে যে, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক আজ টিউশনি, পরীক্ষায় পাশ আর ডিগ্রি লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পথে-ঘাটে দেখা হলে সালাম কিংবা কুশল বিনিময় তো হয়ই না; বরং পরস্পর অপরিচিতের মতো আচরণ করে থাকে। ছাত্রের হাতে আজ বই-খাতা-কলমের পরিবর্তে শোভা পাচ্ছে মারণাস্ত্র ও মাদক। ফলে প্রতিনিয়ত শিক্ষকের খুনে ছাত্রের হাত রঞ্জিত হচ্ছে। আজকের এ অবস্থার জন্য শুধু ছাত্ররা দায়ী নন। এজন্য শিক্ষকসমাজের সে অংশও দায়ী, যারা শিক্ষকতাকে নিছক টাকা কামানোর উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে, যাদের নীতি আর চরিত্র বলতে কিছু নেই। যারা শিক্ষকতার মহান পেশায় থেকেও ধূমপান, মাদক, অশ্লীলতা, অবৈধ নারী সম্ভোগে ডুবে থাকেন সারাক্ষণ, যারা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অপেক্ষা দলবাজি আর টিউশনিতে আনন্দ বেশি পান। দু’পয়সা কামানোর ধান্দায় নীতি-নৈতিকতার মাথা খেয়ে ছাত্রদের সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেন। ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভাবতে পারেন না, একটু স্নেহ করতে পারেন না। তার মধ্যে লুক্কায়িত অপার সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে পারেন না।

আবার এ দুরবস্থার জন্য সেই অভিভাবকও কম দায়ী নন, যিনি সন্তানকে স্নেহের শাসনের পরিবর্তে আশকারা দেন। যিনি সন্তানকে নৈতিক শিক্ষাদানের চেষ্টাও করেন না। যিনি নিজেই উশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। যিনি সন্তানকে শাসনের পরিবর্তে শিক্ষককে শাসন করতে প্রয়াস পান। যিনি লোক্বমান e-এর মতো উপদেশ সন্তানকে দিতে পারেন না। যিনি প্রাইমারি স্কুলগামী সন্তানকে দামী মোবাইল কিনে দেন আধুনিক ও স্মার্ট হওয়ার জন্য, তিনিও কম দায়ী নন। আবার এ পরিণতির দায় ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের ঘাড়ে দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র চুপ থাকতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের স্বাধীনভাবে বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চা করতে হবে সমাজের তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। অনৈতিকতার সকল পথ রুদ্ধ করতে হবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে। ছাত্রদের রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে দূরে রাখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁর মাধ্যমে ঘটে একজন ছাত্রের সত্যিকারের বৃদ্ধি, বিকাশ, ও প্রতিষ্ঠা। আবার ছাত্রই শিক্ষক মূল্যায়নের প্রকৃত উপাদান। সুতরাং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে থাকবে শুধু পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, আস্থা আর কল্যাণচিন্তা।