ছাদাক্বাতুল ফিত্বর : একটি পর্যালোচনা

মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন*


যাকাতের মতো ছাদাক্বাতুল ফিত্বরও একটি আর্থিক ইবাদত। পবিত্র মাহে রামাযানে ছিয়াম পালন করতে গিয়ে সাধারণত আমাদের অনেক ভুলত্রুটি হয়ে যায়। সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদতের নাম ছাদাক্বাতুল ফিত্বর। এটি শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, বরং এর আরেকটি মহৎ উদ্দেশ্য হচ্ছে, গরীবদের ঈদের খুশিতে শরীক করা।

ফিত্বরা (فِطْرَة) আরবী শব্দ, যা ইসলামে যাকাতুল ফিত্বর (ফিত্বরের যাকাত) বা ছাদাক্বাতুল ফিত্বর (ফিত্বরের ছাদাক্বা) নামে পরিচিত। ফিত্বর অর্থ ভেঙ্গে ফেলা। ফাতূর বলতে সকালের খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়, যা দ্বারা ছায়েমগণ ছিয়াম ভঙ্গ করেন।[1]

ছাদাক্বাতুল ফিত্বর কেন আদায় করব?

ছিয়াম পালনকারীদের অনর্থক কথা, কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মার আমলকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যাকাতুল ফিত্বর চালু করা হয়েছে। এছাড়াও মিসকীনদের খাদ্য হিসাবে ও তাদেরকে ঈদের দিন মানুষের কাছে চাওয়া হতে মুক্ত রাখার জন্য চালু করা হয়েছে। হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ k قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ.

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস h বলেন, রাসূলুল্লাহ a ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ওয়াজিব করেছেন অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তার কারণে ছিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করার জন্য ও মিসকীনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের ছালাতের পূর্বে আদায় করলে তা ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসেবে গণ্য হবে। আর ঈদের ছালাতের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ দানের মতো একটি দান হিসেবে গণ্য হবে।[2]

ছাদাক্বাতুল ফিত্বর কারা আদায় করবে?

ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের জন্য নিছাব বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ a ফিত্বরা ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোনো নিছাব নির্ধারণ করেননি; বরং নবী a প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, স্বাধীন-পরাধীন, ছোট-বড় সকলে উপর ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন।

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنْ الْمُسْلِمِينَ وَأَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ.

ইবনু উমার h হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্তবয়স্ক, অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল a ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক ছা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের ছালাতে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।[3]

ছাদাক্বাতুল ফিত্বর কী দ্বারা আদায় করব?

এ সম্পর্কে আবূ সাঈদ খুদরী c বলেছেন,كُنَّا نُخْرِجُ فِىْ عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْفِطْرِ صَاعًا مِّنْ طَعَامٍ وَكَانَ طَعَامُنَا الشَّعِيْرُ وَالزَّبِيْبُ وَالْأَقِطُ وَالتَّمْرُ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ a-এর যুগে ঈদুল ফিত্বরের দিনে এক ছা‘ ত্বআম বা খাদ্যদ্রব্য ফিত্বরা বের করতাম। আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর’।[4] অপর বর্ণনায় আবূ সাঈদ খুদরী c বলেছেন,إِنَّمَا كُنَّا نُخْرِجُ عَلٰى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ صَاعًا مِّنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِّنْ شَعِيْرٍ أَوْ صَاعًا مِّنْ أَقِطٍ لَا نُخْرِجُ غَيْرَهُ ‘রাসূলুল্লাহ a-এর যুগে আমরা কেবল এক ছা‘ খেজুর অথবা এক ছা‘ যব অথবা এক ছা‘ পনির ফিত্বরা বের করতাম। এছাড়া অন্য কোনো জিনিসের সাহায্যে আমরা ফিত্বরা বের করতাম না’।[5]

উল্লেখ্য, হাদীছে ‘ত্বআম’ শব্দটির ব্যাপক অর্থ রয়েছে। অর্থাৎ সকল প্রকার খাদ্যবস্তু যাকে ‘কূতুল বালাদ’ অর্থাৎ দেশের প্রধান খাদ্যবস্তুসমূহ বলা হয়, এখানে সেই অর্থ নেওয়াই হবে অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। এই ব্যাপক অর্থ যেমন আরবী অভিধান দ্বারা প্রমাণিত, ঠিক তেমনি অধিকাংশ অভিজ্ঞ আলেম দ্বারা সমর্থিত। এটাই শরীআতের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাছাড়া এই অর্থে যেমন ফিত্বরার আদেশ প্রতিপালন করা সহজসাধ্য, তেমনি এর মাধ্যমে ফিত্বরার উদ্দেশ্যও সফল হয়।

উক্ত আলোচনা অনুসারে আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য হচ্ছে চাল। অতএব, আমাদেরকে চালের মাধ্যমেই ফিত্বরা আদায় করতে হবে। ধানের ফিত্বরা গ্রহণযোগ্য হবে না।

ছাদাক্বাতুল ফিত্বর-এর পরিমাণ :

ইবনু উমার h-এর হাদীছে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ a রামাযান মাসের ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসেবে খেজুর বা যবের এক ছা‘, দাস-দাসী, স্বাধীন ব্যক্তি, পুরুষ-নারী, ছোট-বড়দের উপর ফরয করেছেন এবং তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন ঈদের ছালাতের জন্য মানুষের বের হওয়ার পূর্বে’।[6] আবূ সাঈদ খুদরী c বলেছেন,كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أقط أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيْبٍ ‘আমরা খাদ্যদ্রব্য অথবা যব অথবা খেজুর অথবা পনির অথবা কিশমিশ হতে এক ছা‘ পরিমাণ ছাদাক্বাতুল ফিত্বর বের করতাম’।[7] অন্য হাদীছে এসেছে, صَدَقَةُ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ ‘ফিত্বরা হচ্ছে এক ছা‘ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য’।[8]

আরবের মানুষের তৎকালীন খাবার ছিল যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যদ্রব্য হচ্ছে চাল এবং গম। অতএব, ফিত্বরাও প্রদান করতে হবে এই চাল অথবা গম দিয়ে, যার যেটা প্রধান খাদ্য। আর তা প্রদান করতে হবে এক ছা‘ পরিমাণ। বাংলাদেশের হিসেবে যা আড়াই কেজির সমপরিমাণ।

ছা‘এর সংজ্ঞা ও পরিমাণ :

আরবীতে ছা‘ (صاع) নির্দিষ্ট পরিমাপের একটি পাত্রকে বলা হয়, যার দ্বারা শস্যজাতীয় খাদ্য পরিমাপ করা হয়। মাঝারি দেহের অধিকারী মানুষের দুই হাতের তালু একত্র করে চার অঞ্জলিতে যে পরিমাণ খাবার উঠে আসে তাই এক ছা‘। এই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্যকে ওযন করা হলে মোটামুটি আড়াই কেজি হবে।[9]

অর্ধ ছা‘ দিয়ে ফিত্বরা আদায়ের বিধান :

নবী a এক ছা‘ পরিমাণ ফিত্বরা অবশ্যক করেছেন। কিন্তু নবী a ও চার খলীফার ইন্তেকালের পর যখন মুআবিয়া c ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনা হতে দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়, তখন তারা গমের সাথে পরিচিতি লাভ করেন। সে যুগে সিরিয়ায় গমের মূল্য খেজুরের মূল্যের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলীফা মুআবিয়া c একদা হজ্জ বা উমরা করার সময় মদীনায় আসলে মিম্বারে আরোহণ করে বলেন, আমি অর্ধ ছা‘ গমকে এক ছা‘ খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এরপর থেকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অর্ধ ছা‘ ফিত্বরার প্রচলন শুরু হয়। বর্ণনাটি এভাবে এসেছে,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ كُنَّا نُخْرِجُ إِذْ كَانَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ عَنْ كُلِّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ فَلَمْ نَزَلْ نُخْرِجُهُ حَتَّى قَدِمَ عَلَيْنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا فَكَلَّمَ النَّاسَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَكَانَ فِيمَا كَلَّمَ بِهِ النَّاسَ أَنْ قَالَ إِنِّي أُرَى أَنَّ مُدَّيْنِ مِنْ سَمْرَاءِ الشَّامِ تَعْدِلُ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ فَأَخَذَ النَّاسُ بِذَلِكَ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَأَمَّا أَنَا فَلاَ أَزَالُ أُخْرِجُهُ كَمَا كُنْتُ أُخْرِجُهُ أَبَدًا مَا عِشْتُ.

আবূ সাঈদ খুদরী c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a-এর জীবদ্দশায় আমরা ছোট, বড়, স্বাধীন, ক্রীতদাস প্রত্যেকের পক্ষ থেকে এক ছা‘ খাদ্য অর্থাৎ গম বা এক ছা‘ পনির বা এক ছা‘ যব বা এক ছা‘ খেজুর বা এক ছা‘ কিশমিশ ফিত্বরা হিসেবে বের করতাম। আমরা এভাবেই ফিত্বরা আদায় করে আসছিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন মুআবিয়া c হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে আমাদের মাঝে আগমন করলেন, তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিলেন এবং বললেন, আমি জানি যে, সিরিয়ার দুই মুদ্দ লাল গম এক ছা‘ খেজুরের সমান। সুতরাং লোকেরা তার এ অভিমত গ্রহণ করল। আবূ সাঈদ c বললেন, কিন্তু আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিন পূর্বের ন্যায় সেই পরিমাণে ও যে নিয়মে দিচ্ছিলাম সেভাবেই দিতে থাকব।[10]

এক্ষণে প্রশ্ন হলো, নবী a কর্তৃক নির্ধারিত এক ছা‘ ফিত্বরার পরিমাণ ছাহাবী মুআবিয়া c-এর রায়ের কারণে রহিত হয়ে যাবে কি? কিংবা কোনো ছাহাবীর সিদ্ধান্তের কারণে নবী a-এর সুন্নাত ছেড়ে দিতে হবে কি? এই কারণে ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী c এই মতের জোরালো বিরোধিতা করেছেন এবং বলেছেন, আমি সারা জীবন সেই পরিমাণেই ফিত্বরা বের করব, যে পরিমাণ নবী a-এর যুগে বের করতাম।

মনে রাখতে হবে, আবূ সাঈদ খুদরী c-সহ অনেক ছাহাবী n রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাহর বিপরীতে মুআবিয়া c-এর রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর এটাই নবী করীম a-এর সুন্নাতের প্রতি ভালোবাসা।

ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী p বলেন,وَفِيْ صَنِيْعِ مُعَاوِيَةَ وَمُوَافَقَةِ النَّاسِ لَهُ دَلَالَةٌ عَلَى جَوَازِ الِاجْتِهَادِ وَهُوَ مَحْمُوْدٌ لَكِنَّهُ مَعَ وُجُوْدِ النَّصِّ فَاسد الإِعْتِبَارِ ‘মুআবিয়া c-এর ইজতিহাদ এবং মানুষের তা গ্রহণ করার মাধ্যমে ইজতিহাদের বৈধতা প্রমাণিত হয়, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু যেখানে দলীল উপস্থিত, সেখানে ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়’।[11] ছহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নববী p (৬৩১-৬৭৬ হি.) বলেন,وَلَيْسَ لِلْقَائِلَيْنِ بِنِصْفِ صَاعٍ حُجَّةٌ إِلَّا حَدِيْثَ مُعَاوِيَةَ ‘অর্ধ ছা‘ গমের কথা যারা বলেন, তাদের মুআবিয়া c-এর এই হাদীছ ব্যতীত অন্য কোনো দলীল নেই’।[12]

টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তু দ্বারা ফিত্বরা আদায়ের বিধান :

নবী a-এর যুগেও মুদ্রা হিসেবে দীনার এবং দিরহামের প্রচলন ছিল এবং সে যুগেও ফকীর-মিসকীনদের তা প্রয়োজন হতো। তা দ্বারা তারা জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় করতেন। তা সত্ত্বেও নবী a মুদ্রা দ্বারা ফিত্বরা নির্ধারণ না করে খাদ্যদ্রব্য দ্বারা নির্ধারণ করেছেন। তাই উপরে হাদীছে বর্ণিত খাদ্যবস্তু দ্বারাই ফিত্বরা আদায় করা সুন্নাত। আর এটাই জমহূর উলামায়ে কেরামের মত। কারণ বর্ণিত খাদ্যবস্তুর বদলে মূল্য তথা টাকা-পয়সা দ্বারা ফিত্বরা দিলে নবী a-এর আদেশকে উপেক্ষা করা হয়।

যারা মূল্য দ্বারা ফিত্বরা দেন তাদের সম্পর্কে ইমাম আহমাদ p-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাহর বরখেলাফ হওয়ার কারণে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, তা যথেষ্ট হবে না।[13]

ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায়ের সময় :

ঈদের ছালাতের জন্য ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বে ফিত্বরা আদায় করতে হবে। এ মর্মে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ أَمَرَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ أَنْ تُؤَدّٰى قَبْلَ خُرُوْجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ ‘রাসূলুল্লাহ a ঈদের ছালাতের জন্য বের হওয়ার পূর্বে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন’।[14]

ঈদের দুই-তিন দিন পূর্বে ফিত্বরা আদায় করা যাবে। তাদের দলীল হচ্ছে— আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h-এর হাদীছ,وَكَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ يُخْرِجُهَا قَبْلَ ذٰلِكَ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h ঈদের এক দিন বা দুই দিন আগে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতেন’।[15]

ঈদের ছালাতের পর ফিত্বরা আদায় করলে তা আদায় হবে না; বরং সাধারণ ছাদাক্বা হিসেবে গণ্য হবে। এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস h থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে ফিত্বরা আদায় করবে, তার দান ফিত্বরারূপেই গৃহীত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পর ফিত্বরা আদায় করবে, তার দান সাধারণ ছাদাক্বার পর্যায়ভুক্ত হবে’।[16]

ফিত্বরার হক্বদার :

এ বিষয়ে ইসলামী বিদ্বানগণের মাঝে দুটি মত রয়েছে। প্রথমত, ইমাম শাফেঈ, ইমাম ইবনু কুদামা, ইমাম কারখী, হাফেয ইবনু হাযম আর হানাফী মাযহাবের বিদ্বানগণের উক্তি এবং শায়খ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভীর সাক্ষ্য অনুসারে চার মাযহাবের  প্রকাশ্য  ফাতওয়া  সূত্রে  ফিত্বরার  যাকাত

সম্পদের যাকাতের নিয়মানুযায়ী বণ্টন করতে হবে।[17]

দ্বিতীয়ত, ছাদাক্বাতুল ফিত্বর বা ফিত্বরা পাওয়ার হক্বদার কেবল ফকীর ও মিসকীন। সূরা আত-তওবায় বর্ণিত অন্য ছয় শ্রেণি ফিত্বরার হক্বদার নয়। হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ.

ইবনু আব্বাস h থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ হতে (রামাযানের) ছওমকে পবিত্র করতে এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য।[18]

এ মতকে সমর্থন করেছেন ইমাম আহমাদ, ইমাম ইবনু তায়মিয়্যা, ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম, ইমাম শাওকানী, আল্লামা শামসুল হক্ব আযীমাবাদী, ইবনু উছায়মীন প্রমুখ o।[19]

ফিত্বরা প্রাপ্তির হক্বদার সম্পর্কিত দ্বিতীয় মতটি অধিক বিশুদ্ধ। কেননা এ মতের পক্ষে স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান।

ফিত্বরা জমা করে কিছুদিন পর বিক্রয় করে মূল্য বিতরণ করা :

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, খাদ্যদ্রব্য দ্বারাই ফিত্বরা দেওয়া সুন্নাত; অর্থ দ্বারা নয়। যেমনটি উপরে বর্ণিত হয়েছে। তবে, ফিত্বরা হিসেবে খাদ্যদ্রব্য জমা হওয়ার পর সাধারণ মানুষের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য করে কর্তৃপক্ষ তা বিক্রি করে অর্থ প্রদান করতে পারে।

ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের উপকারিতা :

১. ঈদের দিনগুলোতে দরিদ্র ব্যক্তিরা ধনীদের ন্যায় স্বচ্ছলতা বোধ করে। ফলে ধনী-গরীব সবার জন্য ঈদ আনন্দদায়ক হয়।

২. ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের মাধ্যমে ছিয়াম অবস্থায় ঘটে যাওয়া ত্রুটিগুলোর কাফফারা হয়ে যায়।

৩. ছাদাক্বাতুল ফিত্বর দ্বারা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হয়।

৪. ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায়ের মাধ্যমে গরীবরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কারণে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ পায়। দরিদ্রদের একদিনের জন্য হলেও অভাব মোচন হয়। এতে তাদের ঈদের খুশিতে অংশগ্রহণের পথ সুগম করতে সহায়তা করে। ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায়ের মাধ্যমে দাতা ব্যক্তির অন্তর প্রশস্ত হয়, আত্মা নির্মল ও পবিত্র হয়।


* শিবগঞ্জ, বগুড়া।

 

[1]. আল-মু‘জামুল ওয়াসীত্ব, পৃ. ৬৯৪।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭, সনদ হাসান।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪; আবূ দাঊদ, হা/১৬১১; তিরমিযী, হা/৬৭৫; নাসাঈ, হা/২৫০৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৪২৫।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৩৯।

[5]. শারহু মাআনিল আছার, হা/২৮৬৯।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫।

[8]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৭৭০৫।

[9]. তাযকীরু ইবাদির রহমান ফীমা আরাদা বিছিয়ামি শাহরি রামাযান, পৃ. ৩১; যাদুছ ছায়েমে ওয়া ফাযলুল ক্বায়েম, পৃ. ২৯।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৭৪।

[11]. ফাতহুল বারী, ৩/৩৭৪, হা/১৫০৮-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[12]. ইমাম নববী, শারহু মুসলিম, ৩/৪৪৭, হা/৩৮৪-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[13]. ইবনু কুদামা, মুগনী, ৪/২৯৫।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩৫।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪১০।

[16]. আবূ দাঊদ, হা/১৬১১; দারাকুত্বনী, ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭।

[17]. ইমাম শাফেঈ, কিতাবুল উম্ম, ২/৫৯; আল-মুহাল্লা, ৬/১৪৪; দুররে বহিইয়া (রওযাসহ), পৃ. ১৪২; আল-বাহরুর রায়েক, ২/২৭৫; উমদাতুর রিআয়া, ১/২২৭; শরহে সিফরুস সাআদা, পৃ. ৩৬৯; মুগনী, পৃ. ৭৮।

[18]. আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, ‘যাকাত’ অধ্যায়, হা/১৮২৭; দারাকুত্বনী, হাকেম, ১/৪০৯; ইরওয়াউল গালীল, হা/৮৪৩; ইমাম হাকেম বলেন, বুখারীর শর্তে ছহীহ। ইমাম যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন।

[19]. মাসায়েলে ইমাম আহমদ, পৃ. ৮৬; মাজমূউল ফাতাওয়া, ২৫/৭৩; যাদুল মাআদ, ২/২২; নায়লুল আওত্বার, ৩-৪/৬৫৭; আওনুল মা‘বূদ, ৫-৬/৩; শারহুল মুমতে, ৬/১৮৪।