তারাবীহর রাকআত সংখ্যা : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
-আহমাদুল্লাহ*


ভূমিকা : রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأَبُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَإِنَّ قِيَامَ اللَّيْلِ قُرْبَةٌ إِلَى اللَّهِ، وَمَنْهَاةٌ عَنْ الإِثْمِ

‘ক্বিয়ামুল লায়লকে আবশ্যিকভাবে আঁকড়ে ধরো। কেননা তোমাদের পূর্বের সৎ বান্দাদের এটাই ত্বরীক্বা ছিল। আর এটা আল্লাহর নৈকট্য, গুনাহের কাফফারা ও গুনাহসমূহ থেকে হেফাযতে থাকার উপায়’।[1] এই ছালাতই যখন রামাযান মাসে আদায় করা হয়, তখন ক্বিয়ামে রামাযান ও সাধারণ লোকদের নিকটে তারাবীহ বলা হয়।

এত গুরুত্বপূর্ণ ছালাতটির রাকআত সংখ্যা কত? তারাবীহর ছালাত ৮ রাকআত। এ ব্যপারে ছাহাবীদের মধ্যে কোনো বিভেদ ছিল না। তার কয়েকটি দলীল নিম্নরূপ :

দলীল-১ : উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যেদা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  হতে বর্ণিত আছে,

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي فِيمَا بَيْنَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاةِ الْعِشَاءِ وَهِيَ الَّتِي يَدْعُو النَّاسُ الْعَتَمَةَ إِلَى الْفَجْرِ، إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُسَلِّمُ بَيْنَ كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَيُوتِرُ بِوَاحِدَةٍ

‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আতামাহ’ বা এশার ছালাত হতে অবসর হওয়ার পর ফজর পর্যন্ত ১১ রাকআত পড়তেন। তিনি প্রত্যেক দুই রাকআতে সালাম ফেরাতেন এবং ১ রাকআত বিতর পড়তেন’।[2]

দলীল-২ : আবূ সালামাহ ইবনু আব্দুর রহমান উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যেদা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) -কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রামাযানের মধ্যে (রাতের) ছালাত (তারাবীহ) কেমন হত? তখন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  বললেন, مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً ‘রামাযান হোক বা রামাযানের বাইরে হোক রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ১১ রাকআতের অধিক পড়তেন না’।[3]

প্রশ্ন : এই হাদীছটির সাথে তাহাজ্জুদের কী সম্পর্ক? জবাব : তাহাজ্জুদ, তারাবীহ, ক্বিয়ামুল লায়ল, ক্বিয়ামে রামাযান একই ছালাতের ভিন্ন ভিন্ন নাম। কেননা নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ আলাদা আলাদা আদায় করা একেবারেই প্রমাণিত নেই। মুহাদ্দিছ ইমামগণ ও অন্য আলেমগণ আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) -এর হাদীছের উপর ‘ক্বিয়ামে রামাযান’ ও ‘তারাবীহ’-এর অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন। যেমন- (১) ছহীহ বুখারী, কিতাবুছ ছওম (ছওম পর্ব), কিতাবু ছালাতিত তারাবীহ (তারাবীহর অনুচ্ছেদ), ক্বিয়ামে রামাযানের ফযীলত পরিচ্ছেদ। (২) মুওয়াত্ত্বা মুহাম্মাদ ইবনিল হাসান আশ-শায়বানী (পৃ. ১৪১, ‘ক্বিয়ামে রামাযান ও এর ফযীলত’ অনুচ্ছেদ)। আব্দুল হাই লাখনভী (রাহিমাহুল্লাহ) এর উপর টীকা লিখেছেন, قوله: شهر رمضان، ويسمّى التراويح ‘ক্বিয়ামে রামাযানকে তারাবীহ নামে নামকরণ করা হয়েছে’। (৩) বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরায় (২/৪৯৫, ৪৯৬) আছে, بَابُ مَا رُوِيَ فِي عَدَدِ رَكَعَاتِ الْقِيَامِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ ‘রামাযান মাসের ক্বিয়ামে রাকআত সংখ্যা সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে’ অনুচ্ছেদ।

পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে কোনো একজন মুহাদ্দিছ বা ফক্বীহ এটা বলেননি যে, এই হাদীছের সম্পর্ক তারাবীহর ছালাতের সাথে নেই। এই হাদীছটিকে অসংখ্য আলেম ২০ রাকআত সম্বলিত বানোয়াট ও মুনকার হাদীছের মোকাবেলায় বিপক্ষীয় দলীল হিসাবে পেশ করেছেন। যেমন- (১) আল্লামা যায়লাঈ হানাফী,[4] (২) হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী,[5] (৩) আল্লামা ইবনু হুমাম হানাফী,[6] (৪) আল্লামা আইনী হানাফী,[7] (৫) আল্লামা সুয়ূত্বী[8](রাহিমাহুল্লাহ)।

প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন স্রেফ ক্বিয়ামে রামাযান সম্পর্কিত ছিল, যাকে তারাবীহ বলে। তাহাজ্জুদ ছালাত সম্পর্কে প্রশ্নকর্তা প্রশ্নই করেননি। কিন্তু উম্মুল মুমিনীন আয়েশা ছিদ্দীক্বা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  জবাবের মধ্যে প্রশ্নের চাইতে অধিক ব্যাখ্যা দিয়ে দিলেন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রামাযানের ক্বিয়াম ও রামাযান ব্যতীত ক্বিয়াম সম্পর্কে। সুতরাং এই হাদীছ থেকে ১১ রাকআত তারাবীহর প্রমাণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

দলীল-৩ : জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, আমাদেরকে নিয়ে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসে ৮ রাকআত ও ১ রাকআত বিতর পড়িয়েছেন।[9]

দলীল-৪ : উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, আমি রামাযানের মধ্যে ৮ রাকআত ও বিতর পড়েছি। আর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললাম, তো তিনি কিছুই বললেন না। فكانت سنة الرضا ‘অতএব এটা সন্তুষ্টিমূলক সুন্নাত হয়ে গেল’।[10] আল্লামা হায়ছামী এই হাদীছ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এর সনদটি হাসান’।[11]

দলীল-৫ : আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উবাই ইবনু কা‘ব এবং তামীম আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে হুকুম দিয়েছিলেন যে, লোকদেরকে (রামাযানে রাতের সময়) ১১ রাকআত পড়াবে।[12]

খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ

‘তোমাদের মধ্য হতে যে এই ইখতিলাফ পাবে, তার উপর আবশ্যক যে, সে আমার সুন্নাত ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে অবশ্যই আঁকড়ে ধরবে’।[13]

দলীল-১ : আস-সায়েব ইবনু ইয়াযীদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, كُنَّا نَقُومُ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً ‘আমরা (ছাহাবীগণ) উমার ইবনু খাত্ত্বাবের যুগে ১১ রাকআত পড়তাম’।[14]

জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (মৃ. ৯১১ হি.) এই রেওয়ায়েত সম্পর্কে লিখেছেন, وَفِي مُصَنَّفِ سَعِيدِ بْنِ مَنْصُورٍ بِسَنَدٍ فِي غَايَةِ الصِّحَّة ‘এটা (১১ রাকআতের বর্ণনাটি) মুছান্নাফ সাঈদ ইবনু মানছূরের মধ্যে অত্যন্ত ছহীহ সনদের সাথে রয়েছে’।[15]

দলীল-২ : أَنَّ عُمَرَ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَيٍّ وَتَمِيمٍ فَكَانَا يُصَلِّيَانِ إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً ‘নিশ্চয়ই উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) লোকদেরকে উবাই (ইবনু কা‘ব ও তামীম আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর ইমামতিতে একত্র করেছেন। তারা উভয়ই ১১ রাকআত পড়াতেন’।[16]

এই বর্ণনাটির সনদ ছহীহ। এর সকল রাবী ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের রাবী এবং ইজমা অনুপাতে আস্থাভাজন।

২০ রাকআত তারাবীহর হাদীছগুলো এক নযরে : নিচে কয়েকটি হাদীছ পর্যালোচনাসহ তুলে ধরা হলো-

দলীল-১ :

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসে ২০ রাকআত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন।[17]

জবাব : এই রেওয়ায়াত সম্পর্কে আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী দেওবন্দী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, بِسَنَدٍ ضَعِيْفٍ وَعَلى ضَعْفِهِ اِتِّفَاقٌ ‘এটি যঈফ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর এর যঈফ হওয়ার উপর ঐকমত্য আছে’।[18]

দলীল-২ :

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ خَرَجَ النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ فَصَلَّى النَّاسُّ أَرْبَعَةً وَعِشْرِينَ رَكْعَةً وَأَوْتَرَ بِثَلاثَة

‘জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রামাযানে কোনো একদিন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হলেন। তিনি লোকদেরকে ২০ রাকআত এবং ৩ রাকআত বিতর পড়ালেন’।[19]

জবাব : এটি জাল হাদীছ। এর একজন রাবী মুহাম্মাদ ইবনু হুমায়েদ সম্পর্কে দেওবন্দী আলেম খান বাদশাহ লিখেছেন, ‘ইনি হলেন মহা মিথ্যুক ও মুনকারুল হাদীছ’।[20] এর অপর রাবী উমার ইবনু হারূনও সমালোচিত।[21] অবশিষ্ট সনদেও আপত্তি আছে।

দলীল-৩ : আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল ক্বারী হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রামাযানের এক রাতে উমার ইবনুল খাত্ত্বাবের সাথে একটি মসজিদের পানে বের হলাম। লোকেরা এলোমেলাভাবে (বিভিন্ন) জামাআতে বিভক্ত। কেউ একাকী ছালাত আদায় করছে। আবার কোনো ব্যক্তি ছালাত আদায় করছে এবং (তার ইক্তিদা করে) একদল লোক ছালাত আদায় করছে। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে একত্রিত করে দেই, তবে তা উত্তম হবে। অতঃপর তিনি দৃঢ় (প্রতিজ্ঞ) হলেন। এরপর তিনি উবাই ইবনু কা‘ব এর উপরে সকলকে জমা করে দিলেন। অতঃপর অন্য আরেকটি রাতে আমি তার সাথে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ক্বারীর (ইমামের) সাথে ছালাত আদায় করছিল। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, কতই না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা। লোকেরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাকে তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম, যে অংশে তারা ক্বিয়াম করে। (এর দ্বারা) তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন। আর লোকেরা রাতের প্রথমভাগে ছালাত আদায় করত।

জবাব : এই হাদীছটি ছহীহ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর দ্বারা হানাফীদের ২০ রাকআতের দলীল প্রমাণিত হয় না। উল্লেখ্য, এ হাদীছ থেকে পাঁচটি মাসআলা প্রমাণিত হয়। যথা- (ক) তারাবীহর জামাআত জায়েয ও উত্তম। (খ) এতে রাকআতের সংখ্যা উল্লেখ নেই। (গ) তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই ছালাত।[22] (ঘ) এই বিদআত দ্বারা আভিধানিক বিদআত উদ্দেশ্য, পারিভাষিক নয়। (ঙ) এই হাদীছটি ছহীহ বুখারীর ‘কিতাবু ছলাতিত তারাবীহ’-এর মধ্যে রয়েছে।[23]

দলীল-৪ : উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই উমার ইবনু খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে আদেশ করেছিলেন, রামাযানের রাতে ছালাত পড়াতে। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই লোকেরা দিনে ছওম রাখে। কিন্তু তারা উত্তমভাবে ক্বিরাআত পারে না। তুমি যদি রাতে তাদের সামনে কুরআন পড়তে। তিনি (উবাই ইবনু কা‘ব) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ বিষয়টি তো পূর্বে ছিল না। তিনি বললেন, আমি জানি। কিন্তু এটি উত্তম। এরপর তিনি তাদেরকে নিয়ে ২০ রাকআত পড়লেন।

জবাব : এই রেওয়ায়াতটির সনদ মাক্বদেসীর ‘আল-মুখতারাহ’ গ্রন্থে পাওয়া যায়।[24] এটা যঈফ। হাফেয ইবনু হিব্বান বলেছেন, ‘আবূ জা‘ফর আর-রাযীর রবী ইবনু আনাস থেকে রেওয়ায়াত করায় অসংখ্য ইযত্বিরাব সংঘটিত হয়েছে’।[25]

দলীল-৫ :

عَنِ الْحَسَنِ أَنَّ عُمَرَ بْن الْخَطَّابِ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ فِي قِيَامِ رَمَضَانَ فَكَانَ يُصَلِّيْ بِهِمْ عِشْرِيْنَ رَكْعَةً

‘হাসান হতে বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর লোকদেরকে রামাযানের ক্বিয়ামে একত্র করেছিলেন। তিনি তাদেরকে নিয়ে ২০ রাকআত পড়েছিলেন।

জবাব : এই রেওয়ায়াতটি মুনক্বাত্বি‘ হওয়ার কারণে যঈফ। হানাফী ইমাম আইনী বলেছেন, ‘এই রেওয়ায়াতের মধ্যে ইনক্বিত্বা আছে। কেননা হাসান (বাছরী) উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে পাননি’।[26]

দলীল-৬ :

عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ أَمَرَ رَجُلًا يُصَلِّي بِهِمْ عِشْرِينَ رَكْعَةً

‘ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ হতে বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একজন ব্যক্তিকে হুকুম দিয়েছিলেন যে, সে যেন লোকদেরকে ২০ রাকআত পড়ায়।

জবাব : এই হাদীছ সম্পর্কে নিমাবী (হানাফী) লিখেছেন, ‘ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আনছারী উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)কে পাননি’।[27] ইমাম ইবনু হাযম বলেছেন, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ সাইয়্যেদুনা উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর ২৫ বছর পর জন্মগ্রহণ করেছেন।[28]

দলীল-৭ :

عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ رُفَيْعٍ قَالَ: كَانَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ يُصَلِّي بِالنَّاسِ فِي رَمَضَانَ بِالْمَدِينَةِ عِشْرِينَ رَكْعَةً، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ

আব্দুল আযীয ইবনু রুফাঈ হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মদীনাতে রামাযানে লোকদেরকে নিয়ে ২০ রাকআত এবং ৩ রাকআত বিতর পড়তেন।[29]

জবাব : এই রেওয়ায়াত সম্পর্কে নিমাবী সাহেব লিখেছেন, আব্দুল আযীয ইবনু রুফাঈ উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)কে পাননি।[30] অর্থাৎ এই রেওয়ায়াতটি মুনক্বাত্বি‘। আর মুনক্বাত্বি‘ বর্ণনা আলেমদের ঐকমত্যানুসারে যঈফ।[31]

দলীল-৮ :

عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ؛ أَنَّهُ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، فِي رَمَضَانَ، بِثَلاَثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَة

‘ইয়াযীদ ইবনু রূমান হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রামাযানে উমারের যামানায় লোকেরা ২৩ রাকআত পড়তেন।

জবাব : এই রেওয়ায়াতটিও মুনক্বাত্বি‘।[32]

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. কিতাবু ফাযলি ক্বিয়ামিল লায়ল ওয়াত-তাহাজ্জুদ, হা/৪, সনদ হাসান; সুনানে তিরমিযী, হা/৩৫৪৯।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৩৪।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৩; উমদাতুল ক্বারী, ১১/১২৮।

[4]. যায়লাঈ হানাফী, নাছবুর রায়, ২/১৫৩।

[5]. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, আদ-দিরায়াহ, ১/২০৩।

[6]. ইবনু হুমাম হানাফী, ফাতহুল ক্বাদীর (প্রকাশনায় : দারুল ফিকর), ১/৪৬৭।

[7]. আল্লামা আইনী হানাফী, উমদাতুল ক্বারী, ১১/১২৮।

[8]. আল্লামা সুয়ূত্বী, আল-হাবী লিল ফাতাওয়া, ১/৩৪৮।

[9]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/১০৭০।

[10]. মুসনাদু আবী ইয়া‘লা, হা/১৮০১।

[11]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ২/৭৪।

[12]. মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, হা/২৪৯।

[13]. তিরমিযী, হা/২৬৭৬।

[14]. হাশিয়া আছারুস সুনান, পৃ. ২৫০।

[15]. সুয়ূত্বী, আল-মাছাবীহ ফী ছালাতিত তারাবীহ, পৃ. ১৫; আল-হাবী লিল ফাতাওয়া, ১/৩৫০।

[16]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৭০।

[17]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৯২।

[18]. আল-আরফুশ শাযী, ১/১৬৬।

[19]. তারীখে ইবনু জুরজান, হা/৫৫৬।

[20]. আল-ক্বওলুল মুবীন ফী ইছবাতিত তারাবীহ আল-ইশরীন ওয়ার রাদ্দু আলাল আলবানী আল-মিসকীন, পৃ. ৩৩৪।

[21]. নাসবুর রায়াহ, ১/৩৫১, ৩৫৫, ৪/২৭৩।

[22]. বিস্তারিত দেখুন : ফায়যুল বারী, ২/৪২০।

[23]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১০।

[24]. আল-মুখতারাহ, হা/১১৬১।

[25]. আছ-ছিক্বাত, ৪/২২৮; আনওয়ারুছ ছাহীফা ফিল আহাদীছিয যঈফা, আবূ দাঊদ, হা/১১৮২।

[26]. শরহে সুনান আবূ দাঊদ, ৫/৩৪৩।

[27]. আছারুস সুনান, হা/৭৮০-এর টীকা দ্রষ্টব্য।

[28]. আল-মুহাল্লা, ১০/৬০, মাসআলা-১৮৯৯।

[29]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৭৬৮৪।

[30]. আছারুস সুনান, হা/৭৮১-এর টীকা দ্রষ্টব্য।

[31]. তায়সীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ, পৃ. ৭৮।

[32]. উমদাতুল কারী, ১১/১২৭, হা/২০১০-এর অধীনে।