দাজ্জাল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা
-আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী*
(শেষ পর্ব)


হাদীছ-২১ : ঈসা e বলেছেন, ‘আমার থেকে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তনের ওয়াদা নেওয়া হয়েছে। তবে কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান আল্লাহ ব্যতীত আর কারো নেই। আমি দুনিয়াতে অবতরণ করে দাজ্জালকে হত্যা করব’।[1]

তাহক্বীক্ব : যঈফ। এর রাবী মুসির দুর্বল রাবী।[2]

হাদীছ-২২ : ‘মসজিদ চাকচিক্যময় হওয়া দাজ্জাল আবির্ভাবের আলামত’।

তাহক্বীক্ব : লাইছ ইবনু আবী সুলাইমের কারণে হাদীছটি যঈফ।[3]

হাদীছ-২৩ : ‘মাসীহ দাজ্জাল ছাড়াও আরও দুজন দাজ্জাল বের হবে। তন্মধ্যে একজন হলো দাজ্জাল আলইয়াস। সে আল্লাহর বান্দাদেরকে খেয়ে ফেলবে’।

তাহক্বীক্ব : মুনকার হাদীছ। এতে একাধিক রাবীর ত্রুটি রয়েছে।[4]

হাদীছ-২৪ : ‘দাজ্জাল ছাহাবীদের মতো উত্তম অথবা তার চাইতে অধিক উত্তম মুমিনদের একটি গোত্র পাবে’।

তাহক্বীক্ব : যঈফ হাদীছ।[5] একই সাথে একটি কুফরী আক্বীদাও বটে। কেননা উম্মতের মধ্যে কেউই ছাহাবীর মতো উত্তম হতে পারবে না। তাদের চেয়েও অধিক উত্তম হওয়া তো দূরের কথা।

হাদীছ-২৫ : ‘যারা তাক্বদীর অস্বীকার করে, তারা দাজ্জালের অনুসারী’।

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি মুনকার।[6]

হাদীছ-২৬ : ‘যারা দ্বীন বেচে দুনিয়া ক্রয় করে, তারা দাজ্জালের অনুসারী’।

তাহক্বীক্ব : জাল হাদীছ।[7]

হাদীছ-২৭ : ‘দাজ্জাল ১ হাজার তাঁতি নিয়ে বের হবে’।

তাহক্বীক্ব : জাল হাদীছ।[8]

হাদীছ-২৮ : ‘কিয়ামতের প্রথম বড় আলামত হবে দাজ্জালের আবির্ভাব’।

তাহক্বীক্ব : জাল হাদীছ।[9]

কল্পকাহিনী :

(১) ‘দাজ্জাল বর্তমানে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কিংবা ড্রাগন ট্রায়াঙ্গলে আছে’।

জবাব : এ জাতীয় আজগুবি কথা ছহীহ হাদীছ তো দূরে থাক; কোনো জাল হাদীছেও নেই। এগুলো বিভিন্ন লেখক তাদের বইতে স্রেফ কল্পকাহিনীর উপর ভিত্তি করে নতুন চমকদার তথ্য হিসেবে প্রচার করছে। যা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়া বিভিন্ন রকম চটকদার তথ্য প্রদান করেছে। আর সেগুলোকেই আমাদের কিছু দ্বীনী ভাই-বোন লুফে নিয়ে দাজ্জালের সাথে জুড়ে দিয়ে প্রসার করে যাচ্ছেন। যা নেহায়াত অন্যায়। আছেম উমারের মতো লেখকরা তাদের বইতে এ জাতীয় অনেক উদ্ভট কথা বলে মুসলিমদেরকে গোমরা করে যাচ্ছেন।

(২) ‘দাজ্জাল ফ্রিমেসনের আড়ালে লুকিয়ে থেকে কলকাঠি নাড়ছে’।

জবাব : দাজ্জাল এখনো বের হয়নি। সুতরাং বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। যদিও দাজ্জাল দুনিয়াতেই আছে। তবে কোথায় কীভাবে আছে তার কোনো বিবরণ কুরআন-হাদীছে নেই। সুতরাং আমাদের বিবরণ খোঁজারও কোনো প্রয়োজন নেই। যখন সময় হবে তখন ঠিকই বিশ্ববাসী তা অবলোকন করবে।

(৩) ‘হাদীছে বর্ণিত দাজ্জালের গাধা বলতে বর্তমানে আকাশে দৃষ্ট রহস্যময় ফ্লাইং সোসারকে বুঝানো হয়েছে’।

জবাব : না। দাজ্জাল আসার আগেই তার বাহন দৃষ্টিগোচর হবে এমন কোনো কথা হাদীছে নেই। যদি থাকত তাহলে এ জাতীয় কল্পনার একটি হলেও ভিত্তি আছে বলে ধারণা করা যেত। তাছাড়া ফ্লাইং সোসারের গায়ে ইংরেজিতে লেখা নাম রয়েছে। ছবিগুলো নেটে সহজলভ্য। তাহলে দাজ্জাল ইংরেজিতে তার বাহনের নাম লিখেছে?

(৪) ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে সময় থেমে থাকে। আর হাদীছে আছে যে, দাজ্জাল আসার পর সময় থেমে যাবে বা সময় পরিবর্তন হবে’।

জবাব : সময় থেমে যাবে মর্মে কোনো হাদীছ নেই। তবে ক্বিয়ামতের পূর্বে সময়ের পরিবর্তন ঘটবে বলা হয়েছে। কিন্তু সেটি গোটা বিশ্বব্যাপী ঘটবে। কেবল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে সময় পরিবর্তন ঘটবে আর অন্য স্থানগুলোতে সময় স্থির থাকবে এমন কোনো কথা বা ইশারা-ইঙ্গিত হাদীছে নেই। সুতরাং এগুলো হাস্যকর যুক্তি ও খেয়ালী কথা-বার্তা বৈ কিছুই নয়।

(৫) ‘পেন্টাগন দাজ্জালের হেডকোয়ার্টার’।

জবাব : দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তার সাথে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনোরূপ যোগাযোগ হবে না। যদি হতো তাহলে হাদীছে তা বর্ণিত থাকত। কিন্তু এমন কোনো কথা হাদীছে পাওয়া যায় না। অতএব, পেন্টাগনের সাথে দাজ্জালের কোনোরূপ সম্পর্ক থাকার দাবি ইসলাম কর্তৃক সমর্থিত নয়। এগুলো নিছকই দাবি। যার কোনো শারঈ ভিত্তি নেই।

(৬) ‘ডেভিড কপার ফিল্ড-সহ ইউরোপীয় বেশ কিছু ম্যাজিক শো-তে দাজ্জাল সরাসরি সাহায্য করে থাকে’।[10]

জবাব : ভিত্তিহীন দাবি।

(৭) ‘ইউরোপ আমেরিকাসহ অমুসলিম শক্তিদেরকে দাজ্জাল মদদ যোগাচ্ছে। ফলে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আজ মুসলিম বিশ্বকে একের পর এক গ্রাস করছে’।

জবাব : তারা নিজেদের চেষ্টায় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। এখানে দাজ্জাল নামক ব্যক্তির কোনোই সংযোগ নেই। মুসলিম শাসকগণ যদি একত্র হয়ে ক্ষমতা বর্ধায়নে এগিয়ে আসেন তাহলে তারাও বিশ্বের যে কোনো পরাশক্তিকে হারিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতার মালিক হবেন ইনশাআল্লাহ। মূলত মিসরের ঈসা দাঊদ নামক এক ব্যক্তি এসব দাবি করেছেন। যার কোনো শারঈ ভিত্তি তিনি দেখাতে পারেননি। আর তিনি কোনো গ্রহণযোগ্য আলেমও নন; একজন সাধারণ গবেষক। যার কাজ হলো আজগুবি তথ্য দিয়ে মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করা। দাজ্জাল যদি আজ অমুসলিম শক্তিকে এত শক্তিশালী করতে পারে তাহলে নবী a এবং ছাহাবীদের যামানায় সে কেন ইসলামবিরোধী শক্তিকে জোরদার করল না?

(৮) ‘দাজ্জাল বিজ্ঞানী আইনেস্টাইনের সাথে দেখা করে তাকে থিওরি অব রিলেটিভিটির জ্ঞান প্রদান করার ফলে আইনস্টাইন বিষয়টি নিয়ে গ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম হয়’।

জবাব : আষাঢ়ে গল্প। বিশ্বাস করার কোনোই যুক্তি নেই।

(৯) ‘নাসা নিজের কোনো গবেষণা প্রকাশ করার যোগ্যতা রাখে না। বরং দাজ্জালের গবেষণাগুলোই কপি করে থাকে মাত্র’।

জবাব : চরম হাস্যকর ও উদ্ভট দাবি। নাসা যোগ্যতার ভিত্তিতে দক্ষ গবেষক নিয়োগ করে নিজেরাই গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে দাজ্জালের কোনো হাত নেই।

(১০) ‘ইমাম মাহদী ও তার বাহিনীর সাথে একত্র হবার জন্য যে সকল মুসলিম মুজাহিদ কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে দাজ্জাল পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে এবং সমগ্র ইসলামবিরোধী শক্তিকে সে একত্র করে ধ্বংসাত্মক কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে’।

জবাব : অবাস্তব দাবি। ইমাম মাহদীর সাথে কারা যুক্ত হবেন, এখন তা মোটেও স্পষ্ট নয়। ব্রেলভীরা দাবি করবে যে, তারা যুক্ত হবেন। অন্যদিকে দেওবন্দীরা দাবি করবেন যে, তারাই মাহদীর প্রকৃত অনুসারী হবে। এভাবে প্রত্যেকটি দল স্ব স্ব দাবিতে অটল থেকে স্বীয় দাবিকে সঠিক প্রমাণের জন্য নানা যুক্তি পেশ করতে থাকবে। এক্ষণে কারা প্রকৃত অনুসারী হবে? এর জবাব সে সময়ই মিলবে। তার আগে নয়।

(১১) ‘ধূমকেতু তথা লেজবিশিষ্ট তারকা হলো দাজ্জালের আবির্ভাবের আলামত’।

জবাব : এখানে একটি হাদীছকে ভিত্তি করা হয়েছে, যা হাকেম বর্ণনা করেছেন। ‘হাদীছ-১৪’-এর অধীনে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, দাজ্জাল একজন শরীরবিশিষ্ট মানুষ হবে। ইয়াহূদী-খ্রিষ্টান সভ্যতাকে দাজ্জাল বলে হাদীছে বর্ণিত মানব দাজ্জালকে অস্বীকার করা বাতিল ও কুফর। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝার তওফীক্ব দিন- আমীন!


* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. ইবনু মাজাহ, হা/৪০৮১।

[2]. সিলসিলা যঈফা, হা/৪৩১৮।

[3]. সিলসিলা যঈফা, হা/৪৪৪৭।

[4]. সিলসিলা যঈফা, হা/৫০৭৬।

[5]. সিলসিলা যঈফা, হা/৫০৯৯।

[6]. সিলসিলা যঈফা, হা/৫৭১৪।

[7]. সিলসিলা যঈফা, হা/৫৯৮৮।

[8]. সিলসিলা যঈফা, হা/৬০৮৫।

[9]. সিলসিলা যঈফা, হা/৬৫৫০।

[10]. আসেম ওমর, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল ও দাজ্জাল পৃ. ৬৪।