টাখনুর উপরে পুরুষের পোশাক পরিধান‌‌ :
যুক্তি ও বিজ্ঞান আছে কি?
জাবির হোসেন
এম. এ. (বাংলা), কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।


ভাগীরথীর পূর্ব তীরে স্নিগ্ধ বাতাসে মনোরম পরিবেশে, স্বপনদার চায়ের দোকানে বসে চা পান করছি; তার সঙ্গে চলছে পড়ন্ত বিকেলের আড্ডা। আড্ডায় সদস্য সংখ্যা চারজন— সন্তুদা, অহন, কিরণ আর আমি।

সন্তুদা আমাদের চাইতে দু’বছরের সিনিয়র। আমি, কিরণ আর অহন একই বছরের।

আমাদের মধ্যে সন্তুদা এথিস্ট টাইপের। মুক্তমনা আর কিছু ইসলামবিদ্বেষী সাইট থেকে ধার করা কিছু বুলি তোতা পাখির মতো আওড়ায়। বেশির ভাগ ছেলে তাঁর এই দিক সম্পর্কে অবগত থাকায় ইচ্ছাকৃত বিতর্কে জড়াতে চায় না।

একদিকে চা পান চলছে, অন্যদিকে অহন আর কিরণ গল্প শুরু করেছে— সিনেমা নিয়ে। সম্প্রতি একটি দৈনিকে শাহরুখ খান ভারতের প্রথম মহাকাশচারী রাকেশ শর্মার রোলে একটি সিনেমা বের করবে তার খবর ছেপেছে।

অহন আবার শাহরুখ ভক্ত। সন্তুদাও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু আমি। আমার এসব সিনেমা-টিনেমা একদম পছন্দের নয়। তাই আমার দৃষ্টি নদীর জলের ঢেউয়ের দিকে।

‘দাদা, এক কাপ চা দিন?’

আমার দৃষ্টি আগন্তুকের দিকে পড়ল।

‘আরে আহমাদ যে, কখন আসা হলো?’ —আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘এই ঘণ্টা খানেক হলো ভাইজান’।

আহমাদ আমার রুমমেট। আমরা সেইম ইয়ার। একই বিভাগের স্টুডেন্ট। পলিটিক্যাল সাইন্স। সপ্তাহ খানেক আগে বাড়ি গিয়েছিল, আজকে এসেছে।

‘আরে ভাই! প্যান্টের কাপড়ে শর্ট পড়ে গিয়েছিল নাকি? বলতেই পারতিস কিছু টাকা ডোনেট করতাম’। —আহমাদকে লক্ষ্য করে সন্তুদা কথাগুলো বলল।

তাইতো— এ কি দেখছি আমি! আহমাদ গোড়ালির উপর পর্যন্ত প্যান্ট বানিয়েছে এবং তা পরিধান করেও এসেছে। এতক্ষণ তো আমি এদিকে খেয়াল করিনি। এই তো সেদিন, বাড়ি যাওয়ার আগেও একটা প্যান্ট বানাল, যা কিনা স্কিন টাইট এবং গোড়ালির নিচে। হঠাৎ এই পরিবর্তন!

 আমি কিছু বলতে যাব ঠিক সেই মুহূর্তে আহমাদ বলে উঠল, ‘আমাদের ইসলাম ধর্মে পুরুষদের পোশাক গোড়ালি বা টাখনুর উপরে পরিধান করার নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ a। —বুঝলে সন্তুদা’।

‘ইসলাম ধর্ম মানে মোহাম্মদ, তোরা যাকে আবার প্রিয় নবী বলিস। যত্তসব, সেই চৌদ্দশ বছরের পুরনো কালচার থেকে এখনো তোরা বের হয়ে আসতে পারলি না। তোরা মডার্ন হতে পারলি না। তোরা ব্যাকডেটেড থেকেই গেলি।

—তা তোদের প্রিয় নবী এ বিষয়ে কী শাস্তির ভয় দেখিয়েছে শুনি? তোরা তো আবার জাহান্নাম নামক কাল্পনিক সৃষ্টির ভয়ে সব কিছু করিস’। —এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে সন্তুদা দম নিল।

আহমাদ বলল, ‘হাদীছে আছে, প্রিয় নবী মুহাম্মাদ a বলেছেন, টাখনুর নিচে কাপড়ের যে অংশটুকু থাকবে তা জাহান্নামে যাবে।[1] এছাড়াও আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না, তার দিকে তাকাবেন না এবং তাকে পবিত্রও করবেন না; তার জন্য রয়েছে মর্মান্তিক শাস্তি; যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করে।[2] এজন্য ইসলাম ধর্মে পুরুষদের পোশাক টাখনুর নিচে পরিধান করা হারাম।[3] এটি কাবীরা গুনাহ’।[4]

আমি চুপ করে শুনছি আহমাদের কথা। যে আহমাদ এই ক’দিন আগেও সিনেমা, গান আর তাস দিয়ে রাত্রি পার করত; বলে বলে তাকে শুক্রবার জুমআর ছালাত পড়তে নিয়ে যেতে পারিনি, আজ সে ছেলের মুখে প্রিয় নবী a-এর কথা। ভাবতে জাস্ট অবাক লাগছে!

সন্তুদা বলল, ‘অ‍্যাজ এক্সপেক্টেড! যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। জাহান্নামের ভয় থাকবেই। —তা তোরা তো আবার তোদের ধর্মকে বিজ্ঞানময় ও যৌক্তিক বলে দাবি করিস। তা বাছা! গোড়ালির উপর প্যান্ট পরিধানে কোনো যুক্তি ও বিজ্ঞান আছে শুনি?’

আহমাদ বলল, ‘সন্তুদা— তোমাদের মতো তথাকথিত নাস্তিকদের সবচেয়ে বড় দোষ কী জানো? তোমরা ধর্মের বিষয়ে সব সময় যুক্তি আর বিজ্ঞান জানতে চাও। অথচ নিজেরা যে সব কাজ করে থাক, তখন তার যুক্তি আর বিজ্ঞান তালাশ কর না। এটা কিন্তু তোমাদের ডাবল স্ট্যান্ডবাজি!’

‘এটা আবার কেমন কথা হলো। কোথায় আমরা ডাবল স্ট্যান্ডবাজি করলাম?’ —সন্তুদা বলল।

‘আচ্ছা সন্তুদা, আমি যদি তোমাকে জিজ্ঞস করি, তুমি কেন টাখনুর নিচে প্যান্ট পরিধান কর, তখন তুমি কী বলবে? আবার যদি বলি, এর মধ্যে কোনো যুক্তি ও বিজ্ঞান আছে, তখন কী জবাব দেবে?’

কাউন্টার প্রশ্ন শুনে সন্তুদা কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘এ ধরনের পোশাক পরিধান করে আমরা কমফর্টেবল ফিল করি। আমাদের স্মার্ট দেখায়। আমাদের মডার্ন মনে হয়’।

আহমাদ বলল, ‘আমি যদি বলি আমরা মুসলিমরা টাখনুর উপরে পোশাক পরিধান করে কমফর্টেবল ফিল করি। আমাদের নিজেদের স্মার্ট দেখায়। আর আমাদের মডার্ন মনে হয়; তার সঙ্গে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল a-এর আদেশ পালন করতে পারছি ভেবে নিজেরা গর্বিত হই, তখন…’

সন্তুদা কী বলবে ভাবছে…

আহমাদ পুনরায় বলতে শুরু করল, ‘বুঝলে সন্তুদা! তুমি তোমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছ তোমাকে স্মার্ট ও মডার্ন মনে হচ্ছে। আর আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি আমাকেও স্মার্ট ও মডার্ন মনে হচ্ছে। তুমি প্রগতির স্রোতে গা ভাসিয়েছ তাই আমাদের ধর্মের সমস্ত বিধান তোমার কাছে অযৌক্তিক, আনস্মার্ট এবং ব্যাকডেটেড মনে হচ্ছে।

—কিন্তু কী জানো সন্তুদা! আজকে আমার টাখনুর উপরে প্যান্ট পরা দেখে ধর্মের গন্ধ পেয়ে তুমি আমার কাছে যুক্তি ও বিজ্ঞান জানতে চাচ্ছ? কিন্তু কোনোদিন কী নিজেকে বা মেসের সুরুজ, রাজু, হাসান অথবা অঙ্কিত দা, রাহুল দা এদের কাছে থ্রি কোয়ার্টার প‍্যান্ট বা হাফ প্যান্ট পড়ার জন্য যুক্তি বা বিজ্ঞান খোঁজ করেছ? 

—না। খোঁজ করনি।

—এমন প্রশ্ন মাথার মধ্যে উদয়ও হয়নি। কিন্তু আমি শুধু টাখনুর উপরে প্যান্ট পরিধান করেছি, যা একটি মাছিরও কোনো ক্ষতি করবে না এবং এটা ধর্মের বিধান বলেই তোমার মাথার মধ্যে এই ধরনের প্রশ্ন এসেছে। জানতে চেয়েছ যুক্তি আর বিজ্ঞান।

—আর হ্যাঁ! আমরা শুধু জাহান্নামের ভয়ে এই বিধান পালন করছি, তা কিন্তু নয়। জাহান্নামকে তো ভয় করি— কেননা তা সত্য। তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ a-কে নিজেদের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আর এটিই আমাদের ঈমান যে, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তিনি রহমাতুল্লিল আলামীন। এটা শুধু আমাদের দৃষ্টিতেই নয়— বিখ্যাত দার্শনিক থমাস কার্লাইল, ঐতিহাসিক মাইকেল এইচ. হার্ট সহ একগুচ্ছ মনীষী তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর ওপর পুস্তক রচনা করেছেন। সেই মহামানব নিজে গোড়ালির উপরে পোশাক পরিধান করেছেন এবং তাঁর অনুসারীদের পরিধান করতে বলেছেন। তারই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমাদের গোড়ালির উপরে প্যান্ট পরিধান’।

‘তার মানে আলটিমেটলি তোরা মোহাম্মদের অন্ধ অনুসরণ করিস? ব্লাইন্ড ফলোয়ার?’ —সন্তুদা বলল।

আহমাদ স্মিত হাসি হেসে বলল, ‘হানি সিংয়ের মতো চুল কাটালে তোমরা তাকে বলো স্টাইল। রঙিন পর্দার অভিনেতাদের অন্ধ অনুকরণে পোশাক-আশাক, হেয়ার স্টাইল, কথাবার্তা ও চালচলন হলে সেটি হয় তোমাদের কাছে ফ্যাশন। তখন তোমরা মুখে কুলুপ এঁটে থাক। 

—আর আমরা নবীজী a-এর অনুসরণ করলে, তোমরা কটাক্ষ কর অন্ধভক্ত বলে। এই ডাবল স্ট্যান্ডবাজি আর কতদিন?’

নিকটবর্তী একটি মসজিদ থেকে মাগরিবের আযান কানে আসছে, ‘হাইয়‍্যা আলাল ফালাহ’।

‘চলি সন্তুদা’। —আহমাদ বলল।

আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল আহমাদ। বলতে চাইল— চল ভাই।

আমরা দুজনে হেঁটে যাচ্ছি মসজিদ অভিমুখে। মাগরিবের ছালাত আদায় করতে।

রাস্তায় যেতে যেতে আহমাদকে শুধালাম, ‘আচ্ছা, পুরুষরা পোশাক টাখনুর উপরে পরিধান করলে তাতে সত্যিই কী কোনো বৈজ্ঞানিক উপকারিতা নেই?’

উত্তরে আহমাদ জানাল, ‘মুসলিমরা আজ বিজ্ঞানফোবিয়ায় ভোগে। কুরআনের কোনো একটা আয়াত বিজ্ঞানবিরোধী মনে হলে সেটা নিয়ে টেনশনে পড়ে যায়। হীনম্মন্যতায় ভোগে। আবার কুরআনের কোনো আয়াত বিজ্ঞানের সাথে মিলে গেলে ১৪০০ বছর আগে কুরআন জানিয়েছে বলে বুকটা কয়েক ইঞ্চি ফুলিয়ে তুলে। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বা তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য এগুলো একটা অস্থায়ী সমাধান হতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান কখনই নয়।

স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রথমত আমাদেরকে বিজ্ঞানফোবিয়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞান আহামরি কিছু নয়। আমরা জানি, মানুষের বিবেক সীমিত। মানুষ যেমন অতীতের সব ঘটনা জানে না; তেমনি আগামীকাল কী হবে তাও জানে না। কিছুক্ষণ পর কী করবে তাও জানে না। তেমনি বিজ্ঞানও জানে না। বিজ্ঞানের জ্ঞানও সীমিত। বিজ্ঞান যতই উন্নত হোক কোনোদিন বলতে পারবে না মানুষ কখন কোথায় কীভাবে মারা যাবে। কেননা বিজ্ঞান অলৌকিক কিছু নয়। মানুষের গবেষণা মাত্র। বিজ্ঞান আসমান থেকে পড়া কোনো অমীয় বাণী নয়। বিজ্ঞানকে মানুষ জন্ম দিয়েছে। অক্ষম ও অজ্ঞ মানুষ কীভাবে সবজান্তা বিজ্ঞানের জন্ম দিতে পারে? মানুষ মাত্রই ভুল করে সেহেতু স্বভাবজাত ভাবেই মানুষের আবিস্কৃত বিজ্ঞানও ভুল করবে। হয়েছেও তাই। সকাল-সন্ধ্যায় বিজ্ঞান তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। অতএব একথা দিনের আলোর ন্যায় সত্য যে, বিজ্ঞান ও মানুষের বিবেক কোনোটাই অকাট্য সত্যের প্রমাণ বহন করে না। সুতারাং বিজ্ঞান ও যুক্তি নিয়ে লাফালাফি বোকামি বৈ কিছু নয়’।[5]

আহমাদের কথা শুনতে শুনতে কখন যে মসজিদের গেটে চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। আর একটা বিষয় জানার ছিল পুরুষের পোশাক টাখনুর উপরে পরিধান নিয়ে। অন্য সময় জানা যাবে ইনশাআল্লাহ। এখন মাগরিবের ছালাতের জন্য ওযূ করতে হবে।


[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭৮৭।

[2]. নাসাঈ, হা/২৫৬৪, হাদীছ ছহীহ।

[3]. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর p, রাহে বেলায়াত (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স), পৃ. ২৬৫।

[4]. আব্দুল্লাহিল হাদী, একশত কাবীরা গুনাহ (প্রকাশনায় : মাকতাবাতুস সুন্নাহ), পৃ. ৯।

[5]. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক, আমরা হাদীছ মানতে বাধ্য (নিবরাস প্রকাশনী), পৃ. ৮৮।