তাক্বদীর নিয়ে কিছু কথা
সাঈদুর রহমান*



(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

একটি হাদীছে নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ «لَا يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتّى يُقَالَ هذَا خَلَقَ اللّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللهَ؟ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ امَنْتُ بِاللهِ وَرَسُوْلِه

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সব সময় মানুষ (বিভিন্ন ব্যাপারে) পরস্পর কথোপকথন করতে থাকে। পরিশেষে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছে যে, এসব তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? তাই যে ব্যক্তির মনে এ জাতীয় সংশয়-সন্দেহের উদয় হয়, সে যেন বলে উঠে, আমি আল্লাহর প্রতি ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।[1]

তাক্বদীর নিয়ে আমাদের অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত নয়; বরং আমাদের উচিত হলো আমলে অগ্রসর হওয়া। অনেকে একটি প্রশ্ন করে যে, তাক্বদীর যেহেতু নির্ধারিত, সেহেতু আমল করার কী প্রয়োজন? ছাহাবীরাও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একি ধরনের প্রশ্ন করেছিল, তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন,

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ اِلَّا وَقَدْ كُتِبَ مَقْعَدُه مِنْ الْجَنَّةِ» وَمَقْعَدُه مِنْ النَّارِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ! أَفَلَا نَتَّكِلُ عَلى كِتَابِنَا وَنَدَعُ الْعَمَلَ؟ قَالَ : اعْمَلُوْا فَكُلُّ مُّيَسَّرُ لِّمَا خُلِقَ لَه أَمَّا مَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ السَّعَادَةِ فَيُيَسَّرُ لِعَمَلِ السَّعَادَةِ وَأَمَّا مَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الشَّقَاوَةِ فَيُيَسَّرُونَ لِعَمَلِ الشَّقَاءِ ثُمَّ قَرَأَ : (فَأَمَّا مَنْ أَعْطى وَاتَّقى – وَصَدَّقَ بِالْحُسْنى)

‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার অবস্থান জান্নাতে কিংবা জাহান্নামে লিখে রাখেননি। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমরা কি আমাদের তাক্বদীরের লেখার উপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দিব না? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, (না, বরং) আমল করে যেতে থাকো। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান, তাকে আল্লাহ সৌভাগ্যের কাজ করার জন্য সহজ ব্যবস্থা করে দিবেন। আর সে ব্যক্তি দুর্ভাগা হবে, যার জন্য দুর্ভাগ্যের কাজ সহজ করে দেওয়া হবে’। অতঃপর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (কুরআনের এ আয়াতটি) পাঠ করলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে (সময় ও অর্থ) ব্যয় করেছে, আল্লাহকে ভয় করেছে, হক্ব কথাকে (দ্বীনকে) সমর্থন জানিয়েছে’ (আল-লায়ল, ৯২/৫-৬)[2]

তাক্বদীর অস্বীকারকারী দলসমূহ :

তাক্বদীর সম্পর্কে সঠিক বুঝ ও ধারণা না থাকার কারণে তিনটি দল পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। (১) ক্বাদারিয়া (২) মুরজিয়া ও (৩) জাবারিয়া। এই দলগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্নরূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে ক্বাদারিয়ারা নাস্তিকতার চাদরে আবৃত হয়েছে এবং মুরজিয়া ও জাবারিয়ারা বাউলবাদের চাদরে আবৃত হয়েছে। তাদের নিকট ভাগ্য বলতে কিছু নেই, বান্দা নিজের কাজ নিজেই করে, এতে আল্লাহর কোনো হাত নেই। গান-বাজনা, মদ, তামাক জুয়া প্রভৃতি অপকর্ম তাদের নিকট সবই বৈধ; হারাম বলতে তাদের নিকট কিছুই নেই। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে জোর গলায় নাস্তিক ও বাউলরা তাদের প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। আর এ কাজে বস্তুবাদী মতবাদে বিশ্বাসী একটি দল পেছন থেকে তাদের মদদ দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষ পড়ছে বিপাকে। এ দিকে বাউলরা বলছে, গান-বাজনা, মদ ও জুয়া বৈধ আর ঐ দিকে হুজুররা বলছে অবৈধ। এখন সাধারণ মানুষ যাবে কোন পথে? সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলবো, আপনারা একটু কুরআনের অর্থ ও হাদীছ পড়ুন, তাহলেই কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক, তা আপনাদের সামনে পরিস্ফুটিত হবে। কোনো মানুষের জাদুমাখা বা রসাত্মক কথায় প্রতারিত হবেন না; বরং নিজ জ্ঞান দিয়ে যাচাই-বাছাই করুন।

তাক্বদীর অস্বীকারকারীদের পরিণতি :

যারাই ইসলামের কোনো বিধানের বিরোধিতা বা অস্বীকার করবে, তাদের শেষ পরিণতি হবে মন্দ। ইসলামের বিরোধিতা করে কেউ টিকতে পারেনি, আর পারবেও না। যারা তাক্বদীর অস্বীকার করবে, তাদের পরিণতি কেমন হবে নিম্নের হাদীছগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য করুন। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন

,الْقَدَرِيَّةُ مَجُوسُ هذِهِ الْأُمَّةِ إِنْ مَرِضُوا فَلَا تَعُودُوهُمْ وَإِنْ مَاتُوا فَلَا تَشْهَدُوهُمْ

‘ক্বাদারিয়ারা হচ্ছে এ উম্মতের মাজূসী (অগ্নি পূজক)। তারা যদি অসুস্থ হয়, তাদেরকে দেখতে যাবে না আর যদি মারা যায়, তবে তাদের জানাযায় উপস্থিত হবে না’।[3]

দেখুন, এই হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কত কঠোর কথা বলেছেন। মানুষের জীবনের সর্বশেষ যে ছালাত (জানাযার ছালাত) সেটাতেও উপস্থিত হতে নিষেধ করেন। এত কোমল হৃদয়ের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কত কঠোর হয়ে গেলেন। বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, তাক্বদীর অস্বীকার করা কত মারাত্মক অপরাধ।

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُوْلُ يَكُونُ فِي أُمَّتِي خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَذلِكَ فِي الْمُكَذِّبِينَ بِالْقَدَرِ.

ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ‘আমার উম্মতের মধ্যেও ‘খাসফ’ (জমিন ধ্বসিয়ে বা অদৃশ্য করে দেওয়া) এবং ‘মাসখ’ (চেহারা বা আকার পরিবর্তন করে দেওয়ার) মতো শাস্তি হবে। তবে এ শাস্তি তাক্বদীরের প্রতি অবিশ্বাসকারীদের মধ্যেই হবে।[4] আল্লাহ তাআলা ইয়াহূদীদেরকে আকৃতি পরিবর্তন করে শাস্তি দিয়েছিলেন, কারণ তারা জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। এই উম্মতের মাঝেও আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে; আর এই শাস্তি আপতিত হবে তাক্বদীর অস্বীকারকারীদের উপর। আমরা এই ধরনের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আল্লাহ আকৃতি পরিবর্তন করবেন এর অর্থ দুটি হতে পারে। সত্যি সত্যিই আকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাবে অথবা মন-মানসিকতা ও মস্তিষ্ক পরিবর্তন হয়ে যাবে। আপনি কি দেখেন না যে, নাস্তিকরা ও বাউলরা কেমন গাঁজাখুরি কথাবার্তা বলে? নারী-পুরুষ একাকার হয়ে গানের তালে উন্মাদের মতো কীভাবে নাচে? মন-মানসিকতার যদি বিকৃতি না ঘটতো, তাহলে এমন কাজ কি কেউ করতে পারে?

وَعَن نَافِعٍ أَنَّ رَجُلًا أَتَى ابْنَ عُمَرَ فَقَالَ إِنَّ فُلَانًا يَقْرَأُ عَلَيْكَ السَّلَامَ فَقَالَ إِنَّه بَلَغَنِي أَنَّه قَدْ أَحْدَثَ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَحْدَثَ فَلَا تُقْرِئْهُ مِنِّي السَّلَامَ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُولُ يَكُونُ فِي أُمَّتِي أَوْ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ أَوْ مَسْخٌ أَوْ قَذْفٌ فِي أَهْلِ الْقَدَرِ.

নাফে‘ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, এক লোক ছাহাবী ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এসে বলল, অমুক লোক আপনাকে সালাম দিয়েছে। উত্তরে ইবনু উমার বললেন, আমি শুনেছি সে নাকি দ্বীনের মধ্যে নতুন মত তৈরি করেছে (অর্থাৎ তাক্বদীরের প্রতি অবিশ্বাস করেছে)। যদি প্রকৃতপক্ষে সে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করে থাকে, তাহলে আমার পক্ষ হতে তাকে কোনো সালাম পৌঁছাবে না। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমার উম্মতের অথবা এ উম্মতের মধ্যে জমিনে ধ্বসে যাওয়া, চেহারা বিকৃত রূপ ধারণ করা, শিলা পাথর বর্ষণের মতো আল্লাহর কঠিন আযাব পতিত হবে, তাদের উপর যারা তাক্বদীরের প্রতি অস্বীকারকারী হবে।[5]

আমরা জানি আকৃতি বিকৃতির মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল ইয়াহূদীদেরকে। কারণ তারা আল্লাহ তাআলার বিধানকে লঙ্ঘন করেছিল। এই উম্মতের মাঝেও এ ধরনের শাস্তি আপতিত হবে; আর এটা হবে তাক্বদীর অস্বীকার করার কারণে।

হে রাসূলের সৈনিক! সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখবে। শয়তান ঈমান নামক গুপ্তধন লুণ্ঠন করার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে। তোমার একটু উদাসিনতার সুযোগে ঈমান নামক পথ চলার জ্যোতি হরণ করে নিয়ে চলে যাবে। সাবধান হও! তুমি অগ্রসর হও সব বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। তোমাকে যে ঈমানী যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে; শয়তানের প্ররোচনায় প্রবঞ্চিত হলে চলবে না। মেঘের ঘনঘটা দেখে ভয় পাবে না; মনে রাখবে, প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ুতে মেঘের ঘনঘটা নিমিষেই দূরীভূত হয়ে যাবে। ঐ মানুষরূপী শয়তান, আর কতকাল ঘাতক হয়ে থাকবে? মানুষের ঈমান নিয়ে কেন ছিনিমিনি খেলছ? তোমার মৃত্যু তো সামনে অবধারিত। এখনও সময় আছে, বেলা ফুরাবার আগে গন্তব্যে চলে এসো, নচেৎ রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। কেউ তোমাদের নাম কোনো দিন উচ্চারণ করবে না। একটি আয়াত উল্লেখ করে লেখার যবনিকাপাত করছি,فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ‘যদি তারা তওবা করে, ছালাত আদায় করে ও যাকাত দেয়, তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই’ (আত-তওবা, ৯/১১)


 

* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪; মিশকাত, হা/৬৬।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৬২; তিরমিযী, হা/৩৩৪৪; মিশকাত, হা/৮৫।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৯১; জামেঊছ ছাগীর, হা/৭৮৯২; মিশকাত, হা/১০৭।

[4]. তিরমিযী, হা/২১৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৪০৬২; মিশকাত, হা/১০৬।

[5]. তিরমিযী, হা/২১৫২; ইবনু মাজাহ, হা/৪০৬১; মিশকাত, হা/১১৬।