ছাহাবীগণের মধ্যে মতানৈক্যের কারণ

-সাঈদুর রহমান
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
রীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য যুগে যুগে অনেক নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তিনিই অসংখ্য মানুষকে নির্বাচন করেছেন তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করা জন্য, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের সহায়তা করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয়  নবী (ছা.)-কে সহায়তা করার জন্য এমন কিছু নির্ভীক ও উদার ব্যক্তি চয়ন করেছেন, যারা ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তারা আর কেউ নন, তারা হলেন ছাহাবায়ে কেরাম (রা.)। স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রশংসা করে কুরআনে বলেন, رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ‘আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট আর তারাও আল্লাহর  উপর সন্তুষ্ট’ (তওবা, ১০০)। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরও বলেন,

, وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرً

‘হেদায়াত স্পষ্ট  হওয়ার পর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অবলম্বন করবে, আমরা তাকে ঐ দিকেই ফিরিয়ে দিব, যেদিকে সে ফিরতে চায়; আর তাকে প্রবেশ করাবো জাহান্নামে। প্রত্যাবর্তনস্থল হিসাবে জাহান্নাম কতইনা নিকৃষ্ট!’ (নিসা, ১১৫)। এই আয়াতে غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ ‘মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্যপথ’ দ্বারা ছাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে আরও অনেক আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।

অনুরূপভাবে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ছা.)ও তাদের মর্যাদা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَوَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ

أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ

‘তোমরা আমার ছাহাবীদের গালি দিবে না। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত সমপরিমাণ স্বর্ণ  আল্লাহর  রাস্তায় দান করে, তথাপিও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ সমপরিমাণ পৌঁছতে পারবে না।[1]   এভাবে অসংখ্য হাদীছে রাসূল (ছা.) তাদের  মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। এতদসত্ত্বেও এ সকল মহান ব্যক্তির মাঝে পরস্পর কিছু বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে। নিম্নে এর কতিপয় কারণ আলোচনা করার প্রয়াস পাবো:

(১) কোনো বিষয়ে হাদীছ না জানা: অর্থাৎ একটি হাদীছ কোনো একজন ছাহাবী শ্রবণ করেছেন, কিন্তু অন্য ছাহাবী তা শ্রবণ করেননি। যার কারণে পরস্পর মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি প্রসিদ্ধ উদাহরণ হচ্ছে- আবু সাঈদ (রা.) বলেন, আবু মূসা (রা.) ওমর (রা.)-এর নিকট অনুমতি চেয়ে বলেন, আস-সালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পারি? ওমর (রা.) বলেন, এক। আবু মূসা (রা.) কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তিনি আবারো সালাম দিয়ে বলেন, আমি কি ভিতরে আসতে পারি? ওমর (রা.) বলেন, দুই। তারপর আবু মূসা (রা.) অল্প সময় নীরবতা অবলম্বন করলেন। তিনি আবার বললেন, আস-সালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পারি? ওমর (রা.) বললেন, তিন। এবার তিনি চলে যেতে লাগলেন। ওমর (রা.) প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি করছেন? প্রহরী বললেন, তিনি চলে গেছেন। তিনি বললেন, তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে নিয়ে এসো। তারপর তিনি ওমর (রা.)-এর সামনে এলে তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি এ রকম করলেন কেন? তিনি বললেন, আমি সুন্নাত পালন করেছি। ওমর (রা.) বললেন, সুন্নাত পালন করেছেন? আল্লাহর কসম! এর স্বপক্ষে আপনাকে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে, তা না হলে আমি আপনার ব্যবস্থা করছি (অর্থাৎ, শাস্তি দিব)। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি (আবু মূসা) আমাদের নিকট আসলেন। আমরা কয়জন আনছারী বন্ধু একসাথে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, হে আনছার সম্প্রদায়! রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর হাদীছ সম্পর্কে কি তোমরা সবার চাইতে বেশি জ্ঞাত নও? রাসূলুল্লাহ (ছা.) কি বলেননি যে, তিনবার অনুমতি চাইতে হবে? তারপর তোমাকে অনুমতি দিলে তো দিলো, নতুবা ফিরে যাবে। উপস্থিত লোকজন তার সাথে কৌতুক করতে লাগলেন। আবু সাঈদ (রা.) বলেন, এবার আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম এবং বললাম, আপনার উপর এ ব্যাপারে কোনো শাস্তি হলে আমি আপনার অংশীদার হব। রাবী বলেন, তারপর তিনি ওমর (রা.)-এর নিকট এসে এ ঘটনা বললেন। ওমর (রা.) বললেন, আমি এ সম্পর্কে জানতাম না।[2]  এই হাদীছের উপর একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, দেখুন ওমর (রা.) এবং আবু মূসা (রা.)-এর মাঝে মতভেদ হওয়ার কারণ হলো উক্ত বিধান সম্পর্কিত হাদীছ না জানা। সেজন্যই তো তিনি আবু মূসা (রা.)-কে দলীল উপস্থাপন করার জন্য বলেছেন।

(২) ভুলে যাওয়া: ভুলে যাওয়ার কারণে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একজন ছাহাবীর একটি হাদীছ বা ঘটনা মনে আছে আর অন্য ছাহাবী তা ভুলে গেছেন। যার কারণে দু’জনের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে- জনৈক ব্যক্তি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.)-এর নিকট এসে জানতে চাইলেন, একবার আমার গোসলের দরকার হলো অথচ আমি পানি পেলাম না। তখন আম্মার ইবনু ইয়াসার (রা.) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.)-কে বললেন, আপনার কি সেই ঘটনা মনে আছে যে, একদা আমরা দু’জন সফরে ছিলাম এবং দু’জনেরই গোসলের প্রয়োজন দেখা দিল। আপনি তো ছালাত আদায় করলেন না। আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ছালাত আদায় করলাম। তারপর আমি ঘটনাটি নবী (ছা.)-এর নিকট বর্ণনা করলাম। তখন নবী (ছা.) বললেন, তোমার জন্য তো এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এ বলে নবী (ছা.) দু’হাত মাটিতে মারলেন এবং দু’হাতে ফুঁ দিয়ে তার  চেহারা ও উভয় হাত মাসাহ করলেন।[3]   ওমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় এক ব্যক্তি এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার গোসল ফরয হয়েছে, অথচ আমার নিকট পানি নেই। এ মুহূর্তে আমি কী করবো? তখন আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা.) ওমর (রা.)-কে রাসূলে (ছা.)-এর যুগে দু’জনের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনা বর্ণনা করেন। কিন্তু ওমর (রা.)-এর তা মনে নেই, যার কারণে তিনি তা অস্বীকার করেন। আর এর ফলেই উভয়ের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়।

(৩) সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হওয়া : সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার কারণে ছাহাবীদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- ইবনে আব্বাস (রা.) মনে করতেন, রাসূল (ছা.) হজ্জের ইহরাম অবস্থায় মায়মূনা (রা.)-কে বিয়ে করেছেন। তিনি বলেন,

 أَنَّ النَّبِىَّ – صلى الله عليه وسلم – تَزَوَّجَ مَيْمُونَةَ وَهُوَ مُحْرِمٌ

‘নবী (ছা.) মুহরিম অবস্থায় মায়মূনা (রা.)-কে বিয়ে করেন’।[4]  অথচ তিনি ব্যতীত অন্য সকল  ছাহাবী জানতেন যে, রাসূল (ছা.) মায়মূনা (রা.)-কে হালাল অবস্থায় বিয়ে করেছেন। এমনকি স্বয়ং মায়মূনা (রা.) বলেন,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- تَزَوَّجَهَا وَهُوَ حَلاَلٌ

‘রাসূল (ছা.) তাকে হালাল অবস্থায় বিয়ে করেন’।[5]  এ বিয়ের ঘটক আবু রাফে‘ (রা.) বলেন,

تَزَوَّجَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مَيْمُونَةَ وَهُوَ حَلاَلٌ وَبَنَى بِهَا وَهُوَ حَلاَلٌ وَكُنْتُ أَنَا الرَّسُولَ فِيمَا بَيْنَهُمَا

‘রাসূল (ছা.) হালাল অবস্থায় মায়মূনা (রা.)-কে বিয়ে করেন এবং হালাল অবস্থায় বাসর করেন। আর আমি ছিলাম উভয়ের মাঝে দূত হিসাবে’।[6]  ইবনে আব্বাস (রা.) সন্দেহের কারণে বলেছেন যে, রাসূল (ছা.) মুহরিম অবস্থায় মায়মূনা (রা.)-কে বিয়ে করেন।

(৪) বুঝের ভিন্নতা: বুঝের ভিন্নতার কারণে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ রাসূল (ছা.)-এর কোনো আমলকে কেউ সুন্নাত মনে করেছেন আবার কেউ বৈধ মনে করেছেন। যেমন- তাওয়াফের ক্ষেত্রে রমল করা। অধিকাংশ ছাহাবী এটাকে সুন্নাত মনে করতেন। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) এটাকে সুন্নাহ মনে করতেন না; বরং তিনি মনে করতেন রাসূল (ছা.) এটা করেছেন কাফেরদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে। কাফেররা বলত, মদীনার জ্বর তাদের দুর্বল করে দিয়েছে। এ কথা শ্রবণ করে রাসূল (ছা.) ছাহাবীদের রমল (জোরে হাঁটা) করার আদেশ দেন।

(৫) বাহ্যত বিপরীতমুখী দু’টি হাদীছের মধ্যে সমন্বয় না করা: পরস্পর ভিন্নমুখী দু’টি হাদীছের মাঝে সমন্বয় সাধন না করার কারণে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- রাসূল (ছা.) পশ্চিম দিকে মুখ করে শৌচকার্য সম্পাদন করতে নিষেধ করেছেন।[7]   ছাহাবীদের মাঝে আবু হুরায়রা, আবু আইয়ূব আনছারী, ইবনে মাসঊদ ও সুরাক্বা ইবনে মালেক (রা.) মনে করতেন, পশ্চিম দিকে মুখ করে শৌচকার্য সম্পাদন করা যাবে না। অন্যদিকে জাবের (রা.) মনে করতেন এ নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে। কারণ তিনি রাসূল (ছা.)-কে তার মৃত্যুর এক বছর পূর্বে দেখেছেন যে, তিনি পশ্চিম দিকে মুখ করে প্রস্রাব করছেন।[8]

ছাহাবীগণের মতানৈক্য ও আমাদের করণীয় :

ইমাম নববী (রহি.) বলেন,

 الصَّحَابِيُّ إِذَا قَالَ قَوْلًا وَخَالَفَهُ غَيْرُهُ مِنْهُمْ لَمْ يَكُنْ ذَلِكَ الْقَوْلُ حُجَّةً اتِّفَاقًا

‘কোনো ছাহাবী যদি একটি কথা বলেন আর অন্য ছাহাবী তার বিপরীত কথা বলেন, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে ঐ কথা দলীলযোগ্য নয়’।[9]     

এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো যে, দেখতে হবে কার কথা রাসূল (ছা.)-এর কথা বা কাজের সাথে মিলে; যার কথা রাসূল (ছা.)-এর কথার সাথে মিলবে, তার কথা প্রধান্য পাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ

الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

‘যদি তোমাদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়, তাহলে তা আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করো; যদি আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো। কারণ এটাই হলো উত্তম ও উৎকৃষ্ট ব্যাখ্যা’ (নিসা, ৫৯)।

পরিশেষে একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আলোচনা শেষ করছি। অনেক সাধারণ মানুষ বলে থাকে, আলেমদের মাঝে এতো মতানৈক্য কেন? এর উত্তর হলো, ছাহাবীগণের মাঝে যে সমস্ত কারণে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, সেসব কারণ এখনো আলেম সমাজের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে; বরং কারণ আরো বেড়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো নির্দিষ্ট আলেমের অন্ধঅনুকরণ করা যাবে না; বরং দেখতে হবে কার কথা রাসূল (ছা.)-এর কথার সাথে মিল রয়েছে। কারণ হতে পারে ঐ আলেম উক্ত বিষয়টি জানেন না। আমাদের সমাজে বর্তমানে চলছে নির্দিষ্ট আলেমের অন্ধঅনুকরণ, যার কারণে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা। এক আলেমের ভক্তরা অন্য আলেমকে গালিগালাজ করছে, বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা করছে। এতে করে ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকরা বগল বাজাচ্ছে। সুধী পাঠক! আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, নির্দিষ্ট কারও অনুসরণ পরিত্যাগ করি এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর দিকে ফিরে আসি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন- আমীন!

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪০।

[2]. তিরমিযী, হা/২৬৯০, সনদ ছহীহ।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৮।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৩৭।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১১।

[6]. তিরমিযী, হা/৮৪১।

[7].  তিরমিযী, হা/৮, সনদ ছহীহ।

[8].  তিরমিযী, হা/৯, সনদ ছহীহ।

[9]. তুহফাতুল আহওয়াযী, ৮/৯, হা/৩০৬৮।