দাজ্জাল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা
-আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী*


ভূমিকা :

এ যাবৎ যে সকল আক্বীদাগত বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তন্মধ্যে দাজ্জালের বিষয়টি অন্যতম। দাজ্জালের বিষয়টি রূপক বা অস্পষ্ট নয়। কেননা এ ব্যাপারে মহানবী মুহাম্মাদ a স্পষ্টভাবে আমাদেরকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ‘হিযবুত তাওহীদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা বায়াজীদ খান পন্নী ও ইমরান নজর  হোসেন— উভয়ই দাজ্জাল বিষয়ক ধূম্রজাল ছড়াতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। তন্মধ্যে ইমরান নজর হোসেনের বইগুলো আধুনিকমনা মুসলিম ভাই-বোনদেরকে গোলকধাঁধায় নিমজ্জিত করার ক্ষেত্রে অধিক অগ্রসর হয়েছে। এছাড়াও আসেম ওমরের লিখিত বইগুলোও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করে ফেতনার দ্বার আরও ব্যাপকভাবে উন্মোচন করেছে।

আমাদের এ প্রবন্ধে দাজ্জাল বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাহক্বীক্বসহ আলোকপাত করা হবে, যেন দ্বীনী ভাই-বোনেরা এ ব্যাপারে যাবতীয় অজ্ঞতা থেকে বিরত থাকতে পারেন এবং অন্যদেরকেও সতর্ক করতে পারেন।

দাজ্জালের পরিচয় :

দাজ্জালের পুরো নাম ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’। মাসীহ : মাসীহ-এর অর্থ সম্পর্কে হাফেয ইবনু হাজার p বলেছেন,يُقَالُ إِنَّهُ سُمِّيَ بِذَلِكَ لِكَوْنِهِ يَمْسَحُ الْأَرْضَ وَقِيلَ سُمِّيَ بِذَلِكَ لِأَنَّهُ مَمْسُوحُ الْعَيْنِ ‘বলা হয়, তাকে এই নামে নামকরণ করা হয়েছে কারণ সে পৃথিবী ভ্রমণ করবে। অনেকের মতে, যেহেতু তার একটি চোখ নষ্ট থাকবে তাই এ নামে তাকে নামকরণ করা হয়েছে’।[1] উভয় অর্থটির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। দুটি একই সাথে প্রযোজ্য।

দাজ্জাল : হাফেয ইবনু হাজার p বলেছেন,مِنَ الدَّجَلِ وَهُوَ التَّغْطِيَةُ وَسُمِّيَ الْكَذَّابُ دَجَّالًا لِأَنَّهُ يُغَطِّي الْحَقَّ بِبَاطِلِهِ ‘শব্দটি دجَل (দাজাল) হতে এসেছে। আর তা হলো কোনো কিছুকে আচ্ছাদিত করা। এছাড়াও মিথ্যুককেও দাজ্জাল বলা হয়। কেননা সে বাতিল দ্বারা হক্ব আচ্ছাদিত করে’।[2]

অর্থাৎ বাতিল দ্বারা হক্বকে আচ্ছাদিতকারী, উভয় চোখ বিকৃত ও এক চোখ কানা, মক্কা-মদীনা ব্যতীত সমগ্র বিশ্ব ভ্রমণকারী ব্যক্তিকেই হাদীছে ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’ বলা হয়েছে।

দাজ্জাল সম্পর্কে কতিপয় হাদীছ

মারফূ হাদীছ :

হাদীছ-১ : দাজ্জাল খুরাসান হতে বের হবে।[3] বর্তমানে খুরাসান ইরানে অবস্থিত। হাদীছে আরও কয়েকটি স্থানের নাম উল্লেখ রয়েছে। যার কারণে আমরা অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যাই যে, আসলে দাজ্জাল কোথা হতে বের হবে। নিম্নে হাদীছগুলো তুলে ধরা হলো।-

إِنَّهُ خَارِجٌ خَلَّةً بَيْنَ الشَّأْمِ وَالْعِرَاقِ-

(ক) ‘দাজ্জাল ইরাক ও শামের মাঝে আবির্ভাব লাভ করবে’।

জবাব : দাজ্জাল ইরাক ও শামের মাঝে আবির্ভাব লাভ করবে— হাদীছটি ছহীহ মুসলিম[4] এবং নুআঈম ইবনু হাম্মাদের কিতাবুল ফিতানে[5] বর্ণিত হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় শায়েখ মুহম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন p বলেছেন, يخرج من طريق بين الشام والعراق من قبل إيران  ‘দাজ্জাল শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী একটি পথ দিয়ে বের হবে, যা ইরানের দিক থেকে এসেছে’।[6] অতএব, খুরাসানের হাদীছটির সাথে এ হাদীছের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই।

عَنْ كَعْبٍ قَالَ مَوْلِدُ الدَّجَّالِ بِقَرْيَةٍ مِنْ قُرَى مِصْرَ يُقَالُ لَهُ قُوصَ-

(খ) কা‘ব c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘দাজ্জালের জন্ম হবে মিসরের একটি গ্রামে। যাকে কূছ বলা হয়’।[7]

তাহক্বীক্ব : প্রথমত, হাদীছটি যঈফ। কারণ এর রাবী জাররাহ ইবনু মালীহ অপরিচিত রাবী। ইবনু মাঈন তাকে চিনতেন না।[8] দ্বিতীয়ত, ইসরাঈলী বর্ণনা। তৃতীয়ত, মারফূ হাদীছের বিরোধী। অতএব, এটি বাতিল।   

حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ عَنْ حَنْظَلَةَ عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ هُوَ ابْنُ صَائِدٍ الَّذِي وُلِدَ بِالْمَدِينَةِ-

(গ) সালেম তার পিতা হতে বর্ণনা করে বলেছেন যে, ‘দাজ্জাল হলো ইবনু ছায়েদ, যে মদীনায় জন্মেছে’।[9]

তাহক্বীক্ব : হদীছটি ছহীহ। কিন্তু এটি ইবনু উমারের নিজস্ব উক্তি, যা একাধিক মারফূ হাদীছের বিরোধী হওয়ায় বাতিল। কেননা— ১. দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু ইবনু ছায়েদ মদীনায় থাকত। ২. মাহদী আসার পূর্বে দাজ্জালের আবির্ভাব হবে না। কিন্তু ইবনু ছায়েদ তো মাহদীর আসার আগেই মদীনায় ছিল। আরও অনেক দলীল রয়েছে। এছাড়াও দাজ্জাল বিষয়ক হাদীছগুলোর মধ্যে থাকা বৈশিষ্ট্যাবলির সাথে ইবনু ছায়েদের শারীরিক অবয়বের পুরোপুরি মিল নেই।  

(ঘ) ‘দাজ্জাল কূছ হতে বের হবে’।[10]

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি ছহীহ। তবে এর দ্বারা শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানকেই বুঝানো হয়েছে। অতএব, ছহীহ হাদীছের সাথে এ হাদীছের কোনো সংঘর্ষ নেই। 

عَنِ الْحَسَنِ قَالَ يَخْرُجُ جَيْشٌ مِنْ خُرَاسَانَ يُعْقِبُهُمُ الدَّجَّالُ-

(ঙ) হাসান বাছরী p হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘খুরাসান (ইরান) হতে একটি বাহিনী বের হবে। দাজ্জাল তাদের পিছনে বাহির হবে’।[11]

তাহক্বীক্ব : এটি সরাসরি ছহীহ হাদীছের বিরোধী নয়। কেননা এখানেও খুরাসান হতে দাজ্জালের বের হবার বিষয়টি বলা হয়েছে, যা ছহীহ হাদীছে বর্ণিত।

عَنِ ابْنِ طَاوُسٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ يَخْرُجُ الدَّجَّالُ مِنَ الْعِرَاقِ-

(চ) ‘দাজ্জাল ইরাক হতে বের হবে’।[12]

তাহক্বীক্ব : ইমাম আব্দুর রাযযাক আছ-ছানআনী p মস্তিষ্ক বিকৃতির শিকার হবার পর হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, না-কি আগে তা প্রতীয়মান নয়। অতএব, হাদীছটির সনদ যঈফ। এছাড়াও তিনি তার উস্তাদ মা‘মার হতে গ্রন্থ দেখে বর্ণনা না করলে ভুল করতেন।[13] এখানে তিনি গ্রন্থ দেখে বর্ণনা করেছেন, না-কি না দেখে বর্ণনা করেছেন তাও প্রতীয়মান নয়। ইমাম আব্দুর রাযযাক মুখতালিত্ব রাবী ছিলেন।[14] উল্লেখ্য, তৎকালীন ইরাককে দুভাবে ভাগ করা হতো। একটি আরব ইরাক। অপরটি অনারব ইরাক। এখানে যদি রাবী অনারব ইরাক তথা খুরাসানকে বুঝান তাহলে বর্ণনাটি ছহীহ হাদীছের বিপক্ষে যাবে না। কেননা অনারব ইরাক বলতে খুরাসানকে বুঝানো হতো।[15]

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো, দাজ্জাল খুরাসান হতে বের হবে, যা ইরানে অবস্থিত। এ ব্যতীত অন্যান্য স্থানের নামসম্বলিত বর্ণনাগুলো যঈফ, যার তাহক্বীক্ব প্রদত্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, কূছ, ইছপাহান, কারমান, খাওয ইত্যাদি যত স্থানের কথা রয়েছে সবই ইরানে অবস্থিত। সুতরাং এগুলোর মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। 

হাদীছ-২ : দাজ্জালের সাথে পানি ও আগুন থাকবে। তার আগুন হবে ঠাণ্ডা পানি এবং তার পানি হবে জাহান্নাম।[16]

হাদীছ-৩ : দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে, যেন তা ফোলা আঙুরের ন্যায়।[17]

হাদীছ-৪ : দাজ্জাল স্থূলকায়, লাল বর্ণের, কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট হবে।[18]

হাদীছ-৫ : রাসূলুল্লাহ a ছালাতে দাজ্জালের ফেতনা হতে আশ্রয় চাইতেন।[19]

হাদীছ-৬ : প্রত্যেক নবী স্ব স্ব জাতিকে এক চোখ কানা, মিথ্যাবাদী এই দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। দাজ্জালের দুচোখের মাঝখানে ‘কাফের’ শব্দটি লেখা থাকবে।[20]

হাদীছ-৭ : দাজ্জাল মক্কা-মদীনাতে প্রবেশ করতে পারবে না।[21] এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইবনু ছাইয়াদ বা ইবনু ছায়েদ দাজ্জাল ছিল না। যদি হতো, তাহলে সে মদীনায় থাকতে পারত না। অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘সে সময় দাজ্জাল মদীনায় থাকার সুযোগ পেলেও পরবর্তীতে যখন ক্বিয়ামতের আগে আগে সে বের হবে, তখন সে পুনরায় মক্কা-মদীনা প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না’। বস্তুত এটি একটি ইজতিহাদী মত। যেহেতু এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মতন বা হাদীছের ভাষ্য নেই, সেহেতু একে জোর দিয়ে সঠিক বলা যাবে না।

হাদীছ-৮ : দাজ্জাল মধ্যবয়স্ক যুবক হবে। সে শাম এবং ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে আবির্ভূত হবে। যে তাকে সম্মুখে পাবে, সে যেন সূরা আল-কাহফ এর প্রথম ১০টি আয়াত পাঠ করে।[22]

হাদীছ-৯ : নবী a-এর উম্মত হতে দাজ্জাল বের হবে। অতঃপর সে ৪০ দিন বা ৪০ মাস বা ৪০ বছর অবস্থান করবে। এরপর আল্লাহ ঈসা e-কে প্রেরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন।[23] অর্থাৎ দাজ্জাল অন্য কোনো নবী a-এর উম্মত হতে অতীতে বের হয়নি। পূর্বের নবীগণ স্ব স্ব উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলো দাজ্জালের নবী a-এর উম্মতভুক্ত হওয়া নাকোচ করেনি। 

হাদীছ-১০ : দাজ্জালের চাইতে মারাত্মক কোনো সৃষ্টি আর নেই।[24]

মাওকূফ হাদীছসমূহ :

হাদীছ-১ : দাজ্জাল বের হওয়ার পর লোকেরা তিনটি দলে ভাগ হবে। এক দল তার সাথে লড়াই করবে। অপর দল তার আনুগত্য করবে। অবশিষ্ট তৃতীয় দলটি দূরে চলে যাবে।[25]

হাদীছ-২ : দাজ্জাল বের হওয়ার পর লোকেরা ৪০ বছর জীবিত থাকবে।[26]

হাদীছ-৩ : দাজ্জালের অনুসারীরা অধিকাংশই ইয়াহূদী এবং ব্যভিচারিণী নারীদের সন্তান হবে।[27]

হাদীছ-৪ : একটি নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত গাধায় চড়ে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।[28]

হাদীছ-৫ : দাজ্জাল আরবদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম বাছরাতে প্রবেশ করবে।[29]

বায়াজীদ খান পন্নীর ভ্রান্ত আক্বীদার পর্যালোচনা

অনেকেই দাজ্জালের ‘ব্যক্তি’ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা দাজ্জাল বলতে ‘ইয়াহূদী-খ্রিষ্টান সভ্যতা’-কে উদ্দেশ্য করেন। বহুল সমালোচিত ও অন্যতম একটি গোমরাহ ফেরকা হিযবুত তাওহীদের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর ‘দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!’ নামের বইটি জোরে-সোরে প্রচার করা হচ্ছে। সেখানে অনেক আক্বীদাবিধ্বংসী ভুল বক্তব্য রয়েছে। সবগুলো ভুল উল্লেখ করলে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে। সেজন্য কয়েকটি মাত্র ভুল আলোচনা করা হবে। উল্লেখ্য, মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর উক্তিগুলোকে ‘তার উক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার উক্তি-১ : ‘৪৭৬ বছর আগেই দাজ্জালের জন্ম হোয়েছে এবং সে তার শৈশব, কৈশোর পার হোয়ে বর্তমানে যৌবনে আছে…’।[30]

জবাব : ডাহা মিথ্যা কথা। এর পক্ষে কোনো আয়াত বা ছহীহ হাদীছ নেই। এমনকি কোনো যঈফ বা জাল হাদীছও জানা নেই, যেখানে দাজ্জালের জন্মকাল ও বয়স সম্পর্কে বলা হয়েছে।

তার উক্তি-২ : ‘মহাশক্তিধর পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতাই হোচ্ছে আল্লাহর রসুল বর্ণিত সেই নির্দিষ্ট দাজ্জাল’।[31]

জবাব : এটি মনগড়া, কপোলকল্পিত দাবি। কোনো নির্দিষ্ট সভ্যতাকে দাজ্জাল বলার দলীল নেই। হাদীছে পরিষ্কারভাবে মাসীহুদ দাজ্জাল বলতে একজন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে।

তার উক্তি-৩ : ‘অনেক সত্য হাদীসও সত্য হওয়া সত্ত্বেও এসনাদের অভাবে বাদ পোড়ে গেছে। কোন একটি বিষয়ে পূর্ণ ধারণা করার জন্য প্রয়োজন ঐ বিষয়টি সম্বন্ধে সহিহ, হাসান, দয়ীফ, এমন কি পরিত্যক্ত হাদীসও পর্যালোচনা কোরে একটি সম্যক ধারনা করা। তাতে ঐ বিষয়টি সম্বন্ধে একটি পূর্ণ চিত্র মনে ফুটে ওঠে। দাজ্জাল সম্বন্ধে আলোচনাতেও আমি এই নীতিই গ্রহণ কোরেছি, যদিও ভিত্তি অবশ্যই রোয়েছে ছহিহ হাদীসগুলির ওপর’।[32]

জবাব : এটি হাস্যকর ও অজ্ঞতাসুলভ দাবি। সত্য হাদীছ ইসনাদের (সনদের) অভাবে বাদ পড়ে গেছে মর্মে দাবি করার অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে হেফাযত করতে ব্যর্থ হয়েছেন (নাঊযুবিল্লাহ)। যঈফ, জাল, পরিত্যক্ত হাদীছের দ্বারা কোনো বিষয়ের সম্যক ধারণা পেতে হবে— এটিও একটি বাতিল চিন্তাধারা। আমরা জানি যে, নবী a-এর যুগে পরিত্যক্ত, বাতিল হাদীছ ছিল না। তাই বলে কি সে সময়ে দ্বীনের কোনো বিষয়ে পূর্ণ ধারণা অর্জিত হয়নি?

তিনি যদিও ছহীহ হাদীছকে ভিত্তি করার দাবি করেছেন। কিন্তু স্বীয় দাবি মোতাবেক একটি ছহীহ হাদীছও পেশ করতে সক্ষম হননি।

তার উক্তি-৪ : ‘কিন্তু তার সময়ের মানুষের শিক্ষার স্বল্পতার জন্য তাঁকে বাধ্য হোয়ে দাজ্জালকে রূপকভাবে বর্ণনা করতে হোয়েছে’।[33]

জবাব : (১) মুহাম্মাদ a দাজ্জালের বিষয়টি ‘মাজাযী’ বা রূপকভাবে বর্ণনা করেছেন বলে কোনো দলীল নেই। (২) এ উক্তি দ্বারা তিনি ছাহাবীগণকে স্বল্প শিক্ষিত বলে দাবি করেছেন, যা আদবের খেলাফ, চরম ভ্রান্তিমূলক। আর নবী a বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করাও চরম মিথ্যাচার।

তার উক্তি-৫ : ‘কিন্তু সে রূপক বর্ণনা আজ পরিষ্কারভাবে ধরা দিয়েছে, যদিও আমাদের প্রায়ান্ধ দৃষ্টির জন্য সে বর্ণনাও আমরা বুঝতে সক্ষম হোচ্ছি না’…।[34]

জবাব : নবী a-এর বাণীর মর্ম এতদিন গোপন ছিল (?)। আজ তার অন্তর্নিহিত মর্ম পরিষ্কার হয়েছে টাঙ্গাইলের একজন সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তির উপর (?)। তাও মোহম্মাদ আসাদ নামের একজন ব্যক্তির রচিত ‘রোড টু মেক্কা’ নামের গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে (পৃ. ২)। মোহাম্মদ আসাদও উল্লেখোগ্য কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। আলেম হওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। এটি একেবারেই হাস্যকর এবং উদ্ভট দাবি। এ উক্তিতে বায়াজীদ খান পন্নী সকল স্তরের মানুষদেরকে ‘প্রায়ান্ধ’ বলে তুচ্ছ করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছেন। যাদের মধ্যে ইমাম, মুহাদ্দিছ, মুফাসসির, ফক্বীহ সবাই শামিল হয়েছেন। এটি মূলত লেখকের অবুঝ চিন্তাধারার ফসল।

তার উক্তি-৬ : ‘আল্লাহর রসুল একে দাজ্জাল নামে অভিহিত কোরেছেন। কিন্তু এটা কোন নাম নয়, এটা একটা বর্ণনা, অর্থাৎ বিষয়টার বর্ণনা’।[35]

জবাব : হাস্যকর দাবি। রাসূলুল্লাহ a দাজ্জাল নামের একজন ব্যক্তির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। দলীল সামনে আসছে ইনশা-আল্লাহ। ‘দাজ্জাল’ কোনো বর্ণনা নয়; বরং এটি ব্যক্তির নাম। নাম আর বর্ণনা এক নয়।

তার উক্তি-৭ : ‘আল্লাহ তাঁর নিজের আত্মা, যেটাকে তিনি বোলছেন— আমার আত্মা, সেটা থেকে আদমের মধ্যে ফুঁকে দেওয়া অর্থ আল্লাহর কাদেরিয়াত অর্থাৎ যা ইচ্ছা তা করার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসহ আল্লাহর সমস্ত সিফত, গুণ, চরিত্র আদমের মধ্যে চলে আসা’।[36]

জবাব : এটা একেবারেই ভুল এবং শিরকী কথা। আল্লাহ কখনোই তাঁর সকল ছিফাত আদম e-এর মধ্যে প্রদান করেননি। আদম e মানুষকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখতেন না। তিনি জন্ম-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের ন্যায় কোনো ক্ষমতার তথা গুণের অধিকারী ছিলেন না। তার পুত্র আরেক পুত্রকে হত্যা করার পরও তিনি কিছুই করতে পারেননি। তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে রুখতে পারেননি। আল্লাহ তাঁর কতিপয় গুণ মানুষকে দান করেছেন সীমিত মাত্রায়। যেমন আল্লাহ শ্রবণ করেন এবং সাথে সাথে তিনি সৃষ্টিকেও শ্রবণের গুণ দান করেছেন। কিন্তু সেটি সসীম। অন্যদিকে আল্লাহর সত্তাগত শ্রবণক্ষমতা অসীম। তিনি রহম করেন। আমরাও রহম করি। তবে আমাদের রহম করার বিষয়টি সীমিত। আর আল্লাহর রহম করার কোনো সীমানা নেই। অতএব, তিনি আদমকে সমস্ত ছিফাত দান করেছেন মর্মে দাবি করা শিরকী কাজ। এখানে আল্লাহর ন্যায় গুণাবলিসম্পন্ন আরেকজনকে কল্পনা করা হচ্ছে। (নাঊযুবিল্লাহ)।

অতঃপর ‘দাজ্জালের পরিচিতি’[37] শিরোনামে লেখক কতগুলো হাদীছ এনেছেন। যেমন—

হাদীছ-১ : ‘দাজ্জাল ইহুদী জাতির মধ্যে থেকে উত্থিত হবে এবং ইহুদী ও মোনাফেকরা তার অনুসারী হবে’।[38]

পর্যালোচনা : তিনি এখানে ইয়াহূদী হতে দাজ্জালের আবির্ভাবের কথা বলেছেন এবং ছহীহ মুসলিমের দলীল প্রদান করেছেন। অথচ ছহীহ মুসলিমে এমন কোনো হাদীছ নেই। বরং يَخْرُجُ الدَّجَّالُ فِي أُمَّتِي ‘আমার উম্মতের মধ্য হতে দাজ্জাল বের হবে’ এমনটিই বলা হয়েছে।[39] অন্য হাদীছে এসেছে, ‘ইয়াহূদীগণ তার অনুসারী হবে’। কিন্তু ছহীহ মুসলিমের কোথাও ‘দাজ্জাল ইয়াহূদীর মধ্য হতে হবে’ বলে কোনো হাদীছ নেই। হাদীছকে এভাবে বিকৃত করার শাস্তি ভয়াবহ।

হাদীছ-২ : ‘দাজ্জাল নিজেকে মানুষের রব, প্রভু বোলে ঘোষণা কোরবে এবং মানবজাতিকে বোলবে তাকে রব বলে স্বীকার কোরে নিতে’।[40]

পর্যালোচনা : এ হাদীছটি বর্ণনা করার পর তিনি উদ্ভট কিছু ব্যাখ্যা প্রদান করে এটি প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, পাশ্চাত্যের ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানই এই হাদীছে উদ্দেশ্য। তিনি কোনো হাদীছের নম্বর বা অনুচ্ছেদ, অধ্যায় প্রদান করেননি। আরবী ইবারতও প্রদান করেননি। স্রেফ ‘বোখারী’ লিখে দিয়েছেন। ছহীহ বুখারীর দাজ্জাল বিষয়ক হাদীছগুলোতে এই উক্তিসম্বলিত কোনো হাদীছ আমরা অবগত হতে পারিনি।[41]
(চলবে)


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. ফাতহুল বারী, ৬/৪৭২।

[2]. ফাতহুল বারী, ১৩/৯১; তুহফাতুল আহওয়াযী, ৬/৪০৬।

[3]. মুসনাদে আবী ই‘য়ালা, হা/৩৪; তিরমিযী, হা/২২৩৭; ইবনু মাজাহ, হা/৪০৭২।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭।

[5]. কিতাবুল ফিতান, হা/১৪৯১।

[6]. শরহে রিয়াযুছ ছালেহীন ৬/৬১৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ, হা/৪২৬১।

[7]. কিতাবুল ফিতান, হা/১৪৯৭।

[8]. ইবনু আবী হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তাদীল, রাবী নং ২১৭৬।

[9]. নুআঈম ইবনু হাম্মাদ, আল-ফিতান, হা/১৪৯৯।

[10]. আল-ফিতান, হা/১৫০০, ১৫০২, ১৫০৩।

[11]. আল-ফিতান হা/১৫০১, ১৫০৪।

[12]. আল-ফিতান, হা/১৫০৫।

[13]. সুওয়ালাত ইবনু বুকাইর, পৃ. ২।

[14]. নাসাঈ, আয-যুআফা ওয়াল-মাতরূকূন, রাবী নং ৩৭৯।

[15]. বিস্তারিত দ্র. আবূ উবায়দা মাশহূর হাসান রচিত ‘ফিতান সংক্রান্ত হাদীছ আসারের আলোকে ইরাক’ পৃ. ১৬৯।

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৪।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১২৩।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১২৮।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১২৯।

[20]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৩।

[21]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪৩।

[22]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭।

[23]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪০।

[24]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪৬।

[25]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৩৭৬২৬, সনদ ছহীহ; আরও দেখুন : যুবায়ের আলী যাঈ p রচিত তাহক্বীক্বী মাক্বালাত, ৩/৪১৩।

[26]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৩৭৪৭৬, সনদ হাসান; তাহক্বীক্বী মাক্বালাত, ৩/৪১৪।

[27]. ইমাম আহমাদ, কিতাবুল ই‘লাল, হা/৪১৮১; তাহক্বীক্বী মাক্বালাত, ৩/৪১৪।

[28]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৩৭৫২৫, আলী যাঈ ‘সনদ হাসান’ বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত, ৩/৪১৪।

[29]. ইমাম দারানী, আল-ই‘লালুল ওয়ারিদাহ ফিল ফিতান, হা/৬২৪, তাহক্বীক্বী মাক্বালাতের বরাতে।

[30]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ১, ‘তওহীদ প্রকাশন’।

[31]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩।

[32]. প্রাগুক্ত।

[33]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৪, ‘তওহীদ প্রকাশন’।

[34]. প্রাগুক্ত।

[35]. প্রাগুক্ত।

[36]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৬, ‘তওহীদ প্রকাশন’।

[37]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, ‘দাজ্জালের পরিচিতি’ পৃ. ২৯।

[38]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ২৯।

[39]. ছহীহ মুসিলম হা/২৯৪০, ‘ফিতনা এবং ক্বিয়ামতের আলামত’ অধ্যায়-৫২, অনুচ্ছেদ-২৩।

[40]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৩০।

[41]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১২২-৭১৩৪, ৬/৩৫৩-৩৫৭, কিতাবুল ফিতান, পর্ব-৯২, অধ্যায়-২৬, ‘তাওহীদ পাবলিকেশন্স’।