اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ছোঁয়াচে রোগ: ইসলাম কী বলে?

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলতে কি কিছু আছে? আমাদের ভূমিকাই বা কী? ছোঁয়াচে রোগের ব্যাপারে আমরা দুই কিসিমের হাদীছ পাই। প্রথম কিসিম: (১) রাসূল (ছাঃ)  বলেন, ‘কুষ্ঠ রোগী থেকে পালাও, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে পালাও’ (বুখারী, হা/৫৭০৭)। (২) রাসূল (ছাঃ)  বলেন, ‘রোগাক্রান্ত উটপালের মালিক (অসুস্থ উটগুলোকে) সুস্থ উটপালের মালিকের (উটের) ধারে কাছে আনবে না’ (মুসলিম, হা/২২২১)। (৩) নবী (ছাঃ)  আরো বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব শুনতে পাও, তখন তোমরা সেখানে যেও না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান করো, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না’ (বুখারী, হা/৩৪৭৩; মুসলিম, হা/২২১৮)। দ্বিতীয় কিসিম: (১) রাসূল (ছাঃ)  বলেন, ‘রোগের কোনো সংক্রমণ নেই’…। তখন এক বেদুঈন বলে উঠলেন , হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে উটের এ দশা কেন হয়? যখন সে চারণভূমিতে থাকে, তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমতাবস্থায় তাদের সাথে চর্মরোগা উট এসে মিশে তাদেরকেও চর্মরোগা বানিয়ে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে প্রথম উটটির চর্মরোগ কোথা হতে এসেছিল?’ (বুখারী, হা/৫৭১৭; মুসলিম, হা/২২২০)। (২) রাসূল (ছাঃ)  বলেন, ‘কোনো কিছুই অন্য কিছুকে সংক্রমণ করতে পারে না’।… (তিরমিযী, হা/২১৪৩, ছহীহ)। উভয় কিসিমের সবগুলো হাদীছ এখানে একত্রিত করা উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য বাহ্যতঃ পরস্পরবিরোধী হাদীছগুলোর মর্মার্থ উদ্ঘাটন করা এবং ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা।

সম্মানিত পাঠক! বিভিন্ন কারণে বাহ্যিকভাবে স্ববিরোধী মনে হলেও আসলে কুরআন-হাদীছের বক্তব্য কখনই পরস্পর বিরোধী নয় (আন-নিসা, ৪/৮২)। তাহলে বাহ্যতঃ পরস্পর বিরোধী উপর্যুক্ত হাদীছগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন হবে কীভাবে? এগুলোর মর্মার্থই বা কী? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে বহু মতভেদ থাকলেও এখানে উল্লেখযোগ্য দু’টি মত তুলে করা হলো: (১) একদল আলেমের মতে, ‘ছোঁয়াচে রোগ নেই’ এটা আকীদা ও ঈমানের অংশ। মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী যে রোগ ছোঁয়াচে, তাতে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রাণী বা এলাকা থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা যেসব হাদীছে এসেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যায় তারা বলেন, ‘ছোঁয়াচে রোগ নেই’ এই বিশ্বাসকে ঠিক রাখার জন্যই এসব হাদীছে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কারণ কোনো সুস্থ ব্যক্তি ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি, প্রাণী বা এলাকায় যাওয়ার ফলে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাক্বদীর অনুযায়ী সে যদি রোগাক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে তার এই চিন্তা আসতে পারে যে, এই ব্যক্তি, প্রাণী বা এলাকায় আসার কারণে সে আক্রান্ত হয়েছে, না আসলে হতো না। এই ধরনের বিশ্বাস তাক্বদীরের প্রতি তার ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। ফলে মানুষের অন্তরে যেন এই ধরনের দুর্বল আক্বীদা জন্মাতে না পারে সে লক্ষ্যেই মূলতঃ হাদীছগুলোতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এই শ্রেণীর আলেমের মতে, যাদের ঈমান ও আল্লাহর ভরসা এতো মযবুত যে, তারা ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে যদি অসুস্থও হয়ে যায়, তবুও তাদের অন্তরে সরিষা পরিমাণ সন্দেহ তৈরী হবে না যে, এই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার কারণে সে আক্রান্ত হয়েছে; বরং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস কাজ করবে যে, তাক্বদীরে ছিলো বলেই আল্লাহর ইচ্ছায় সে আক্রান্ত হয়েছে। আল্লাহর উপর মযবুত ভরসাকারীরা প্রয়োজন পড়লে ছোঁয়াচে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রাণী ও এলাকায় যেতে পারে বলে তারা মনে করেন। (২) আরেকদল আলেমের মত হচ্ছে, ‘রোগের কোনো সংক্রমণ নেই’- একথা বলে নবী (ছাঃ)  কিছুতেই ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। বরং জাহিলী আরবদের ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাসের অপনোদন করতে চেয়েছেন। জাহিলী যুগে আরবদের ধারণা ছিলো, রোগ নিজে নিজেই অন্য দেহে সংক্রমণ করে। সংক্রমণের পেছনে যে মহান আল্লাহর কোনো ইচ্ছা ও শক্তি আছে, তা তারা মনেই করতো না। এক্ষেত্রে তারা তাকদীরকে অস্বীকার করতো, মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতো না। সম্পূর্ণ বস্তুবাদী এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের অপনোদনকল্পেই নবী (ছাঃ)  উক্ত উক্তি করেছেন। অতএব, ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণ নেই মানে ছোঁয়াচে রোগের নিজস্ব কোনো শক্তি ও প্রভাব নেই। প্রথম উটটি যেমন কারো ছোঁয়া ছাড়া কেবল আল্লাহর ইচ্ছাতেই আক্রান্ত হয়েছিলো, তার সংস্পর্শে আসা অন্য উটও তেমনি কেবল আল্লাহর ইচ্ছাতেই আক্রান্ত হতে পারে। সেকারণে ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে গেলে কেউ আক্রান্ত হতে পারে, আবার কেউ নাও হতে পারে। আল্লাহ চাইলে সংক্রমিত হবে আর না চাইলে হবে না।

এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও একটু ইঙ্গিত দেয়া দরকার। ‘ছুঁলেই সংক্রমিত হবে’- একথা চিকিৎসাবিজ্ঞানও বলেনি। বরং নাক, মুখ, চোখ বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভাইরাস ভেতরে গেলে সংক্রমিত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এও বলছে যে, কারো দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেও সংক্রমণ নাও ঘটাতে পারে। ইসলাম অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব জীবন ব্যবস্থার নাম নয়। সেকারণে আমরা দেখতে পাই, যে পাত্রে কুকুর মুখ দেয়, তা রাসূল (ছাঃ)  ৭ বার ধুতে বলেছেন, যার প্রথম বার হবে মাটি দিয়ে (মুসলিম, হা/২০৮)। রাসূল (ছাঃ)  পেশাব-পায়খানা করার পর হাত মাটিতে ঘষে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে বলেছেন (মুসলিম, হা/৫১০)। ঘুম থেকে উঠার পর হাতকে আলাদাভাবে না ধোয়া পর্যন্ত তিনি তা পানির পাত্রে চুবাতে নিষেধ করেছেন (বুখারী, হা/১৬২)। পরিচ্ছন্নতার এরকম আরো বহু নির্দেশনা ইসলামে রয়েছে। সুতরাং ইসলাম ভাইরাসজনিত রোগকে অস্বীকার  করে না।

অতএব বলা যায়, (১) ইসলামের বক্তব্যসমূহ পরস্পর বিরোধী নয় (২) ছোঁয়াচে রোগ মানে ছুঁলেই হবে এমনটা নয়। এটা না ইসলাম বলে, না বিজ্ঞান বলে। (৩) ইসলাম অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব জীবন ব্যবস্থার নাম নয়। (৪) ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি প্রমাণিত, তবে তার নিজস্ব কোনো শক্তি ও প্রভাব নেই। এটা রোগ ছড়ানোর একটা কারণ মাত্র। (৫) মহান আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছুই ঘটে না। সেজন্য তার উপর মযবূত ঈমান ও অগাধ তাওয়াক্কুলই ইসলামে মুখ্য বিষয়। (৬) ছোঁয়াচে রোগ মহান আল্লাহর সৃষ্টি। মহান আল্লাহ চাইলে এর মাধ্যমে কাউকে আক্রান্ত করবেন এর স্পর্শ ছাড়া বা স্পর্শ দ্বারা আর না চাইলে আক্রান্ত করবেন না শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পরও। (৭) ইসলামে শুধু সতর্কতাও নিন্দনীয়। সতর্কতাবিহীন আল্লাহভরসাও নিন্দনীয়। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের দুর্বলতা আনতে পারে এমন কথা ও বিশ্বসও নিন্দনীয়। সুতরাং সবগুলোর সমন্বয় থাকতে হবে। যেমন থাকবে সতর্কতা, তেমন থাকবে আল্লাহভরসা, তেমন থাকবে তাকদীরে বিশ্বাস। ফলে ইসলামী নির্দেশনার পরিপন্থী নয় এমন সকল উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। (৮) জাহিলীযুগের মানুষের মতো নিরেট বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনা থেকে বেরিয়ে আসা যরূরী।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় রোগ-বালাই, বালা-মুছীবত থেকে রক্ষা করুন। আমীন!