ড্রামা এন্ড মুভি : আমার অনুভূতি
-আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক*


ড্রামা সিরিয়াল বা মুভি একটি আলাদা পৃথক অদৃশ্য ইমোশনের জগৎ। রোমান্টিক দৃশ্য বা বেদনাতুর ক্যামেরা শুটের কৃত্রিম অঙ্কিত প্রতিকৃতিগুলোর পিছনে অনেক সময় দৃশ্যমান মানুষগুলো হারিয়ে যায়। রিয়্যালিটির বাইরে টিভিস্ক্রিনের পর্দায় অবলোকিত রূপক চিত্রের পেছনে দর্শক নিজ কল্পনার সাগরে রক্তিম ঢেউ খেলাতে থাকে। হারিয়ে যেতে থাকে কল্পনাবিলাসী হয়ে অলীক পাথারে। বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কাল্পনিক অবাস্তব সেই নীলাভ আকাশের বুকে উন্মুক্ত স্বপ্নের পাখা মেলে অফুরন্ত উড়ান দিতে ভালোবাসে। অদৃষ্টের পথে সেই উড়ানের শেষ পরিণতি যদিওবা না জানা থাকে। যদিওবা সেই উড়ানের পাখির ডানা কাটা থাকে অবশেষে আছড়ে পড়া ছাড়া আর কী থাকে!

পড়ার টেবিল বা ঘুমানোর পূর্ব সময়ে সামান্য ফুরসত পেলেই বানোয়াট অসত্য দৃষ্ট সেই গল্পের ন্যায় নিজের জীবনের উঁচু-নিচুকে সাজাতে শুরু করে। হৃদয় কোণে স্বপ্নের আকারে আপনার গৃহ নির্মাণে শুরু করে। অনেক সময় কল্পিত দৃশ্যগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়। নায়কের খোলা বক্ষে, আস্তিন জড়া দোলানো হাতে দম্ভভরে কোনো নারী হাসিলের লড়াই পানে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যের ন্যায় কারো সাথে লড়ায়ের উন্মাদ সৃষ্টি হয়। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয়ে অপরের সামনে নিজের ৩৬ ইঞ্চি বক্ষ প্রদর্শনের উন্মাদ সৃষ্টি হয়। কলেজে, স্কুলে প্রেম ভালোবাসাই মূল লক্ষ্য হয়ে প্রিয় চারাগাছ রূপে অঙ্কুরিত হয়। নারী-লোভ সকল চাওয়াকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। তাকে পাওয়ার অনন্দ সকল উৎফুল্লতার উপরে উঠে আসতে চায়। পড়ালেখা প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, প্রেম মূল কর্মে পরিণত হয়। প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সুন্দর চাদরে জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নারী প্রেম নামক অপরিষ্কার কলঙ্কিত চাদরের ছায়ায় কেটে যায়।  কেননা ঐ সাদা-কালো বা রঙ্গিন পর্দায় এর বাইরে স্বল্পই সময় হয়েছে অন্য কিছু অবলোকন করার।

ভালোবাসার কোমল ফুলে ছোঁয়া দেয় এসব সিরিয়ালের দৃশ্য। অন্তরের প্রেম কোণায় আলতো ছোঁয়া দিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি করে। প্রণয়াসক্তি সৃষ্টির সুড়সুড়ি দিয়ে যেতে থাকে ব্যগ্রতার বুকে। দর্শক এতোটা আবেগতাড়িত হয়ে যান যে, আনমনেই গণ্ডদেশ বেয়ে অঝোরধারে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কষ্ট-খুশি সব কিছুতেই দর্শক যেন নিজের খেই হারিয়ে ফেলেন। নিজেই নায়ক ভেবে টিভির পর্দার নায়িকার প্রেম কোলে হারিয়ে যেতে থাকে। দোপাট্টার কোণায় কান্নার সুরে বেরিয়ে আসা অশ্রু মুছানোর চিত্রে নিজেকে অঙ্কিত করতে থাকে। এখানেই কি থেমে থাকে? কাল্পনিক জগতের নায়ক বাস্তব জীবনের হিরোতে পরিণত হয়। একবার তার সাথে সাক্ষাৎ করার অগাধ ইচ্ছা, কামনা তাড়িয়ে নিয়ে যায় এ শহর থেকে সে শহর। তার মতো হওয়ার প্রবণতায় প্রকৃত জীবন লক্ষ্যে বিচ্যুতি ঘটে যায়।

ধীরে ধীরে টিভির ঐ আলোক-রশ্মির পেছনে ছুপে থাকা তমাশায় আগামীর ভবিষ্যৎগুলো ডুবে যায়। ঐ রূপক আলোকের উজ্জ্বলতায় সৃষ্টিশীলতা স্তব্ধ হয়ে আসে। চিন্তক শক্তি কার্যক্ষমতা হীন হতে থাকে। আলো করে উঠা সূর্যগুলো অস্ত যায়। তারাগুলো কালো মেঘের নিষ্ঠুর ছায়াতলে অদৃশ্য হয়ে যায়। পর্দায় গড়ে উঠা আবেগময় রোমান্টিক খোলামেলা চিত্রপটের অ্যাকশন নিজের জীবনে তৈরি করতে চাওয়ার মনোবাসনা বাস্তবিক যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেয়। অতি খোলামেলা সেই জানালা দিয়ে আগত তীব্র দমকা হাওয়া জ্বলে উঠা কচি-আলোর বুকে প্রবল দমকা আঘাত হেনে দপ করে নিভিয়ে দেয়। কর্মঠ বিবেক ধীরে ধীরে সৃজনশীলতা হারিয়ে অভাবের পথে এগিয়ে যায়। ক্রিয়েটিভিটি সদ্য জেগে উঠা ফুলের উপর অমানিশার ঝড়ো হাওয়ায় টপ-টপ করে ঝরতে থাকা ফুল-কলিগুলোর ন্যায় সমাজের ফুল-কলিগুলো ঝরে যেতে থাকে। সমাজের স্বপ্নের উঠানে ফের আবর্জনা জমা হয়। ফলে সকালে জেগে উঠা মালিও আর তাদের আশ্রয় দিতে চায় না। বাস্তব জীবন থেকে অন্ধত্ব জীবন গাড়ির চাকা খুব বেশি দূর আর টেনে নিয়ে যেতে পারে না। টিভিস্ক্রিন থেকে বেড়ে উঠা অলীক কল্পনার গভীর কাদাময় নিরিবিলি রাস্তায় চাকা দেবে যায়। উদ্যম রণ যাত্রা আহা! কী কষ্টে না মৃত্যু হয়। উদ্যম রণ যাত্রা বাস্তবতার সাথে লড়ায়ে এসে প্রারম্ভে বাধাগ্রস্ত হয়। থেমে যায় আগামীর পথের যাত্রা, স্বপ্নের পথের গুরুত্বপূর্ণ সফর। অবশেষে হেরে যায় চাওয়া, শূন্য থেকে যায় পাওয়া। অপূর্ণ থেকে যায় কামনা।

কখনোবা দর্শকের মানসিকতা-মাঝে নীল পর্দায় অবলোকিত ভিলেনের কঠোরতা, নির্মমতা প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সমাজে নানা নির্দয় ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। সামান্য বিষয় নিয়ে রক্তপাত থেকে খুনোখুনি পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। আবার কখনো নায়কের বাহাদুরি আকৃষ্ট করে, তখন সমাজের বিবেকবানদের উপদেশের ফুল-মাল্যকে গলার কাঁটা বলে অনুভূত হয়। পিতা-মাতার নিষেধ মাড়িয়ে অগ্রবর্তী হতে প্রবল স্পৃহা সৃষ্টি হয়। জন্মদাতাদের নছীহতসমূহকে চরণ তলে দেবে রাতের ছায়ায় চক্ষু-লজ্জার ভয়ে চুপিসারে যা হবার হয়, অথবা উদ্যমতা বেড়ে গেলে সমাজের খোলা চোখের সামনে অনিষ্ট সংঘটনে নিজের বাহাদুরি খুঁজে পায়। মনে হয় যেন সমাজের নিয়ম ভেঙে ফেলার মধ্যে রয়েছে মূল সফলতা। রেজাল্ট নয়; প্রেমিকার পরীক্ষায় ফেল করাই যেন মূল বিফলতা। প্রণয়ীর প্রেম পরীক্ষায় পাস করাই যেন সত্য, সঠিক সফলতা। আলোই যেন আঁধার এবং আঁধারই যেন আলোক-রশ্মিতে পরিণত হয়। কখনোবা প্রেমময় মায়াবী গল্পকথার রাজকন্যার রাজপুত্র হতে ইচ্ছা জাগে। শুধু কি তাই? শুরু হয় চেষ্টা-প্রচেষ্টা; মূল লক্ষ্য ভুলে কারো উত্তরীয় বায়ে মুগ্ধ হওয়ার প্রলুব্ধতা টেনে নিয়ে যায় পড়ার টেবিল থেকে রেস্টুরেন্টের কোনো চিপায় রাখা টেবিলে। কোনো পার্কের নীরব জনবিরল কোণায়। কোনো হোটেলের বদ্ধ কামরায়। বই কেনার টাকাগুলো চলে যায় কোনো রূপসীর চুড়ির ঝংকার আশ্রয়ে। কোনো কিন্নরীর চরণের সাজপোশাকে। চক্ষুগুলো বইয়ের পাতা থেকে উঠে চলে যায় গার্লস স্কুলের দরজায় দরজায়, নিজ কলোনির ছাদে ছাদে, মহল্লার অলিতে-গলিতে।  

আর এভাবেই ধীরে ধীরে মেধাগুলো হারিয়ে যায়। নোংরা চোরাবালিতে ফেঁসে অল্প-অল্প করে শ্বাস আটকে নির্দয় মৃত্যু ঘটে শত-শত স্বপ্নচারিতার, হাজার-হাজার স্বপ্ন-বিলাসীর, লক্ষ-লক্ষ আশার বাতি প্রদীপকের। আগামীর উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো এভাবেই খসে-খসে পড়তে থাকে, উজ্জ্বলতা হারিয়ে কালিমার গহ্বরে অস্তমিত হয়। কী-বা করার আছে; দুই দৃশ্যের বাইরে কিছুই তো সে দেখেনি। আর কোনো কিছুই তো উপস্থাপিত হয়নি ঐ মরিচা আবরিত স্ক্রিনের বুকে। হয় প্রেম না হয় মারামারি।

ছোট থেকে বড়, বিবাহিত থেকে অবিবাহিত সবার বুকে নিয়ম ভাঙার নতুন নতুন সব স্বপ্ন এঁকেছে মরীচিকাময় টিভির পরিবার বিধ্বংসী, কূটচাল শিক্ষাদানকারী নাটক, কল্পিত প্রেমের তিমিরে ঢাকা মুভির দৃশ্য। করুণ এই ছোবল থেকে কেউ যেন আজ বেঁচে নেই। বাঁচাই-বা সম্ভব কীভাবে? ভালোবাসা বা প্রেম হৃদয়ের সাথে সম্পর্কিত, সেই সম্পর্কে যদি কেউ নাড়া দেয়, সাগরে ঝড় তো উঠবেই, বাঁধ ভাঙা ঢেউ তো জাগবেই। ভালোবাসার অনুভূতি আমৃত্যু মানুষের সাথে বসবাস করে। সুপ্ত সাগরের ন্যায় চুপচাপ কোনো ঝড়ো হাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। তারপর গিলে নিয়ে যায় কত-শত জাহাজ, কত-শত গ্রাম বাড়ি-ঘর।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? নিদ্রিত সমুদ্রে ঝড় যে উঠেছে প্রবল আকারে, ভেঙে যাবে বাঁধ, ডুবে যাবে স্বপ্নিল শহরখানি, নোংরা কাদার ছড়াছড়িতে সমাজের উঠান যে চলার অনুপযোগী হয়ে যাবে। আঁধার যে ফের কালো মেঘের ডানা পরে ভেসে আসতে শুরু করেছে, তমাশাছন্ন হতে শুরু করেছে চারিপাশ। আলোক মাড়িয়ে বিপদ্দশার এই অতি বৃদ্ধি যদি রোখা না যায়, তবে ঘরে ঘরে যে বিস্ফোটক ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে নোংরা অগ্নির ছোঁয়ায় তখন কে বাঁচাবে? এ কিনারায় সে কিনারায় আজ এতো লাশ যে ভেসে উঠেছে, কাল অবধি এরূপ চলতে থাকলে তো এ শুভ্র সমাজটি লাশের পচা গন্ধে দম আটকে তড়পে তড়পে মারা যাবে! হায়!

রুধে অশ্লীলতার দুয়ার চলো আগামীর পানে
সাদা-কালো, নীল পর্দা ছিড়ে নির্মলতার তালাশে।
কল্পিত সাম্রাজ্যের প্রাচীর ভেদে হও আগুয়ান
বাস্তবতার সমর পানে তুমি আগামীর জওয়ান।
সুদূরের সুগন্ধ বায়ু ভরে, যে ছুটে-
ডাহুকের ডাক শুনে কাঁদে সে দুখে।
প্রাত-প্রদোষকালে চলো দুলে কাছা তুলে
মায়া-মালার এ ডোর দাও টুটে ধূলার ধূলে।
কারীমের করুণা সদা থাকুক তোমার সাথে
রুধে অশ্লীলতার দুয়ার চলো আগামীর পানে।


* ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত।