ত্যাগের দীক্ষা দিতে কুরবানী এলো আজ ঘরে ঘরে…
জাবির হোসেন*


[ক]

হে মুসলিম! স্মরণ করো, আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। ইরাকের ব্যাবিলন শহরের একটি জনপদের নাম ছিল উর। যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইবরাহীম e। সেই ইবরাহীম e, যিনি ছিলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত একজন সম্মানিত নবী। নবী হবার পর থেকে যিনি আমৃত্যু পরীক্ষা দিয়েই জীবনযাপন করেছেন। পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়ে যিনি সফলতার উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়েছেন।

স্মরণ করো, নবী ইবরাহীম e-এর কথা। যখন তাঁর সন্তান না হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎ সন্তান দান করুন’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০০)। মহান আল্লাহ তাঁর ফরিয়াদ কবুল করেছিলেন, অতঃপর তাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, যার নাম ইসমাঈল e।

স্মরণ করো, সেই সময়ের কথা, যখন ইবরাহীম e তাঁর শিশুপুত্র ইসমাঈল ও তাঁর স্ত্রী হাজেরা u-কে মক্কার এক বিজন পাহাড়ের উপত্যকায় রেখে আসার ইলাহী নির্দেশ পান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে; যা ছিল একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই, তিনি আরও একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। যে পরীক্ষা বাস্তবিকই ছিল কঠিন। এবারের পরীক্ষা, তার বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র আদরের সন্তান ইসমাঈল e-কে কুরবানী করা।

স্মরণ করো, যখন ইসমাঈল e-এর বয়স ১৩ বছর, তিনি দৌড়ঝাঁপ করতে পারেন; এসময় ইবরাহীম e-কে স্বপ্নে হুকুম দেওয়া হলো যে, তুমি তোমার কলিজার টুকরো সন্তানকে আল্লাহর রাহে কুরবানী করো।

যুলহিজ্জা মাসের অষ্টম তারিখের রাতে তিনি সর্বপ্রথম স্বপ্ন দেখেন যে, তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিজ হাতে যবেহ করছেন। স্বপ্নটি দেখার পরে ওই দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি এই চিন্তায় বিভোর থাকেন যে, এটি আল্লাহর তরফ থেকে সুস্বপ্ন, না-কি দুঃস্বপ্ন। অতঃপর যুলহিজ্জা মাসের নবম তারিখের রাতে তিনি আবার একই স্বপ্ন দেখেন। ফলে এই দিন তিনি জানতে ও বুঝতে পারেন যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যিকার স্বপ্ন। তারপর যুলহিজ্জা মাসের দশম তারিখের রাতে তিনি পুনরায় একই স্বপ্ন দেখেন। তাই ওই দিনে তিনি কুরবানী করতে উদ্যত হন। পরপর তিন রাত স্বপ্ন দেখার পর তার  মনে  যে  প্রতিক্রিয়া  সৃষ্টি  হয়  তারই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত তিনটি দিন তিনটি বিশেষ নামে বিশেষিত হয়েছে। যেমন : যুলহিজ্জার অষ্টম দিনের নাম ‘ইয়াওমুত তারবিয়াহ’ বা চিন্তাভাবনার দিন। নবম দিনের নাম ‘ইয়াওমুল আরাফা’ বা জানার দিন। আর দশম দিনের নাম ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা কুরবানীর দিন।[1]

স্মরণ করো, সেই দিনটি, যেদিন স্বপ্ন দেখার পরে ইবরাহীম e তাঁর পুত্রকে কুরবানী দেওয়ার জন্য তৈরি হলেন। আর পিতা-পুত্র ঘর থেকে বের হয়ে গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে শয়তান তাঁদেরকে প্রতারিত করার জন্য বারবার চেষ্টা করছিল। ইবরাহীম e পরপর সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে শয়তানকে বিতারিত করেন। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এবং মুমিনদেরকে শয়তানের প্রতারণার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ বিষয়টিকে পবিত্র হজ্জের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার জন্য আজও উম্মাতে মুহাম্মাদী হজ্জের সময় তিন জামরায় তিনবার শয়তানের বিরুদ্ধে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকে।

অতঃপর, পিতা-পুত্র আল্লাহর নির্দেশিত কুরবানগাহ ‘মিনায়’ উপস্থিত হলেন এবং সেখানে পৌঁছে তাঁর স্বপ্নের কথা ইসমাঈল e-কে বর্ণনা করলেন, ‘হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন বলো, তোমার অভিমত কী?’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০২)। ইসমাঈল e জবাব দেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০২)। তারপর যখন ইবরাহীম e ও ইসমাঈল e উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইসমাঈল e-কে অধোমুখে শায়িত করে, তাঁর পিতা যবেহ করার জন্য উদ্যত হলেন, তখন মহান আল্লাহ ডাক দিয়ে বললেন, ‘হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্ন বাস্তবেই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০-১০৬)। অতঃপর মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমি এক মহাকুরবানীর মাধ্যমে তাকে মুক্ত করলাম এবং যারা এর পরে আসবে তাদের জন্য এটি স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০৭-১১১)

বর্তমানে উক্ত মিনা প্রান্তরেই হাজীগণ কুরবানী করে থাকেন এবং বিশ্ব মুসলিম ঐ সুন্নাত অনুসরণে ১০ই যুলহিজ্জা বিশ্বব্যাপী শরীআত নির্ধারিত পশু কুরবানী করে থাকেন।[2]

[খ]

মহান আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী সেই তখন থেকে চলে আসছে এই ইবরাহীমী আদর্শের বাস্তবায়ন। আমাদের জন্য বাৎসরিক যে দুটি ঈদ নির্ধারিত হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো— ঈদুল আযহা। এই দিনকে আমরা ‘কুরবানীর ঈদ’ও বলে থাকি। এই দিনে আমরা ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকআত ছালাত সম্পাদনের পরে, শরীআত অনুমোদিত হালাল পশু কুরবানী করে, ইবরাহীম e ও ইসমাঈল e-এর ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ঘটনাকে স্মরণ করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে প্রয়াসী হই। মুসলিম জনসমাজে ছালাত, যাকাত ও হজ্জসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফরয ও সুন্নাত বিষয়সমূহ উপেক্ষিত অবহেলিত পরিলক্ষিত হলেও কুরবানীর মতো ইবাদত ধুমধামের সহিত উদযাপিত হয়ে থাকে।

কুরবানী নিছক কোনো আনন্দানুষ্ঠান নয় যে, তা সাড়ম্বরে পালন করে আনন্দ-উল্লাস, হৈ-হুল্লোড় ও খেল-তামাশার মধ্য দিয়ে দিনটিকে পার করা হবে। বরং কুরবানী হলো একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরবানী ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’। ইসলামের মৌলিক নিদর্শনসমূহের অন্যতম এটি। যা সুন্নাতে ইবরাহীমী হিসাবে আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মাত দ্বারা সাব্যস্ত। আর ইবাদতে যদি বিন্দুমাত্র লৌকিকতা প্রদর্শনের ইচ্ছা থাকে তাহলে তা মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। উল্লেখ্য, ফরয বা নফল যে কোনো ইবাদত মহান আল্লাহর নিকট কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। আর তা হলো :

(১) বিশুদ্ধ ঈমান : শিরক, কুফর ও নিফাকমুক্ত তাওহীদ ও রিসালাতের বিশুদ্ধ ঈমান সকল ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত।

(২) ইবাদতের ইখলাছ : ইখলাছ অর্থ বিশুদ্ধকরণ। ইবাদতটি একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যের সামান্যতম সংমিশ্রণ থাকলে সে ইবাদত আল্লাহ কবুল করবেন না।

(৩) অনুসরণের ইখলাছ : কর্মটি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাতের অনুসরণে পালিত হতে হবে। সুন্নাতের ব্যতিক্রম কর্ম ইবাদত বলে গণ্য নয়।

(৪) হালাল ভক্ষণ : ইবাদত পালনকারীকে অবশ্যই হালাল জীবিকানির্ভর হতে হবে। হারাম ভক্ষণকারীর কোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।[3]

[গ]

কুরবানী হলো ইসলামের ইতিহাসে এক অতুলনীয় বিরল ঘটনা। এটি ইবরাহীম, ইসমাঈল ও মা হাজেরা v-এর পরম ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত ইবাদত। এই ইবাদতটির ইতিহাস রচনার পেছনে পিতা-পুত্র ও মায়ের ভূমিকা ছিল অসামান্য। তাঁদের মধ্যে ছিল বিশ্বাসের সেতুবন্ধন এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা। আদর্শ মানব যেমন— সর্বদা আল্লাহর আদেশ সন্দেহাতীতভাবে মেনে চলে, তারই প্র্যাকটিক্যাল দৃষ্টান্ত রয়েছে তাঁদের পরম আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মধ্যে। তাঁরা ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা স্থাপনকারী, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়—

‘ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার!
ইবরাহিমের মতো আবার
কোরবানি দাও প্রেয় বিভব!
‘জবিহুল্লাহ’ ছেলেরা হোক,
যাক সব কিছু-সত্য রোক!
মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।’

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কী উদ্দেশ্যে কুরবানী করার হুকুম প্রদান করেছেন অথবা কুরবানী থেকে কী শিক্ষা অর্জন করতে বলেছেন, এই বিষয়গুলো আজ উপেক্ষিত। আমাদের এই ইবাদতটি মহান আল্লাহ কবুল করছেন কিনা, সেই দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনও মনে করি না। অথচ ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত রয়েছে, যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। এখন আমরা দেখব, ইবাদত কবুলের পূর্বশর্তের কষ্টিপাথরে যাচাই করে যে, আমাদের এই কুরবানী নামক ইবাদতটি মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে কিনা।

ইবাদত কবুলের প্রথম শর্ত হলো— বিশুদ্ধ ঈমান। আমরা যারা কুরবানী দিই আমাদের ঈমান আছে বলেই তো দিই। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ইবাদত কবুলের দ্বিতীয় শর্ত হলো— ইবাদতের ইখলাছ। অর্থাৎ ইবাদতটি একান্তই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। এই শর্তটি আমাদের অনেকেরই লঙ্ঘিত হয়। আমাদের অনেকেরই কুরবানীর ইবাদতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি গৌণ হলেও, মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় লৌকিকতা এবং সামাজিকতা। লৌকিকতা ও সামাজিকতার বাস্তব উদাহরণ আমরা সমাজে দেখতে পাই ‘কুরবানী না দিলে লোকে বলবে কী, কে কত বেশি মূল্যে পশু ক্রয় করল— তা নিয়ে আত্মতুষ্টি, কার কত বেশি গোশত হলো, কে ঠকলো আর কে জিতল’ ইত্যাদি বাক্যগুলোর মাধ্যমে।

ইবাদত কবুলের তৃতীয় শর্ত হলো— অনুসরণের ইখলাছ। এই শর্তটি আমরা মেনে চলি। আমরা শরীআত সমর্থিত পশু ক্রয় করি। রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাতের অনুসরণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তা যবেহ করি। ইবাদত কবুলের চতুর্থ শর্ত হলো— হালাল ভক্ষণ। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল ভক্ষণের আদেশ ও হারাম ভক্ষণের নিষেধ থাকলেও এই শর্তটি আমাদের অনেকেরই লঙ্ঘিত হয়। আমরা অনেকেই মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা, সূদ, ঘুষ, জুয়া ও জালিয়াতি অথবা সরাসরি হারাম পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকে উপার্জন করি। তারপরও আমরা কুরবানী দিই। এখন আমাদের ভেবে দেখা উচিত, আমরা যারা হারাম উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কুরবানী দিচ্ছি, তা কী মহান আল্লাহর নিকট গৃহীত হচ্ছে?

সবমিলিয়ে বলা চলে, ইবাদত কবুলের পূর্বশর্তের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম ও তৃতীয় শর্ত লঙ্ঘিত না হলেও দ্বিতীয় ও চতুর্থ শর্তটি লঙ্ঘন করছেন অনেক কুরবানীদাতা। এক্ষণে এই কুরবানীদাতাদের জন্য ভেবে দেখার অনুরোধ রইল, আপনার কুরবানী সত্যিই কি মহান আল্লাহ কবুল করছেন, না-কি শুধু গোশত ভক্ষণই হচ্ছে?

[ঘ]

এক্ষণে প্রশ্ন আসতে পারে, কার কুরবানী গৃহীত হবে? উত্তরে বলা যায়, উপরিউক্ত ইবাদত কবুলের পূর্বশর্তগুলো পরিপূরণকারী বান্দা আশা করতে পারেন যে, আপনার কুরবানী মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে। আর অন্যরা, আপনারা হাবীল ও কাবীলের ঘটনাটি স্মরণ করতে পারেন। কুরবানী দিলেই যে তা গৃহীত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কেননা আদম e-এর দুই ছেলের কুরবানী পেশ করার কথা কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আদমের দুই পুত্রের (হাবীল ও কাবীলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। (তাদের একজন) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। (অপরজন) বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন’ (আল-মায়েদা, ৫/২৭)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে— ‘এখানে হাবীল ও কাবীলের কথোপকথনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে যে, সৎকর্ম ও ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহভীতির উপর নির্ভরশীল। যার মধ্যে আল্লাহভীতি নেই, তার সৎকর্মও গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই পূর্ববর্তী আলেমরা বলেছেন, আলোচ্য আয়াত ইবাদতকারী ও সহকর্মীদের জন্য চাবুকস্বরূপ। এজন্যই আমের ইবনু আব্দুল্লাহ c অন্তিম মুহূর্তে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। উপস্থিত লোকেরা বলল, আপনি তো সারা জীবন সৎকর্ম ও ইবাদতে মশগূল ছিলেন। এখন কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, তোমরা একথা বলছ, আর আমার কানে আল্লাহ তাআলার এ বাক্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,﴿إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ﴾ ‘আমার কোনো ইবাদত গৃহীত হবে কিনা তা আমার জানা নেই’ (আল-মায়েদা, ৫/২৭)

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ c বলেন, ‘যদি আমি নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, আল্লাহ তাআলা আমার কোনো সৎকর্ম গ্রহণ করেছেন, তবে এটা হবে আমার জন্য একটি বিরাট নেয়ামত। এ নেয়ামতের বিনিময়ে সমগ্র পৃথিবী স্বর্ণে পরিণত হয়ে আমার অধিকারে এসে গেলেও আমি তাকে কিছুই মনে করব না’। আবূদ্দারদা c বলেন, ‘যদি নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, আমার একটি ছালাত আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে, তবে আমার জন্য এটি হবে সমগ্র বিশ্ব ও তার অগণিত নেয়ামতের চাইতেও উত্তম’। উমার ইবনু আব্দুল আযীয p কোনো এক ব্যক্তিকে পত্র মারফত নিম্নোক্ত উপদেশাবলি প্রেরণ করেন—
আমি জোর দিয়ে বলছি যে, তুমি আল্লাহভীতি অবলম্বন করো। এছাড়া কোনো সৎকর্ম গৃহীত হয় না। আল্লাহভীরু ছাড়া কারও প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয় না, এবং এটি ছাড়া কোনো কিছুর ছওয়াবও পাওয়া যায় না। এ বিষয়ের উপদেশদাতা অনেক, কিন্তু একে কার্যে পরিণত করে— এরূপ লোকের সংখ্যা নগণ্য। আলী c বলেন, ‘আল্লাহভীতির সাথে ছোট সৎকর্মও ছোট নয়। যে সৎকর্ম গৃহীত হয়ে যায় তাকে কেমন করে ছোট বলা যায়’।[4]

[ঙ]

পশু কুরবানীর মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ কোন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন? পশু কুরবানী দিয়ে আমাদের লাভ কী? শুধুই কী গোশত খাওয়া, না-কি অন্য কিছু? এ বিষয়ের দিকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই না। কুরবানীর যে মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, তা সম্পর্কে আমরা অসচেতন। আর কুরবানী থেকে আমাদের যে শিক্ষা লাভ করতে হবে, সে ব্যাপারে আমরা বেখেয়াল। অথচ কুরবানীর মতো ইবাদত মহৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ। এতে আছে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। আর তা হলো :

(১) সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা : কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা হলো, মহান আল্লাহর আনুগত্য; যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইবরাহীম e। তিনি তাঁর সন্তানের প্রতি স্নেহ, দয়া, মায়া ও ভালোবাসা এবং স্ত্রীর প্রতি মুহাব্বত থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহ তাআলার আদেশকে কার্যকর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। মহান আল্লাহর আদেশটি কঠিন না সহজ, তা ভেবে দেখেননি। ‘এটি মহান আল্লাহর হুকুম এবং আমি তাঁর দাস, আমার কর্তব্য হুকুমটি মান্য করা’ এই আদর্শ, এই মন-মানসিকতা ইবরাহীম e-কে সফলতার উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। মহান আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল শর্তহীন— তা সুস্পষ্ট। এখান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাআলার যে কোনো আদেশ, তা সহজ হোক বা কঠিন, তা পালন করার বিষয়ে আমাদেরও মন-মানসিকতা থাকতে হবে ইবরাহীম e-এর মতো। দুনিয়াবী স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিয়ে, মহান আল্লাহর আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুনিয়ার স্বার্থকে দিতে হবে কুরবানী।

(২) তাক্বওয়া অর্জনের শিক্ষা : তাক্বওয়া অর্জন ব্যতীত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। আমাদের জীবনের অন্যতম চাওয়া হলো, মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। কুরবানীর অন্যতম একটি শিক্ষা হলো তাক্বওয়া অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো, তাক্বওয়া কী? ‘তাক্বওয়া’ শব্দের অর্থ- আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা করলে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, যেসব কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাক্বওয়া। মূলত সকল হারাম, নিষিদ্ধ ও পাপ বর্জনকে তাক্বওয়া বলা হয়।[5]

তাক্বওয়ার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে বলা হয় মুত্তাক্বী। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, ‘মহান আল্লাহ মুত্তাক্বীদের কুরবানীই কবুল করেন’ (আল-মায়েদা, ৫/২৭)। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আর আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং না এগুলো রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৭)। অথচ আমরা তাক্বওয়া অর্জনকে গুরুত্ব না দিয়ে বেশি বেশি লৌকিকতা ও সামাজিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছি। ফলস্বরূপ কুরবানী আজ আর মহৎ ইবাদত না হয়ে আমাদের কাছে নিছক একটি গোশত খাওয়ার আনন্দানুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে— ইবরাহিমী চেতনা, ইসমাঈলের আত্মত্যাগ ও মা হাজেরার ধৈর্য।

(৩) ভোগে নয়, ত্যাগেই সফলতার শিক্ষা : কুরবানীর আরও একটি অন্যতম শিক্ষা হলো— ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা। মহান আল্লাহর বিধিবিধান পালনে আমাদেরকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। নিজেদের জীবনের ভেতর যে পশুসুলভ আচরণ আছে, তা ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মূলত মানুষ এবং পশুর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। মানুষের মধ্যে আছে বিবেক ও বোধশক্তি। এই বোধশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ভালো ও মন্দের পার্থক্যে জ্ঞান লাভ করতে পারে; যেটা পশুর পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।

কিন্তু যখন মানুষের বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ মানুষও এক পর্যায়ে পশুর সারিতে অবস্থান করে। একথার সমর্থন পাওয়া যায় পবিত্র কুরআনে— ‘তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না। তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই হলো উদাসীন’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৭৯)

সুতরাং কুরবানীর অন্যতম শিক্ষাই হলো, পশু কুরবানীর মধ্য দিয়ে নিজের প্রবৃত্তির মধ্যে যে পশুত্ব রয়েছে, সেটিকে কুরবানী দেওয়া। নিজেদের আত্ম-সংশোধন ও আত্ম-উন্নয়ন ঘটানো। তবেই কুরবানীর আসল উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে। তাক্বওয়া অর্জিত হবে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কবির ভাষায়—

‘ত্যাগের দীক্ষা দিতে কুরবানী
এলো আজ ঘরে ঘরে,
এই শুভক্ষণে মনের কালিমা
দাও তুমি দূর করে।
মনের পশুকে বলি দাও তুমি,
বলি দাও হিংসার
লোভ লালসার বলি দিয়ে কভু
চলো না সে পথে আর’।[6]

(৪) সমাজের প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের শিক্ষা : পিতা ও পুত্রের বিশ্বাসগত সমন্বয় ব্যতীত কুরবানীর এই গৌরবময় ইতিহাস রচিত হতো না। ইসমাঈল e যদি পিতার অবাধ্য হতেন এবং দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতেন, তাহলে আল্লাহর হুকুম পালন করা ইবরাহীম e-এর পক্ষে হয়তো বা আদৌ সম্ভব হতো না। তাই এ ঘটনার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সমাজের প্রবীণদের কল্যাণময় নির্দেশনা এবং নবীনদের আনুগত্য ও উদ্দীপনা একত্রিত ও সমন্বিত না হলে কখনোই কোনো উন্নত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।[7]

[চ]

মানব জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী দুটি মারাত্মক ব্যাধির নাম হলো হিংসা ও অহংকার। হিংসা ও অহংকার মানুষকে পশুর চাইতে নিচে নামিয়ে দেয়। এরই বাস্তব প্রতিফলন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মুসলিমদের মধ্যে ভাই-ভাই, পিতা-পুত্র, মামা-ভাগ্নে, চাচা-ভাতিজা এক কথায় আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে মারামারি, খুনাখুনি, হিংসা-কলহ-বিদ্বেষ বিদ্যমান। এটি নবী মুহাম্মাদ a-এর শিক্ষা নয়। কারণ তিনি বলেছেন, ‘পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না’।[8]

এই কুরবানীর মধ্য দিয়ে, আমাদের যত হিংসা-বিদ্বেষ ও অহমিকা রয়েছে, সবগুলোকে বিসর্জন দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। হুসনুল খুলূক্ব তথা উত্তম চরিত্র, বিনয় ও নম্রতা নিজেদের জীবনে আনার চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহর বিধি-নিষেধ সম্পর্কে অবগত হতে হবে। নিজেকে সৎকাজে অভ্যস্ত করতে হবে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভ-লালসা কমানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কবির ভাষায়—

‘বলি দাও তুমি হৃদয়ের মাঝে
যত শয়তানী আশা,
মনের ভেতরে সঞ্চিত রেখো
প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা।
আল্লাহকে পেতে ছুটে এসো তুমি
ত্যাগের দীক্ষা নিতে,
এসো এসো আজ যত ভালোবাসা
উজাড় করিয়া দিতে’।[9]

তাই আসুন! কুরবানীর উৎসব যেন আমাদের কাছে নিছকই কোনো গোশত খাওয়ার উৎসবে পরিণত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখি। কুরবানীর মতো মহৎ ইবাদতে কোনো অন্তর্নিহিত শিক্ষাগুলো লুক্কায়িত আছে, সেগুলো সন্ধান করে বাস্তবে প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হই। তাহলে সমাজে ভাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ, সম্প্রীতি, হৃদ্যতাপূর্ণ, বন্ধুত্বসুলভ অনুপম সম্পর্ক গড়ে উঠবে। আমরা সকলে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলার সাথে বসবাস লাভে ধন্য হব ইনশাআল্লাহ।

প্রখ্যাত উর্দূ কবি আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন, ‘যদি আমাদের মাঝে ফের ইবরাহীমe-এর ঈমান পয়দা হয়, তাহলে অগ্নির মাঝে ফের ফুলবাগানের নমুনা সৃষ্টি হতে পারে’।


* এম. এ. (বাংলা), কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

[1]. শায়খ আইনুল বারী আলিয়াভী p, ঈদুল আযহা ও কুরবানী, পৃ. ১৯।

[2]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, নবীদের কাহিনী-১ম খণ্ড, ‘হযরত ইবরাহীম (আ.)’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) ।

[3]. ডঃ খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর p, রাহে বেলায়াত, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স), পৃ. ২৬২-২৬৩

[4]. মুফতী মুহাম্মাদ শফী p, তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন, সূরা আল-মায়েদা, ৫/২৭-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

[5]. ডঃ খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর p, রাহে বেলায়াত, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স), পৃ. ৪১।

[6]. কিছু ব্যথা কিছু কথা (প্রথম খণ্ড), কবিতা: এল কোরবানী, মোহাঃ নুরুল ইসলাম মিয়া, পৃ. ২০।

[7]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, নবীদের কাহিনী-১ম খণ্ড, (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ), পৃ. ১৪০।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৮৪।

[9]. ‘কিছু ব্যথা কিছু কথা’ (প্রথম খন্ড) কবিতা: এলো কোরবানী, মোহাঃ নুরুল ইসলাম মিয়া, পৃ.২০।