জ্ঞানীদের গুণাবলি
মো. তরিকুল ইসলাম*



জ্ঞানী সদা সম্মানের পাত্র। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী কে? কী তার গুণাবলি? এ সম্পর্কে আল-কুরআনের সূরা আর-রাদের ১৯ থেকে ২৪ আয়াতে খুব সুন্দর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿أَفَمَنْ يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ – الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ – وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ – وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ – جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَابٍ – سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ﴾

‘আপনার রব হতে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে, সে কি তার মতো, যে অন্ধ? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকসম্পন্নগণই। যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না। আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ্ন রাখে, তাদের রবকে ভয় করে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে। আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্যধারণ করে এবং ছালাত ক্বায়েম করে, আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভালো কাজের দ্বারা মন্দ কাজকে প্রতিহত করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম। স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রীগণ ও সন্তানসন্ততিদের মধ্যে যারা সৎ কাজ করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে এবং বলবে, তোমরা ধৈর্যধারণ করেছো বলে তোমাদের প্রতি শান্তি। আর আখেরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম’ (আর-রা‘দ, ১৩/১৯-২৪)

আল্লাহ তাআলা কুরআনকে নাযিল করেছেন যাতে এর আয়াতগুলো বুঝা হয়, সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা হয় এবং সেগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা হয়। শুধু তেলাওয়াত করাই মূল লক্ষ্য নয়। আমরা এখানে সূরা আর-রা‘দের আয়াতগুলো একটু বুঝার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা এখানে প্রশ্নের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করছেন, যে ব্যক্তি অহীকে সত্যায়ন করে, কোনো সন্দেহ করে না এবং সেই অনুযায়ী আমল করে আর যে অহী থেকে অন্ধ, কুরআন ও সুন্নাহ জানার চেষ্টা করে না আবার জানলেও সে অনুযায়ী আমল করে না, তারা কখনোই সমান হতে পারে না। তাদের মধ্যে আসমান ও যমীনের ব্যবধান।[1] আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অনেক জায়গায় এমন কথা বলেছেন। কোথাও তিনি বলেছেন যে, ‘জানা ব্যক্তি আর না জানা ব্যক্তি সমান নয়’ (আযযুমার, ৩৯/)। আবার কোথাও বলেছেন যে, ‘জান্নাতী আর জাহান্নামী সমান নয়’ (আলহাশর, ৫৯/২০)। এটি স্পষ্ট বুঝা গেলেও এখান থেকে উপদেশ গ্রহণ করে শুধু যারা জ্ঞানী, যাদের বিবেক আছে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, উপদেশ গ্রহণ করা জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য।

তারপর জ্ঞানী মানুষদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেন, ﴿الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ﴾ যারা আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে’। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছেন, তারা সেগুলো পালন করে। আল্লাহর হক্ব ও বান্দার হক্ব দুটোই এর অন্তর্ভুক্ত। জ্ঞানীগণ আল্লাহর হক্ব ও বান্দার হক্ব পালন করে অঙ্গীকার পূর্ণ করে। পক্ষান্তরে মুনাফিক্বরা এর বিপরীত করে। এরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবে আর মুমিনদেরকে নির্বোধ মনে করে যেমনটি আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাক্বারাতে উল্লেখ করেছেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে এরাই বোকা। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ তারা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না আল্লাহ ও তাদের মাঝে যে প্রতিজ্ঞা আছে, সেগুলো তারা ভঙ্গ করে না। সাথে সাথে বান্দার সাথেও যদি তাদের কোনো প্রতিজ্ঞা, চুক্তি, সন্ধি থাকে, তাহলে তাও তারা ভঙ্গ করে না।

وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আদেশ করেছেন, তারা তা অক্ষুণ্ন রাখে’ দ্বীনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত।

জ্ঞানী মানুষ তার মাঝে ও আল্লাহ তাআলার মাঝে সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে তারা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই ইবাদত করে, তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করে না। একমাত্র তাঁকেই ভয় করে, তাঁরই অভিমুখী হয়, তাঁরই ওপর ভরসা করে। সাথে সাথে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতসমূহকে স্বীকার করে এবং এর শুকরিয়াস্বরূপ তারা এসব নেয়ামতকে আল্লাহর নাফরমানীতে কাজে লাগায় না; বরং যাতে আল্লাহ খুশি হন, একমাত্র সেগুলোতেই কাজে লাগায়। তাছাড়াও তারা তাদের ভুলত্রুটির জন্য একমাত্র তাঁরই কাছে তাওবা করে। মোটকথা, তারা তাদের সার্বিক জীবনে তাওহীদকে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে এবং নিজেদেরকে শিরক থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।

জ্ঞানী মানুষগণ আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে তারা সেই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ঈমান আনে, তার দেওয়া সকল সংবাদকে সত্যায়ন করে, তার যথাযথভাবে অনুসরণ করে, তার দেওয়া ফয়সালাকে তারা মেনে নেয় এবং মনের মধ্যে কোনো ধরনের সংকোচ রাখে না। সাথে সাথে তারা তাকে নিজেদের সন্তানসন্ততি, পিতা-মাতা এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।

জ্ঞানী মানুষ পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, স্ত্রী, দাস-দাসী, দূরের ও কাছের প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। তারা সফরের সঙ্গীদের সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখে। তারা নিজেদের জন্য যা ভালোবাসে, তা অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্যও ভালোবাসে। তারা অন্যদের থেকে যে আচরণ আশা করে, মানুষদের সাথে তেমনই আচরণ করে। এমনকি তারা তাদের দুই কাঁধের ফেরেশতাগণের সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখে। তারা তাদেরকে সম্মান করে এবং তাদেরকে লজ্জা করে যেমন একজন লোক তার পাশের সাথীকে দেখে লজ্জা করে। যার ফলে তারা গোপনেও কোনো পাপের কাজ করে না।[2]

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ ‘তারা তাদের রবকে ভয় করে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে’ অন্তরে আল্লাহ তাআলার ভয় না থাকলে তিনি যেসব সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে বলেছেন, সেগুলো অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব নয়। আল্লাহর ভয় এবং কিয়ামতের দিবসে হিসাবের ভয়ে তারা পাপ কাজের দিকে যায় না। বরং আল্লাহ তাআলা যে আদেশ করেছেন, সেগুলো তারা যথাযথভাবে পালন করে।

وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ ‘আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্যধারণ করে’ ধৈর্য হলো স্বভাববিরুদ্ধ বিষয়গুলোতে অস্থির না হওয়া, সৃষ্টির কাছে অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ থেকে জবানকে বিরত রাখা, গাল চাপড়ানো এবং জামাকাপড় ছেঁড়া থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিরত রাখা।[3]

আল্লাহর হুকুম বা বিধান দুই প্রকার : সৃষ্টিগত ও শরীআতগত। মানুষের জীবনে কিছু কষ্টের ঘটনাসহ তাক্বদীরের সকল বিষয় এই সৃষ্টিগত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। আর শরীআতগত বিধানগুলো হলো আল্লাহর আদেশ ও নিষেধসমূহ। তাক্বদীরে নির্ধারিত কষ্টকর বিষয়গুলোতে যেমন ধৈর্যধারণ করতে হয়, ঠিক তেমনই আল্লাহর আদেশ পালনে এবং তার নিষেধকৃত কাজগুলো থেকে বাঁচতেও ধৈর্যের প্রয়োজন। অনেক মানুষ আছে, তারা আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ করে, কিন্তু হারাম থেকে বাঁচতে পারে না। আবার অনেকেই এর উল্টা। আবার অনেকেই তাদের জীবনের সামান্য কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাতেই ভেঙে পড়ে, অস্থির হয়ে পড়ে। এরা জ্ঞানী নয়। বরং জ্ঞানী হলো তারাই যারা আল্লাহর আদেশ পালনে, নিষেধকৃত কাজগুলো থেকে বাঁচতে এবং তাক্বদীরে নির্ধারিত অপ্রীতিকর ঘটনাতে ধৈর্যধারণ করে। তারা কোনো অবস্থাতেই অস্থির হয়ে পড়ে না। অস্থিরতা বা ধৈর্যহীনতাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, তোমার পিতা কে? তখন সে উত্তরে বলবে, অক্ষমতা বা দুর্বলতা। আর জ্ঞানী বা বুদ্ধিমানকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, তোমার পিতা কে? তখন সে উত্তরে বলবে, ধৈর্য।[4] তাই জীবনে ধৈর্য ছাড়া চলার উপায় নেই। কারণ মানুষের নাফসে আম্মারা তাকে আল্লাহর পথ থেকে শয়তানের পথের দিকে নিয়ে যেতে চায়। মানুষের নফস হলো একটি বাহন, যাতে আরোহন করে সে জান্নাতে অথবা জাহান্নামে দিকে চলে। আর ধৈর্য হলো সেই বাহনের লাগাম।[5] যদি বাহনের লাগাম না থাকে, তাহলে যেকোনো সময় সে বিপথে যাবে, ঠিক তেমনই মানুষের ধৈর্য না থাকলে সে আল্লাহর পথে টিকে থাকতে পারবে না। সে তখন শয়তানের বাহিনীতে পরিণত হবে। এমনকি কোনো কোনো সময় শয়তানই তার বাহিনীতে পরিণত হয়।[6]

এখানে আল্লাহ তাআলা বলছেন, জ্ঞানীগণ ধৈর্যধারণ করে, কিন্তু সেই ধৈর্যধারণ একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য, অন্য কারো জন্য নয়।

وَأَقَامُوا الصَّلاةَ ‘ছালাত কায়েম করে’ তিনি বলেননি যে, তারা ছালাত আদায় করে। কারণ শুধু বাহ্যিক আকৃতিতে ছালাত আদায় করা যথেষ্ট নয়। বরং ছালাত ক্বায়েম হলো, ছালাতের রুকনসমূহ, ওয়াজিবসমূহ এবং সুন্নাতসমূহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করে বাহ্যিকভাবে ছালাত ক্বায়েম করা। সাথে সাথে ছালাতের রূহ অর্থাৎ অন্তরকে ছালাতে হাযির করে যেটি বলছে এবং যে কাজ করছে সেগুলো গভীরভাবে চিন্তা করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণভাবে ছালাত ক্বায়েম করা। আর এই রকম ছালাতের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন,‌ ‘নিশ্চয় ছালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে’ (আল-আনকাবূত, ২৯/৪৫)। আর এতেই ছওয়াব অর্জিত হয়। কারণ ছালাতের মধ্যে যতটুকু অংশে মানুষ মনোযোগ দেয় বা বুঝে, শুধু ততটুকু অংশে ছওয়াব পায়, অন্য অংশে নয়। ফরয ও নফল ছালাতসমূহও আয়াতে বর্ণিত ছালাতের অন্তর্ভুক্ত।[7] আয়াতে বর্ণিত ছালাত ও ধৈর্য হলো দুনিয়া ও আখেরাতের সকল কল্যাণ অর্জনে সহায়ক। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলছেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। আর এটি বিনয়ী ছাড়া অন্যদের জন্য খুবই কঠিন’ (আল-বাক্বারা, ২/৪৫)

وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلانِيَةً ‘আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে’ ফরয ব্যয়সমূহ যেমন— যাকাত, স্ত্রী, নিকটাত্মীয় ও দাস-দাসীসহ অন্যদের জন্য ব্যয় করা এবং নফল ব্যয়সমূহ যেমন— সকল কল্যাণকর রাস্তায় ব্যয় করা। এই দুই ধরনের ব্যয়ই আয়াতে বর্ণিত ব্যয় বা খরচের অন্তর্ভুক্ত। কাদের জন্য খরচ করবে সেটি কিন্তু আয়াতে বলা হয়নি। এর কারণ হলো যাতে করে অনেক প্রকার মানুষদের জন্য ব্যয় করা যায়। কেননা দান করা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। আয়াতে বর্ণিত من শব্দটি প্রমাণ করে, সম্পদের কিছু অংশ দান করতে হবে। এটি দিয়ে আল্লাহ তাআলা মানুষদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি শুধু তাদের থেকে তাদের সম্পদের সামান্য পরিমাণই চান, যাতে তাদের কোনো ক্ষতিও না হয় এবং বোঝাও না হয়ে যায়। বরং তাদের এই দান বা ছাদাক্বা দ্বারা যাতে তারা নিজেরাও উপকৃত হয় এবং তাদের ভাইয়েরাও উপকৃত হয়।

رَزَقْنَاهُمْ ‘আমরা তাদেরকে জীবিকা হিসেবে দিয়েছে’ এটি দিয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, তোমাদের যেসব সম্পদ রয়েছে, সেগুলো তোমাদের শক্তিবলে অর্জিত হয়নি এবং তোমরা সেগুলোর মালিকও নও। বরং এগুলো আল্লাহ তাআলার রিযিক যেগুলো একমাত্র তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন। যেহেতু একমাত্র তিনিই তোমাদের এসব দান করেছেন এবং তার বহু বান্দার মধ্যে বিশেষভাবে তোমাদের অনুগ্রহ করেছেন, সেহেতু তোমরা তার দেওয়া এসব অনুগ্রহ থেকে দান করার মাধ্যমে এবং তোমাদের অভাবী ভাইদের সান্ত্বনা দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করো।

কুরআনে অনেক জায়গায় ছালাত আর যাকাতকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ছালাত হলো মা‘বূদ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার জন্য ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা আর যাকাত ও ছাদাক্বা হলো বান্দার জন্য ইহসানস্বরূপ। বান্দার সৌভাগ্য ও কল্যাণের লক্ষণ হলো তার মা‘বূদের জন্য ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা রাখা এবং সৃষ্টির কল্যাণ বা উপকারের জন্য চেষ্টা করা। পক্ষান্তরে বান্দার দুর্ভাগ্যের লক্ষণ হলো এই দুইটি অর্থাৎ ইখলাছ ও ইহসানের কোনোটিই না থাকা।[8]

وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ ‘ভালো কাজের দ্বারা মন্দ কাজকে প্রতিহত করে’ জ্ঞানী মানুষগণ তাদের সাথে কেউ মূর্খামি করলে তারা সেই মন্দকে মন্দ দিয়ে নয়, বরং তারা ভালো দিয়ে প্রতিহত করে। নবী (আলাইহিস সালাম)-দের দিকে দৃষ্টি দিন। তারা কীভাবে মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করেছেন। আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যেন এখনো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখছি, যখন তিনি একজন নবী (আলাইহিস সালাম)-এর অবস্থা বর্ণনা করছিলেন যে, তাঁর স্বজাতিরা তাঁকে প্রহার করে রক্তাক্ত করে দিয়েছে আর তিনি তাঁর চেহারা হতে রক্ত মুছে ফেলছেন এবং বলছেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, যেহেতু তারা জানে না।[9] সুবহানাল্লাহ! একটু চিন্তা করুন, এখানে সেই নবী (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে শুধু ক্ষমাই করেননি; বরং তাদের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনাও করছেন। আবার তিনি তাদের জন্য ওযরও পেশ করছেন যে, তারা জানে না।[10]

এই প্রতিহত করাকে আরেকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেটি হলো তারা পাপকে নেকী দিয়ে প্রতিহত করে। অর্থাৎ তাদের দ্বারা কোনো পাপ কাজ হলেই তারা ভালো কাজ করে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় ভালো কাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেয়’ (হূদ, ১১/১১৪)। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুআযকে (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছিলেন, ‘মন্দ কাজের পরপরই ভালো কাজ করো, তাতে মন্দ দূরীভূত হয়ে যাবে’।[11]+[12]

এসকল গুণ যাদের মধ্যে আছে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এমনকি তাদের পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি ও স্ত্রীদের মধ্যে যারা ভালো কাজ করেছে, তাদেরকেও এই লোকদের সাথেই জান্নাতে স্থান দিবেন। দুনিয়াতে ধৈর্যের সাথে জীবন অতিবাহিত করার জন্য ফেরেশতাগণ তাদেরকে সালাম দিবেন।

উক্ত আয়াতগুলো থেকে আরও বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা এই সকল লোকদেরকে তাদের আমলের বিনিময়ে জান্নাত দিবেন। সুতরাং জান্নাতে প্রবেশের জন্য আমলের প্রয়োজন। আমলকারীর ওপরেই আল্লাহ তাআলা রহম করবেন। আর সেই রহমতের ফলেই জান্নাতে যাবে। উক্ত আয়াতগুলোতে জাবরিয়াদেরও খণ্ডন বিদ্যমান। কারণ জাবরিয়ারা বান্দার ইচ্ছাকে সাব্যস্ত করে না। অথচ আয়াতগুলোতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, বান্দা এই আমলগুলো নিজেদের ইচ্ছাতেই করে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই আমলগুলো করতে বাধ্য করেন না।

আল্লাহ তাআলা যেন আমদের ইলমকে আরও বাড়িয়ে দেন এবং এই ইলম দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করুন- আমীন!


* গবেষণা সহকারী, আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ।

[1]. তাফসীরে সা‘দী, সূরা আর-রা‘দ এর ১৯ নং আয়াতের আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[2]. ইবনুল ক্বাইয়িম, উদ্দাতুছ ছবেরীন, পৃ. ৫০-৫১-এর আলোকে।

[3]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫।

[4]. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫।

[5]. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫।

[6]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০।

[7]. তাফসীরে সা‘দী, সূরা আল-বাক্বারার ৩ নং আয়াতের আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[8]. প্রাগুক্ত।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭৭।

[10]. বাদাই‘ ফাওয়ায়েদ, ২/৭৭৩।

[11]. তিরমিযী, হা/১৯৮৭।

[12]. উদ্দাতুছ ছবেরীন, পৃ. ৫৩।