اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

জুয়ায় ভাসছে দেশ!

বাংলাদেশের সর্বত্রই ছেঁয়ে গেছে জুয়ার আড্ডাখানা। আমাদের দেশের শহর, গ্রাম সর্বত্র নামে-বেনামে চলছে নানান জুয়ার রমরমা ব্যবসা। এটা আমাদের সমাজে মহামারির রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন ক্লাব, হোটেল, অফিস ও বাসাবাড়িতে জেঁকে বসেছে জুয়া-মাদক ও নেপথ্যে নারী ব্যবসা। ছোট-বড়, পুরুষ-নারী সবশ্রেণীর মানুষ জড়িত এ পাপে। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ‘ক্যাসিনো’ (Casino)-এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। এ অভিযানে জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মাদকদ্রব্য ও ক্যাসিনোসামগ্রী। গ্রেফতার করা হয় ছোট-বড় কয়েক শ’ জুয়াড়িকে। আমরা এ পদক্ষেপের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই এবং দেড়শ’ বছরের পুরনো দুর্বল জুয়া আইন সংশোধন করে জুয়াড়িদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপের আহবান জানাই। সাথে সাথে দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সবধরনের দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে দমনের আহবান জানাই। যাহোক, অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সারাদেশের সবখানেই এখন আলোচনার মূল বিষয় ক্যাসিনো, যদিও শব্দটি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে একেবারেই অপরিচিত। ‘ক্যাসিনো’ ইতালিয়ান শব্দ। এর অর্থ: জুয়াখেলার ঘর, নাচঘর, তাসখেলা বা আমোদপ্রমোদের ঘর বা ভবন। এককথায় ক্যাসিনো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জুয়াখেলার একটি নির্দিষ্ট স্থান। ক্যাসিনোতে সাধারণত বিস্তৃত পরিসরে জুয়ার আড্ডা বসে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নামীদামী হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, শপিং মল বা কোন দর্শনীয় স্থানের কাছেই এর অবস্থান থাকে। ব্ল্যাকজ্যাক, ভিডিও পকার, ব্রাক্যারেট, ক্রাপ, রুলেট ইত্যাদি খেলায় মত্ত হয় জুয়াড়িরা। অনেক ক্যাসিনোতে লাইভ রিয়েলিটি শো, কমেডি শো, কনসার্ট, খেলাধুলা ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকে; সাথে বহিরাগত (Exotic) ছেলেমেয়ের সার্ভিসও থাকে। ক্যাসিনোতে সাধারণত তথাকথিত সুন্দরী মডেল কিংবা পার্টি গার্ল জুয়াড়িদের উৎসাহ দিয়ে থাকে। ইতালিতে ক্যাসিনোর জন্ম হলেও আমেরিকানরাই এটিকে জনপ্রিয় করে তুলে। ইতিহাসের প্রায় সব সমাজেই কোন না কোনভাবে জুয়ার প্রচলন থাকলেও এর শুরুর ইতিহাস জানা যায় না। যতটুকু জানা যায়, অনিয়ন্ত্রিত জুয়াকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ইতালির ভেনিসে ১৬৩৮ সালে রীডোট্ট নামের ক্যাসিনোর মধ্য দিয়ে সর্বপ্রথম ক্যাসিনোর যাত্রা শুরু হয়। তবে সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে ১৭৭৪ সালে সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য আইনি বৈধতা পেয়ে প্রথম ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩১ সালে আমেরিকার নেভাদায়। আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো, ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল সহ এশিয়ার নেপাল, ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া ক্যাসিনোর ঊর্বর ভূমি। আইনি বৈধতা না থাকলেও এর হাওয়া লাগে বাংলাদেশেও। এখানে প্রায় ৫০টি ক্যাসিনো আছে বলে খবরে প্রচারিত।

আরবীতে জুয়াকে ‘মাইসের’ (ميسر) বা ‘ক্বিমার’ (قمار) বলা হয়। প্রত্যেক এমন খেলাকে জুয়া বলে, যাতে পরাজিতের কাছ থেকে বিজয়ী কিছু পাবে বলে শর্ত থাকে (কুল্লিয়্যাত, পৃ: ৭০২)। প্রত্যেক এমন লেনদেনকে জুয়া বলে, যেখানে অংশগ্রহণকারী মাত্রই হার-জিতের ঝুঁকিতে থাকে (আল-ক্বিমার: হাকীকাতুহূ…, পৃ: ৭৫)। জুয়া শুধু খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা হতে পারে বিভিন্ন লেনদেনে ও ক্রয়-বিক্রয়েও। ইসলামে জুয়া হারাম ও কাবীরা গোনাহ। এটা নাপাক ও জঘন্য শয়তানী কাজ (আল-মায়েদাহ, ৫/৯০-৯১)। এটা শয়তানী ফাঁদ, যে ফাঁদে আটকিয়ে সে মানুষকে নানাবিধ অপকর্মে লিপ্ত করতে চায় (আন-নূর, ২৪/২১)। জুয়াখেলার প্রস্তাব করলেই কাফফারাহস্বরূপ ছাদাক্বাহ দিতে হবে (বুখারী, হা/৪৮০৬), তাহলে তাতে জড়িয়ে পড়লে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে! জুয়াখেলাকে শূকরের রক্ত-মাংসে হাত রঞ্জিত করার সাথে তুলনা করা হয়েছে (মুসলিম, হা/২২৬০)। এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হারাম এবং এ সম্পর্কে ক্বিয়ামতের ময়দানে জিজ্ঞেস করা হবে (তিরমিযী, হা/২৪১৬)। এ ব্যাপারে সাহায্য-সহযোগিতা করাও হারাম (আল-মায়েদাহ, ৫/২)। জুয়া হারাম হওয়ার পেছনে মৌলিক কিছু কারণ হচ্ছে, (১) জুয়ার মাধ্যম আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে নাফরমানী করা হয় (আবুদাঊদ, হা/৪৯৩৮)। (২) জুয়া মানুষকে আল্লাহর যিকির, ছালাত ও অন্যান্য ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে (আল-মায়েদাহ, ৫/৯১)। (৩) জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মূল্যবান সম্পদ সময় নষ্ট হয়, যে সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন জবাবদিহিতা করতে হবে (তিরমিযী, হা/২৪১৭)। একে বাহ্যিক দৃষ্টিতে লাভজনক মনে হলেও এর অর্থনৈতিক ক্ষতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর; কেবল আমেরিকাতেই প্রতি বছর ৫৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। (৪) এর মাধ্যমে মানুষ কর্মবিমুখ হয় এবং অবৈধ উপার্জনে ঝুঁকে পড়ে। ফলে, দেশে অলস প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা দেশ ও দশের জন্য বোঝা হয়।  (৫) এর মাধ্যমে সুখী পরিবার ধ্বংস হয়, অন্যায় পথে সম্পদ নষ্ট হয়, ধনী পরিবার নিঃস্ব হয়, সম্মানিত ব্যক্তি লাঞ্ছিত হয়। (৬) জুয়ার মাধ্যমে অন্যের মাল অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয় এবং এর ফলে জুয়াড়িদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় (আল-মায়েদাহ, ৫/৯১)। (৭) জুয়া জুয়াড়িকে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে পরাজিত পক্ষ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সূদ, ঘুষ যে কোন উপায়ে ক্ষতি পূরণে মরিয়া হয়ে উঠে। (৮) জুয়ার নেশা একপ্রকার মানসিক ব্যাধি। জুয়া ব্যক্তির মধ্যে মারাত্মক দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়। ফলে তার দেহে বাসা বাঁধে দূরারোগ্য নানা রোগব্যাধি। মানুষকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর কোলে। অনেক সময় দুশ্চিন্তার প্রচন্ডতায় জুয়াড়ি আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। (৯) এর মাধ্যমে জুয়াড়িদের মধ্যে নিকৃষ্ট চরিত্র ও জঘন্য স্বভাবের জন্ম হয়। নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ, নাচ-গান, যৌনাচারের মত বিভিন্ন নষ্ট চরিত্রের দিকে ঠেলে দিতে জুয়ার জুড়ি নেই। এককথায় জুয়া-মদ জাতীয় সবকিছু ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক ও নৈতিক সঙ্কট তৈরি করে। মানুষকে বহুবিধ ক্ষতির সম্মুখীন করে। জুয়া ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই মানবজাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে (আল-মায়েদাহ, ৫/৯০)। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন!

6 মন্তব্য