ছাদাক্বাতুল ফিত্বর : একটি পর্যালোচনা
 সাজ্জাদ সালাদীন*



ফিত্বরা (فِطْرَة) আরবী শব্দ, যা ইসলামে যাকাতুল ফিত্বর (ফিত্বরের যাকাত) বা ছাদাক্বাতুল ফিত্বর (ফিত্বরের ছাদাক্বা) নামে পরিচিত। ফিত্বর বা ফাতুর বলতে সকালের খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়, যা দ্বারা ছায়েমগণ ছিয়াম ভঙ্গ করেন।[1] আল্লাহ তাআলা সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য আনন্দ ও খুশির দিন হিসাবে ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহা নামক দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন।

ঈদুল ফিত্বরের খুশির দিনে ধনীদের সাথে গরীবরাও যেন সমানভাবে আনন্দ ও খুশিতে শরীক হতে পারে, সেজন্য যাকাতুল ফিত্বর ফরয করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى ‘সে অবশ্যই সাফল্য লাভ করবে, যে যাকাত আদায় করবে’ (আল-আ‘লা, ৮৭/১৪)। এখানে যাকাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যাকাতুল ফিত্বর।[2] ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,

فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِيْنِ.

‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন ছিয়াম আদায়কারীর অনর্থক কথা-কর্ম ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্রতাস্বরূপ এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থাস্বরূপ’।[3]

যাকাতুল ফিত্বর ফরয হওয়ার শর্ত : যাকাতুল ফিত্বর ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া কি শর্ত? না, যাকাতুল ফিত্বর ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়। কেননা যাকাতুল ফিত্বর ব্যক্তির উপর ফরয; মালের উপর ফরয নয়। মালের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মালের কম-বেশির কারণে এর পরিমাণ কম-বেশি হবে না। এক্ষেত্রে শুধু ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, ঈদের দিন ভোরে কারও নিকট যদি যাকাতের নিছাব পরিমাণ সম্পদ তথা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা তার সমপরিমাণ সম্পদ থাকে এবং তা যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তবেই তার উপরই ফিত্বরা আদায় করা ফরয। অথচ এ সংক্রান্ত হাদীছসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন প্রত্যেক মুসলিমের উপর খেজুর অথবা যব হতে এক ছা‘ যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন।[4] এই হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছোট ও ক্রীতদাসের উপরও যাকাতুল ফিত্বর ফরয বলে উল্লেখ করেছেন। যাকাতুল ফিত্বর ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত হলে, ছোট ও ক্রীতদাসের উপর যাকাত ফরয হওয়ার কথা এখানে উল্লেখ থাকতো না। অথচ সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানও এখানে ‘ছোট’ এর অন্তর্ভুক্ত, যার নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। অনুরূপভাবে ক্রীতদাস সাধারণত নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় না। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্রীতদাসের উপর যাকাত ফরয করেননি। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَيْسَ فِيْ الْعَبْدِ صَدَقَةٌ إِلاَّ صَدَقَةُ الْفِطْرِ ‘ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ব্যতীত ক্রীতদাসের উপর অন্য কোনো ছাদাক্বা (যাকাত) নেই’।[5]

যাকাতুল ফিত্বর আদায় করার যিম্মাদার : প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে এবং যাদের খরচ বহন করা তার উপর ওয়াজিব, তাদের সবার যাকাতুল ফিত্বর আদায় করার যিম্মাদার তিনিই হবেন।

ফিত্বরার পরিমাণ : আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أقط أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيْبٍ ‘আমরা খাদ্য অথবা যব অথবা খেজুর অথবা পনির অথবা কিশমিশ হতে এক ছা‘ পরিমাণ ছাদাকাতুল ফিত্বর বের করতাম’।[6] অন্য হাদীছে এসেছে, صَدَقَةُ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ ‘ফিত্বরা হচ্ছে এক ছা‘ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য’।[7] এই হাদীছে ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের পরিমাণ এক ছা‘ উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ছা‘ বলতে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যামানায় মদীনায় প্রচলিত ছা‘ উদ্দেশ্য। পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রচলিত যেকোনো ছা‘ যদি আল্লাহর রাসুল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ধারিত ছা‘-এর বিপরীত হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

অর্ধ ছা‘ ফিত্বরা দেওয়া যাবে কি? বর্তমানে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে অর্ধ ছা‘ ফিত্বরা প্রদানের যে নিয়ম চালু রয়েছে, তা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। সর্বপ্রথম মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে শুধু গমের ক্ষেত্রে অর্ধ ছা‘ ফিত্বরা আদায়ের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। আর এটা ছিল তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ, যা আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)সহ অন্যান্য ছাহাবী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। হাদীছটি নিম্নরূপ—

আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায় ছোট-বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস প্রত্যেকে খাদ্যদ্রব্য অথবা পনির অথবা যব অথবা খেজুর অথবা কিশমিশ হতে এক ছা‘ (পরিমাণ) ‘যাকাতুল ফিত্বর’ আদায় করতাম। আমাদের যাকাতুল ফিত্বর প্রদান পদ্ধতি এইভাবেই চলতে থাকে। মুআবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন হজ্জ বা উমরা উপলক্ষ্যে মদীনায় আসলেন। (তার সঙ্গে সিরিয়ার গমও এলো)। তিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি মনে করি, সিরিয়ার দুই মুদ (অর্ধ ছা‘) গম (মূল্যের বিচারে) মদীনার এক ছা‘ খেজুরের সমতুল্য’। লোকজন তা গ্রহণ করে নিল। তখন আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, فَأَمَّا أَنَا فَلاَ أَزَالُ أُخْرِجُهُ كَمَا كُنْتُ أُخْرِجُهُ أَبَدًا مَا عِشْتُ ‘আমি যতদিন দুনিয়ায় বেঁচে থাকব, ততদিন (রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যামানায়) যা দিতাম, তাই-ই দিয়ে যাব’।[8] অর্থাৎ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যমানায় যে এক ছা‘ আদায় করতাম, তা-ই করব; আধা ছা‘ ফেতরা আদায় করব না।

অর্ধ ছা‘ ফিত্বরা আদায় সম্পর্কে সালাফগণের মতামত :

১. একদা আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে যাকাতুল ফিত্বর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যমানায় খেজুর অথবা যব অথবা পনির হতে যে এক ছা‘ যাকাতুল ফিত্বর আদায় করতাম, তা-ই করব। তখন গোত্রের কোনো এক ব্যক্তি বললেন, যদি অর্ধ ছা‘ গম দ্বারা হয়? তিনি বললেন, لاَ تِلْكَ قِيْمَةُ مُعَاوِيَةَ لاَ أَقْبَلُهَا وَلاَ أَعْمَلُ بِهَا ‘না, এটা মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য। আমি তা গ্রহণও করব না এবং তার উপর আমলও করব না’।[9]

২. ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,… وَفِيْ صَنِيْعِ مُعَاوِيَةَ وَمُوَافَقَةِ النَّاسِ لَهُ دَلَالَةٌ عَلَى جَوَازِ الِاجْتِهَادِ وَهُوَ مَحْمُوْدٌ لَكِنَّهُ مَعَ وُجُوْدِ النَّصِّ فَاسد الإِعْتِبَارِ. ‘…মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ইজতিহাদ এবং মানুষের তা গ্রহণ করার মাধ্যমে ইজতিহাদের বৈধতা প্রমাণিত হয়, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু যেখানে দলীল উপস্থিত, সেখানে ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়’।[10]

৩. ছহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) (৬৩১-৬৭৬ হি.) বলেন, (রাহিমাহুল্লাহ) وَلَيْسَ لِلْقَائِلَيْنِ بِنِصْفِ صَاعٍ حُجَّةٌ إِلَّا حَدِيْثَ مُعَاوِيَةَ ‘অর্ধ ছা‘ গমের কথা যারা বলেন, তাদের মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই হাদীছ ব্যতীত অন্য কোনো দলীল নেই’।[11]

অতএব, স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, অর্ধ ছা‘ গম দ্বারা ফিত্বরা আদায় করা মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিজের ইজতিহাদ মাত্র; রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- বর্ণিত কোনো হাদীছ নয়। আর দলীলের উপস্থিতিতে ‘ইজতিহাদ’ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী ও আমল অনুযায়ী এক ছা‘ খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিত্বরা আদায়ের উপর অটল থেকেছেন।

তাছাড়া হাদীছে যেসব খাদ্যদ্রব্যের নাম এসেছে, তার সবগুলোর মূল্য এক ছিল না, বরং মূল্যে পার্থক্য ছিল। তা সত্ত্বেও সকল খাদ্যদ্রব্য থেকে এক ছা‘ করে যাকাতুল ফিত্বর আদায় করতে বলা হয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে তার পরিমাণ বা ওজনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

ছা‘-এর সংজ্ঞা ও পরিমাণ : আরবীতে ছা‘ (صاع) নির্দিষ্ট পরিমাপের একটি পাত্রকে বলা হয়, যার দ্বারা শস্যজাতীয় খাদ্য পরিমাপ করা হয়। মাঝারি দেহের অধিকারী মানুষের দুই হাতের তালু একত্র করে চার অঞ্জলিতে যে পরিমাণ খাবার উঠে তাই এক ছা‘। এই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্যকে ওজন করা হলে মোটামুটি আড়াই কেজি হবে।[12] ছা‘কে কিলোগ্রামের মাপে নেওয়া হলে শস্যভেদে ছা‘-এর পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে। যেমন ওজনের দিক থেকে চাউল ও গমের সমান নয়। তাই আড়াই কেজি কিংবা এর চেয়ে কিছু কম-বেশি যাকাতুল ফিত্বর হিসাবে আদায় করা কর্তব্য।

যা দিয়ে যাকাতুল ফিত্বর আদায় বৈধ : যাকাতুল ফিত্বরের পরিমাপের মত এর খাদ্যের ধরনও নির্ধারিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, أَدُّوْا صَاعًا مِنْ طَعَامٍ فِي الْفِطْرِ ‘তোমরা এক ‘ছা’ খাদ্যদ্রব্য দ্বারা’ ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করো ।[13] আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيْبٍ. ‘আমরা ত্ব‘আম (খাদ্য) অথবা যব অথবা খেজুর অথবা পনির অথবা কিশমিশ হতে এক ‘ছা’ পরিমাণ যাকাতুল ফিত্বর আদায় করতাম’।[14]

এই হাদীছে যাকাতুল ফিত্বর হিসাবে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের মানুষের সাধারণ খাদ্যের (ত্ব‘আমের) কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যা যেকোনো সময়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ খাদ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। হাদীছে তৎকালীন সময়ের কোনো খাদ্যকে নির্দিষ্ট না করে ‘ত্বআম’ বা সাধারণ খাদ্যের ব্যবহার করে যেকোনো সময়ের সাধারণ খাদ্যকে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে প্রদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যাতে করে মানুষ সরাসরি খাদ্য নয় এমন বস্তুকে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে আদায় করতে না পারে। যেমন যবের উপর ধানকে ক্বিয়াস করা। কেননা যব খোসাসহ পিষে খাওয়া যায়। কিন্তু ধান খোসাসহ পিষে খাওয়া যায় না। সুতরাং বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য হিসাবে চাউল দ্বারা ফিত্বরা প্রদান করাই শরীআতসম্মত।

টাকা দিয়ে যাকাতুল ফিত্বর আদায়ের প্রচলন : টাকা দিয়ে ফিত্বরা আদায়ের রীতি ইসলামের সোনালি যুগে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ছাহাবায়ে কেরাম টাকা দ্বারা ফিত্বরা আদায় করেছেন মর্মে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন থাকা সত্ত্বেও তিনি খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিত্বরা আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণকে আদায় করতে বলেছেন। যার কারণে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের কথা হাদীছে উল্লেখিত হয়েছে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘আমরা ত্ব‘আম (খাদ্য) অথবা যব অথবা খেজুর অথবা পনির অথবা কিশমিশ হতে এক ছা‘ পরিমাণ যাকাতুল ফিত্বর আদায় করতাম’।[15]

অতএব, খাদ্যশস্য দ্বারা ‘যাকাতুল ফিত্বর’ আদায় করাই ইসলামী শরীআতের বিধান। টাকা-পয়সা দ্বারা ফিত্বরা প্রদান করা ইসলামী শরীআতের পরিপন্থী বিষয়। ছায়েম নিজে যা খান, তা থেকেই ফিত্বরা আদায়ের মধ্যে আল্লাহ ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অধিক ভালোবাসা নিহিত আছে।

যাকাতুল ফিত্বর আদায়ের সময় : রামাযান শেষে শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের পর থেকে ঈদের মাঠে গমনের পূর্ব পর্যন্ত যাকাতুল ফিত্বর আদায় করতে হবে। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,

فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيْرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى وَالصَّغِيْرِ وَالْكَبِيْرِ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ وَأَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوْجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ

‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বাধীন-পরাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় প্রত্যেক মুসলিমের উপর খেজুর অথবা যবের এক ছা‘ যাকাতুল ফিত্বর ফরয (নির্ধারণ) করেছেন এবং ছালাতের উদ্দেশ্যে লোকেদের বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন’।[16]

যাকাতুল ফিত্বরের সর্বশেষ সময় : ঈদের ছালাত শুরু হলে যাকাতুল ফিত্বর আদায়ের সময় শেষ হয়ে যায়। অতএব, যাকাতুল ফিত্বর ছালাতের পর আদায় করা বৈধ নয়। ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাদাক্বাতুল ফিতর ফরয করেছেন- অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ হতে (রমাযানের) ছিয়ামকে পবিত্র করা এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থা স্বরূপ। যে ব্যক্তি (ঈদের) ছালাতের পূর্বে তা আদায় করে সেটা কবুল ছাদাক্বা হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করে, তা সাধারন দান হিসেবে গৃহীত হবে।[17]

উক্ত জমাকৃত যাকাতুল ফিত্বর ঈদের ছালাতের পরে হক্বদারদের মাঝে বণ্টন করতে হবে। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, كَانُوْا يُعْطُوْنَ لِلْجَمْعِ لاَ لِلْفُقَرَاءِ ‘তারা জমা করার জন্য দিতেন, ফক্বীরদের মাঝে বণ্টন করার জন্য নয়’।[18]

সময় হওয়ার পূর্বে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায়ের বিধান :  প্রয়োজনে এক অথবা দু’দিন পূর্ব থেকে যাকাতুল ফিত্বর আদায় করা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

 كَانَ ابْنُ عُمَرَ  يُعْطِيْهَا الَّذِيْنَ يَقْبَلُوْنَهَا وَكَانُوْا يُعْطُوْنَ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ

‘ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জমাকারীদের নিকট ছাদাক্বাতুল ফিত্বর প্রদান করতেন। আর তারা ঈদুল ফিত্বরের একদিন অথবা দু’দিন পূর্বে তা আদায় করতেন’।[19] ছহীহ ইবনু খুযায়মাতে আব্দুল ওয়ারেছের সূত্রে আইয়ূব থেকে অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।[20] তাছাড়া আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ফিত্বরার মাল পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।[21]

যাকাতুল ফিত্বর বণ্টনের খাত ও প্রকৃত হক্বদার : যাকাতুল ফিত্বর বণ্টনের খাত নিয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে ছহীহ মতে, যাকাতুল ফিত্বর যাকাতের মতো নয়। ফক্বীর ও মিসকীনরাই যাকাতুল ফিত্বরের হক্বদার। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাকাতুল ফিত্বরকে طُعْمَةً لِلْمَسَاكِيْنِ তথা ‘মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ’ বলে উল্লেখ করেছেন।[22]

যাকাতুল ফিত্বর আদায় করার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ : যাকাতুল ফিত্বর নিজে আদায় করাই উত্তম। তবে কারণবশত তা আদায় করার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ।[23]

আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার ও সঠিকভাবে ছাদাক্বতুল ফিত্বর আদায় এবং বণ্টন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


 

* এম. এ., ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[1]. আল-মু‘জামুল আওসাত্ব, পৃ. ৬৯৪।

[2]. তাফসীরে ত্বাবারী, সূরা আ‘লার তাফসীর দ্রষ্টব্য।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭, হাদীছ ছহীহ।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘ছাদাক্বাতুল ফিত্বর’ অনুচ্ছেদ; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/১৮১৫।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮২; মিশকাত, হা/১৭৯৫।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫।

[7]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৭৭০৫

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫।

[9]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/২৪১৯; মুসতাদরাক হাকেম, হা/১৪৯৫; ইরওয়াউল গালীল, ৩/৩৩৯।

[10]. ফাতহুল বারী, ৩/৩৭৪, হা/১৫০৮-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[11]. ইমাম নববী, শারহু মুসলিম, ৩/৪৪৭, হা/৩৮৪-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[12]. তাযকীরু ইবাদির রহমান ফীমা অরাদা বিছিয়ামি শাহরি রামাযান, পৃ. ৩১; যাদুছ ছায়েম ওয়া ফাযলুল ক্বায়েম, পৃ. ২৯।

[13]. ছহীহুল জামে‘, হা/২৪২; সিলসিলা ছহীহা, হা/১১৭৯।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫; মিশকাত, হা/১৮১৬।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫; মিশকাত, হা/১৮১৬।

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘ছাদাক্বাতুল ফিত্বর’ অনুচ্ছেদ; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/১৮১৫।

[17]. আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭

[18]. ফাতহুল বারী (বৈরুত : দারুল মা‘রেফা), ৩/৩৭৬।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫১১, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘ছাদাক্বাতুল ফিত্বর’ অনুচ্ছেদ।

[20]. ছহীহ ইবনু খাযায়মা, হা/২৩৯৭, সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল, হা/৮৪৬।

[21]. ছহীহ বুখারী, হা/২৩১১; ফাতহুল বারী, ৩/৩৭৬।

[22]. আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭, হাদীছ ছহীহ।

[23]. মাজমূ‘উল ফাতাওয়া লি ইবন উছায়মীন, ১৮/৩১০।