তারাবীহর রাকআত সংখ্যা : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
-আহমাদুল্লাহ*



(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

দলীল-৯ : মুহাম্মাদ ইবনু কা‘ব আল-কুরাযী বলেছেন, লোকেরা উমার ইবনু খাত্ত্বাবের যামানায় রামাযানে ২০ রাকআত পড়তেন। তারা তাতে দীর্ঘ ক্বিরাআত করতেন এবং তিন রাকআত বিতর পড়তেন।

জবাব : এই রেওয়ায়াতটির সনদ নেই। সুতরাং এটি ভিত্তিহীন।

দলীল-১০ : ইয়াযীদ ইবনু খুছায়ফা বলেছেন, সায়েব ইবনু ইয়াযীদ বলেছেন, তারা উমার ইবনুল খাত্ত্বাবের যুগে রামাযান মাসে ২০ রাকআত পড়তেন। তিনি বলেছেন, তারা ছালাতে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরা পড়তেন। আর তারা তাদের লাঠির উপর ভর দিতেন উছমান ইবনু আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে ক্বিয়ামের (দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার) কষ্টের কারণে।[1]

জবাব : এই রেওয়ায়াতটি আলী ইবনুল জাদ-এর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থেও বিদ্যমান।[2] তা সত্ত্বেও খোদ আলী ইবনুল জাদ-এর উপর সমালোচনা আছে। উপরোল্লিখিত আলী ইবনুল জাদ উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোরভাবে সমালোচনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ তাআলা মুআবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আযাব দিলে আমার কাছে মোটেও খারাপ লাগবে না’।[3]

সতকীর্করণ : এই রেওয়ায়াতের মধ্যে ক্বিয়ামকারীদের পরিচয় অজ্ঞাত রয়েছে।

এই অজ্ঞাত লোকেরা যদি নিজেদের ঘরে নফল অনুধাবন করে ২০ রাকআত পড়ে থাকেন, তাহলে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে এর কী সম্পর্ক, যারা এ হাদীছ দিয়ে দলীল দেন তারা নিম্নোক্ত শর্তাবলী প্রমাণ করবেন :

(ক) ঐ লোকেদের নাম বলতে হবে, যারা ফারূক্বী যামানায় ২০ রাকআত পড়তেন। (খ) এটি প্রমাণ করতে হবে যে, তারা ২০ রাকআত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা অনুধাবন করে পড়তেন। (গ) প্রমাণ করতে হবে যে, তারা মসজিদে নববীতে জামাআতের সহিত এই রাকআতসমূহ পড়তেন। (ঘ) এটি প্রমাণ করুক যে, উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ বিষয়টি জানা ছিল। (ঙ) প্রমাণ করতে হবে, এই লোকেরা ২০ এর কম অথবা বেশি করা হারাম বা নাজায়েয অনুধাবন করতেন। (চ) প্রমাণ করতে হবে যে, ইমাম আবূ হানীফা এই আছার দ্বারা দলীল গ্রহণ করে এটি প্রমাণিত করেছেন যে, স্রেফ ২০ রাকআত তারাবীহই হলো জামাআতের সাথে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তার থেকে কম বা অধিক করা জায়েয নেই।

দলীল-১১ : সায়িব ইবনু ইয়াযীদ হতে বর্ণিতে আছে, আমরা উমারের যুগে ২০ রাকআত এবং বিতর পড়তাম।[4]

জবাব : এই বর্ণনাটি শায। খালেদ ইবনু মাখলাদের (শীআ) এই বর্ণনাটির বিপরীতে ইমাম সাঈদ ইবনু মানছূর-এর বর্ণনা আছে যে, সায়েব ইবনু ইয়াযীদ বলেছেন, আমরা উমার এর যুগে ১১ রাকআত পড়তাম।[5]

দলীল-১২ : আবূ আব্দির রহমান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রামাযানুল মুবারকে ক্বারীদেরকে আহ্বান করে তাদের মধ্য হতে একজনকে ২০ রাকআত পড়ানোর জন্য নির্দেশ দিলেন। আবূ আব্দির রহমান বলেন, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাদেরকে বিতরের ছালাত পড়াতেন।[6]

জবাব : এই বর্ণনার রাবী হাম্মাদ ইবনু শুআইবকে জমহূর মুহাদ্দিছ যঈফ বলেছেন। ইমাম বুখারী বলেছেন, তার মাঝে আপত্তিকর বস্তু রয়েছে।[7] অর্থাৎ তিনি মাতরূক রাবী।

দলীল-১৩ : আ‘মাশ বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ ২০ রাকআত তারাবীহ এবং ৩ রাকআত বিতর আদায় করতেন।[8]

জবাব : এই বর্ণনা কয়েকটি কারণে প্রত্যাখ্যাত। (ক) মারওয়াযীর মুখতাছার ক্বিয়ামুল লায়লের (পৃ. ২০০) এই বর্ণনা সনদবিহীন। (খ) এর রাবী ‘হাফছ ইবনু গিয়াছ মুদাল্লিস রাবী।[9] (গ) আ‘মাশও মুদাল্লিস রাবী।[10] (ঘ) ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর এক যুগ পর ৬১ হিজরীতে আ‘মাশ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং এই সনদটি মুনক্বাত্বি‘।

দলীল-১৪ : أَنْبَأَ أَبُوْ الْخُصَيبِ قَالَ : كَانَ يَؤُمُّنَا سُوَيْدُ بْنُ غَفَلَةَ فِي رَمَضَانَ فَيُصَلِّي خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ عِشْرِينَ رَكْعَةً আবুল খুছায়ব বলেছেন, সুওয়াইদ ইবনু গাফালা রামাযানে আমাদেরকে তারাবীহ পড়াতেন। তিনি ২০ রাকআত পড়াতেন পাঁচ তারবীহা সহকারে।[11]

জবাব : সুওয়াইদ ইবনু গাফালার (তাবেঈ) এই বর্ণনাটিতে এটি স্পষ্টভাবে বলা নেই যে, তিনি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা মনে করে ২০ রাকআত পড়তেন। সুতরাং এই আছারটি দেওবন্দী ও ব্রেলভীদের দাবির পক্ষে দলীল নয়।

দলীল-১৫ : عَنْ أَبِي الْبَخْتَرِيِّ: أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ আবুল বাখতারী হতে বর্ণিত, তিনি রামাযানে পাঁচ তারবীহা (এখানে ২০ রাকআত তারাবীহ উদ্দেশ্য) এবং ৩ রাকআত বিতর পড়তেন।[12]

জবাব : এই বর্ণনাটির উপর দুটি আলোচনা রয়েছে। (ক) রবী ও খালাফের নির্দিষ্টতা প্রতীয়মান নয়। সুতরাং এই সনদটি যঈফ। (খ) এই বর্ণনায় এর স্পষ্ট বিবরণ নেই যে, আবুল বাখতারী সাঈদ ইবনু ফায়রূয আত-তাঈ এই ২০ রাকআত তারাবীহকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা মনে করে আদায় করার প্রবক্তা ও আমলকারী ছিলেন। সুতরাং দলীল ও দাবির মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই।

দলীল-১৬ : عَنْ شُتَيْرِ بْنِ شَكَلٍ : أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ আব্দুল্লাহ ইবনু ক্বায়েস বর্ণনা করেছেন, শুতায়র ইবনু শাকাল রামাযানে ২০ রাকআত এবং বিতর পড়তেন।[13]

জবাব : এই বর্ণনাটি দুটি কারণে যঈফ। (ক) সুফিয়ান ছাওরী মুদাল্লিস রাবী। আর এই বর্ণনাটি মুআনআন। (খ) আবূ ইসহাক্ব আস-সাবীঈ মুদাল্লিস রাবী। আর এই বর্ণনাটি মুআনআন।

দলীল-১৭ : عَنِ الْحَارِثِ أَنَّهُ كَانَ يَؤُمُّ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ بِاللَّيْلِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ وَيَقْنُتُ قَبْلَ الرُّكُوعِ হারেছ রামাযানে রাতের বেলায় লোকদের নিয়ে ২০ রাকআত পড়াতেন এবং তিনি রুকূর আগে কুনূত পাঠ করতেন।[14]

জবাব : এই আছারটি কয়েকটি কারণে প্রত্যাখ্যাত। যথা- (ক) আবূ ইসহাক্ব আস-সাবীঈ মুদাল্লিস। আর এই বর্ণনাটি মুআনআন। (খ) হাজ্জাজ ইবনু আরত্বা যঈফ মুদাল্লিস রাবী। আর এই বর্ণনাটি মুআনআন। (গ) আবূ মুআবিয়া আয-যরীর মুদাল্লিস রাবী। আর এই বর্ণনাটি মুআনআন। (ঘ) হারেছ আওয়ার কাযযাব ও সমালোচিত রাবী। ইমাম শা‘বী (তাবেঈ) বলেছেন, আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি অন্যতম একজন কাযযাব রাবী।[15] আবূ খায়ছামা বলেছেন, হারেছ আওয়ার কাযযাব রাবী।[16]

দলীল-১৮ : عَنْ إِبْرَاهِيمَ، أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ ইবরাহীম নাখাঈ লোকদেরকে নিয়ে রামাযানে পাঁচ তারবীহা পড়তেন।[17]

জবাব : এই বর্ণনাটি কতিপয় কারণে প্রত্যাখ্যাত- (ক) ইউসুফ ইবনু আবূ ইউসুফ আল-ক্বযীর তাওছীক প্রতীয়মান নয়। (খ) হাম্মাদ ইবনু আবী সুলায়মান মুখতালিত রাবী। হাফেয হায়ছামী লিখেছেন, ‘হাম্মাদের স্রেফ ঐ বর্ণনাই গ্রহণযোগ্য হয়, যা তার পুরাতন ছাত্ররা— শুবা, সুফিয়ান ছাওরী এবং হিশাম দাসতাওয়াঈ বর্ণনা করেছেন। এই তিনজন ব্যতীত অন্যরা তার ইখতিলাতের পর তার থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন’।[18] (গ) হাম্মাদ ইবনু আবী সুলায়মান মুদাল্লিস রাবী।[19] আর এই বর্ণনাটি মুআনআন। (ঘ) কিতাবুল আছার গ্রন্থটি আবূ ইউসুফ হতে প্রমাণিত নেই। (ঙ) এতে ২০ রাকআতের সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হওয়ার স্পষ্ট বিবরণ নেই। সুতরাং ২০ রাকাতের দাবিদারদের দাবি ও দলীলের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য নেই।

দলীল-১৯ : عَنْ عَطَاءٍ، قَالَ: أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يُصَلُّونَ ثَلَاثًا وَعِشْرِينَ رَكْعَةً بِالْوِتْرِ আতা ইবনু আবী রবাহ বলেছেন, আমি লোকদেরকে ২০ রাকআত তারাবীহ এবং বিতর পড়তে দেখেছি।[20]

জবাব : এই আছার সম্পর্কে কতিপয় বিষয় লক্ষণীয়। (ক) এখানে দাবি ও দলীলেন মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। কেননা এই আছারে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হওয়ার সুস্পষ্ট বিবরণ নেই। (খ) ‘লোকদেরকে’-এর কোনো স্পষ্ট আলোচনা নেই যে তারা কারা? আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, তিনটি বস্তুকে লোকেরা ত্যাগ করেছে। যার মধ্যে তৃতীয় বস্তু এই যে, নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকবীর বলে সিজদা করতেন এবং তাকবীর বলে সিজদা হতে মাথা উঠাতেন।[21] এখানে ‘লোকেরা’-দ্বারা কি ছাহাবীগণ এবং তাবেঈদেরকে উদ্দেশ্য করা যাবে এবং তাকবীর ব্যতীত সিজদা করা যাবে? আর একে কি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা মনে করা যাবে?

দলীল-২০ : নাফে‘ বলেছেন, ‘ইবনু আবী মুলায়কা আমাদের সাথে নিয়ে রামাযানে ২০ রাকআত তারাবীহ পড়াতেন’।[22]

জবাব : দেওবন্দীদের দাবি ‘২০ রাকআত হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’-এর সাথে এর কোনো সামঞ্জস্যতা নেই। কেননা এতে এটা লিখিত নেই যে, ইবনু আবী মুলায়কা ২০ রাকআতকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা মনে করে পড়তেন।

৮ রাকআত তারাবীহ ও হানাফী আলেম : এখন এই প্রবন্ধে হানাফী তাকলীদীর বরাত পেশ করা হচ্ছে, যেগুলোর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই লোকদের নিকটেও ৮ রাকআত তারাবীহ হলো সুন্নাত। যথা- (১) ইবনু হুমাম হানাফী (মৃ. ৮৬১ হি.) লিখেছেন, আলোচনার সারকথা এই যে, ক্বিয়ামে রামাযান (তারাবীহ) ১১ রাকআত বিতরসহ, জামাআতের সাথে আদায় করা সুন্নাত।[23] (২) সাইয়্যেদ ত্বাহত্বাবী হানাফী (মৃ. ১২৩৩ হি.) বলেছেন, কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ২০ রাকআত পড়েননি। বরং তিনি ৮ রাকআত ছালাত আদায় করেছেন।[24] (৩) ইবনু নুজাইম মিছরী (মৃ. ৯৫০ হি.) ইবনু হুমাম হানাফী হতে সত্যায়নসহ বর্ণনা করেছেন যে, অতএব এভাবে আমাদের শায়খদের উছূল মোতাবেক ৮ রাকআত তারাবীহ মাসনূন এবং ১২ রাকআত তারাবীহ মুসতাহাব হয়ে যায়।[25] (৪) মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (মৃ. ১০১৪ হি.) বলেছেন, এইসবের সারকথা এই যে, ক্বিয়ামে রামাযান ১১ রাকআত বিতরসহ জামাআতে আদায় করা সুন্নাত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আমল এটাই ছিল।[26] (৫) দেওবন্দীদের মানযূর মুহাম্মাদ আহসান নানূতূবী (মৃ. ১৩১২ হি.) বলেছেন, কেননা নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ২০ রাকআত পড়েননি; বরং তিনি ৮ রাকআত পড়েছেন।[27] (৬) দেওবন্দীদের নয়নমণি আব্দুশ শাকূর লাখনভী (মৃ. ১৩৮১ হি.) লিখেছেন, যদিও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে ৮ রাকআত তারাবীহ মাসনূন বর্ণিত আছে; আর একটি যঈফ হাদীছে ইবনু আব্বাস হতে ২০ রাকআতও আছে। কিন্তু…।[28] (৭) দেওবন্দীদের নয়নমণি আব্দুল হাই লাখনভী (মৃ. ১৩০৪ হি.) লিখেছেন, তিনি তারাবীহকে দুইভাবে আদায় করেছেন। (ক) ২০ রাকআত তারাবীহ জামাআতের সাথে। …কিন্তু এই বর্ণনার সনদটি যঈফ…। (খ) ৮ রাকআত এবং ৩ রাকআত বিতর জামাআতের সাথে…।[29] (৮) খলীল আহমাদ সাহারানপূরী দেওবন্দী (মৃ. ১৩৪৫ হি.) লিখেছেন, অবশ্য কতিপয় আলেম যেমন ইবনু হুমাম ৮ রাকআতকে সুন্নাত এবং অতিরিক্ত রাকআতকে মুসতাহাব লিখেছেন। তাদের এই বক্তব্য সমালোনাযোগ্য নয়।[30] খলীল আহমাদ সাহারানপূরী আরো লিখেছেন, আর ৮ রাকআত তারাবীহর সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হওয়া ঐকমত্যপ্রাপ্ত। যদি মতানৈক্য থাকে, তাহলে ১২ রাকআতের ক্ষেত্রে রয়েছে।[31] (৯) আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী দেওবন্দী (মৃ. ১৩৫২ হি.) বলেছেন, আর একে স্বীকার না করে কোনো উপায় নেই যে, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তারাবীহ ছিল ৮ রাকআত। আর কোনো একটি বর্ণনাতেও এটা প্রমাণিত নেই যে, নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযানে তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ আলাদাভাবে আদায় করেছেন…। রইল ২০ রাকআতের বিষয়টি, তো তার থেকে ৮ রাকআত তারাবীহই প্রমাণিত আছে। আর ২০ রাকআতের হাদীছটি নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে যঈফ সনদে বর্ণিত। আর এর যঈফ হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে।[32] (১০) তারাবীহ ছালাত সম্পর্কে হাসান ইবনু উমারাহ ইবনু আলী আশ-শুরুনবুলালী হানাফী (মৃ. ১০৬৯ হি.) বলেছেন, (আর একে জামাআত সহকারে আদায় করা সুন্নাতে কেফায়াহ) কেননা এটা প্রমাণিত আছে যে, নবী কারীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামাআতের সাথে ১১ রাকআত বিতরসহ আদায় করেছেন।[33]

তারাবীহ ২০ রাকআত হওয়ার উপর ছাহাবায়ে কেরামের ইজমার দাবি কতটুকু সত্য : (১) ইবনু কুদামা বলেন, ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) ইয়াযীদ ইবনু হারূন হতে বর্ণনা করেছেন, উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যামানায় লোকেরা ২৩ রাকআত পড়তেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, তিনি একজন ব্যক্তিকে হুকুম দিয়েছিলেন, সে যেন লোকদের নিয়ে রামাযানে ২০ রাকআত পড়ায়। আর এটা ইজমার অনুরূপ।

জবাব : ইবনু কুদামার দাবির ভিত্তি দুটি বর্ণনার উপর- (ক) ইয়াযীদ ইবনু রূমানের বর্ণনা, যাকে আইনী হানাফী মুনক্বাত্বি‘ বলেছেন। (খ) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ হতে যা সনদের দৃষ্টিকোণ হতে যঈফ। এই দুটি যঈফ বর্ণনার কারণে ইবনু কুদামা ইজমার অনুরূপ লিখে দিয়েছেন।

(২) কাসতালানী শাফেঈ বলেছেন, উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে যা হত (২০ রাকআত তারাবীহ), তাকে ফক্বীহগণ ইজমার ন্যায় মনে করেছেন। 

জবাব : ইজমার এই দাবি কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাখ্যাত- (ক) এই দাবির ভিত্তি যঈফ ও প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাসমূহের উপর। যেমনটা ইবনু কুদামার উক্তির ব্যাখ্যায় গত হয়েছে। (২) উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে ১১ রাকআত ছহীহ সনদের সাথে প্রমাণিত আছে।[34]

২০ রাকআত তারাবীহর উপর ইজমার দাবি বাতিল : এখন আপনার খেদমতে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করা হলো। যেগুলোর প্রত্যেকটির আলোকে উক্ত ইজমার দাবি বাতিল হয়।

(১) ইমাম মালেক (মৃ. ১৭৯ হি.) বলেছেন, আমি আমার জন্য ১১ রাকআতকে পছন্দ করেছি। এর উপরই উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)- লোকদেরকে একত্র করেছিলেন এবং এটাই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছালাত ছিল।[35] ইমাম চতুষ্টয় হতে একজন থেকেও এটা প্রমাণিত নেই যে, ২০ রাকআত তারাবীহ হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং এর উপর ইজমা হয়েছে। (২) ইমাম কুরতুবী (মৃ. ৬৫৬ হি.) বলেছেন, তারাবীহর সংখ্যায় আলেমদের ইখতিলাফ রয়েছে। অধিকাংশ আলেম এটা বলেন যে, ১১ রাকআত হাদীছে রয়েছে। তারা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর পূর্বের হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহন করেছেন।[36] (৩) আইনী হানাফী (মৃ. ৭৫৫ হি.) বলেছেন, তারাবীহর মুসতাহাব সংখ্যা নিয়ে আলেমগণ ইখতিলাফ করেছেন। তারা অনেক কথাই বলেছেন। আর বলা হয় যে, তারাবীহ হলো ১১ রাকআত।[37] (৪) আল্লামা সুয়ূত্বী (মৃ. ৯১১ হি.) বলেছেন, তারাবীহ সম্পর্কে আলেমগণ মতানৈক্য করেছেন।[38] (৫) ইবনু হুমাম (মৃ. ৬৮১ হি.) বলেছেন, এই সকল আলোচনা হতে এই সারকথা বের হয়ে আসল যে, বিতরের সাথে তারাবীহ ১১ রাকআত রয়েছে। একে নবী কারীম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) জামাআতের সাথে পড়েছেন।[39] (৬) ইমাম তিরমিযী বলেছেন, আলেমগণ ক্বিয়ামে রামাযান সম্পর্কে মতানৈক্য করেছেন।[40]

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো, তারাবীহ হলো ৮ রাকআত। একে ২০ রাকাতের মধ্যে খাছ করা সুন্নাত বহির্ভূত কাজ। এ থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হুবহু অনুসরণই আমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারে। এ ব্যতীত বাঁচার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ আমদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, হা/৪২৮৮।

[2]. আলী ইবনুল জাদ, মুসনাদ, হা/২৮২৫।

[3]. তাহযীবুত তাহযীব, ৭/২৫৭।

[4]. মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/৫৪০৯; নবীজীর নামায পৃ. ৪০৮।

[5]. আল-হাবী লিল ফাতাওয়া, ১/৩৪৯; হাশিয়া আছারুস সুনান, পৃ. ২৫০।

[6]. বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, হা/৪২৯১।

[7]. আত-তারীখুল কাবীর, ৩/২৫।

[8]. মারওয়াযী, মুখতাছার ক্বিয়ামুল লায়ল, পৃ. ১৫৬।

[9]. তবাকাতে ইবনু সা‘দ, ৬/৩৯০।

[10]. আত-তালখীছুল হাবীর, হা/১১৮১।

[11]. বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, হা/৪২৯০।

[12]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮৬।

[13]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮০।

[14]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮৫।

[15]. আল-জারহু ওয়াত তা‘দীল, ৩/৭৮, সনদ ছহীহ।

[16]. আল-জারহু ওয়াত তা‘দীল, ৩/৭৯, সনদ ছহীহ।

[17]. আবূ ইউসুফ, কিতাবুল আছার, হা/২১১।

[18]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১১/১১৯, ১২০।

[19]. তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন, ২/৪৫।

[20]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮৮।

[21]. সুনানে নাসাঈ, হা/৮৮৪, ২/১২৪, সনদ ছহীহ।

[22]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮৩।

[23]. ফাতহুল ক্বাদীর শরহে হেদায়া, ১/৪০৭, ‘নফল ছালাত’ অনুচ্ছেদ।

[24]. হাশিয়া ত্বাহত্বাবী আলাদ দুররিল মুখতার, ১/২৯৫।

[25]. আল-বাহরুর রায়েক্ব, ২/৬৭।

[26]. মিরক্বাতুল মাফাতীহ, হা/১৩০৩, ৩/৩৮২।

[27]. হাশিয়া কানযুদ দাক্বায়েক্ব, পৃ. ৩৬-এর টীকা : ৪ দ্রষ্টব্য।

[28]. ইলমুল ফিক্বহ, পৃ. ১৯৮-এর টীকা দ্রষ্টব্য।

[29]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া আব্দুল হাই, ১/৩৩১, ৩৩২।

[30]. বারাহীনে ক্বাতেআহ, পৃ. ৮।

[31]. বারাহীনে ক্বাতেআহ, পৃ. ১৯৫।

[32]. আল-আরফুশ শাযী, ১/১৬৬।

[33]. মারাক্বিল ফালাহ শরহে নূরুল ঈযাহ, পৃ. ৯৮।

[34]. আছারুস সুনান, হা/৭৭৬, সনদ ছহীহ।

[35]. ইবনু মুগীস মালেকী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, পৃ. ৮৯০।

[36]. আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীসি কিতাবি মুসলিম, ২/৩৮৯, ৩৯০।

[37]. উমদাতুল ক্বারী, ১১/১২৬, ১২৭।

[38]. আল-হাবী লিল ফাতাওয়া, ১/৩৪৮।

[39]. ফাতহুল ক্বাদীর শরহে হেদায়া, ১/৪০৭।

[40]. তিরমিযী, হা/৮০৬।