জেলখানায় অপরাধ প্রবণতা : ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাবনা

জুয়েল রানা*


পরিচিতি : Prison বা Jail বাংলায় কারাগার, বন্দিশালা, জেলখানা ও কয়েদখানা নামে পরিচিত। কারাগার বলতে সবার মনে দুঃখ-কষ্টে ভরা পরাধীনতার এক করুণ দৃশ্য ভেসে ওঠে। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অপরাধীদের আটকে রাখতে কারাগারের উৎপত্তি।

জেলখানায় নারীসঙ্গ : সম্প্রতি হলমার্ক কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা তুষারের ঘুষের বিনিময়ে কারাগারে নারীসঙ্গ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া শুরু হয়েছে।[1] অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে প্রচলিত আইন অমান্য করে নারীসঙ্গ নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, তা যথার্থ।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, হলমার্ক কেলেঙ্কারি মামলার অন্যতম আসামি হলমার্কের মহাব্যবস্থাপকের সাথে বহিরাগত এক নারীকে ৪৫ মিনিট অবস্থান করার সুযোগ দিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ। কারাগারের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত এ ভিডিও চিত্রটি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হলে তা ভাইরাল হয়ে যায়।

পরিবারের সঙ্গে বন্দীর সাক্ষাৎ : ইমাম মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়দের বন্দির সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়’। বন্দিদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে অন্যায়। নির্যাতনের কারণে কোনো বন্দির মৃত্যু হলে তা ইচ্ছাকৃত হত্যা বলে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও ‘ক্বিছাছ’ (হত্যার বদলা)-এর ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। নানা কারণে নারীরাও বন্দি হয়েছে। তাই ইসলামী ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই কারাগারে নারীদের জন্য পৃথক থাকার ব্যবস্থা ছিল। নারীদের পৃথক ব্যবস্থার প্রতি মুসলিম আইনবিদগণ বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। নারী বন্দিদের দায়িত্বেও একজন নারী দায়িত্বশীল নিয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন তাঁরা।

বছরের পর বছর বিচারে বা বিনা বিচারে বন্দিরা কারারুদ্ধ থাকে। বিবাহিত নারী বা পুরুষ সকলের জন্য এটা শরীআতের দৃষ্টিকোণ থেকে ও মানবিক বিচারে অন্যায়। বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষদের জন্যও এটা সমস্যা। বন্দিদেরকে পরিবার থেকে এভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা শরীআতের দৃষ্টিতে অবৈধ। এ কারণে সমকামিতা ও মাদকাসক্ত হওয়ার মতো জটিল অপরাধ ও সমস্যার উদ্ভব ঘটছে।[2]

বন্দি অভিযুক্ত কিংবা দোষী সাব্যস্ত যা-ই হোন না কেন, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। ইসলামিক স্কলাররা মনে করেন, বিবাহিত বন্দির নৈতিক ও চারিত্রিক অধপতন রোধ এবং মানসিক বিকাশের প্রয়োজনে স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট জেলকোড ও শর্তাবলী অনুসরণ করে নির্ধারিত বিরতিতে স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ থাকা উচিত। এর অন্যতম একটি কারণ হলো, স্বামীর অপরাধের কারণে স্ত্রীকে জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আদৌ ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা, মানব ইতিহাসের অন্যতম ন্যয়বিচারক ও আদর্শ শাসক উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বন্দিদের স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতের সুযোগ দিতেন।

ইসলামের ইতিহাসের বেশিরভাগ ইমাম ও স্কলার যেমন ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল ও ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, বন্দিকে নির্দিষ্ট শর্ত ও জেলকোড মেনে এবং স্ত্রীর সম্মতিসাপেক্ষে স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া উচিত। বন্দি যদি নারী হন, তবে সেক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সঊদী আরবসহ পৃথিবীর বহু দেশে এ নিয়ম পুরোপুরি প্রচলিত আছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, স্পেনসহ অনেক দেশে এ নিয়ম আছে। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের ২০১৫ সালের একটি রায়ের পর থেকে ভারতে এ নিয়ম চালু আছে। তুরস্কে কোনো কয়েদীর আচরণ সুন্দর, শৃঙ্খলা উত্তম এবং সর্বোপরি সার্বিক পারফরমেন্স ভালো হলে তাদের এ সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বন্দির মানসিক বিকাশ ও চিন্তাগত সুস্থতার পথ সুগম হয় এবং চারিত্রিক স্খলনের পথ রুদ্ধ হয়। কেউ বলতে পারেন, জেলে এ সব সুবিধা থাকলে আর বন্দিত্বের মানে কী থাকে? এর উত্তর হলো, বন্দিত্ব একটি সাজা। একজন বন্দির সাজাভোগের পাশাপাশি মৌলিক মানবিক প্রয়োজনগুলো পূরণের সুযোগ যেমন দূষণীয় নয়, তেমনি এটি দোষেরও নয়। বিশেষ করে এর সঙ্গে যেহেতু অন্যের অধিকার জড়িত। জেলে সন্তানাদি ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ যেমন ন্যায্য, এটিও তেমন ন্যায্য। সেই সঙ্গে বন্দিদের মানসিক ও আদর্শিক পরিচর্যার প্রয়োজনে প্রতিটি জেলখানায় ইসলামিক  আলোচনা ও মোটিভেশনাল বক্তব্যের ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ বন্দিজীবনের অবসরে মানুষ সবচেয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ পায়। বাংলাদেশে এ নিয়মের ব্যবস্থা যথাযথভাবে করা হলে বন্দিদের মানসিক বিকাশ ও সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ সুগম হবে এবং দেশে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে ইনশা-আল্লাহ।

ফিরে দেখা : বাংলাদেশে কারাগারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধটি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঘটেছিল৷ সেদিন কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে খুন করা হয়। উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া এই মামলার দলীলপত্র বলছে, চার নেতাকে খুনের আগে এক জায়গায় নিয়ে আসার কাজটি করেছিলেন জেলখানার লোকজনই৷ 

মাত্র ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাশিমপুর-২ কারাগার থেকে দিন-দুপুরে মই নিয়ে সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে বেরিয়ে যান আবু বকর ছিদ্দিক নামের এক কয়েদি। ওই সময় ১২ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। ছয় মাস যেতে না যেতেই কাশিমপুর-১ কারাগারে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাইরের এক নারীর সঙ্গে এক বন্দির অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর সুযোগ হয়। এ নিয়ে আলোচনার ঘূর্ণি উঠেছে দেশজুড়ে। বলা চলে, পুরো কারাগারব্যবস্থাই দুর্নীতির কারণে অরক্ষিত হয়ে আছে।

জানা গেছে, কারাগারের অনেক কর্মকর্তা ও রক্ষী মাদক কারবারে জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যান্টিনের খাবার ও দর্শনার্থী নিয়ে বাণিজ্য, বন্দিদের নির্যাতন করে অর্থ আদায়, বন্দিদের মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। কারাগারগুলোকে অনিয়মের আখড়া বানিয়ে কারা কর্মকর্তারা গড়ছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বস্তাভরা টাকা নিয়ে ধরাও পড়েছেন ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কারা কর্মকর্তা। তাদের বিচার চলছে। কিন্তু থেমে নেই টাকার বিনিময়ে অপরাধ করার সুযোগ দেওয়া। সর্বশেষ ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারির কারাবন্দি তুষার আহমেদের কাশিমপুর-১ কারাগারে এক নারীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর বিষয়টি কারাগারে ভয়াবহ অনিয়মকে সামনে এনেছে।

কারা সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে শতাধিক কারা কর্মকর্তা ও রক্ষীকে অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এরপরও উন্নতি হয় নি। আরেক হিসাবে দেখা গেছে, গত তিন বছরে শতাধিক কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এরপরও কমছে না অপরাধ। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটিজ কেন্দ্রীয় কারা ক্যাম্পাসে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগে পলাশ হোসেন (৩০) নামের এক কারারক্ষীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ঘটনার পর থেকে অন্য দুই কারারক্ষী পলাতক। একই বছর ২১ সেপ্টেম্বর মাদক কারবার ও সেবনের অভিযোগে হাই সিকিউরিটিসহ কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ ও ২-এর পাঁচ কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে কর্মকর্তা ও কারারক্ষী মিলিয়ে অন্তত ৭০ জনের বিরুদ্ধে মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনজনকে চাকরিচ্যুত এবং দুজনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বরিশাল কারাগারের চার রক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়।

উদাহরণ হয়ে আছে আলোচিত নেতা আবু তাহেরের পুত্র এ এইচ এম আফতাব উদ্দিন বিপ্লবের লক্ষ্মীপুর কারাগারের ভেতরে ঘটা করে গায়েহলুদ ও বিয়ে। ২০১৪ সালের ১ আগস্টের সেই ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

সম্প্রতি বিতর্কিত একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর সুচিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।[3] উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু মিস সুচি ধর্ষণ, হত্যা এবং সম্ভাব্য গণহত্যা রুখতে কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর নিন্দা কিংবা তাদের নৃশংসতার মাত্রাও স্বীকার করেননি। তবে ২০১৯ সালে হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপের বিষয়ে তার নিজের স্বপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর তার আন্তর্জাতিক সুনাম বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

কারাগারে অনিয়ম ও দুর্নীতি : মানুষ সমাজেই পরিশুদ্ধ অবস্থায় থাকবে, দুর্নীতি করবে না, অন্যায় করবে না, অবিচার করবে না- এটেই প্রত্যাশিত৷ তবে শেষ পর্যন্ত সেটা হয় না৷ তাই সমাজে কেউ যদি দুর্নীতি করে ফেলে, তাহলে তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য নেওয়া হয় কারাগারে৷ কিন্তু আমরা এখন উল্টো চিত্র দেখছি…৷ সমাজে যেসব কাজে দুর্নীতি নেই, কারাগারে সেসব কাজেও দুর্নীতি চলে৷ স্বাভাবিক জীবনে একজন অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধ কিনতে কাউকে বখরা দিতে হয় না৷ কিন্তু কারাগারে নাকি একটা প্যারাসিটামল পেতেও কাউকে না কাউকে বখরা দিতেই হবে৷ আপনি যামিন পেয়েছেন, কারামুক্তি পাবেন, সেখানেও দিতে হয় বখরা৷ যিনি জীবনে এক টাকা ঘুষ দেননি, তাকেও নাকি কারাগারে গেলে ঘুষ দিতে হয়৷ এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে একজন অপরাধীকে পরিশুদ্ধ করে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটি কীভাবে হবে? পরিশুদ্ধির জায়গা কারাগারে বন্দিকে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দুর্নীতির মাঝ দিয়ে যেতে হয়, তাহলে পরিশুদ্ধির কাজটা হবে কীভাবে? যেখানে সমাজের দুর্নীতিবাজদের পরিশুদ্ধ করতে কারাগারে নেওয়া হয়, সেখানে কারাগারের দুর্নীতিবাজদের কোথায় নেওয়া হবে?

১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেওয়ার পর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দি থাকেন। ঐ সময় বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি কারাগারে প্রতিদিনের ডায়েরি লেখা শুরু করেন। তিনি জেলখানার ভেতরে অনেক কথা লিখেছিলেন। তার মধ্যে একটা লেখার নাম দিয়েছিলেন, ‘থালা বাটি কম্বল, জেল খানার সম্বল’।[4]

কিন্তু সেদিনের জেলখানা আর এখনকার জেলখানা এক নয়। লোকে বলে, ‘টাকা’ নাকি সেকেন্ড গড (!)। কেউ কেউ বলেন, ‘টাকা হলে নাকি বাঘের চোখ পাওয়া যায়’। টাকায় কী না হয়? এটাই মানুষের ধারণা। সমাজের বিত্তশালী লোকদের সবাই সমীহ করে। সংশ্লিষ্ট লোকেরা কীভাবে বিশাল টাকাওয়ালা বা বিত্ত-বৈভবের মালিক হলো কেউ তার খোঁজ নিতে যায় না। টাকার কাছে নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই। বর্তমানে সমাজে একজন চরিত্রবান মানুষের কোনো মূল্য নেই, যদি তার টাকা না থাকে। সমাজ তার নিজস্ব রূপচরিত্র বদলে ফেলেছে। টাকার কাছে ‘সমাজ’ নির্বিকার হয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘কারাগার’ সবচেয়ে দুর্গম এলাকা হওয়ার কথা, যেখানে হাজতি বা কয়েদি এবং কারারক্ষী ছাড়া অন্য লোকের প্রবেশের ন্যূনতম সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু টাকা হলে বাংলাদেশের যেকোনো জেলখানায় নারীসঙ্গ থেকে শুরু করে কারাগার কর্তৃপক্ষ সব কিছুরই ব্যবস্থা করে দেয়। অর্থের পরিমাণ বেশি হলে কারাগার থেকে বাড়িতে গিয়ে দু-এক রাত কাটানোর ইতিহাসও রয়েছে।

ইসলামে বন্দীদের মর্যাদা : ইসলাম বন্দীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছে। রাসূলুল্লাহ  (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বন্দীদের সাথে কোমল ব্যবহার করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বদর যুদ্ধের বন্দীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার জন্য তিনি ছাহাবীদের নির্দেশ দেন। অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে তাগিদ দেন। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী বন্দীদের এমন স্থানে রাখতে হবে, যেখানে তারা জীবনের নিরাপত্তাবোধ করবে। কেননা বন্দীদের আটকের উদ্দেশ্য হলো মানব মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে তাদের সংশোধন করা ও সমাজের কল্যাণে প্রস্তুত করা। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শরীআতের দৃষ্টিতে কয়েদিকে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় আটক রাখবে, যেখানে তার ব্যক্তিগত কোনো শক্তি প্রয়োগের সুযোগ থাকবে না। চাই সে বন্দিত্ব ঘরে, মসজিদে কিংবা কারাগারে হোক’।[5] রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বন্দীদের রাখার জন্য প্রশস্ত ও আলো প্রবেশ করে এমন তাঁবু নির্বাচন করতেন। যাতে বন্দীরা শারীরিক ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে। আধুনিক যুগে এ ধরনের কারাগারকে উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, যাতে কয়েদিদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করে।[6]

প্রস্তাবনা : বন্দীদেরকে স্ব স্ব ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। কারাগারে জুমআ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অথবা প্রতি ওয়ার্ডে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ও জুমআর ছালাতের ব্যবস্থা করতে হবে। দুই ঈদে সকল বন্দীকে অন্তত তিন ঘণ্টার জন্য খোলামেলাভাবে একত্রিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। জুমআ ও ঈদে বাহির থেকে যোগ্য আলেম এনে বন্দীদের সামনে কুরআন ও হাদীছ থেকে আখেরাত ভিত্তিক উপদেশ দিতে হবে। নিরক্ষর বন্দীদের দ্রুত অক্ষর জ্ঞান, প্রাথমিক ধর্মীয় জ্ঞান ও গণিত ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন করে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিদিন বাদ ফজর ও বাদ এশা প্রতি কক্ষে দারসে কুরআন ও দারসে হাদীছের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বন্দীদের মধ্য থেকেও যোগ্য ব্যক্তিদের এ কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে করে অপরাধীরা সংশোধন হয়ে ভালো মানুষে পরিণত হয়ে যাবে ইনশা-আল্লাহ। সেই সাথে সংশোধিত বন্দীদের বন্দীত্বের মেয়াদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস করার বিধান রাখতে হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশ, মুসলিমদের মানবিক শিক্ষায় অভিভূত হয়ে গত ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৭ জন কারাবন্দী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নওমুসলিমরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা করে জ্ঞান অর্জনের পর স্বতস্ফূর্তভাবে মুসলিম হয়েছেন।

তারা জানান, মুসলিমদের সুন্দর আচার-ব্যবহার ও ইসলাম বিষয়ক মৌলিক জ্ঞান সম্পর্কিত কিছু কোর্স সম্পন্ন করে ইসলাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করি। এরপর আমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। আল-খায়মাহ কারাগার জানায়, পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম থেকে অনেক কয়েদি উপকৃত হয়েছে।[7] ‘আসামী’ পরিভাষা বাতিল করে হাজতীদের জন্য ‘বন্দী’ ও দণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য ‘কয়েদী’ পরিভাষা চালু করা হৌক। সেই সাথে মুসলিমকে হেয় করার জন্য সাদা টুপি ও জামা পরার প্রচলিত কয়েদী পোশাক বাতিল করতে হবে। কেবল প্রথম শ্রেণি প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা বা মন্ত্রী-এমপি নয়, বরং সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন আলেম-ওলামা ও অন্যদেরকে কারাগারে শুরুতেই ডিভিশন প্রাপ্ত হিসাবে মর্যাদা দিতে হবে। জেল কোড অনুসারে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে নির্দিষ্ট অন্তর বন্দীদেরকে তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে কারাগারের মধ্যে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ দিয়ে (কমপক্ষে ৫ ঘণ্টা) নিরিবিলি থাকার সুযোগ দিতে হবে। তাতে বন্দীদের জৈবিক ও মানবিক চাহিদা পূরণ হবে। তাতে সংসারে শান্তি বজায় থাকবে।

পরিশেষে বলব, আদালতে ইসলামী বিধান ও দণ্ডবিধিসমূহ কার্যকর করা এবং কারাগারে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন- আমীন!


* খত্বীব, গছাহার বেগ পাড়া জামে মসজিদ (১২ নং আলোকডিহি ইউনিয়ন), গছাহার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর; সহকারি শিক্ষক, চম্পাতলী জান্দি পাড়া ইসলামিক একাডেমি, চম্পাতলী বাজার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

১. https://www.bangla.24livenewspaper.com/bangladesh/74515-three-withdrawn-from-kashimpur-jail.

২. মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক, কারাগার থেকে বলছি (ঢাকা : বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স, প্রথম প্রকাশ-সেপ্টেম্বর ২০১৩), পৃ. ১৪৩-১৪৪।

৩. বিবিসি বাংলা, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

৪ শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, প্রথম প্রকাশ- মার্চ ২০১৭), পৃ. ২৫।

৫. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ৩৫/৩৯৮।

[6]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা, ২/২৮৫; হুকূকুল মাসজুন ফিশ শরীআতিল ইসলামিয়া, পৃ. ৫৪।

[7]. দৈনিক ইনকিলাব (অনলাইন সংস্করণ), ২৫ জানুয়ারি ২০২১।