দাজ্জাল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা
-আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী*
(পর্ব-৩)


হাদীছ-১৩ : ‘আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক দাজ্জালের অনুসরণ কোরবে’।[1]

পর্যালোচনা : তিনি দলীল হিসেবে ‘শারহুস সুন্নাহ’-এর উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। হাদীছটি হলো—

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ يَتْبَعُ الدَّجَّالَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعُونَ أَلْفًا عَلَيْهِمُ السِّيجَانُ.

আবূ সাঈদ খুদরী c বলেছেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার লোক দাজ্জালকে অনুসরণ করবে’।[2]

তাহক্বীক্ব : এটি নিতান্তই যঈফ হাদীছ। (ক) শায়খ আলবানী p যঈফ বলেছেন।[3] তিনি বলেছেন,ضعيف جداً بلفظ أمتي ‘আমার উম্মত’ শব্দ যোগে এটি অত্যন্ত দুর্বল। আমি বলেছি, সনদটি খুবই যঈফ। আবূ হারূনের নাম হলো উমারাহ ইবনু জুয়াইন। হাফেয (ইবনু হাজার) আত-তাকরীব গ্রন্থে বলেছেন, তিনি মাতরূক। তিনি তাদের মধ্য হতে রয়েছেন, যাদেরকে মিথ্যুক বলা হয়েছে।[4] অতঃপর তিনি বলেছেন, লোকেরা বলেন যে, ‘আমার উম্মত’ দ্বারা ‘উম্মতে দাওয়াহ’ হওয়ার সম্ভাবনা আছে— (যদি তাই হয়ে থাকে) তবে এক্ষেত্রে কোন বৈপরীত্য নেই। আমি বলেছি : হ্যাঁ, এটি সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এটি তাবীল। তাবীল ‘তাছহীহ’-এর শাখা। যতক্ষণ হাদীছটি ছহীহ হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাবীলের প্রতি কোনো আহ্বায়ক থাকবে না।[5] (খ) শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ p বলেছেন, ‘এর সনদ খুবই দুর্বল। বাগাবী p এটি শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।[6] এতে আবূ হারূন আল-আবদী নামী মাতরূক (পরিত্যক্ত, যাকে বাতিল করা হয়েছে) রাবী রয়েছেন। যিনি মিথ্যার দোষে অভিযুক্ত। আর ছহীহ মুসলিমের হাদীছটি (হা/২৯৪৪) এর  বিরোধী’।[7]   (গ)  মোল্লা  আলী  কারী  হানাফী p বলেছেন, قِيلَ فِي سَنَدِهِ أَبُو هَارُونَ وَهُوَ مَتْرُوكٌ ‘বলা হয়েছে, এর সনদে আবূ হারূন রয়েছেন। আর তিনি মাতরূক’।[8]

এটি ছহীহ মুসলিমের হাদীছেরও সরাসরি বিরোধী। আনাস ইবনু মালেক c বলেছেন, রাসূল a বলেছেন,يَتْبَعُ الدَّجَّالَ مِنْ يَهُودِ أَصْبَهَانَ سَبْعُونَ أَلْفًا عَلَيْهِمُ الطَّيَالِسَةُ ‘ইস্পাহানের ৭০ হাজার ইয়াহূদী দাজ্জালের অনুগত হবে। যাদের পরনে ত্বায়ালিসা (এক ধরনের সেলাইবিহীন লম্বা চাদরজাতীয় পোশাক) থাকবে’।[9]

অতএব, রাসূল a-এর উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার লোক তাকে অনুসরণ করবে বলে দাবি করা বাতিল।

উল্লেখ্য, উম্মত দুই প্রকার— (১) উম্মতে ইজাবাহ : যারা নবীর দাওয়াতকে কবুল করেছেন। (২) উম্মতে দাওয়াহ : যারা নবীর দাওয়াতকে কবুল করেননি। তবে দাওয়াত পেয়েছেন। দাজ্জাল নবী a-এর উম্মত বলতে ‘উম্মতে দাওয়াহ’-এর অন্তভুর্ক্ত।

হাদীছ-১৪ : ‘দাজ্জালের শক্তি, প্রভাব ও প্রতিপত্তি পৃথিবীর সমস্ত মাটি ও পানি (ভূ-ভাগ ও সমুদ্র) আচ্ছন্ন কোরবে। সমস্ত পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ চামড়া দিয়ে জড়ানো একটি বস্তুর মত তার করায়ত্ত হবে’।[10]

পর্যালোচনা : এমন কোনো হাদীছ নেই। এর কাছাকাছি একটি হাদীছ রয়েছে। তা হলো, وَإِنَّهُ سَيَظْهَرُ عَلَى الْأَرْضِ كُلِّهَا إِلَّا الْحَرَمَ وَبَيْتَ الْمَقْدِسِ ‘অচিরেই দাজ্জাল হারাম এবং বায়তুল মাক্বদেস ব্যতীত সমগ্র যমীনকে জয় করবে’।[11] যা হাদীছে নেই তা রাসূল a-এর দিকে সম্বন্ধিত করা হারাম।

হাদীছ-১৫ : ‘আরবে এমন কোন স্থান থাকবে না যা দাজ্জালের পদতলে না আসবে না সেখানে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি না থাকবে’।[12]

পর্যালোচনা : তিনি ছহীহ বুখারী এবং মুসলিমের উদ্ধৃতি প্রদান করলেও এই গ্রন্থদ্বয়ে এমন কোনো হাদীছ আমরা পাইনি। বরং এটা ঐ হাদীছের বিরোধী, যেখানে বলা হয়েছে

যে, ‘দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না’।[13]

হাদীছ-১৬ : ‘দাজ্জাল পৃথিবীর সর্বত্র যেতে পারবে ও যাবে কিন্তু মক্কা ও মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। মদীনায় প্রবেশের প্রত্যেক দরজায় দু’জন করে মালায়েক (ফেরেশতা) পাহারা দিবে যারা দাজ্জালকে সেখানে প্রবশ করতে দিবে না’।[14]

পর্যালোচনা : তিনি আবূ বাকরাহ c এবং ফাতেমা বিনতে ক্বায়েস g-এর বর্ণিত ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। ছহীহ বুখারীতে আবূ বাকরাহ বর্ণিত হাদীছটি ‘ফিতান’ অধ্যায়-এর মধ্যে দাজ্জাল সম্পর্কিত আলোচনা অনুচ্ছেদে আছে।[15] কিন্তু এ হাদীছে মক্কার কথা নেই। কেবল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না বলে বলা হয়েছে। ফাতেমা বিনতে ক্বায়স g-এর বর্ণিত হাদীছটিতে মক্কা ও মদীনার কথা আছে।[16]

হাদীছ-১৭ : ‘আল্লাহর রাসূল দাজ্জালকে কখনো কখনো মাসীহ উল-কাযযাব বোলে আখ্যায়িত কোরেছেন (আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে মোসলেম)। আবার কখনো কখনো তাকে মাসীহ উদ্-দাজ্জাল বোলেও বর্ণনা করেছেন (আবু হোরায়রা (রা) থেকে বোখারী ও মোসলিম, আবু বাকরাহ (রা) ও ওবাদাহ বিন ছামেত (রা) থেকে আবু দাউদ)। ঐ একই শব্দ মাসীহ রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য নবী ঈসা (আ) সম্বন্ধেও ব্যবহার কোরেছেন’।[17]

পর্যালোচনা : (ক) আবূ সাঈদ খুদরী c বর্ণিত হাদীছে রয়েছে, يَخْرُجُ الدَّجَّالُ فَيَتَوَجَّهُ قِبَلَهُ رَجُلٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ‘দাজ্জাল বের হবে এবং একজন মুমিন তার প্রতি মনোনিবেশ করবে’।[18] লেখকের দাবি মোতাবেক দাজ্জালের আবির্ভাবের ৪৭৬ বছর হয়ে গিয়েছে।[19] তাহলে হাদীছে বর্ণিত এই লোকটিকে হত্যার কাজ দাজ্জাল এখনো করল না কেন?

(খ) ছহীহ বুখারীর অসংখ্য স্থানে ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’ শব্দটি এসেছে। তন্মধ্যে একটি হাদীছে এসেছে— ‘একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ মানুষকে দেখলাম যার বাম চোখ কানা যেন তা ফোলা আঙুরের ন্যায়’।[20] এ হাদীছে স্পষ্টভাবে ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’-কে পুরুষ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আফসোস তিনি মাসীহুদ দাজ্জাল শব্দদ্বয় অবলোকন করতে পারলেও পুরুষ শব্দটি অবলোকন করতে পারলেন না।

(গ) ছহীহ মুসলিমের অসংখ্য স্থানেই ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’ শব্দটি এসেছে। তবে ছহীহ বুখারীর উপরিউক্ত হাদীছটি (হা/৫৯০২) ছহীহ মুসলিমেও আছে।[21] অথচ এখানেও তিনি ‘পুরুষ মানুষ’ শব্দটি এড়িয়ে গিয়েছেন।

(ঘ) আবূ দাঊদের একাধিক স্থানে ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’ শব্দটি এসেছে। একটি হাদীছে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই মাসীহ দাজ্জাল একজন বেটে মানুষ’।[22] লেখকের উদ্ধৃত উবাদাহ ইবনু ছামেত c বর্ণিত এই হাদীছেও একেবারেই স্পষ্ট ভাষায় দাজ্জালকে ‘একজন বেটে মানুষ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাদীছ-১৮ : ‘ঈসা (আ) দাজ্জালকে হত্যা কোরবেন [আব্দুল্লাহ বিন ওমর থেকে মুসলিম এবং নাওয়াস বিন সামআন (রা) থেকে মুসলিম ও তিরমিযী]’।[23]

পর্যালোচনা : এটি যে হাদীছে এসেছে, সেখানেও দাজ্জালের পুরুষ ব্যক্তি হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ রয়েছে। নাওয়াস ইবনু সামআন c-এর হাদীছটির আলোচনা গত হয়েছে।

দাজ্জাল সংক্রান্ত কতিপয় অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা :

হাদীছ-১ :

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ثَلَاثٌ مِنْ أَصْلِ الْإِيمَانِ الْكَفُّ عَمَّنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَلَا نُكَفِّرُهُ بِذَنْبٍ وَلَا نُخْرِجُهُ مِنَ الْإِسْلَامِ بِعَمَلٍ، وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ، وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ، وَالْإِيمَانُ بِالْأَقْدَارِ.

আনাস ইবনু মালেক c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় মূল ঈমানভুক্ত। যে বলবে, ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ তার ক্ষতি করা হতে বিরত থাকা। তাকে আমরা পাপের কারণে কাফের আখ্যায়িত করব না এবং তাকে ইসলাম হতে বেরও করে দিব না। আমাকে পাঠানোর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহতভাবে চালু আছে এবং থাকবে। অতঃপর উম্মতের জিহাদকারী দল সর্বশেষ দাজ্জালের সাথে জিহাদ করবে’।[24]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। হাফেয যাহাবী,[25] ইবনু হাজার,[26] শাওক্বানী,[27] আযীমাবাদী,[28] উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী,[29] আলবানী[30] এবং যুবায়ের আলী যাঈ[31] এ হাদীছের রাবী ইয়াযীদ ইবনু আবী নুশবাকে ‘মাজহূল’ তথা ‘অজ্ঞাতপরিচয় রাবী’ বলেছেন।

হাদীছ-২ : ‘ভয়ংকর যুদ্ধ, কনস্টান্টিনোপল বিজয় এবং দাজ্জালের আবির্ভাব সাত মাসের মধ্যে ঘটবে’।[32]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। এখানে দুজন সমালোচিত রাবী আছেন।

রাবী-১ : আবূ বকর ইবনু আবী মারইয়াম। তার সম্পর্কে ইমামগণ বলেছেন—

(ক) ইবনু হাজার p বলেছেন,أبو بكر ابن عبد الله ابن أبي مريم الغساني الشامي وقد ينسب إلى جده قيل اسمه بكير وقيل عبد السلام ضعيف وكان قد سرق بيته فاختلط من السابعة আবূ বকর ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু আবী মারইয়াম… যঈফ। তিনি ইখতিলাত্বে পতিত হয়েছিলেন। তিনি সপ্তম স্তরভুক্ত’।[33]

(খ) শায়খ আলবানী p বলেছেন, قلت: وهذا سند ضعيف من أجل أبي بكر بن أبي مريم كان اختلط ‘আমি বলেছি, এই সনদটি যঈফ আবূ বকর ইবনু আবী মারইয়ামের কারণে। তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছিল’।[34]

(গ) আযীমাবাদী p বলেছেন,فِي إِسْنَادِهِ أَبُو بَكْرٍ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ وَهُوَ أَبُو بَكْرِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ أَبِي مَرْيَمَ الْغَسَّانِيُّ الشَّامِيُّ قِيلَ اسْمُهُ بُكَيْرٌ وَقِيلَ اسْمُهُ كُنْيَتُهُ وَقِيلَ بَكْرٌ وَقِيلَ عَبْدُ السَّلَامِ وَلَا يُحْتَجُّ بِحَدِيثِهِ ‘এর সনদে আবূ বকর ইবনু আবী মারইয়াম আছেন। আর তিনি হলেন আবূ বকর ইবনু আব্দুল্লাহ আবূ মারইয়াম আল-গাসসানী আশ-শামী। বলা হয়, তার নাম বুকাইর। …তার হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না’।[35]

(ঘ) আব্দুর রহমান মুবারকপূরী p বলেছেন,وفِي إِسْنَادِهِ أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ وَهُوَ ضَعِيفٌ ‘এর সনদে আবূ বকর ইবনু আবী মারইয়াম আছেন। তিনি যঈফ রাবী’।[36]

(ঙ) যুবায়ের আলী যাঈ p যঈফ বলেছেন।[37]

রাবী-২ : ইয়াযীদ ইবনু কুত্বাইব।

(ক) তিনি মাজহূল রাবী। যুবায়ের আলী যাঈ p তাকে ‘মাজহূলুল হাল’ বলেছেন।[38]

(খ) ইবনু হাজার p বলেছেন,يزيد ابن قطيب بموحدة مصغر السكوني مقبول من السادسة ‘ইয়াযীদ ইবনু কুত্বাইব… মাক্ববূল রাবী’।[39] অর্থাৎ অন্যের সমর্থন বা সাক্ষ্য পেলে তার হাদীছ মাক্ববূল তথা গ্রহণীয় হবে। নতুবা যঈফ হবে।

হাদীছ-৩ : ‘বড় যুদ্ধ এবং মদীনা বিজয়ের মাঝে ছয় বছরের ব্যবধান রয়েছে। আর দাজ্জাল বের হবে সপ্তম বছরের মধ্যে’।[40]

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি যঈফ। এর রাবী ইবনু আবী হেলাল মাজহূল রাবী।[41]

হাদীছ-৪ : ‘প্রত্যেক উম্মতে মাজূসী আছে। আর এই উম্মতের মাজূসী তারা, যারা বলে যে, ভাগ্য বলে কিছু নেই। যে এর উপর (ভাগ্য নেই মতবাদে বিশ্বাসের উপর) মারা যাবে, তার জানাযাতে শরীক হবে না। তাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা করবে না। আর তারা হলো দাজ্জালের অনুসারী’।[42]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। عَنْ رَجُلٍ مِنَ الْأَنْصَار তথা ‘কোনো একজন আনছারী ব্যক্তি হতে’ বর্ণনা করা হয়েছে। আনছারী ব্যক্তিটির সম্পর্কে কোনো তথ্য আমরা অবগত হতে পারিনি।

হাদীছ-৫ : ‘দাজ্জালের বাবা-মা ৩০ বছর অতিবাহিত করবে। তাদের কোনো সন্তান হবে না। অতঃপর তাদের একটি সন্তান হবে, যার চোখ হবে অন্ধ। সে অধিক অনিষ্টকারী এবং কম উপকারী হবে। তার দুচোখ ঘুমাবে। কিন্তু তার অন্তর ঘুমাবে না। তার পিতা হবে লম্বা, হালকা-পাতলা গড়নের। তার নাক হবে পাখির ঠোঁটের মতো। তার মা হবে মোটা, স্থূলকায়’।[43]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। আলী ইবনু যায়েদ ইবনু জাদ‘আন যঈফ রাবী।[44] অপর রাবী হাম্মাদ ইবনু সালামাহও সমালোচিত। তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছিল এবং তিনি সমালোচিত রাবী।[45]

হাদীছ-৬ : ‘যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম তিনটি আয়াত পাঠ করবে, সে দাজ্জালের ফেতনা হতে মুক্তি পাবে’।[46]

তাহক্বীক্ব : এটি শায বর্ণনা। সুতরাং যঈফ। শায়খ আলবানী p শায বলেছেন।[47] যুবায়ের আলী যাঈ p ‘শায’ বলেছেন।[48]

সূরা কাহফের প্রথম তিন আয়াত বা শেষের আয়াতসমূহ নয়। বরং প্রথম ১০ আয়াত পাঠ করলে দাজ্জালের ফেতনা হতে মুক্তি পাওয়ার হাদীছটি ছহীহ। হাদীছটি নিম্নরূপ—

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّال.

আবূ দারদা c হতে বর্ণিত, নবী a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত হিফয করবে সে দাজ্জাল হতে মুক্তি পাবে’।[49]

হাদীছ-৭ : ‘দাজ্জাল ও মাহদী একই ব্যক্তি’।[50]

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি মুনকার। যা যঈফ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত।[51]

হাদীছ-৮ : ‘দাজ্জাল জাসাদ তথা রূহবিহীন সত্তা হবে’।

তাহক্বীক্ব : একথা কোনো হাদীছে বর্ণিত হয়নি। তবে কিছু লেখক এমনটা দাবি করেছেন।[52]

জাসাদ মানে আত্মাবিহীন শরীর কথাটি হাদীছবিরোধী। আমরা যদি হাদীছে যাই, তাহলে এর জবাব পেয়ে যাব। যেমন—

كَانَ النَّبِيُّ يَأْخُذُ ثَلاَثَةَ أَكُفٍّ وَيُفِيضُهَا عَلَى رَأْسِهِ ثُمَّ يُفِيضُ عَلَى سَائِرِ جَسَدِهِ.

‘নবী a তিন অঞ্জলি পানি নিলেন এবং তা তার মাথায় ঢাললেন। অতঃপর তিনি তার সারা দেহে প্রবাহিত করলেন’।[53] এই হাদীছে দেহ বুঝাতে جَسَد (জাসাদ) শব্দটি এসেছে। তাহলে কি নবী a-এর দেহ আত্মাবিহীন ছিল? যদি কেউ বলে যে, নবী a-এর দেহ মুবারক আত্মাবিহীন ছিল, তাহলে কি তার ঈমান থাকবে? অবশ্যই থাকবে না। কেননা এটা নবী a সম্পর্কে নিতান্তই ভুল আক্বীদা। আর এটা জানা কথা যে, নবী a সম্পর্কে প্রতিটি মুসলিমকে সঠিক আক্বীদা পোষণ করতে হবে।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ k قَالَ أَمَّرَ رَسُولُ اللَّهِ فِي غَزْوَةِ مُؤْتَةَ زَيْدَ بْنَ حَارِثَةَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ إِنْ قُتِلَ زَيْدٌ فَجَعْفَرٌ وَإِنْ قُتِلَ جَعْفَرٌ فَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ كُنْتُ فِيهِمْ فِي تِلْكَ الغَزْوَةِ فَالْتَمَسْنَا جَعْفَرَ بْنَ أَبِي طَالِبٍ فَوَجَدْنَاهُ فِي القَتْلَى وَوَجَدْنَا مَا فِي جَسَدِهِ بِضْعًا وَتِسْعِينَ، مِنْ طَعْنَةٍ وَرَمْيَةٍ.

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ a যায়েদ ইবনু হারেছা c-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি যায়েদ c শহীদ হয়, তাহলে জা‘ফর ইবনে আবূ তালেব c সেনাপতি হবে। যদি জা‘ফর c শহীদ হয়ে যায়, তাহলে আব্দুল্লাহ ইবনু রওয়াহা c সেনাপতি হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h বলেন, ঐ যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমরা জা‘ফর ইবনু আবূ তালেব c-কে অনুসন্ধান করলাম। এরপর আমরা তাকে শহীদদের মাঝে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তীরের ৯০টিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেলাম।[54]

উক্ত হাদীছেও جَسَد (জাসাদ) শব্দটি বর্ণিত হয়েছে। ছাহাবী জা‘ফর ইবনু আবূ তালেব c কি তাহলে আত্মাবিহীন ব্যক্তি ছিলেন? নাঊযুবিল্লাহ। তাছাড়াও হাদীছে দাজ্জালকে সরাসরি যুবক ও পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, তার দেহে রূহ আছে। সুতরাং ‘দাজ্জাল আত্মাবিহীন সত্তা’ বলা চরম বিভ্রান্তিকর।

হাদীছ-৯ : ‘দাজ্জাল জেরুজালেম হতে বের হবে’।

তাহক্বীক্ব : এর পক্ষে কোনো জাল হাদীছও নেই; ছহীহ বা হাসান তো দূরের কথা। আমরা এর পক্ষে কোনো জাল সনদও পাইনি। বরং বাইবেলে এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়।[55]

হাদীছ-১০ : ‘দাজ্জাল জেরুজালেম হতে শাসনকার্য চালাবে’।

তাহক্বীক্ব : এটিও ভিত্তিহীন দাবি। এটি কোনো হাদীছ নয়। বরং কিছু বক্তা বাইবেলের কথাগুলোকে হাদীছের বক্তব্য মনে করে এ জাতীয় আজগুবি কথা বিশ্বাস করেছেন ও তা প্রচার করে যাচ্ছেন।

হাদীছ-১১ : ‘সুলায়মানের সিংহাসনে বসে থেকে দাজ্জাল সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে’।

তাহক্বীক্ব : এটি হাদীছ তো নয়ই; বরং চরম হাস্যকর কথা। যেহেতু হাদীছে এ জাতীয় কোনো বক্তব্য নেই, সেহেতু এমন দাবি করা মিথ্যাচারের নামান্তর।

(চলবে)


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৪৬।

[2]. তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/৫৪৯০।

[3]. বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ, হা/৪২৬৫; মিশকাত, হা/৫৪৯০।

[4]. সিলসিলা যঈফা, হা/৬০৮৮।

[5]. প্রাগুক্ত।

[6]. শারহুস সুন্নাহ, হা/৪২৬৫, ১৫/১২।

[7]. তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/৫৪৯০, ৩/২৭৭।

[8]. মিরকাতুল মাফাতীহ, ৮/৩৪৮১।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪৪।

[10]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৪৮।

[11]. হাকেম, আল-মুসতাদরাক, হা/১২৩০।

[12]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৪৯।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩২।

[14]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৫০।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১২৫, ৭১২৬।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪২।

[17]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৫১।

[18]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৮, ৭২৬৭।

[19]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ১।

[20]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯০২।

[21]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯।

[22]. আবূ দাঊদ, হা/৪৩২০, হাদীছ ছহীহ।

[23]. দাজ্জাল? ইহুদী-খৃষ্টান সভ্যতা!, পৃ. ৫২।

[24]. আবূ দাঊদ, হা/২৫৩২।

[25]. আল-কাশেফ, রাবী নং ৬৩৬১।

[26]. আত-তাকরীব, রাবী নং ৭৭৮৫।

[27]. নায়লুল আওত্বার, ৭/২৫১।

[28]. আওনুল মা‘বূদ, ৭/১৪৭।

[29]. মিরআতুল মাফাতীহ, ১/১৩৪, ১৩৭।

[30]. যঈফ আবূ দাঊদ, হা/৪৩৭, ২/৩১১।

[31]. আবূ দাঊদ, ৩/৭৯।

[32]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৫; তিরমিযী, হা/২২৩৮।

[33]. আত-তাকরীব, রাবী নং ৭৯৭৪।

[34]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১২৮১।

[35]. আওনুল মা‘বূদ, হা/৪২৯৫-এর হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.।

[36]. তুহফাতুল আহওয়াযী, হা/১০১২, ২২৩৮।

[37]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৫, ৪/২৯৪।

[38]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৫, ৪/২৯৪।

[39]. তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৭৭৬৪।

[40]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৬।

[41]. হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ p, আনওয়ারুছ ছহীফা, পৃ. ১৫৩।

[42]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৯২।

[43]. তিরমিযী, হা/২২৪৮; মিশকাত, হা/৫৫০৩।

[44]. তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৪৭৩৪।

[45]. বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করুন : মুহাক্কিক্ব ইরশাদুল হক্ব আসারী রচিত আহাদীছে হিদায়া ফান্নী ওয়া তাহক্বীক্বী হাইসিয়াত, পৃ. ৯৯-১০৩। (গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশের অপেক্ষায়)।

[46]. তিরমিযী, হা/২২৬৮; মিশকাত, হা/২১৪৬।

[47]. সিলসিলা যঈফা, হা/১৩৩৬।

[48]. তাহক্বীক্ব মিশকাত, ১/৬৯৬।

[49]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮০৯; মিশকাত, হা/২১২৬; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১০২১।

[50]. ইবনু মাজাহ, হা/৪০৩৯।

[51]. সিলসিলা যঈফা, হা/৭৭।

[52]. ইমরান নজর হুসেন, দাজ্জাল, কুরআন ও ইতিসহাসের সূচনা, পৃ. ৮৫।

[53]. ছহীহ বুখারী, হা/২৫৬।

[54]. ছহীহ বুখারী, হা/৪২৬১।

[55]. যাখারিয়া, ৯ : ৯ : ১০; ইযখিল, ৩৭ : ২১ : ২২।